আমৃত্যু প্রেসিডেন্টের জন্য ভোট

Feb 15, 2017 11:26 am


আলফাজ আনাম

তুর্কমেনিস্তানের প্রেসিডেন্ট গুরবানগুলি বেরদিমুহামেদভ তৃতীয়বারের মতো সাত বছরের জন্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। বিশে^র চতুর্থ বৃহত্তম জ্বালানি মজুদের এই দেশের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খুব একটা আলোচনা ছিল না। বেরদিমুহামেদভ যে নির্বাচনে বিজয়ী হবেন তা আগে থেকেই নিশ্চিত ছিল। প্রেসিডেন্টের শক্ত কোনো প্রতিদ্বন্দ্বীও ছিল না। নির্বাচনে অবশ্য সাতজন প্রার্থী ছিল। যার মধ্যে ছিলেন সরকারি কর্মকর্তা, রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানির ম্যানেজার কিংবা বর্তমান প্রেসিডেন্টের প্রতি অনুগত রাজনৈতিক দলের নেতা। এদের অনেকের নামও ভোটাররা জানেন না। এরা কেউই বেরদিমুহামেদভের প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বী নন। বিরোধী রাজনীতি চালুর পথ তিনি আগেই রুদ্ধ করে দিয়েছেন।


৫৯ বছর বয়সী দন্তচিকিৎসক ও সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী বেরদিমুহামেদভ ২০০৬ সালে নিয়াজভের মৃত্যুর পর দেশটির ক্ষমতা গ্রহণ করেন। এর পর থেকে একনায়কতান্ত্রিক কায়দায় দেশ শাসন করছেন। তুর্কমেনিস্তানের প্রথম প্রেসিডেন্ট সাপারমুরাত নিয়াজভও ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে আসার পর থেকে আমৃত্যু দেশ শাসন করেছেন।


এবারের নির্বাচনে বেরদিমুহামেদভ পেয়েছেন ৯৮ শতাংশ ভোট। এর আগে ২০১২ সালের নির্বাচনে তিনি পেয়েছিলেন ৯৭ শতাংশ ভোট। এবারও বহু লোক ভোটকেন্দ্রে আসেনি। ভোট দেয়ার কোনো আগ্রহ ছিল না। কারণ ফলাফল ছিল পূর্বনির্ধারিত। অবশ্য প্রেসিডেন্টকে ছাড়া কাউকে ভোট দেয়ার দুঃসাহস খুব কম লোকের আছে।


গত বছর তিনি সংবিধান সংশোধন করেন, যাতে প্রেসিডেন্টের বয়সসীমা তুলে দেয়া হয়। আগে প্রেসিডেন্টের বয়সসীমা ছিল ৭০ বছর। সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে পূর্বসূরির মতো তিনি আমৃত্যু প্রেসিডেন্ট হিসেবে থাকার পথ প্রশস্ত করেন। এবারের নির্বাচনের মাধ্যমে সাত বছর ক্ষমতায় থাকা নিশ্চিত হলো। একই সময় সংবিধান সংশোধন করে তিনি প্রেসিডেন্টের মেয়াদ পাঁচ বছর থেকে বাড়িয়ে সাত বছর করেন। ভোটের দিন রাজধানীর আশগাবাদের একটি স্কুলে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ভোটকেন্দ্রে আসেন। এর মধ্যে তার ছেলেও ছিলেন। যিনি গত বছর এক উপনির্বাচনের মাধ্যমে পার্লামেন্ট সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।


বিশে^র বৃহত্তম জ্বালানি মজুদের দেশটির অর্থনীতি এখনো অনেকটা রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীল। তুর্কমেনিস্তানের গ্যাসের প্রধান ক্রেতা হচ্ছে রাশিয়া। রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত গ্যাস কোম্পানি গ্যাজপ্রম তুর্কমেনিস্তানের গ্যাস চীনের কাছে বিক্রি করছে। অবশ্য প্রেসিডেন্ট বেরদিমুহামেদভ রাশিয়ার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ইরান ও চীনের সাথে গ্যাস পাইপলাইন গড়ে তুলেছেন। অন্য স্বৈরশাসকদের মতো তিনি জনগণের কল্যাণ ও উন্নয়নমূলক কাজের স্লোগান তুলছেন। অবশ্য রাজধানী আশগাবাদসহ দেশে বিভিন্ন ধরনের অবকাঠামো নির্মাণ করেছেন। রাষ্ট্রীয়ভাবে জনগণের গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির সেবা পরিশোধ করা হয়।


তুর্কমেনিস্তানের একনায়কত্ববাদী শাসনের ব্যাপারে পশ্চিমা বিশ^ অনেকটা নীরব। রাজনৈতিক নিপীড়ন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হরণ কিংবা মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে খুব কমই আলোচনা হয়। বাস্তবতা হচ্ছে, বেরদিমুহামেদভের সাথে রাশিয়া, চীন ছাড়াও পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে ভালো সম্পর্ক বিরাজ করছে। এ ক্ষেত্রে ভূকৌশলগত অবস্থান আর বিপুল জ্বালানি রিজার্ভের শক্তিকে তিনি কাজে লাগিয়ে যাচ্ছেন। পশ্চিমা দেশগুলো চায় না আফগানিস্তানের সীমান্তে ইসলামপন্থী রাজনীতির উত্থান ঘটুক। তুর্কমেনিস্তানে বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে ইসলামপন্থীদের উত্থানের সম্ভাবনা ছিল। বেরদিমুহামেদভ কঠোরহস্তে ইসলামপন্থীদের দমন করেছেন। শত শত বিরোধী ইসলামপন্থী রাজনৈতিক নেতাকর্মী গ্রেফতার ও গুম করেছেন। অপর দিকে তুর্কমেনিস্তানের গ্যাসের দিকে চীনের অনেক আগে থেকেই নজর। সবাইকে খুশি করে আমৃত্যু প্রেসিডেন্ট থাকার পথে আরো এক ধাপ এগিয়ে গেলেন গুরবানগুলি বেরদিমুহামেদভ।