খালেদা জিয়াকে জেলে রেখে নির্বাচন

Feb 23, 2017 11:55 am


আলফাজ আনাম


বাংলাদেশের রাজনীতিতে ছোট দলের বড় নেতারা অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরিস্থিতির আভাস দিতে পারেন। দেশের প্রধান দ্ইু রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির রাজনৈতিক জোটে অনেক খুচরা দল আছে। এসব দলের নেতারা প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের নেতাদের চেয়েও কঠোর কথাবার্তা বলেন। বড় দলের দায়িত্বশীল নেতারা যেসব কথা বললে বিতর্ক সৃষ্টি হতে পারে, এমন কথা অনেক সময় এদের মুখ থেকে বেরিয়ে আসে। হয়তো কৌশলগত কারণে এসব কথা ছোট দলের নেতাদের মুখ দিয়ে বলানো হয়। আবার অনেক সময় আলোচনায় থাকার জন্য এসব নেতা অনেক কথা বলেন। জোটের রাজনীতির পরিকল্পনার নানা দিকও তাদের মুখ থেকে বেরিয়ে আসে। ফলে দল ছোট হলেও তাদের বক্তব্য ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। ক্ষমতাসীন জোটের এমনই এক খুচরা দল হলো তরিকত ফেডারেশন। এই জোটের নেতা নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারী আগামী নির্বাচনের আগে দেশের রাজনীতি নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন।

আগামী নির্বাচন নিয়ে বিএনপি নেতারাও এখন নানা রকম শঙ্কা ও উদ্বেগের কথা জানাচ্ছেন। এর প্রধান কারণ বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা। ২০০১-২০০৬ মেয়াদের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে সোয়া পাঁচ কোটি টাকা দুর্নীতির দুই মামলা এখন বিচারের শেষ পর্যায়ে। বিএনপি নেতারা প্রকাশ্যে বলছেন, বেগম খালেদা জিয়াকে এসব মামলায় শাস্তি দিয়ে জেলে রেখে নির্বাচন করতে চায় সরকার। খালেদা জিয়াকে মিথ্যা মামলায় সাজা দিয়ে জেলে পাঠানো হলে দেশে কোনো নির্বাচন হবে না বলে বিএনপির মহাসচিব মন্তব্য করেছেন। বিএনপি মহাসচিবের এই বক্তব্যের পর তরিকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারী বলেন, ‘নির্বাচন হবে এবং খালেদা জিয়া গ্রেফতার হবেন। প্রয়োজনে তাকে জেলে নেয়া হবে না, গৃহবন্দী করে রাখা হবে। যদি আদালতের বিচারে তিনি দোষী হন, তার সাজা হয়, সরকার আদালতের আদেশ মানতে বাধ্য হবে।’


নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারী নির্বাচনের আগে খালেদা জিয়ার অবস্থান কোথায় হবে তা মোটামুটিভাবে নিশ্চিত করে বলেছেন। মনে রাখতে হবে, তরিকত ফেডারেশন ১৪ দলীয় জোটে ফেলনা কোনো দল নয়। ক্ষমতাসীন জোটের অনেক নীতিনির্ধারণী বিষয়ের প্রতিফলন এই দলের মাধ্যমে ঘটতে দেখা গেছে। যেমন নির্বাচন কমিশন গঠনে তরিকত ফেডারেশনের প্রস্তাবিত ব্যক্তিরা সার্চ কমিটির কাছে সবচেয়ে যোগ্য বিবেচিত হয়েছেন। মাইজভাণ্ডারী নিজেই তা প্রকাশ করে বলেছেন, প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নুরুল হুদা এবং আরো দুই কমিশনার তরিকত ফেডারেশনের প্রস্তাব করা নামের তালিকা থেকে নেয়া হয়েছে। (প্রথম আলো, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৭)


খালেদা জিয়াকে ছাড়া নির্বাচন হতে পারবে না বলে বিএনপির হুঁশিয়ারির প্রতিক্রিয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আদালতে দোষী প্রমাণিত হলে তার শাস্তি হবেই।’ জার্মানি সফরের সময় মিউনিখে জার্মান আওয়ামী লীগের সংবর্ধনায় তিনি বলেন, ‘যদি সত্যি কোর্টের কাছে এভিডেন্স থাকে যে, চুরি করেছে, তাহলে শাস্তি হবে। সে জন্য তারা ইলেকশনই হতে দেবে না। একটা চোর এতিমের টাকা যে চুরি করে খায় তাকে রক্ষার জন্য ইলেকশন হতে দেবে না। কত আবদারের কথা, কত আহ্লাদের কথা! এত আহ্লাদ যখন, তখন গরিব মানুষের টাকা কয়টা দিয়ে দিলেই হতো।’ (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৭)


এর আগে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ১৬ ফেব্রুয়ারি এক অনুষ্ঠানে বলেন, ‘খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার কিংবা জেলে পাঠানোর কোনো ভাবনা সরকারের নেই। আদালতে কেউ দোষী সাব্যস্ত হলে সে কারাগারে যাবে কি না, সে মাফ পাবে কি না সেটা আদালত বলতে পারবেন। সময় ও স্রোত যেমন কারো জন্য অপেক্ষা করে না, তেমনি বাংলাদেশের সংবিধান ও নির্বাচন কারো জন্য অপেক্ষা করবে না।’ ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্যের জবাবে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রহুল কবির রিজভী বলেন, ‘বিএনপি চেয়ারপারসনকে বাদ দিয়ে কোনো নির্বাচন হতে পারবে না। এ দেশের জনগণ সে নির্বাচন মেনে নেবে না।’ তিনি আরো বলেন, ‘সংবিধানের দোহাই দিয়ে একতরফা ও বিতর্কিত নির্বাচন করার যেকোনো অপচেষ্টা জনগণ রুখে দেবে।’


সংবিধান অনুযায়ী দেশে জাতীয় নির্বাচন হওয়ার কথা ২০১৯ সালের জানুয়ারি মাসের আগের ৯০ দিনের মধ্যে। প্রায় দেড় বছরের বেশি সময় বাকি। কিন্তু আগামী নির্বাচন ঘিরে ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে এক ধরনের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। শুধু তাই নয়, জাতীয় সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টি তো ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে নির্বাচনের টিকিট পেতে আগ্রহী প্রার্থীদের নামের তালিকা পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এক নতুন নির্বাচনী জোট গঠনের পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন বলে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের অংশীদার। মহাজোটে থেকে ২০১৪ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। এখন সরকারি দল ও বিরোধী দল উভয়ই অবস্থানে আছে। এমন বিস্ময়কর রাজনৈতিক দল দুনিয়াতে খুঁজে পাওয়া যাবে কি না সন্দেহ আছে। এখন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদও নির্বাচনকে সামনে রেখে জোট গঠনের জন্য দৌড়ঝাঁপ করছেন। বলা যায়, তিনি একটু বেশি এগিয়ে যাচ্ছেন।


শুধু জাতীয় পার্টি নয়, অন্য রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচন নিয়ে তাদের বক্তব্য তুলে ধরছেন। বিকল্প ধারার প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী ১৭ ফেব্রুয়ারি রাজধানীতে এক আলোচনা সভায় বলেন, ‘নির্বাচনের আগে একটা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তো করতে হবে। বিএনপির সাঙ্গপাঙ্গ, বাচ্চা-কাচ্চাসহ কত হাজার মামলা যে আছে, গড নোজ। এত হাজার হাজার মামলা থাকলে নির্বাচন করবে কিভাবে? এটা হয় না। ‘আমি বলব, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড করতে হলে সব মামলা আগামী দুই বছর বন্ধ, স্থগিত করে দেন। দুই বছর পর আবার বিচার করুন, কোনো অসুবিধা নেই। রাজনৈতিক সব মামলা অবিলম্বে স্থগিত করার ঘোষণা দেন। সরকার, সুপ্রিম কোর্ট-হাইকোর্টসহ সংশ্লিষ্ট যারা আছেন, তারা সবাই এ জন্য ব্যবস্থা নেন। তাহলে আমরা মনে করি, মোর অর লেস লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড হবে।’ আগামী নির্বাচন ‘অবাধ ও সুষ্ঠু’ করতে নির্বাচনকালীন ‘জাতীয় সরকার’ গঠনের প্রস্তাব দেন বি চৌধুরী।


সব মিলিয়ে বিএনপিকে দুর্বল অবস্থানে রেখে খালেদা জিয়াকে জেলে রেখে বা নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ যাতে না পায়, এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করে জাতীয় নির্বাচনের ভাবনা ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে আছে। এমন পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত কার্যকর করা সম্ভব হবে কি না তা ভিন্ন প্রশ্ন। এ দেশে ক্ষমতাসীন দল চাইলে অনেক কিছু করতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, শেষ বিচারে ক্ষমতাসীনেরা তাতে কতটা লাভবান হবেন? বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি ১৯৮৬ সালের নির্বাচন বর্জন করেছিল। সামরিক সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ না নিয়ে বিএনপি সে সময় ভুল করেনি। তা পরবর্তীতে প্রমাণিত হয়েছে। বিরোধী দলগুলোকে পার্লামেন্টে নিয়ে আসার প্রচেষ্টা আংশিক সফল হলেও এরশাদ সেই সংসদের মেয়াদ পূরণ করতে পারেননি।


অপর দিকে, ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন ছাড়া বিএনপির সামনে আর কোনো বিকল্প ছিল না। কারণ বিএনপির তখন মূল দাবি ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠান। বাস্তবতা হলো, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দেশে বাস্তবে কোনো ভোট হয়নি। ১৫৪ জন সংসদ সদস্য ভোটের আগে যেখানে নির্বাচিত হয়ে যান, তাকে আর যাই হোক নির্বাচন বলা চলে না। এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সরকার হয়তো ৫ বছর মেয়াদে ক্ষমতায় থাকবে। বৈধতার সঙ্কটে থাকা একটি অনির্বাচিত সরকার আর ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারের মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য আছে।


দুনিয়াতে বহু সামরিক শাসক ১৫ থেকে ২০ বছর একটানা ক্ষমতায় থেকেছে। তারাও মাঝে মধ্যে নির্বাচনের আয়োজন করেছে। কিন্তু তাই বলে এসব সরকারকে জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। খালেদা জিয়াকে নির্বাচনের বাইরে রেখে আরেকটি নির্বাচনের আয়োজন বড়জোর ১৯৮৬ সালের নির্বাচনের মতো হতে পারে। এ ধরনের নির্বাচনেরও কোনো গ্রহণযোগ্যতা থাকবে না।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকার ও বিরোধী দলের প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে, জনগণের ইচ্ছার ওপর ভিত্তি করে সরকার গঠন করা। জনগণ যদি সুষ্ঠুভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে না পারে সে নির্বাচনে অংশ নেয়া অর্থহীন হয়ে পড়ে। বাস্তবতা হচ্ছে, বিএনপি দেশের অর্ধেক মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে। বিএনপি বা খালেদা জিয়াকে নির্বাচনের বাইরে রেখে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন কোনোভাবেই সম্ভব হবে না।


অনেকে মনে করেন, নির্বাচনে অংশ না নিয়ে বিএনপি সাংগঠনিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিংবা আগামী দিনে যেকোনো মূল্যে বিএনপির নির্বাচনে অংশ নেয়া উচিত। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, বিএনপির সাংগঠনিক অবস্থা এখন যেমন আগেও তেমনি ছিল। সাংগঠনিক তৎপরতা বা কাঠামোর ভেতর দিয়ে বিএনপির রাজনীতির মূল্যায়ন করা যাবে না। সংগঠন নয়, বিপুল জনসমর্থন হচ্ছে এ দলের ভিত্তি। এরশাদের আমলে এবং ওয়ান-ইলেভেনের সময় তার প্রমাণ পাওয়া গেছে। ওয়ান-ইলেভেনের পর দলের সাধারণ সম্পাদক মান্নান ভূঁইয়াসহ দলের একাধিক সিনিয়র নেতা চেয়ারপারসনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে আলাদা দল গঠন করেছিলেন, কিন্তু শত চেষ্টা করেও আরেকটি বিএনপি গঠন করা সম্ভব হয়নি। ৯১-এর নির্বাচনের ফলাফলের আগ পর্যন্ত সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী আওয়ামী লীগের চোখে বিএনপি প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না। কিন্তু নির্বাচনের ফলাফল হয়েছে ভিন্নরকম। ফলে খালেদা জিয়াকে বাইরে রেখে নির্বাচন হয়তো করা যাবে। কিন্তু এ দেশের মানুষের কাছে সে নির্বাচনের কোনো গ্রহণযোগ্যতা থাকবে না।