ভারতের ভরসা ইসরাইল

Jul 12, 2017 03:21 pm
ভারতের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র দেশ হিসেবে দৃশ্যপটে চলে এলো ইসরাইল

 
আলফাজ আনাম
ভারতের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র দেশ হিসেবে দৃশ্যপটে চলে এলো ইসরাইল। ভারতের সাথে ইসরাইলের সম্পর্ক নতুন না হলেও এই সম্পর্কের ক্ষেত্রে একধরনের রাখঢাক ছিল। আরব দেশগুলোর সাথে সম্পর্কের কথা বিবেচনায় নিয়ে ফিলিস্তিনের প্রতিও সমর্থন প্রকাশ করত ভারত। কিন্তু ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ইসরাইল সফরের মধ্য দিয়ে তেল আবিবের সাথে নয়াদিল্লির সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতার দিকটি প্রকাশ্য রূপ পেল। এই প্রথম ভারতের কোনো প্রধানমন্ত্রী ইসরাইল সফর করলেন।

নরেন্দ্র মোদি তার তিন দিনের সফরে ফিলিস্তিনের নামও উচ্চারণ করেননি। এর মধ্য দিয়ে ভারত যে ফিলিস্তিন ইস্যুকে পরিত্যাগ করে ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক বিশেষ পর্যায়ে নিয়ে যাবে তার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। নরেন্দ্র মোদিকে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু স্বর্গ থেকে আসা দোস্ত বলে উল্লেখ করেছেন। দুই নেতার সাংবাদিক সম্মেলনে নেতানিয়াহু কিছুটা রসিকতার করে বলেন, ভারত ও ইসরায়েলের মধ্যে বিয়ের বিষয়টি স্বর্গেই ঠিক হয়েছিল। আর সেই বিয়েটা হলো আজ। দুই দেশের আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্কের ২৫ বছর পূর্তিতে তিন দিনের সফরে ইসরাইল সফরে যান নরেন্দ্র মোদি।


কয়েক বছর যাবৎ ভারতের প্রধান অস্ত্র আমদানিকারক দেশের তালিকায় শীর্ষে চলে এসেছে ইসরাইল। মোদির ইসরাইল সফরে বড় ধরনের সামরিক সহায়তার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। অ্যান্টি ট্যাংক মিসাইল এবং বারাক-৮ এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম ও নজরদারির জন্য অত্যাধুনিক ড্রোনের মতো প্রতিরক্ষাসামগ্রী কেনার বিষয়ও রয়েছে। নরেন্দ্র মোদির ইসরাইল সফরে গুরুত্ব পায় সাইবার প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়। মাঝারি পাল্লার ভূমি থেকে আকাশ ক্ষেপণাস্ত্র, লঞ্চার, ড্রোন এবং যোগাযোগের বিভিন্ন প্রযুক্তি ভারতকে সরবরাহ করবে বিভিন্ন ইসরাইলি সংস্থা। মোদির সফরের আগে ইসরাইলের সাথে গত এপ্রিল মাসে ভারত দুই বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র ও প্রতিরক্ষাসামগ্রী কেনার চুক্তি করে। জুন মাসেই ভারতের নৌবাহিনীর সদস্যরা ইসরাইলের সাথে যৌথ মহড়ায় অংশ নিয়েছে। ভারতের বিমান বাহিনীর সদস্যরা নিয়মিত ইসরাইলে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। মোদির এই সফরে ইসরাইলের সাথে প্রতিরক্ষা সম্পর্কিত গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, কাউন্টার টেরোরিজম, কৃষি ও পানি ব্যবস্থাপনা, মহাকাশ সহযোগিতাসহ আরো বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।


নরেন্দ্র মোদির ইসরাইল সফরের মধ্যে সামরিক ও কৌশলগত সম্পর্কের দিকটি ছিল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। সীমান্তের দুই পাশের দেশ চীন ও পাকিস্তানের দিক থেকে ভারত একধরনের চাপের মধ্যে থাকে। এর মধ্যে ভারতের প্রধান অস্ত্র সরবরাহকারী দেশ রাশিয়ার সাথে পাকিস্তান ও চীনের কৌশলগত নিবিড় সম্পর্ক গড়ে ওঠায় ভারত উদ্বিগ্ন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক নিয়ে ভারতের নীতিনির্ধারকেরা পুরোপুরি আস্থা রাখতে পারছে না। বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একধরনের অস্থিতিশীল অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। ইসরাইল সফরের আগে নরেন্দ্র মোদি যুক্তরাষ্ট্র সফর করেন। এই সফরে ভারতের অর্জন নিয়ে যথেষ্ট সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে মোদিকে। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা ছাড়া কিছুই অর্জন হয়নি বলে সাবেক কয়েকজন ভারতীয় কূটনীতিক মনে করেন। অপর দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরিভাবে পাকিস্তানকে পরিত্যাগ করবে এমনটাও মনে করছেন না তারা। বিশেষ করে আফগানিস্তানে সঙ্ঘাতময় পরিস্থিতির কারণে তা সম্ভবও নয়।


যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ভারতের সামরিক সম্পর্ক বাড়ছে। রাশিয়ার পরিবর্তে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন ভারতের প্রধান অস্ত্র ও প্রতিরক্ষাসামগ্রী আমদানিকারক দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। দেশটির সাথে পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি হয়েছে। নিয়মিতভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ভারতের সামরিক মহড়া অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এশিয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র জাপানের সাথে ভারতের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। এর পরও ভারত মনে করে চীন, পাকিস্তান ও রাশিয়ার মধ্যে যে কৌশলগত সম্পর্ক নতুন গড়ে উঠেছে তা মোকাবেলায় ইসরাইল হতে পারে দেশটির সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মিত্র। তেল আবিবে নরেন্দ্র মোদির ভাষণে এই মনোভাবের প্রতিফলন ঘটে। তিনি বলেন, ‘ভারত ও ইসরাইল দুই দেশই জটিল ভৌগোলিক অবস্থানে রয়েছে। মোদির মতে, সন্ত্রাসবাদের ঘৃণা ও হিংসার ভুক্তভোগী ভারত ও ইসরাইল। আর নেতানিয়াহু বলেন, ‘আমরা দুই দেশই সন্ত্রাসবাদের শিকার।

গোটা বিশ্বের শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য এবার আমরা একসঙ্গে কাজ করব।’
এই সফরে কাউন্টার টেরোরিজমের নামে ইসরাইলের বিশেষ সহায়তা চায় ভারত। কাশ্মিরে স্বাধীনতাকামী সংগঠনগুলোকে দমনে হামাসকে মোকাবেলায় ইসরাইলের কৌশল ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে চায় দেশটি। প্রকৃতপক্ষে কাশ্মির ও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ইসরাইলকে পাশে চাইছেন মোদি। একই সাথে ইসরাইলের সীমান্ত ব্যবস্থাপনার দিকটি ভারতের কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। সীমান্তে নজরদারি বাড়ানোর জন্য ভারত নিয়মিতভাবে ইসরাইল থেকে ড্রোনসহ স্পর্শকাতর প্রতিরক্ষাসামগ্রী কিনে থাকে।


ভারতের হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকারের সাথে ইসরাইলের বিশেষ ধরনের আদর্শিক সম্পর্ক গড়ে উঠছে বলে মনে করেন অনেক বিশ্লেষক। ইসরাইল বিশ্বের একমাত্র ধর্মরাষ্ট্র। বিজেপি মনে করে ভারতের পরিচয় হওয়া উচিত একান্তই হিন্দুরাষ্ট্র হিসেবে। ইসরাইল রাষ্ট্রের জন্মের শুরু থেকে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো ইসরাইলকে সমর্থন দিয়ে আসছে। বলা যায়, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের (আরএসএস) কয়েক দশকের প্রয়াসের সাফল্য এসেছে মোদির ইসরাইল সফরের মধ্য দিয়ে। আরএসএসের দ্বিতীয় পরিচালক এম এস গোলওয়ালকারের সময় থেকে ইসরাইলের সাথে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনটির সম্পর্কের শুরু। আরএসএসের তৃতীয় পরিচালক বালাসাহেব দেওরস ওরফে মধুকর দত্তাত্রেয় দেওরসের ভাই ভাউরাও দেওরস সম্পর্ক আরো এক ধাপ এগিয়ে নেন। এক সঙ্ঘ-নেতার মতে, ইসরাইল ইসলামের এক বিপরীত প্রতীক। তারা প্রাচীন হিব্রু ভাষাকে পুনরুজ্জীবিত করতে চেয়েছিল, দেওরসও চেয়েছিলেন সংস্কৃতের পুনরুদ্ধার।

ইসরাইলের জাতীয়তাবাদের ভাবনাও আকৃষ্ট করেছিল তাকে। হিন্দুমহাসভা নেতা বিনায়ক দামোদার সাভারকার ইসরাইল রাষ্ট্রের সৃষ্টির সময় রাজনৈতিক ও নৈতিক সমর্থন প্রদান করেন। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের মতো উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো ৫০-এর দশক থেকে ইসরাইলকে সমর্থন দিয়ে আসছে। এর পেছনে কাজ করছে উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর মুসলিমবিরোধী চেতনা। বর্তমান বিজেপি ইসরাইলের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে আগের নীতি আরো জোরালো করেছেন। ইসরাইলকে একটি মডেল রাষ্ট্র হিসেবে দেখে থাকে বিজেপি।
হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের বাইরে ইসরাইলের সাথে ভারতের সম্পর্ক নতুন নয়। জওয়াহেরলাল নেহরুর সময় ১৯৫০ সালে ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেয় ভারত। ১৯৫৩ সালে মুম্বাইয়ে কনস্যুলেট খুলে ইসরাইল। ১৯৯২ সালে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে ভারত। আনুষ্ঠানিক সম্পর্কের অনেক আগে থেকেই ভারতের সাথে ইসরাইলের প্রতিরক্ষা সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে ওঠে।