অর্থের বিনিময়ে সৌদি নিরাপত্তা

May 24, 2017 09:13 am
ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সৌদি বাদশাহ উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়েছেন

 

আলফাজ আনাম

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০১৬ সালে নির্বাচনের আগে টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন সৌদি আরব যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সাহায্য ও নিরাপত্তা চায় তা তিনি অবশ্যই দেবেন কিন্তু তা হতে হবে অর্থের বিনিময়ে। এফবিআই প্রধানকে বরখাস্ত এবং নির্বাচনে তার রাশিয়া কানেকশন নিয়ে যখন দেশের মধ্যে চাপের মুখে, সে সময় ট্রাম্প বেড়িয়েছেন বিদেশ সফরে। তাও আবার সফরের প্রথম দেশ সৌদি আরব। যিনি এক সময় দেশটি রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকার অযোগ্য বলে মন্তব্য করেছিলেন। তবে অর্থের বিনিময়ে সৌদি আরবের নিরাপত্তা দেয়ার যে কথা তিনি বলেছিলেন তা পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করেছেন।

১১০ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্রচুক্তিসহ আরো ৩০০ বিলিয়ন ডলারের নানা ধরনের বিনিয়োগ চুক্তি করেছেন। সৌদি আরবের সাথে এই অস্ত্র চুক্তি সম্ভবত কোনো দেশের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় অঙ্কের অস্ত্র বিক্রির চুক্তি। ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সৌদি বাদশাহ উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়েছেন। স্কার্ফছাড়া মেলানিয়া ট্রাম্পের সাথে হাত মিলিয়েছেন।


দুই পবিত্র মসজিদের খাদেম বাদশাহর সভাপতিত্বে সব মুসলিম দেশের সরকার প্রধানদের দেয়া সম্মেলনে বক্তব্য রেখেছেন। সম্মেলনের নামও ছিল দারুণ এক চটকদার। আরব ইসলামিক অ্যামেরিকান সম্মেলন। সৌদি নেতৃত্বাধীন ৪১টি দেশের সরকার প্রধানদের এ সম্মেলনে প্রধান বক্তা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। অথচ তার ইসলামোফোবিক বিখ্যাত উক্তি আমি মনে করি, ইসলাম আমাদের ঘৃণা করে। আর তার সদ্য পদত্যাগী নিরাপত্তা উপদেষ্টা মাইকেল ফ্লিনের ইসলাম হচ্ছে ক্যান্সারের মতো এমন বক্তব্য নিয়ে মুসলিম বিশ্ব ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল। নির্বাচিত হওয়ার পর সিরিয়া, ইরান, ইরাক, লিবিয়া, সোমালিয়া, সুদান ও ইয়েমেন এই সাতটি মুসলিম দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ নিয়ে মুসলিম দেশগুলোতে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন।

তিনি এবার মুসলিম নেতাদের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তাদের দায়িত্বের কথা স্মরণ করে দিয়ে বলেছেন যুক্তরাষ্ট্র্রের যুদ্ধ ইসলামের বিরুদ্ধে নয়। এ লড়াই নৃশংস অপরাধীদের বিরুদ্ধে, যারা মানব সভ্যতাকে গুঁড়িয়ে দিতে চায়, যা সব ধর্মের ভালো মানুষেরা রক্ষা করতে চায়। এটা ‘শুভ আর অশুভের লড়াই’। তার আহ্বান সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াইতে অবশ্যই মুসলিম দেশগুলোকে নেতৃত্ব দিতে হবে।সৌদি আরবের অবস্থানের সাথে সঙ্গতি রেখে তিনি সব সন্ত্রাসের জন্য ইরানকে মদদদাতা হিসেবে দায়ী করেছেন। ফিলিস্তিন সঙ্কটের ব্যাপারে ট্রাম্পের অবস্থান স্পষ্ট না হলেও ফিলিস্তিনের মুক্তি আন্দোলন হামাসকে চিহ্নিত করেছেন একটি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে। মিশরের সামরিক স্বৈরশাসক জেনারেল সিসির করেছেন প্রশংসা।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের সৌদি আরব সফর নিঃসন্দেহে তার পররাষ্ট্র নীতির দিক থেকে বিরাট সাফল্য। কার্যত সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অঙ্গীকারের বিনিময়ে বড় ধরনের বাণিজ্য করেছেন। সৌদি আরবের নেতৃত্বে জিসিসি দেশগুলোর সাথে যে ৩০ বছর মেয়াদি কৌশলগত সর্ম্পকের চুক্তি হয়েছে তাতে এ দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব রক্ষার যেমন প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে, তেমনি ইরানকে সন্ত্রাসী কার্যক্রমের উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। মার্কিন প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে জিসিসি দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগ ও নিরাপত্তা সহযোগিতার সম্পর্ক আরো ঘনিষ্ঠ করার ব্যাপারে একমত হয়েছে। অর্থাৎ এ কৌশলগত সম্পর্কের ভিত্তিতে আরব দেশগুলোতে ট্রাম্প প্রশাসন আরো বিপুল পরিমাণ অস্ত্র বিক্রির সুযোগ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছেন।


সত্যিকার অর্থে ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমরাস্ত্র কারখানার জন্য বিরাট সুখবর এনে দিয়েছেন। চুক্তির পর যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে প্রথম দিনের লেনদেনে বাজার চাঙ্গা হয়ে ওঠে ও তিনটি মার্কিন অস্ত্র তৈরি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার মূল্য রেকর্ড পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। এ তিনটি প্রতিষ্ঠানের অন্যতম হচ্ছে লকহিড মার্টিন। এ প্রতিষ্ঠানটি ট্রাম্পের সৌদি আরব সফরের সময় ছয় হাজার কোটি ডলার খরচে দেড় শ’ ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টার বিক্রির চুক্তি করে। লকহিড মার্টিন ছাড়াও আরো দুটি মার্কিন অস্ত্র তৈরি প্রতিষ্ঠান নর্থগ্রুপ গ্রামম্যান ও রেথিয়ন’এর শেয়ারমূল্য বাজারকে চাঙ্গা করছে।


আরব বসন্তকে কেন্দ্র করে ওবামা প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্যকে যেভাবে সাজানোর পরিকল্পনা নিয়েছিলেন তা আগেই ট্রাম্প পরিত্যাগ করেছেন। রেজিম চেঞ্জের বদলে তিনি বাণিজ্যর বিনিময়ে এসব দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব নিয়েছেন। বারাক ওবামার সময় সৌদি-মার্কিন সম্পর্ক ছিল নিম্নমুখী। একদিকে ইরানের সাথে আলোচনা এবং পশ্চিমা দেশগুলোর সম্পর্ক স্বাভাবিক করণের উদ্যোগ, অপরদিকে সৌদি আরবের পাশ্ববর্তী দেশগুলোতে আরব বসন্তে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন সৌদি শাসকদের দারুণ উৎকণ্ঠায় ফেলেছিল। আরব বসন্তে একের পর এক স্বৈরশাসকদের পতনের রক্ত হিম করা এ সময় সৌদি বাদশাহরা ছিলেন নানা কারণে উদ্বিগ্ন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অনেকটাই আস্থা হারিয়ে ফেলেছিল সৌদি আরব।

২০১৬ সালের মার্চ মাসে নাইন-ইলাভেনের হামলায় সৌদি নাগরিকের দায় সৌদি সরকারকে নিতে হবে কংগ্রেসে বিল পাস হয়। সৌদি আরব হুমকি দেয় মার্কিন ট্রেজারিতে রক্ষিত সৌদি ৭৫০ বিলিয়ন ডলার তুলে নেয়া হবে। এছাড়া অন্য মার্কিন সম্পদ জব্দ করা হবে। এরপরও ২০১৬ সেপ্টেম্বর মার্কিন কংগ্রেস এ আইন পাস করে। দুই দেশের সম্পর্কের ওপর খারাপ প্রভাব পড়বে বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে সৌদি আরব।


এ সময় সৌদি অর্থনীতি নাজুক পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে। ২০১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র তেল উৎপাদন শুরু করে। বিশ্বব্যাপী তেলের দাম পড়ে যায়। সৌদির তেল রফতানি ৫০ শতাংশ কমে যায়। ২০১৪ সালের জুনে যেখানে ব্যারেল প্রতি তেলের দাম ছিল ১১০ ডলার, ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে দাম হয় ২৭ ডলার। এখন এ বিরূপ পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে পারেনি সৌদি আরব। তেল উৎপাদন বাড়িয়ে দেয়ার পাশাপাশি অন্যান্য খাত থেকে আয় বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। অর্থনীতির চেয়ে নিরাপত্তা এখন সৌদি আরবের জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ। একদিকে ইরানকে মোকাবেলা, সীমান্তবর্তী ইরাকে অব্যাহতভাবে ইরানের প্রভাব বেড়ে যাওয়া এবং আইএসের নামে দলছুট নানা সশস্ত্র সংগঠনের তৎপরতা সৌদি আরবের জন্য বিশাল এক মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।


আরব বসন্তকে কেন্দ্র করে ইয়েমেনে ক্ষমতার পরিবর্তনের এক পর্যায়ে দেশটির সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে সৌদি আরব। কিন্তু এ যুদ্ধে মার্কিন সমর্থন তো পায়নি বরং মার্কিন কোম্পানিগুলোর অস্ত্র বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল। ট্রাম্প যেভাবে ইরানকে সন্ত্রাসের জন্য দায়ী করছেন তাতে ইয়েমেন যুদ্ধে সৌদি আরব প্রকাশ্য মার্কিন সমর্থন পাবে তা নিশ্চিত করে বলা যায়। প্রকৃতপক্ষে ট্রাম্প আবির্ভূত হয়েছেন সৌদি বাদশাহ ত্রাতার ভূমিকায়। আর অস্ত্র বিক্রির পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন ট্রাম্পের চৌকস ইহুদি জামাই জ্যারেড কুশনার। এর আগে ২০১৭ মার্চ সৌদি ক্রাউন প্রিন্স ও ডিফেন্স মিনিস্টার মোহাম্মদ বিন সালমান ওয়াশিংটন সফর করেন। ট্রাম্পের সাথে বৈঠক করেন। সেখানে বিপুল অঙ্কের অস্ত্র কেনার বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন প্রিন্স মোহাম্মদ।


মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সৌদি আরবের অস্ত্র ও তেল বাণিজ্যর এ সম্পর্ক অনেক পুরনো। ১৯৩৩ সালে স্ট্যান্ডার্ট ওয়েল অব ক্যালোফিার্নিয়ার তেল অনুসন্ধানের অনুমতির মধ্যদিয়ে। পরে ১৯৫০ সালে এটি সউদি আরব এবং অ্যারবিয়ান আমেরিকান ওয়েল কোম্পানি (আরামকো) নামে পরিচিতি পায়। ১৯৪৫ সালে বাদশাহ আব্দুল আজিজ ইবনে সউদ সুয়েজ খালে ইউএসস মারফিতে প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের সাথে বৈঠক করেন। এ বৈঠকে সৌদি আরবের নিরাপত্তা ও তেল সম্পদ নিয়ে দুই দেশের দীর্ঘ মেয়াদি বন্ধুত্ব নিয়ে আলোচনা হয়। অবশ্য এর আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দাহরানে একটি সামরিক ঘাঁটি গড়ার প্রস্তাব দেয়।

সেই থেকে মার্কিন ঈগলের চোখে দুনিয়া দেখছে সৌদি আরব। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য হয়ে উঠেছে এক রক্তস্নাত জনপদ। রিপাবলিকানদের সাথে সৌদি আরবের সম্পর্ক তেল বাণিজ্যর মতো পুরনো। ট্রাম্পকে আগলে রেখেছেন বিভিন্ন তেল কোম্পানির সাবেক নির্বাহীরা। বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্সটিলারসন ছিলেন এক্সনমবিলের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী। আসলে বাণিজ্যের পুরনো সম্পর্ক ধরেই ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে সৌদি আরবের ঘনিষ্ঠতা বাড়ছে। শেষ কথা হলো সৌদি আরবের নিরাপত্তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দেবে কিন্তু বিনিময়ে দিতে হবে বিপুল পরিমাণ অর্থ।