জীবন্ত কিংবদন্তি সু চি

Nov 10, 2015 09:48 am

 


দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তখনো শেষ হয়নি। ১৯৪৫ সালের ৯ জুন। মিয়ানমারের অবিসংবাদিত নেতা ইউ অং সান এবং কিন চি-এর ঘরে জন্ম নিলো তাদের তৃতীয় সন্তান। কী নাম দেয়া যায়? মিয়ানমারে বাবা-মায়ের নামেই সন্তানের নাম দেয়া বেশ প্রচলিত। বাবা-মা সবাই চান তার নামেরই প্রাধান্য থাকুক। অবশেষে নাম দেয়া হলো বাবার নাম থেকে ‘অং সান’ এবং মায়ের নাম থেকে ‘চি’। এ দিকে দাদীও চান তার নামও থাকুক নাতনীর নামের সাথে। তাই দাদীর নাম ‘সু’ও ঢোকানো হলো। অবশেষে নাম দাঁড়াল ‘অং সান সু চি’। তাকে নিয়ে লিখছেন মুহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান

 

অং সান সু চির বয়স যখন মাত্র দুই বছর, কোনো কিছু বুঝতে শেখার আগেই বাবা অং সান শিকার হলেন হত্যাকাণ্ডের। দুই ভাই এবং মা-ই তার পৃথিবী। সু চির বয়স যখন আট বছর, বড় ভাই অং সান লিন তখন পানিতে ডুবে মারা যান।
এ দিকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য থেকে সদ্যস্বাধীন মিয়ানমারের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে আবির্ভূত হন মা কিন চী। ১৯৬০ সালে মা কিন চি-কে ভারত ও নেপালে বার্মিজ অ্যাম্বাসেডর হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। সপরিবারে চলে যান দিল্লিতে। সু চি পড়াশোনার জন্য প্রথমে ভর্তি হন দিল্লির যিশু অ্যান্ড মেরি স্কুলে এবং পরে লেডি শ্রীরাম কলেজে।
পরে উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমান নিউ ইয়র্কে। গ্র্যাজুয়েশন করেন দর্শন, রাজনীতি ও অর্থনীতিতে। এ দিকে ১৯৬২ সালে নিজের দেশে সামরিক সরকার ক্যুর মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে।
গ্র্যাজুয়েশনের পর নিউ ইয়র্কে মা থান ই নামে এক পারিবারিক বন্ধুর বাড়িতে থাকতেন তিনি।
১৯৭২ সালে সু চি বিয়ে করেন ব্রিটিশ নাগরিক ও শিক্ষাবিদ ড. মাইকেল এরিসকে। পরের বছরই জন্ম হয় ছেলে আলেক্সান্ডার এরিসের। ১৯৭৭ সালে জন্ম হয় দ্বিতীয় সন্তান কিম। কিমের জন্মের কিছুদিন পর তিনি পিএইচডি শুরু করেন। ১৯৮৫ সালে লাভ করেন পিএইচডি। স্বামী-সন্তান তিনজনই ব্রিটিশ নাগরিক।

 

আততায়ীর হাতে নিহত হন বাবা অং সান
আততায়ীর হাতে নিহত হয়েছেন অং সান সু চির বাবা অং সান। মিয়ানমারের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রধান নেতা ও সমরনায়ক ছিলেন তিনি।
জন্মগ্রহণ করেন ১৯১৩ সালে মিয়ানমারের নাটমাউক শহরে। বাবা উ ফা কেন্দ্রীয় মিয়ানমারের (তৎকালীন বার্মা) মাগওয়ে জেলার নাটমাউক শহরের আইনজীবী ছিলেন। মায়ের নাম দাও সু। মিয়ানমারের প্রভাবশালী একটি পরিবারে জন্ম অং সানের। তার দাদার ভাই বো মিন ইয়া উং ১৮৮৬ সালে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়েছিলেন। অং সান নাটমাউকের বৌদ্ধ মন্দিরের স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা এবং ইয়েনাঙ্গিয়া উং হাইস্কুল থেকে মাধ্যমিক শিক্ষা লাভ করেন।
মেধাবী ছাত্র হিসেবে পরিচিত অং সান রাজনীতিতে যোগ দেন ইয়াঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়। অল্প সময়েই পরিণত হন একজন ছাত্রনেতায়। তিনি ইয়াঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ইউনিয়নের কার্যনির্বাহী সভায় নির্বাচিত হন এবং তাদের ম্যাগাজিন ওয়ের সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন।
পরে তিনি ‘অ্যান্টি ফ্যাসিস্ট পিপলস ফ্রিডম লিগ’ প্রতিষ্ঠা করেন। এই সংগঠনই মিয়ানমারের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দেয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিয়ানমারে জাপানি বিমান হামলা চলাকালীন অং সান মিয়ানমারের প্রতিরক্ষামন্ত্রী নিযুক্ত হন। ১৯৪৫ সালে তিনি মিয়ানমারের জাতীয় সেনাবাহিনীর কমান্ডার নিযুক্ত হন এবং মিত্রবাহিনীর সাথে একাত্মতা ঘোষণা করেন। ১৯৪৭ সালে মিয়ানমারের আইনসভার নির্বাচনে এএফপিল নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে এবং দলটি মিয়ানমারের পূর্ণ স্বাধীনতার ডাক দেয়। অং সান তখন মিয়ানমারের অস্থায়ী সরকারের প্রধান ছিলেন।
১৯৪৭ সালের ১৯ জুলাই মিয়ানমারের স্বাধীনতাচুক্তি স্বাক্ষরের মাত্র ছয় মাস আগে আততায়ীর গুলিতে অং সান ও তার কিছু গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী নিহত হন। আজো মিয়ানমারের জনগণ তাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে এবং ‘বগিয়োকে’ (জেনারেল) ডাকনামে তাকে ডেকে থাকে।

 

সাইকেলে ঘোরা থেকে প্রেম, পরে বিয়ে
ষাটের দশকের কথা। যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে সাইকেলে করে ঘুরে বেড়াতেন সুন্দর এক বার্মিজ মেয়ে। ভিন্ন দেশের এমন সুন্দর একটি মুখ দেখে মুগ্ধ হন অক্সফোর্ডের শিক্ষার্থী মাইকেল এরিস। আশপাশের মানুষের কাছে জানতে চান, ‘এমন সুন্দর মেয়েটা কে?’ উত্তরে জানতে পারেন, বার্মার (বর্তমান মিয়ানমার) কোনো জেনারেলের মেয়ে, নাম অং সান সু চি।
গল্প আর এগোনোর কথা নয়। কারণ সু চির বাবা অং সান মিয়ানমারের বিপ্লবী নেতা ও আধুনিক সেনাবাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা। তার নেতৃত্বেই দেশটি ব্রিটিশদের এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্ত হয়, স্বাধীনতা অর্জন করে। যদিও এর ছয় মাস আগেই তাকে হত্যা করা হয়। এমন পরিবারের মেয়ে নিজ দেশের কাউকেই জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নেবেন, এমনটাই সবাই প্রত্যাশা করেছিল।
কিন্তু সু চির জীবনের চিত্রনাট্য এমন প্রত্যাশায় চলেনি। কিউবায় জন্ম নেয়া ও যুক্তরাজ্যে পড়াশোনা করা লম্বা-সুদর্শন মাইকেল এরিসের সাথে ১৯৬৭ সালে তার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। হিমালয়ান কিংডম নিয়ে গবেষণা করার বিষয়ে এরিসের ব্যাপক আগ্রহ ছিল। পরে এসব বিষয় নিয়েই তিনি কাজ করেন।
সেই আগ্রহ থেকেই অক্সফোর্ডে পড়াশোনা করা এরিস ভুটানের রাজপরিবারের শিক্ষক হিসেবে কাজ করতেন। তখন দু’জনের মধ্যে চিঠি চালাচালি চলে। কিছু চিঠি এখন অক্সফোর্ডের এক গ্রন্থাগারে আছে। সু চির জীবনীমূলক বই ‘পারফেক্ট হোসটেজ’-এর লেখক জাস্টিন উইন্টলি জানিয়েছেন, এরিসকে লেখা এক চিঠিতে সু চি লিখেছিলেন, ‘আমার দেশের জনগণের আমাকে প্রয়োজন। এ দায়িত্ব পালনে আমাকে তোমার সহযোগিতা করতে হবে।’ ১৯৭২ সালে এরিসের সাথে ঘর বঁাঁধেন সু চি।

 

সুখের সংসার নাড়িয়ে দেয় একটি ফোন
বিয়ের এক বছর পর সু চি-এরিসের কোলে আসে প্রথম সন্তান। ১৯৭৭ সালে দ্বিতীয় সন্তান। স্বামী এরিস পড়াশোনায় মন দিলেন। সু চি তখন ঘরের কাজ, ছেলেদের দেখাশোনা, কাপড় সেলাই, সবার আগে বন্ধুদের কাছে বড়দিনের কার্ড উপহার পাঠানো এভাবেই দিন কাটাচ্ছিলেন। এরিস পড়াশোনা শেষ করে অক্সফোর্ডে শিক্ষকতা শুরু করেন। সু চি ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনে ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজ বিভাগে পিএইচডির পড়াশোনা শুরু করেন।
কিন্তু ১৯৮৮ সালে তাদের সুখের সংসারটা নাড়িয়ে দেয় মিয়ানমার থেকে আসা একটি ফোন। ‘ফ্রিডম ফ্রম ফিয়ার’ বইয়ে এরিস লিখেছেন, ‘১৯৮৮ সালের মার্চের শেষ দিন। আমাদের দুই ছেলে ঘুমিয়ে পড়েছে। আমরা দু’জন পড়াশোনা করছিলাম। এমন সময় ফোনটা বেজে উঠল। সু চি ফোনটা ধরল। ওই প্রান্ত থেকে জানানো হলো, সু চির মা হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছেন। খবরটা শুনেই সে ব্যাগ গোছাতে শুরু করল। তখনই বুঝলাম; আমাদের জীবনটা চিরদিনের মতো বদলে যাচ্ছে।’ স্বামী-সন্তানদের যুক্তরাজ্যে রেখে দেশে ফেরেন সু চি।
মিয়ানমারে চলছিল অস্থিরতা
সু চি যখন দেশে ফিরছিলেন ওই সময় মিয়ানমারে চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা চলছিল। সামরিক জান্তা ছাত্রসহ সাধারণ মানুষের ওপর চড়াও হয়। তিন হাজারের মতো লোককে হত্যা করা হয়। এ অবস্থার প্রতিবাদ জানিয়ে বাবার আদর্শকে ধারণ করে সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেন সু চি। ১৯৯০ সালের সাধারণ নির্বাচনে সু চির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্র্যাসি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। তবে সামরিক জান্তা তাকে সরকার গঠন করতে দেয়নি, গৃহবন্দী করে। সেই থেকে গত দুই দশকের মধ্যে ১৫ বছর গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী সু চি গৃহবন্দী অবস্থায় থেকেছেন।

 

স্বামীর সাথে শেষ ১১ বছরে দেখা হয় মাত্র একবার
১৯৯১ সালে শান্তিতে নোবেল পান সু চি। তখন এরিস বিশ্ব সম্প্রদায়কে জানান, ‘পরিবারের সদস্য হিসেবে সু চির সাথে আমাদের কোনো ধরনের যোগাযোগ করতে দেয়া হয় না। তার অবস্থা সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি না। শুধু জানি, তিনি একা গৃহবন্দী আছেন। তাকে তার বাড়িতে রাখা হয়েছে, নাকি অন্য কোথাও সরিয়ে নেয়া হয়েছে সেটাও আমাদের জানা নেই।’
এরিসের সাথে সু চির দেখা হয় সাত বছর পর, ১৯৯৫ সালের বড়দিনে। এটাই ছিল তাদের শেষ দেখা। ১৯৯৯ সালে এরিস ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। মৃত্যুর আগে তিনি বারবার স্ত্রীর সাথে দেখা করার জন্য আবেদন জানালেও সামরিক জান্তা সে সুযোগ দেয়নি। জীবদ্দশায় এরিস তিব্বত ও ভুটান নিয়ে অনেক গবেষণামূলক কাজ করেছেন। গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের জন্য স্ত্রী সু চির কাজের কথা সারা বিশ্বে পৌঁছে দিতেও তিনি সোচ্চার ছিলেন। এরিস দুই সন্তানকে বড় করেছেন। আলেক্সান্ডার এরিস যুক্তরাষ্ট্রে দর্শন নিয়ে কাজ করছেন। আর ছোট ছেলে কিম যুক্তরাজ্যেই উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়েছেন বলে বলা হয়। ২০১০ সালে সু চি মুক্তি পাওয়ার ১০ দিন পর বড় ছেলে আলেক্সান্ডারের সাথে তার দেখা হয়। সেটাও মা-ছেলের ১০ বছর পর দেখা। মায়ের সাথে দেখা করার জন্য বারবার আবেদন করে তিনিও অনুমতি পাননি।

 

জীবনের বড় সময় কেটেছে চার দেয়ালের ঘেরাটোপে
অং সান সু চির জীবনের বড় একটা সময় কেটেছে চার দেয়ালের ঘেরাটোপে। গণতন্ত্রের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন তিনি। মুক্ত হয়েই চষে বেড়িয়েছেন রাজনীতির ময়দান। ১৯৮০-এর দশকে সক্রিয় রাজনীতিতে অংশ নেন সু চি। ২২ বছরের বেশি সময় ছিলেন গৃহবন্দী। মুক্তি পান ২০১০ সালের নভেম্বরে। ১৯৮৮ সালে দেশে ফিরলে সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে দেশব্যাপী বিক্ষোভে অন্তত তিন হাজার লোকের প্রাণহানি ঘটে। ১৯৮৯ সালে তিনি গৃহবন্দী হন এবং ১৯৯০ সালের নির্বাচনে তার দল এনএলডি বিশাল ব্যবধানে জিতলে সু চির দলের কাছে ক্ষমতা তুলে দেয়নি জান্তা সরকার।
এত সব বাধার পাহাড় পেরিয়ে লক্ষ্যে অবিচল সু চি একুশ শতকের দ্বিতীয় দশকের প্রথমার্ধে এসে আক্ষরিক অর্থেই গণতন্ত্রের মশাল প্রজ্বলিত করলেন।

 

পছন্দকে প্রাধান্য, বিসর্জনকে নয়
মিয়ানমারের বিরোধীদলীয় নেত্রী অং সান সু চি ২০১৩ সালের অক্টোবরে রোমের সম্মানসূচক নাগরিকত্ব পান। ১৯৯৪ সালে তাকে এ নাগরিকত্ব দেয়া হয়। তবে দুই দশকের বেশির ভাগ সময় মিয়ানমারে গৃহবন্দী ছিলেন সু চি। ফলে তিনি এ পুরস্কার গ্রহণ করতে পারেননি। দীর্ঘ ১৯ বছর পর তিনি এই পুরস্কার গ্রহণ করেন।
পুরস্কার গ্রহণের সময় ইতালির রাজধানী রোমের টাউন হলে এক অনুষ্ঠানে বিনম্র সু চি জীবনে বিশেষ কিছু করার কথা অস্বীকার করে বলেন, তিনি তার জীবনে পছন্দকে প্রাধান্য দিয়েছেন, বিসর্জনকে নয়।

 

সু চির সেকেন্ড হোম ভারত
ভারতকে অং সান সু চি সেকেন্ড হোম বলে মনে করেন। ২০১৪ সালের নভেম্বরে মিয়ানমারে অনুষ্ঠিত আসিয়ান সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাথে এক বৈঠকে এ মন্তব্য করেন সু চি। মিয়ানমারের পার্ক রয়্যাল হোটেলের প্রেসিডেন্সিয়াল স্যুটে দুই নেতার মধ্যে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়।
এর আগে ২০১৩ সালের নভেম্বরে ভারত সফর করেন ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্র্যাসি দলের প্রধান অং সান সু চি। এ ছাড়া শৈশবে সু চি বেশ কয়েক বছর ভারতে কাটিয়েছেন। তখন তার মা দো খিন ই ভারতে মিয়ানমারের দূত ছিলেন। সে সময় দিল্লির লেডি শরিরাম কলেজে লেখাপড়া করেন সু চি। এ ছাড়া ১৯৮৭ সালে ইনস্টিটিউট অব অ্যাডভান্সড স্টাডি ইন শিমলায় উচ্চতর গবেষণা করেন।

 

উপনির্বাচনের মাধ্যমে পার্লামেন্টে সু চির অভিষেক
সব প্রতীক্ষার অবসান। শ্বাসরুদ্ধ করা দেশ মিয়ানমার সরকারের আমন্ত্রণে ২০১২ সালের ২৩ এপ্রিল পার্লামেন্টে অভিষেক হয় অং সান সু চির। পার্লামেন্টের শূন্য আসনের উপনির্বাচনে সু চি ও তার দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্র্যাসি-এনএলডির বিশাল জয়ের পর মিয়ানমারের সেনাসমর্থিত সরকার এ আমন্ত্রণ জানায়।
অং সান সু চিসহ দলের আরো ৩৬ জন নির্বাচিত সদস্যকে নতুন করে পার্লামেন্ট অধিবেশন শুরুর জন্য রাজধানী নেইপিডোয় যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়। টেলিফোনে এই আমন্ত্রণ পাওয়ায় দলের চেয়ারপারসন অং সান সু চিসহ নির্বাচিত সদস্যরা ২৩ এপ্রিল অনুষ্ঠেয় পার্লামেন্টের নি¤œকক্ষের অধিবেশনে যোগ দেন।
পাঁচ দশক ধরে সামরিক শাসনের যাঁতাকলে পিষ্ট মিয়ানমারের পার্লামেন্টে সু চির এই উপস্থিতি সবার কাছে অনেক বড় একটি অগ্রগতি হিসেবেই গণ্য হয়।
এ বছর ১ এপ্রিল মিয়ানমারে অনুষ্ঠিত উপনির্বাচনে পার্লামেন্টের ৪৫টি আসনে ভোট হয়। এর মধ্যে শান্তিতে নোবেল বিজয়ী সু চির দল এনএলডি জয় পায় ৪৩টি আসনে। এনএলডির এ বিজয় সেনাসমর্থিত ক্ষমতাসীন দলের জন্য বড় ধাক্কা। এর আগে ২০১০ সালের সাধারণ নির্বাচন বয়কট করে সু চির দল। তবে এ ৪৩ আসন নিয়ে সু চি দেশটির ক্ষমতার ভারসাম্য আনতে পরেননি। কারণ পার্লামেন্টের ৬৫৯টি আসনের মধ্যে এক-চতুর্থাংশই সেনাবাহিনীর হাতে। বাকি ৮০ শতাংশ আসনে আসীন রয়েছে সেনাসমর্থিত রাজনৈতিক দল ইউএসডিপি। তার পরও তার এ অভিষেক দেশটি যে গণতন্ত্রের পথে হাঁটতে যাচ্ছে, তা মনে করছেন অনেকে।

 

দৃষ্টি প্রেসিডেন্ট নির্বাচন
মিয়ানমারের প্রিয় কন্যা অং সান সু চি ক্ষমতায় আসীন হওয়ার বেশ কাছাকাছি বলা চলে।
শান্তিতে নোবেল জয়ী সু চি প্রায় দুই দশক আটক ছিলেন। মুক্তির পর প্রেসিডেন্ট হওয়ার আকাক্সক্ষা ব্যক্ত করেন তিনি। কিন্তু দেশটির বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী কোনো নাগরিকের জীবনসঙ্গী বা সঙ্গিনী অথবা সন্তান যদি ভিন্ন কোনো দেশের নাগরিক হন তাহলে তিনি রাষ্ট্রপ্রধান হতে পারবেন না। সু চির প্রয়াত স্বামী মাইকেল এরিসের সাথে তাদের দুই সন্তান আলেক্সান্ডার এবং কিম উভয়ই জন্মগতভাবে ব্রিটেনের নাগরিক।
ইউএসডিপি সংবিধান সংশোধনে তাদের দাবিগুলো উপস্থাপন করেছে। এর মধ্যে প্রার্থীর স্বামী বা স্ত্রীর মিয়ানমারের নাগরিক হওয়ার বাধ্যবাধকতা বাদ দেয়ার বিষয়টি রয়েছে। অং সান সু চি এ বিষয়ে মন্তব্য করেন, এটা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী। এ ছাড়াও প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের নাগরিকত্বের বিষয়টি তিনি অপ্রাসঙ্গিক বলে অভিহিত করেন।
বর্তমান সংবিধানে শুধু তার প্রেসিডেন্ট হওয়ার ক্ষেত্রে বাধ্যবাধকতা রয়েছে তা-ই নয়। একই সাথে সংবিধান সংশোধনের যেকোনো প্রচেষ্টা রোধ করার ক্ষমতা দেয়া রয়েছে সেনাপ্রধানকে।
সামরিক বাহিনীর নিবিড় তত্ত্বাবধানে বর্তমান সংবিধান প্রণয়ন করা হয়েছিল। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠা হওয়ার পরও রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ বহাল রাখতে এমন করা হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। এ জন্যই সহজে অনুমেয় সংবিধান পরিবর্তনের দাবি কেন এত জোরেশোরে শোনা যাচ্ছে।
আর যদি এটি হয়, অনেকেরই প্রত্যাশা, নির্বাচনে জয়ী হয়েই ক্ষমতায় যাবেন অং সান সু চি।

 

মানবাধিকার সংরক্ষণের ক্ষেত্রে হতাশার নাম সু চি
দীর্ঘ গৃহবন্দিত্বকে বেশ সাহসিকতার সাথে মোকাবেলা করেন অং সান সু চি। এ সময়ে শক্ত নৈতিক অবস্থানের জন্য বিশ্বব্যাপী খ্যাতি অর্জনও করেছেন তিনি। কিন্তু দেশের বাইরে অনেকের কাছে এবং দেশেও তার ওই অবস্থান দুর্বল হয়ে গেছে বড় একটি ইস্যুতে নীরবতার কারণে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মিয়ানমারের সিনিয়র গবেষক ডেভিড ম্যাথিয়েসন বলেছেন, ‘আমি মনে করি মানবাধিকার সংরক্ষণের ক্ষেত্রে তিনি একটা হতাশার নাম।’
এই নোবেল বিজয়ীর খ্যাতি বিশ্বজোড়া এবং যেকোনো বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব মিয়ানমার ভ্রমণ করলে তার সাথে দেখা করেন, ছবি তোলেন এবং সেসব ছবি সম্মানের সাথে টাঙিয়ে রাখেন।
কিন্তু পর্যবেক্ষকদের মতে, অর্ধশতকের পর মিয়ানমার হয়তো কর্তৃত্বপরায়ণ সামরিক সরকারের হাত থেকে মুক্তি পাচ্ছে। কিন্তু সংখ্যালঘু মুসলিম রোহিঙ্গাদের ওপর হামলার ব্যাপারে এই নারীর কোনো কথা বলতে ব্যর্থ হওয়াকে অনেক বড় ব্যর্থতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এ নিয়ে অংসান সু চির সমালোচনার যথেষ্ট জায়গা রয়েছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের নির্বাহী পরিচালক কেনেথ রথ একটি প্রতিবেদনে বলেছেন, ‘এটা ধরে নেয়া বিশ্ববাসীর জন্য ভুল হবে যে, মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হওয়া এই সম্মানিত নারীও মানবাধিকার রক্ষাকর্মী হয়ে যাবেন।’
এখন মানবাধিকার নিয়ে তার নীরবতার ব্যাখ্যা বিভিন্ন জন বিভিন্নভাবে দিয়েছেন। এটাকে অনেকেই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নীরবতা হিসেবে দেখছেন!
মানবাধিকার রক্ষার এই স্পষ্টভাষী রক্ষক কেন হঠাৎ করে তার মুখ বন্ধ করে দিয়েছেন?
এটাকে ডেভিড ম্যাথিয়েসন ‘একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নীরবতা’ হিসেবে দেখছেন।
তিনি মনে করেন, সু চি ও তার দল এনএলডি মিয়ানমারের রাজনীতিতে শক্ত অবস্থানের জন্য এমনটি করছেন।
রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর হামলার ঘটনার কেন তিনি নিন্দা জানাচ্ছেন না জানতে চাইলে সিডনিতে এক সভায় সু চি বলেছেন, ‘লোকজন নিন্দা চায় না, চায় আত্মরক্ষা। আমি নিন্দা জানাচ্ছি না। কারণ আমি দেখেছি যে নিন্দায় কোনো সুফল পাওয়া যায় না।’
তবে তার ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা দ্য আরাকান প্রজেক্টের পরিচালক ক্রিস লিউয়া।
সু চির অবস্থানকে ‘চরম হতাশাজনক’ মন্তব্য করে তিনি বলেছেন, এতে সহিংসতাকারীদেরই সবুজ সঙ্কেত দেয়া হচ্ছে।
তিনি বলেছেন, রোহিঙ্গা আর বৌদ্ধদের সহিংসতাকে এক পাল্লায় মেপেও সু চি ভুল করছেন।
এই রাজনৈতিক বন্দী যিনি নিজেকে ‘সবসময়ের জন্য রাজনীতিবিদ’ হিসেবে দেখেছেন এবং বারবারই এটা বলে আসছেন যে, তিনি মিয়ানমারের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হতে চান।