অবিশ্বাস্য এক বেঁচে থাকা

Mar 08, 2017 09:46 am

 


সমুদ্রে মাছ ধরতে গিয়েছিল এল স্যালভাদরের এক জেলে। হঠাৎ তার নৌকার রেডিও ও ইঞ্জিন দুটোই বিকল হয়ে যায়। নিঃসীম সমুদ্রে ভাসতে থাকে একটি নৌকা ও দু’জন আরোহী। খাদ্য নেই, পানি নেই, উদ্ধারের কোনো আশা নেই এমন এক অবিশ্বাস্য অবস্থায় তাদের দিন কাটে। কেটে যায় এক বছরেরও বেশি। অবশেষে উদ্ধার পায় একজন, অন্যজন আগেই মৃত। সেই অবিশ্বাস্য, ভুতুড়ে ও রোমাঞ্চকর কাহিনী নিয়ে জোনাথান ফ্রাঙ্কলিন লিখেছেন বই ৪৩৮ ডে’জ : অ্যান এক্সট্রা অর্ডিনারি ট্রু স্টোরি অব সারভাইভাল অ্যাট সি। বইটির সংক্ষেপিত বাংলা রূপান্তর করেছেন হুমায়ুন সাদেক চৌধুরী


স্যালভেদর অ্যালভারেঙ্গার বয়স এখন ৩৭ হলেও তার কোনো পরিবার নেই, ফলে পরিবারের পিছুটানও নেই। অবশ্য ‘পরিবার নেই’ বলতে পরিবার ছিল না, তা-ও নয়। ছিল। ১৩ বছর বয়সী একটি মেয়েও আছে। সে তার মায়ের সাথে এল স্যালভাদরে থাকে। ফলে অ্যালভারেঙ্গা বলতে গেলে একরকম হাত-পা ঝাড়া।
অ্যালভারেঙ্গা পেশায় জেলে। সমুদ্রে মাছ শিকারের সময়টুকু ছাড়া বাকি সময়টা মদে ডুবে থাকাই তার নেশা। মাছ শিকারের জন্য তার আছে একটি নৌকা। নৌকাটি তার ভারি প্রিয়, এমন আহামরি কোনো নৌকা নয় যদিও। ফাইবার গ্লাসের সেই নৌকায় না আছে ছই, না আছে কোনো কেবিন। ২৫ ফুট লম্বা, সরু ছিপছিপে নৌকাটি এমনভাবে তৈরি, যেন ঢেউয়ের প্রবল তোড়ও সামাল দিতে পারে; অনেকটা সার্ফবোটের মতো। পেছন দিকে ইঞ্জিন লাগানো। নৌকাটি চলেও দুর্দান্ত গতিতে।
দিনটি ছিল ২০১২ সালের ১৮ নভেম্বর। অ্যালভারেঙ্গা তার নৌকা নিয়ে সকাল ১০টায় ভাসান দিলো সমুদ্রে (প্রশান্ত মহাসাগর)। তার পরিকল্পনা, পরদিন বিকেল ৪টা পর্যন্ত মাছ ধরবে সমুদ্রে, তারপর ফিরবে। যদিও তার জানা ছিল, সমুদ্রে একটা ঝড় ঘোঁট পাকাচ্ছে, কিন্তু ঝড়ের তোয়াক্কা করলে কি আর অ্যালভারেঙ্গার মতো মানুষদের চলে? সে ভাবল, এই দুই দিনেই এত মাছ ধরবে যে, আগামী এক সপ্তাহ বসে বসেই খাবে। নো কাজ, ডু ফুর্তি!


অ্যালভারেঙ্গার সাথে আছে একজন ক্রু-ম্যান; করডোবা। ২২ বছর বয়সী এক টগবগে যুবক। আছে আরো নানা সরঞ্জাম, যার ওজন হবে এক হাজার পাউন্ডের বেশি। এর মধ্যে আছে পাঁচ ফুট লম্বা, চার ফুট উঁচু একটি আইস বক্স (বরফের বাক্স)। ফেরার সময় এই বাক্সই ভর্তি থাকবে টুনা, হাঙর ও মাহিমাহি মাছে।
নৌকা চলতে লাগল সমুদ্রের প্রবল ঢেউয়ের সাথে লড়াই করে। নৌকাটি যখন উপকূল থেকে ৭৫ মাইল দূরে, তখন হাওয়ার বেগ বাড়তে থাকল। রাত ১টার দিকে ঢেউ এমন মাতাল হয়ে উঠল যে, তাদের ছোট নৌকাটি দুলতে থাকল বিনোদন পার্কের কোনো রাইডের মতো। তা দেখে ভীষণ ভয় পেয়ে গেল অ্যালভারেঙ্গার তরুণ সঙ্গী করডোবা। সে চেঁচাল, ‘চলো, ফিরে যাই।’
পরিস্থিতি দেখে রাজি হলো অ্যালভারেঙ্গাও। কিন্তু ততক্ষণে প্রবল বাতাস ও ঢেউয়ের তোড়ে হু হু করে পানি ঢুকতে শুরু করেছে নৌকায়। তারা দু’জনই প্রাণপণে পানি সেঁচতে থাকল। কিন্তু সমুদ্র যেন তাদের সাথে প্রতিযোগিতায় নেমেছে। তারা যত পানি সেঁচে, সমুদ্র ঢুকিয়ে দেয় তার চেয়ে আরো বেশি।
কী করব, কী করা যায় ভাবতে গিয়ে মাথা ঝিমঝিম করছে অ্যালভারেঙ্গার। হঠাৎ সে একটা ‘বিপ্লবী’ সিদ্ধান্ত নিযে বসল। নৌকার সব সরঞ্জাম সমুদ্রে ফেলে দিলো। তারপর নৌকার মুখ ঘোরালো চোকোহুইটাল বন্দরের দিকে। আর তার বস উইলিকে জানিয়ে দিলো কোথায়, কিভাবে আছে তার বিবরণ।
ভোরের আকাশ ফরসা হয়ে উঠতেই দিগন্তরেখায় পর্বতমালার আভাস চোখে পড়ল অ্যালভারেঙ্গার। এই চক্রাবক্রা ঢেউয়ের মাঝখান দিয়ে পথ কেটে কিভাবে সামনে এগোনো যাবে, তা যখন ভাবছিল অ্যালভারেঙ্গা, তখনই বুড়ো কেশো রোগীর মতো ঘট ঘট শব্দ তুলে একেবারে চুপ মেরে গেল নৌকার ইঞ্জিনটা।
ইঞ্জিনের কাণ্ড দেখে হাসবে না কাঁদবে ভেবে পায় না অ্যালভারেঙ্গা। কী কারবার, এখনো তীর থেকে ১৫ মাইল দূরে আছি, আর এখনই কিনা ইঞ্জিনটা মরে গেল!
অ্যালভারেঙ্গা ইঞ্জিনের তার ধরে টান দেয়। একবার, দু’বার... তার টানাটানিতে একসময় ওটা ছিঁড়ে যায়। এবার সে হাতে তুলে নেয় রেডিও। ততক্ষণে ঢেউয়ের ধাক্কায় নৌকাটা এপাশ-ওপাশ করতে শুরু করেছে। রেডিওতে বস উইলির উদ্দেশে চেঁচায় অ্যালভারেঙ্গা, ‘উইলি, উইলি! আমাদের বাঁচাতে চাইলে এখনই এসে পড়ো।’
ওদিক থেকে উইলির উদ্বিগ্ন গলা শোনা গেল, ‘আসছি। আসছি আমরা!’
এর একটু পরেই রেডিওটাও মরে গেল। আর সমুদ্র এই দুই মানবসন্তানকে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে থাকল দূরে, আরো দূরে। আরো গভীরে।

 

পাঁচ দিন কেটে গেছে। শান্ত হয়ে এসেছে সমুদ্র। অ্যালভারেঙ্গা ও করডোবা এখন উপকূল থেকে প্রায় ২৮০ মাইল দূরে। এখান থেকে তাদের উদ্ধার পাওয়ার একটাই পথ যদি অন্য কোনো নৌকা তাদের দেখতে পায়। কিন্তু তাও তো প্রায় অসম্ভব। তাদের নৌকাটা এত ছোট যে, পানির সাথে প্রায় মিশে থাকে। আধা মাইলের বেশি দূর থেকে আর দেখাই যায় না।
অবস্থা দেখে হতাশায় ভেঙে পড়ে করডোবা। ভাঙা গলায় কাতরায় সে, ‘মরা ছাড়া আমাদের আর পথ নেই।’
ছেলেটার কথা শুনে কী বলবে ভেবে পায় না অ্যালভারেঙ্গা। বলে, ‘আহ্ হা, এভাবে ভেবো না। কোনো রেসকিউ মিশন আমাদের খুঁজে বের করবেই।’
বলে বটে, কিন্তু বোঝেও যে, রেসকিউ মিশন কিভাবে তাদের খুঁজে বের করবে? নিজেদের অবস্থান জানানোর জন্য তাদের তো কোনো ফ্লেয়ার গান নেই অথবা সাহায্য চাওয়ার অন্য কোনো মাধ্যমও নেই! অ্যালভারেঙ্গা আরো জানে, তারা উপকূলের এতটাই দূরে আছে যে, এখানে কখনো কোনো মাছধরা নৌকা আসেই না।
এভাবে দিন যায়, রাত কাটে। দুপুরে সূর্য যখন মাঝ আকাশে, তখন প্রচণ্ড গরমে তাদের হাড়-মাংস যেন সিদ্ধ হতে থাকে। রাতে আবার উল্টো। তখন ভয়াল শীত। দু’জন তখন খালি আইস বক্সে ঢুকে একজন অপরজনকে জড়িয়ে ধরে থাকে একটু উষ্ণতার আশায়।
এর ওপর আছে ক্ষুধা আর প্রাণ ফাটানো তৃষ্ণা। চোখ লেগে আসতেই পানির স্বপ্ন দেখে। আর ক্ষুধার জ্বালায় অ্যালভারেঙ্গা নিজের নখ খেতে থাকে।
চার দিন পর হঠাৎ আকাশ ঝেঁপে বৃষ্টি নামে। অ্যালভারেঙ্গা ও করডোবা দু’জনই নিজেদের শরীরের কাপড়-চোপড় সব খুলে ফেলে গোসল সারে। আনন্দে লাফায়, কোলাকুলি করে আর বৃষ্টির পানি সংগ্রহ করে। বৃষ্টি শেষে দেখে, প্লাস্টিক বোতলে তাদের সংগৃহীত পানি পাঁচ গ্যালনের মতো হবে। খুব সাবধানে খেলে এই দিয়ে আগামী এক সপ্তাহ চলে যাবে।
এর মধ্যে এক সপ্তাহ কেটে গেছে। হাতে শিকার করা ছোট মাছ খেয়ে চলেছে এই ক’টা দিন। এক রাতে অ্যালভারেঙ্গা কিসের যেন একটা শব্দ শুনে সচকিত হলো। খুঁজে দেখে, নৌকার কাছেই একটা কচ্ছপ। সে খুশিমনে ওটাকে নৌকায় তুলে নিলো। ওটার মাংস খেযে ক্ষুধা মেটানো যাবে আর রক্ত দিয়ে চলবে পানির কাজ।


অ্যালভারেঙ্গা এর পর থেকে কচ্ছপ শিকারে মনোনিবেশ করল। করডোবা যদিও কচ্ছপের মাংস কোনোমতে গলায় ঠেলে দেয়, রক্ত একেবারেই সহ্য করে না। অ্যালভারেঙ্গা তাকে খুব করে বোঝায়, কচ্ছপের মাংস কেমন সুস্বাদু। সে কচ্ছপের মাংস চিকন করে কাটে, তারপর সেগুলোকে লবণজলে চুবিয়ে রাখে, সবশেষে সেগুলোকে সূর্যের তাপে ‘ভেজে নেয়’। কচ্ছপের খোলকে বাসন বানিয়ে সেই খাদ্য তরুণ সঙ্গীর সামনে পরিবেশন করে অ্যালভারেঙ্গা।
খেতে যেমনই হোক, কচ্ছপের মাংস কিন্তু এই দুই নৌকা-আরোহীকে অনাহার থেকে বাঁচিয়ে দেয়। কিন্তু এ তো কেবল কষ্টেসৃষ্টে বেঁচে থাকা। তারা বেঁচে থাকল বটে, কিন্তু মাঝে মধ্যেই কল্পনা ও বাস্তবের মধ্যে পার্থক্য ভুলে যেতে থাকল। তাদের কল্পনা হয়ে উঠতে থাকল বুনো। যেমন, করডোবা একদিন আচ্ছন্নের মতো বারবার বকতে থাকল, ‘কমলা, কমলা... আমাকে ক-টি কমলা এনে দাও না!’
অ্যালভারেঙ্গা বলল, ‘আচ্ছা, ঠিক আছে। আমি স্টোরে গিয়ে দেখি ওটা খোলা পাই কি না।’ বলেই সে নৌকার অপর প্রান্তের দিকে হাঁটতে শুরু করল। মিনিট পাঁচেক পর ফিরে এসে বলল, ‘স্টোর বন্ধ। তবে এক ঘণ্টা পর খুলবে। ওদের ওখানে ভালো অমলেট পাওয়া যায়।’
কী আশ্চর্য, অ্যালভারেঙ্গার কথায় জাদুমন্ত্রের মতো কাজ হলো। করডোভার নাকিকান্না বন্ধ হলো এবং সে চুপচাপ ঘুমিয়ে পড়ল।

বাঁধনহারা নৌকার আরোহী হয়ে সমুদ্রে ভেসে ভেসে কয়েক মাস কেটে গেল। অ্যালভারেঙ্গা তার দৈনিক ‘কাজের’ একটি রুটিন ঠিক করে নিয়েছে। যেমন, ভোর ৫টায় ঘুম থেকে উঠে নৌকার ডেকে বসে থাকা। সকালের এই কাজটি করতে তার খুব ভালো লাগে। সে বসে বসে দেখে, পূর্ব দিগন্তে লাল সূর্য উঠছে। সে ভাবে, নিশ্চয়ই কোথাও মাটি আছে, ওখানেই তো আমার ফেলে আসা পৃথিবীটা!
এরপর সে পানিতে ফেলা ট্র্যাপগুলো (ফাঁদ) তুলে দেখে কোনো মাছ ওতে ধরা পড়ল কি না। তারপর অপেক্ষা করে থাকে কখন করডোবার ঘুম ভাঙবে। তারপর খানিকক্ষণ ঝিমায়। এরপর দিনের বেশির ভাগ সময় তারা আইস বক্সের ভেতরে গিয়ে গুটিশুটি মেরে বসে থাকে।
নৌকায় যখন উঠছিল তখন একে অপরকে তেমনভাবে না চিনলেও এই দীর্ঘ সমুদ্রবাস পরস্পরকে বন্ধু বানিয়ে ফেলেছে। যেন দুই তরুণ কোনো অ্যাডভেঞ্চারে বেরিয়েছে, এমনভাবে তারা রাতে পাশাপাশি শুয়ে থাকে; আকাশের দিকে মুখ করে আর কল্পনায় আকাশের তারাদের সাথে খেলা করে। রাতের পর রাত এ খেলা চলে। তারা একে অপরের আরো কাছাকাছি হয়, যেন তারা নতুন কোনো তারা আবিষ্কার করেছে। দু’জনেই নানারকম আকাশকুসুম কল্পনা করে। এমনকি এমনটাও ভাবে, তাদের উদ্ধার করতে স্বর্গ থেকে বিমান আসছে। কোনো কোনো সময় করডোবা তার প্রিয় গানগুলো গাইতে থাকে। বেশির ভাগ সময় অবশ্য গায় আইস বক্সের ভেতরে ঢুকে। এতে শব্দটা ভালো শোনায়। করডোবার গান শুনতে ভারি ভালো লাগে অ্যালভারেঙ্গার।


এক সন্ধ্যায় ওরা দু’জন ধারণা করে, আজ বড়দিন। তারা এমনভাবে কথা বলতে থাকে, যেন তারা বড়দিনের খাবার তৈরি করছে। অ্যালভারেঙ্গা সেদিন তাদের মেনু বাড়াতে পেরেছে। তাদের নৌকার ওপর বসেছিল একটি সামুদ্রিক পাখি, অ্যালভারেঙ্গা সেটাই শিকার করেছে।
এ সময় হঠাৎ করডোবা কঁকিয়ে উঠল, ‘পেটে ব্যথা!’ এরপরই শুরু হলো বমি। অল্পক্ষণের মধ্যেই তাকে দেখাতে লাগল বহু দিনের অসুস্থ রোগীর মতো। যে পাখিটার মাংস খেয়েছিল করডোবা, তার বাকি অংশটা চিরে দেখল অ্যালভারেঙ্গা। সর্বনাশ, ওটার পেটে একটা বিষাক্ত সাপ!
করডোবা সেরে উঠল, কিন্তু তার মনের মধ্যে একটা ভয় ঢুকে গেল যে, ওই সাপের কিছু বিষ এখনো বুঝি তার শরীরে আছে। এখন কোনো সামুদ্রিক পাখির মাংস তার সামনে এলেই সে প্রবল বমি ভাব নিয়ে থুতু ফেলে। এভাবে চলতে চলতে একসময় সে খানাপিনা একেবারেই বন্ধ করে দিলো।
পরবর্তী দুই মাস না খেয়ে একেবারে কাঠি বনে গেল করডোবা। তার বাহু দু’টো শুকিয়ে হয়ে গেল লাঠির মতো, আর রান দুটো হলো বাহুর আকৃতির। সে ভাবতে থাকল, এভাবে না খেয়ে থাকার চেয়ে সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে মরা অনেক ভালো। একদিন তা-ই করতে গেল সে। অ্যালভারেঙ্গাকে তার ডাকনাম ধরে ডেকে বলল, ‘গুডবাই, চানচা!’ বলেই সে সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রস্তুতি নিতে থাকল।
মুহূর্তেই তাকে জাপটে ধরল অ্যালভারেঙ্গা। অনাহারে শুকিয়ে কাঠি হয়ে যাওয়া শরীরে তাকে ঠেকাতে পারল না করডোবা। অ্যালভারেঙ্গা তাকে টেনে-হিঁচড়ে আইস বক্সের ভেতরে ঢুকিয়ে দিলো আর পাহারায় রইল যেন সে আর বেরোতে না পারে। করডোবা ওখানেই চিৎকার-চেঁচামেচি করতে লাগল।
বেশ খানিকক্ষণ দাপাদাপির পর করডোবা একটু শান্ত হয়ে এলে আইসবক্সের ভেতর ঢুকল অ্যালভারেঙ্গা। তার তরুণ বন্ধুটিকে বলল, ‘আমাদের বাঁচতে হবে। পৃথিবীটাকে আমাদের বেঁচে থাকার লড়াইয়ের কথা জানাতে হবে না!’
করডোবা মন দিয়ে সেসব কথা শোনে। কিন্তু হতাশার যে সমুদ্রে সে নিমজ্জিত হয়েছে, তা থেকে সে আর উঠতে পারে না। ক’দিন পরই সে কাতর গলায় বলে, ‘আমি মারা যাচ্ছি!’
অ্যালভারেঙ্গা তড়িঘড়ি করে তার মুখে কিছু খাওয়ার পানি ঢেলে দেয়। কিন্তু করডোবা ওই পানি গিলতে পারে না। অ্যালভারেঙ্গা ভয় পেয়ে যায়। ভয়ার্ত গলায় সে বলে, ‘মরে যেয়ো না। আমাকে একা ফেলে যেয়ো না।’
এর কয়েক মিনিট পরই করডোবা মারা যায়। লাশটি যাতে পানিতে পড়ে না যায় সেজন্য সেটিকে বেঞ্চের ওপর এনে শুইয়ে রাখে অ্যালভারেঙ্গা।


পরদিন সকাল বেলা। ঘুম ভাঙতেই আইস বক্স থেকে বেরিয়ে করডোবার দিকে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে দেখে অ্যালভারেঙ্গা। তারপর বেঞ্চের ওপর বসে। দেখে মনে হবে যেন রোদ পোহাচ্ছে। তারপর লাশের দিকে তাকিয়ে জানতে চায়, ‘এখন কেমন লাগছে? ঘুম ভালো হয়েছে তো?’
‘ঘুম ভালো হয়েছে। তুমি নাশতা করেছ?’ জবাব দেয় অ্যালভারেঙ্গা, যেন পরকাল থেকে কথা বলছে করডোবা।
‘হ্যাঁ, করেছি।’
‘আমিও করেছি। স্বর্গের নাশতা খেলাম।’
অ্যালভারেঙ্গা এসব করার উদ্দেশ্য হলো, সে ভেবে দেখেছে, সঙ্গী হারানোর কষ্ট ভুলে থাকার পথ হলো এমন ভাব করা যেন তার সঙ্গীটি মরেনি। সে করডোবার লাশকে ফের জিজ্ঞেস করে, ‘আচ্ছা, মরতে কেমন লাগে, খুব কষ্ট হয়?’
‘মৃত্যু খুব সুন্দর। আমি তোমার অপেক্ষায় আছি।’
‘অ্যালভারেঙ্গা এবার কাতরে ওঠে, ‘আমি মরতে চাই না। আমি ওই পথে যেতে চাই না।’

করডোবার মৃত্যুর ছয় দিন পর অ্যালভারেঙ্গা অবশেষে তার তরুণ বন্ধুর লাশটি পানিতে ফেলে দিলো। সে এখন একা, যেন এক মহাসমুদ্রের বুকে ছোট একটি বিন্দু। সে আইস বক্সে ঢুকে কাঁদতে থাকল।
করডোবা চলে গেছে। চার দিকে নিঃসীম শূন্যতা। এই ভয়াল একাকিত্ব কিভাবে কাটাবে অ্যালভারেঙ্গা? সে ঠিক করে, নিজেকে ব্যস্ত রাখতে হবে। উপায় হলো, মাছ ও পাখি ধরার চেষ্টা করা আর বাকি সময়টুকু এমন কল্পনায় মজে থাকা যে, কেউ তাকে উদ্ধার করতে আসছে। তাতে কিছুটা কাজ হয়। সে স্বল্প সময়ের জন্য সাঁতার কাটতে নামে। আর মিনিট পাঁচেক পরই উঠে এসে কল্পনা করতে বসে, সে বন্ধুদের নিয়ে সৈকতে হৈ হৈ করছে। একটু পরেই সাঁতার কাটতে সমুদ্রে নামবে।
অ্যালভারেঙ্গা আরো কল্পনা করে, বহু দিন আগে ফেলে আসা তার কিশোরীকন্যা ফাতিমার (১৪) কথা। কত দিন তাকে দেখেনি! কল্পনায় মেয়ের দেখা পেয়ে গায়ে জোর পায় অ্যালভারেঙ্গা। মেয়েকে নিয়ে সারা দিন আকাশকুসুম ভাবতে শুরু করে। জেগে জেগেই স্বপ্ন দেখে, মেয়ে তাকে দেখেই খুশিতে চিৎকার করে উঠছে, ‘পাপা!’ কল্পনাই, তবুও অদ্ভুত এক খুশিতে মনটা ভরে যায় অ্যালভারেঙ্গার।
যদি বাড়ি ফিরে যেতে পারে তাহলে জীবনটা কিভাবে গড়বে, তাও বসে বসে ভাবে অ্যালভারেঙ্গা। ভাবে, আর ছন্নছাড়া জীবন নয়, এবার সে প্রকৃত গেরস্থই হবে। তার বাড়িভর্তি থাকবে ছেলেপুলে, মাঠভরা গরু-ছাগল। ভেবে ভেবে কাতর হয়ে আকাশের দিকে হাত তোলে, আকুল হয়ে প্রার্থনা জানায় সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশে : প্রভু, শেষবারের মতো একটা সুযোগ দাও। আমার মেয়েটাকে কাছে পেতে দাও!
চলতে চলতে একদিন হঠাৎ একটি মালবাহী জাহাজের দেখা পায় অ্যালভারেঙ্গা। তার নৌকাটি সে দিকেই ছুটছে। তার ভয় হয়, জাহাজের সাথে ধাক্কা লেগে নৌকা বুঝি দুই টুকরোই হয়ে গেল! জাহাজের ৫০ গজের মধ্যে আসতেই অ্যালভারেঙ্গা গায়ের সব জোর গলায় ঢেলে চেঁচাল, ‘হেল্প, হেল্প, হিয়ার!’ জাহাজের ধারে মাছধরার ছিপ হাতে দাঁড়িয়ে ছিল তিন মূর্তি। তারা অ্যালভারেঙ্গার দিকে তাকিয়ে হাত নাড়াল, কিন্তু তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে এলো না। এমনকি জাহাজটা তার গতিও কমাল না।
‘তোমরা কী ভেবেছ, আমি আজই সাগরে নেমেছি?’ বিড় বিড় করে বলল অ্যালভারেঙ্গা। উদ্ধার পাওয়ার সুযোগ হাতের নাগালে এসেও ফসকে যাওয়ায় হতাশায় ছেয়ে গেল তার মন। মন থেকে উবে গেল খানাপিনার ইচ্ছা আর চোখ দুটো ক্রমেই মুদে আসতে থাকল। তার মনে পড়তে থাকল করডোবার কথা। মরণের আগে তারও ক্ষুধা-তৃষ্ণা উবে গিয়েছিল। একই রকম অবসাদ তাকেও ঘিরে ধরেছে। তবে কি...

সমুদ্রে ভাসমান অবস্থায় অ্যালভারেঙ্গার ১১ মাস কেটে গেছে। এরই মধ্যে তার নৌকা পাড়ি দিয়েছে পাঁচ হাজার মাইল পথ; অর্থাৎ প্রতি ঘণ্টায় এক মাইলেরও কম।
অ্যালভারেঙ্গা ভাবে, এই সুদীর্ঘ দিকচিহ্নহীন সমুদ্রযাত্রা কি সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে তার জন্য কোনো শিক্ষা? নইলে সে বেঁচে রইল কোন যুক্তিতে? তার তো আরো কয়েক মাস আগেই মারা যাওয়ার কথা!
২০১৪ সালের ৩০ জানুয়ারি। সমুদ্রের পানিতে নারকেল ভাসতে দেখল অ্যালভারেঙ্গা। আকাশে দেখল সামুদ্রিক পাখিদের ওড়াউড়ি। তবে কি উপকূলের কাছে এসে পড়েছি? ভাবল অ্যালভারেঙ্গা। হঠাৎ বৃষ্টি এলো। হিমশীতল বৃষ্টি। অ্যালভারেঙ্গা বৃষ্টি উপেক্ষা করেই নৌকার ডেকে এসে দাঁড়াল। বৃষ্টির কারণে চার দিক ঝাপসা। তবুও তার দৃষ্টি এড়াল না ছোট্ট একটি দ্বীপ। কিন্তু তার মনে হলো, ওই দ্বীপে বুঝি কোনো মানুষজন থাকে না। কই, কোনো রাস্তা, গাড়ি বা বাড়ির চিহ্ন তো দেখা যাচ্ছে না দ্বীপে! তা না থাক, কত কাল পরে মাটির স্পর্শ পেতে যাচ্ছে অ্যালভারেঙ্গা! তার তীব্র ইচ্ছে জাগতে লাগল, নৌকা থেকে নেমে সাঁতরে বাকি পথটুকু পাড়ি দেয়। তবে হাঙরের ভয়ে মনের ইচ্ছা মনেই চেপে রাখল। কিন্তু দ্বীপের ১০ গজের মধ্যে পৌঁছতেই আর পারল না অ্যালভারেঙ্গা, ঝাঁপিয়ে পড়ল সে। আর মুহূর্তেই প্রবল ঢেউ এসে ধাক্কা দিয়ে তাকে তুলে দিলো সৈকতে। ঢেউ নেমে গেল। সে উপুড় হয়ে শুয়ে থেকেই এক মুঠো বালি তুলে নিলো। এক মুঠো বালি, কিন্তু তার মনে হলো, এ যেন অমূল্য ধন।
অ্যালভারেঙ্গা যে দ্বীপটিতে গিয়ে ঠেকেছিল সেটির নাম এবন। ছোট একটি প্রবাল দ্বীপ। মার্শাল দ্বীপপুঞ্জের দক্ষিণ প্রান্তে এর অবস্থান; পৃথিবীর সবচেয়ে দূরবর্তী অঞ্চলগুলোর অন্যতম। যদি অ্যালভারেঙ্গা এই প্রবাল দ্বীপে উঠতে না পারত, তাহলে তার পরবর্তী সম্ভাব্য গন্তব্যটি হতো ফিলিপিন্স; যা ওখান থেকে তিন হাজার মাইল দূরে।
অ্যালভারেঙ্গা যা ভেবেছিল, তা-ই; দ্বীপটি জনশূন্যই। তবে বাস করত এক দম্পতি। তারাই ওকে প্রথম দেখতে পেয়ে উদ্ধার করে।
১১ দিন ওই দম্পতির আশ্রয়ে থেকে নিজ দেশ এল সালভাদরে ফিরে যাওয়ার মতো শক্তি সঞ্চয় করে অ্যালভারেঙ্গা। তারপর যাত্রা করে স্বদেশের উদ্দেশে।
দেশে ফিরে মেয়ে ফাতিমার সাথে দেখা হয় অ্যালভারেঙ্গার। ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে সে বলে, ‘আই লাভ ইউ’। জবাবে ফাতিমা তার বাবাকে আরো জোরে জড়িয়ে ধরে।

শেষ কথা
অ্যালভারেঙ্গা ইতিহাসের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সমুদ্রযাত্রা শেষ করেছে। কী অদ্ভুত সেই সফর! কোনো নৌপথ নেই, পাল নেই, হাল নেই, দাঁড় নেই। নৌকা ভেসে চলেছে স্রোতের টানে। নৌকাকে যে নিজের ইচ্ছায় ঘোরাবে, সে উপায়ও নেই। এভাবেই নিঃসীম সমুদ্রে নিঃসঙ্গ কাটিয়ে দিলো সে ৪৩৮টি দিন! বলতেই হয়, অ্যালভারেঙ্গা একই সাথে চরম দুর্ভাগা ও পরম সৌভাগ্যবান একজন মানুষ। এই মানুষটি এখন বাড়িতেই আছে।