সিল্ক রুটের পুনরুজ্জীবন : বিচ্ছিন্ন ভারত

May 17, 2017 01:34 pm


আলফাজ আনাম

বিশ্বনেতাদের মিলনমেলা বসেছিল চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে। উদ্দেশ্য দুই হাজার বছর আগের বিশ্বজুড়ে যে বাণিজ্যপথ গড়ে উঠেছিল তা পুনরুজ্জীবন করা। এই পথ পুনর্গঠনে বিশ্বের এক নম্বর অর্থনৈতিক পরাশক্তি চীন যে উদ্যোগ নিয়েছে তাতে শামিল হওয়া। নিউ সিল্ক রুট বা ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড (ওবিওআর) নামে এই মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের এই সম্মেলনে বিশ্বের ২৯টি দেশের সরকার প্রধানরা যোগ দেন। দুই দিনের সম্মেলনে ১৩০টি দেশের ১৫০০ অতিথি অংশগ্রহণ করেন। এ প্রকল্পের লক্ষ্য হচ্ছে, বিশাল বিনিয়োগের মধ্য দিয়ে সড়ক, রেলপথ ও বন্দরের উন্নয়ন ঘটিয়ে এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ এবং এর বাইরের দেশগুলোর সাথেও বাণিজ্যের প্রসার ঘটানো। নতুন ও উন্নততর অবকাঠামো নির্মাণের মধ্য দিয়ে ব্যবসায় বাণিজ্য, বিনিয়োগ, সংস্কৃতি ও চিন্তার যেমন প্রসার হবে, তেমনি সব দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হবে। থাকবে জ্বালানি সরবরাহের পাইপলাইন নির্মাণ। বিশ্বজুড়ে যোগাযোগব্যবস্থা পুনর্গঠনের এই প্রকল্পে ১২ হাজার ৪০০ কোটি ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে চীন।


দুই দিনের এই সম্মেলনে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন যেমন উপস্থিত ছিলেন, তেমনি ছিলেন হোয়াইট হাউজের উপদেষ্টা ম্যাট পটিনজারের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল। অংশ নিয়েছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোগান, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ ছাড়াও ইউরোপ ও এশিয়ার অনেক দেশের সরকারপ্রধান। এ ছাড়া জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব, বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের প্রধান নির্বাহীরা। চীনবিরোধী হিসেবে পরিচিত জাপান ও ভিয়েতনামের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা অংশ নেন এই সম্মেলনে। শুধু ব্যতিক্রম ভারত। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সার্বভৌমত্ব ক্ষুন্নের শঙ্কার কথা বলে এই সম্মেলনে অংশ নেয়নি ভারত।


চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়ার খবরে বলা হয়েছে এই প্রকল্পে চীন যে নতুন করে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে তার পরিমাণ ১৪.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এ ছাড়া ওবিওআর-এর বিভিন্ন প্রকল্পে চায়না ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ও চায়না এক্সিম ব্যাংক ৫৫.১ বিলিয়ন ডলার ঋণ দেবে। দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতা প্রকল্পগুলোতে ১ বিলিয়ন ডলার; ওবিওআর প্রকল্পে জড়িত আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে ১ বিলিয়ন ডলার দেবে। এ ছাড়া জরুরি খাদ্যত্রাণের জন্য ২৯০ মিলিয়ন ডলার ও সামাজিক-সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোর জন্য ৮.৭ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করা হয়েছে।


২০১৩ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এই ওবিওআর ধারণা প্রকাশ করেন। একবিংশ শতকের মেরিটাইম সিল্করোড ও প্রাচীন সিল্করোড অর্থনৈতিক অঞ্চলের সমন্বয়ে এই ওবিওআর উদ্যোগ। এই ধারণার পেছনে নিশ্চিতভাবে চীনের রাজনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব বিস্তারের চিন্তাও রয়েছে। এই প্রকল্পের আওতাধীন দেশগুলোতে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৬৫ শতাংশের বাস। ওবিআর পরিকল্পনার আওতাধীন দেশগুলো বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ জ্বালানি সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করে। এই দেশগুলোতে ইতোমধ্যে চীনের বাণিজ্য ১ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
বর্তমানে চীনের জ্বালানি চাহিদার ৮০ শতাংশ আসে সরু মালাক্কা প্রণালি দিয়ে। যেকোনো যুদ্ধ বা বৈরি পরিস্থিতিতে এই প্রণালি বন্ধ করে দিলে জ্বালানি সঙ্কটে পড়বে চীন। এখন নতুন এই সিল্করোড পরিকল্পনায় মধ্য এশিয়া, মিয়ানমার ও পাকিস্তানের সাথে জ্বালানি সরবরাহের পাইপলাইন স্থাপন করেছে। এ ছাড়া পাকিস্তানের গোয়াধরে বন্দর নির্মাণের মধ্য দিয়ে সহজে আরব সাগরে প্রবেশের সুযোগ পেয়েছে দেশটি। এ কারণে সিল্করোড পরিকল্পনায় সবচেয়ে গুরুত্ব পেয়েছে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর। এবারের সম্মেলনে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোরের বিস্তারিত পরিকল্পনা প্রকাশ করা হয়েছে। যেখানে সড়ক ও রেল যোগাযোগ ছাড়াও বিদ্যুৎ, জ্বালানি, কৃষিসহ বিভিন্ন খাতে চীনা বিনিয়োগ পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে। চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোরের মাধ্যমে কাশগড় থেকে বেলুচিস্তানের গোয়াধর বন্দর পর্যন্ত দুই হাজার কিলোমিটার সড়ক ও রেল যোগাযোগ স্থাপন করা হচ্ছে। এই অর্থনৈতিক করিডোরে সব মিলিয়ে ব্যয় হচ্ছে ৪৬ বিলিয়ন ডলার। সম্মেলনে পাকিস্তানের সাথে কয়েক মিলিয়ন ডলারের একাধিক চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। এ ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার ছয়টি দেশের সাথে চীনের ২০টি অবকাঠামো নির্মাণের চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। শুধু এশিয়া নয় ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড প্রকল্পে ইউরোপের দেশগুলোর রয়েছে সমান আগ্রহ। ইতোমধ্যে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে লন্ডন-বেইজিং পণ্য পরিবহনের জন্য রেল যোগাযোগ চালু হয়েছে। লন্ডন থেকে পণ্যবাহী এই ট্রেন বেইজিং পৌঁছতে লাগছে ১৮ দিন। ৭ হাজার ৪৬৫ কিলোমিটারের এই রেললাইন কাজাখস্থান, রাশিয়া, বেলারুশ, পোল্যান্ড, বেলজিয়াম, ফ্রান্স হয়ে যুক্তরাজ্যে পৌঁছাবে।


সম্মেলনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেন, ‘আমরা বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রকল্প বাস্তবায়নকে এ অঞ্চলে শান্তির প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করছি। আমরা শত্রু শত্রু খেলার পুরনো পথে ফিরে যাব না। আলোচনার মাধ্যমে সব পক্ষের স্বার্থ রক্ষা করে এই পরিকল্পনা আমরা এগিয়ে নিতে চাই। আশা করি এ ক্ষেত্রে কেউ বাধা সৃষ্টি না করে সমঝোতার পথ বেছে নেবে। বিশ্ব অর্থনীতির গতি আরো বাড়াতে আমাদের সবার উচিত পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদার করা। আমাদের এমন একটা উদ্যোগ নেয়া উচিত, যাতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগের স্বচ্ছ একটি ভিত্তি তৈরি হয়।’ তিনি আরো বলেন, ‘উন্মুক্ত উন্নয়নকে উৎসাহিত করা এবং সুষ্ঠু, যৌক্তিক ও স্বচ্ছ বিশ্ববাণিজ্য ও বিনিয়োগ বিধিব্যবস্থা গড়ে তোলার এখনই সময়। চীন সব দেশের সাথেই তাদের উন্নয়নের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতে চায়। আর অন্যান্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়েও চীন হস্তক্ষেপ করবে না। এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা কিংবা আমেরিকা যেখানকার দেশই হোক না কেন বেল্ট অ্যান্ড রোড পরিকল্পনায় তাদের সবারই সহযোগিতা এবং অংশীদারত্ব থাকবে।


চীনের অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন কাজ শেষ হওয়ার পর যে অতিরিক্ত শিল্পোৎপাদন হবে তার জন্য এখন বাজার সৃষ্টি জরুরি হয়ে পড়েছে। তাই বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে যেসব দেশ অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য মরিয়া হয়ে চেষ্টা চালাচ্ছে সেখানে নিজের অতিরিক্ত সামর্থ্য কাজে লাগাতে চাচ্ছে চীন। এর ফলে শুধু চীন লাভবান হবে না যেসব দেশে চীনা বিনিয়োগ যাবে সেসব দেশে অর্থনৈতিক উন্নতি ঘটবে। ওবিওআর প্রকল্প চীনের এই বিনিয়োগকে সম্প্রসারণ করবে। ইউরোপ এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলো নিজ দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বার্থে এই প্রকল্পে যোগদান করছে। এই প্রকল্প যে আগামী দিনে বিশ্ব অর্থনীতিতে শুধু গতি সঞ্চার করবে না আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক রাজনীতির গতিপথও বদলে দেবে।


ভারতের বর্জন : প্রতিবেশীদের অংশগ্রহণ
চীনের ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড সম্মেলনে এশিয়ার প্রায় সব দেশ অংশ নিলেও যোগ দেয়নি ভারত। ওবিওআর প্রকল্পের চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর পাকিস্তানের গিলগিট বাল্টিস্থান হয়ে সড়ক ও রেলপথ নির্মাণ করা হয়েছে। ভারতের দাবি এই প্রকল্প ভারতের আঞ্চলিক অখণ্ডতা বিঘ্নিত করবে। অবশ্য ওবিওআর সম্মেলনের উদ্বোধনী ভাষণে চীনের প্রেসিডেন্ট ভারতের নাম উল্লেখ না করে উন্নয়ন প্রকল্পে বাধা সৃষ্টি করা থেকে বিরত থাকার পাশাপাশি সব দেশকে অন্য দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার আহ্বান জানান। একই সাথে আঞ্চলিক অর্থনীতি শক্তিশালী করতে দ্রুত নিউ সিল্করোড প্রকল্প বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। ভারতের আশঙ্কা ওবিওআর সফল হলে প্রতিবেশী দেশগুলো অর্থনৈতিক সহায়তা, বিনিয়োগ ও নিরাপত্তার জন্য দিল্লিকে উপেক্ষা করে চীনের দিকে তাকিয়ে থাকবে। তখন দক্ষিণ এশিয়ায় তার আধিপত্যের অবসান ঘটতে পারে।


ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গোপাল বাগলে বলেন ভারত এমন কোনো প্রকল্প মেনে নিতে পারে না যার বিনিময়ে সার্বভৌমত্বের সাথে আপস করতে হয়। ভারতের মুখপাত্রের মতে এই উচ্চাভিলাষী প্রকল্প বাস্তবায়ন কোনো কোনো দেশের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তবে নরেন্দ্র মোদি সরকারের অবস্থান নিয়ে ভারতের ভেতরে বিতর্ক রয়েছে। এই প্রকল্পে সম্পৃক্ত না হয়ে ভারত পিছিয়ে পড়ছে বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন।
ভারত এই সম্মেলনে যোগ না দিলেও একমাত্র ভুটান ছাড়া প্রতিবেশী সবগুলো দেশে অংশ নেয়। ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড (ওবিওআর) সম্পৃক্ত হওয়ার ব্যাপারে ২০১৪ সালে সিদ্ধান্ত নেয় মালদ্বীপ। বাংলাদেশ এ প্রকল্পে যোগ দেয়ার চুক্তি স্বাক্ষর করে ২০১৬ সালে। ২০১০ সালে হামবানতোতা বন্দর নির্মাণ শুরু হওয়ার পর শ্রীলঙ্কা ওবিওআর-এর অংশে পরিণত হয়। সম্মেলনে শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহে ও কৌশলগত উন্নয়নমন্ত্রী মালিক সামারাবিক্রমা বৈঠকে প্রতিনিধিত্ব করেন। ১১-১২ মে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শ্রীলঙ্কা সফর সত্ত্বেও ওবিওআর সম্মেলনে যোগদান করেন প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (সিপিইসি) নির্মাণের মাধ্যমে পাকিস্তান এই প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারে পরিণত হয়। সম্মেলনে পাকিস্তানে বিমানবন্দর, নৌবন্দর ও মহাসড়ক নির্মাণে আরো ৫০০ মিলিয়ন ডলারের চুক্তি স্বাক্ষর করে দুই দেশ। আর চলতি মাসেই চীনের সাথে ওবিওআর কাঠামোগত চুক্তি সই করে নেপাল। নেপাল থেকে সম্মেলনে যোগ দেন উপপ্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী কৃষ্ণবাহাদুর মহররা। এ প্রকল্পের আওতায় নেপালের সাথে সরাসরি রেল যোগাযোগ স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছে চীন। যাতে ৮ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হতে পারে। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদপত্র গ্লোবাল টাইমস এক প্রতিবেদনে মন্তব্য করেছে চীনের পক্ষ থেকে ভারতকে এই সম্মেলনে যোগদানের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। ভারত যদি এ প্রকল্পে যোগ দিতে না চায় তার উচিত দর্শক হয়ে থাকা। প্রতিবেশী কোনো দেশকে এই প্রকল্প থেকে দূরে রাখতে পারবে না।