জাতীয় অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চাই : খালেদ মিশাল

May 21, 2017 10:04 am
সাক্ষাতকার খালেদ মিশাল

 

নতুন সাংগঠনিক নীতিমালা প্রকাশ করেছে ফিলিস্তিনের প্রতিরোধ আন্দোলন হামাস। হামাস প্রধান হিসেবে দুই মেয়াদের দায়িত্ব শেষ হওয়ার এক দিন আগে চলতি মাসের শুরুতে খালিদ মিশালের কাতারের রাজধানী দোহায় এক সংবাদ সম্মেলনে এই নতুন নীতি প্রকাশ করেন। নতুন নীতি, দশ বছরের দায়িত্ব পালনসহ বিভিন্ন বিষয়ে তিনি কথা বলেছেন আলজাজিরার সাথে একান্ত সাক্ষাৎকারে ।

 

হামাসের নতুন দলিলকে আপনি কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন, এটি কি হামাসের পুরনো সনদের বিকল্প?
: চার বছর ধরে হামাসের নতুন দলিল প্রস্তুত হয়েছে। ফিলিস্তিনি সমাজ, ইসরাইলের সাথে দ্বন্দ্ব ও বহির্বিশ্বের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন বাস্তবতার আলোকে হামাসের জন্য এটি পথনির্দেশ হিসেবে কাজ করবে। এতে আমাদের বর্তমান অবস্থান ফুটে উঠেছে, যাতে প্রমাণিত হবে আমরা কোনো কট্টর মতাদর্শে বিশ্বাসী নই। এই দলিল প্রমাণ করে আমরা একটি গতিশীল সংগঠন এবং জনগণের স্বার্থের বিষয়ে যেকোনো পরিবর্তন আনতে আগ্রহী। ভবিষ্যতেও নতুন সম্পর্কের বিষয়ে আরো দলিল ও নীতিমালা প্রকাশ করবে হামাস। আমাদের পুরনো সনদ ৩০ বছর আগের তৈরি, বর্তমানে যুগ ও পরিস্থিতি পাল্টেছে।


নতুন সনদের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পশ্চিম তীর ও গাজায় ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের সীমান্ত মেনে নেয়া, যা সংগঠনটির আগের নীতিমালায় ছিল না। এই পরিবর্তনের কারণ কী?
: আমরা আগেও অনেকবার বলেছি, ইসরাইল ও অন্যান্য ফিলিস্তিনি সংগঠনগুলোর আলোচনার সিদ্ধান্ত মোতাবেক ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রগঠন হামাসের লক্ষ্য নয়। সম্ভাবনাকে অস্বীকার করতে না পারলেও এর অর্থ এই নয় যে আমরা ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিচ্ছি এবং এই নীতিকে বিসর্জন দিচ্ছি না যে ফিলিস্তিনের সব কিছুই ফিলিস্তিনের জনগণের।


আপনি কত দিন ধরে হামাসের সাথে জড়িত?
: আমি হামাসের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। প্রথম দিন থেকে সংগঠনটির সাথে জড়িত। ১৯৮৭ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশের আগ থেকেই আমি এটির সাথে জড়িত। আনুষ্ঠানিক ঘোষণার ১০ বছর আগে ১৯৭৭ সাল থেকে এটির প্রতিষ্ঠার জন্য কৌশলগত দিকগুলো নিয়ে কাজ করেছি। প্রথম দিন থেকেই আমি সংগঠনটির পরামর্শ পরিষদ ও নেতৃত্ব কাঠামোর সাথে জড়িত ছিলাম।


সংবাদ সম্মেলনে আপনি সমগ্র ঐতিহাসিক ফিলিস্তিনকে স্বাধীন করার আহ্বান জানিয়েছেন। ধরা যাক যেকোনোভাবে সেই লক্ষ্য অর্জিত হলো, তখন ইসরাইলি ইহুদিদের কী হবে?
: আমরা আমাদের ভূখণ্ডে জাতীয় অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চাই। মুক্ত ও সার্বভৌম রাষ্ট্রে বসবাসের জন্য উদ্বাস্তু ফিলিস্তিনিদের ফিরিয়ে আনতে চাই। যেটা ফিলিস্তিনি জনগণেনর একান্ত চাওয়া। ইহুদিদের বিষয়ে আমাদের ‘ভয়ঙ্কর’ হিসেবে তুলে ধরার ইসরাইলি প্রপাগান্ডা নিয়ে কথা বলতে চাই না। আরব ও মুসলিমরা যুদ্ধের সময়ও তাদের শত্রুদের বিষয়ে সর্বোচ্চ নৈতিকতা প্রদর্শন করে। তারা নিরীহ বেসামরিক লোকদের ওপর আঘাত না হানতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ ক্ষেত্রে আমি মুসলিম নেতা সালাউদ্দিন আইয়ুবীকে স্মরণ করতে চাই, যিনি ১১৮৭ সালের ক্রুসেডের সময় জেরুসালেম মুক্ত করার পর এর বাসিন্দাদের নিরাপত্তা দিয়েছিলেন। হামাসেরও একটি মানবিক মানদণ্ড রয়েছে, তবে তারা আধিপত্যবাদ ও ঔপনিবেশিকতার সাথে সহাবস্থান করবে না।


নেতৃত্ব থেকে অবসরের পর হামাসে আপনার নতুন ভূমিকা কী হবে?
: ১৯৯৫ সাল থেকে আমি সংগঠনটির নির্বাচিত নেতা ছিলাম। সে সময় আমাদের গঠনতন্ত্রে নেতৃত্বের মেয়াদের বিষয় নির্ধারিত ছিল না। কিন্তু গত দশকে আমরা একজন নেতা চার বছর মেয়াদের সর্বোচ্চ দুই মেয়াদ পদে থাকতে পারবেন এমন নিয়ম করেছি। (পদে না থাকলেও) সংগঠনের সাথে আমি থাকব। এমন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চাই যেন সবাই সংগঠনে অবদান রাখার সুযোগ পায় এবং সর্বোচ্চ পদে না থাকলেও জনগণের জন্য কাজ করতে পারে।


হামাস কি একটি গণতান্ত্রিক সংগঠন?
: শতভাগ। আমি মনে করি আমাদের অভ্যন্তরীণ নীতি ও শর্তের ক্ষেত্রে আমার গণতান্ত্রিক সরকারপদ্ধতির চর্চা করি যা আপনি এই অঞ্চলে খুব কমই দেখবেন। সেই সাথে আমরা বাস্তবমুখীও। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের অঞ্চলে প্রয়োগজনিত ত্রুটির কারণে বাস্তবমুখিতাকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা হচ্ছে। তবে আমাদের বাস্তবমুখিতা ইতিবাচক এবং এগুলো কখনোই আমাদের মূল নীতির ব্যত্যয় ঘটিয়ে করা হয় না।


সাম্প্রতিক সময়ে আপনারা ইসরাইলের সাথে আলোচনায় বসার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। ধরুন ইসরাইল আপনাদের সাথে আলোচনায় বসতে রাজি হলো সে ক্ষেত্রে নীতিগত কোনো বিষয় কি আপনাদের জন্য বাধা হয়ে দাঁড়াবে?
: আমাদের জন্য আলোচনায় বসা বা না বসার নীতি কোনো স্থায়ী দলিল নয়, এটি রাজনৈতিক ও পরিবর্তনশীল একটি বিষয়। ইতিহাসে এমন অনেক নজির আছে যেখানে মুসলিম নেতারা শত্রুদের সাথে আলোচনায় বসেছেন। উদাহরণস্বরূপ নবী মোহাম্মদ সা: ও সালাউদ্দিন আইয়ুবীর কথা বলা যায়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ইসরাইলের সাথে আলোচনার মাধ্যমে সুফল পাওয়ার সম্ভাবনা কম। বর্তমানে ইসরাইল শান্তিতে আগ্রহী নয়। ইসরাইলকে আমাদের শান্তি স্থাপন করতে ও আমাদের অধিকার ফিরিয়ে দিতে বাধ্য করা যাচ্ছে না। আমরা শক্তিশালী হয়ে যখন এই বাস্তবতা সৃষ্টি করতে পারব যে, ইসরাইল আমাদের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য হবে, শুধু তখনই আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ ও অর্থবহ হবে আমাদের জন্য। পিএলওর কথা স্মরণ করুণ, কয়েক দশক ইসরাইলের সাথে আলোচনা করেও তারা কোনো ফল পায়নি।
সূত্র : আলজাজিরা
ভাষান্তর : আহমেদ বায়েজীদ