চীনকে মোকাবেলায় ভারতের কেৌশল কী সফল হবে

Jul 15, 2017 12:36 pm
চীনা সৈন্যের মুখোমুখি এক ভারতীয় সীমান্তরক্ষী


মোহাম্মদ হাসান শরীফ

 

দোকলাম ভুটান-ভারত-চীন সীমান্তের একটি সঙ্কীর্ণ মালভূমির নাম। আদর্শ তিব্বতি ভাষায় একে বলে দ্রোকলাম, চীনাদের নাম দঙলাঙ। এই ভূখণ্ডটি নিয়ে বিরোধ ভুটান আর চীনের। তবে সম্প্রতি ভারতীয় সেনাবাহিনী এখানে ঢুকে পড়ায় অত্যন্ত শীতল জায়গাটি গরম হয়ে উঠেছে। ভারত ও চীনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সীমানা নাথা লা পাস থেকে মাত্র ১৫ কিলোমিটার দূরে জায়গাটি অবস্থিত।

ভূখণ্ডটির মালিক কোনোভাবেই ভারত নয়, ভারত দাবিও করে না। কিন্তু তবুও ভারতের কারণেই তিন দেশের সৈন্যদের শ্বাস-প্রশ্বাসে ভারী হয়ে উঠেছে স্থানটি।


চীন-ভুটান সীমান্তবিরোধ নিরসনে ১৯৬০ সালে ভারত সরকার আগ্রহ প্রকাশ করেছিল। কিন্তু চীন এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিল। চীনের অবস্থান হলো, ভুটান একটি সার্বভৌম দেশ। তাই ওই দেশ সরাসরি চীনের সাথে আলোচনায় বসবে। প্রথমে রাজি না হলেও চীন অনড় থাকায় ভারত সম্মতি দেয়। ১৯৮০-এর দশকে ভুটান ও চীনের মধ্যে সীমান্ত আলোচনা শুরু হয়। এর পর থেকে আন্তরিক পরিবেশে ২৪ রাউন্ড বৈঠক হয়েছে। এসব বৈঠকে বেশ অগ্রগতিও অর্জিত হয়েছে। তবে ভারতকে সবসময় অবগত রেখেছে ভুটান। ভারত-ভুটান মৈত্রী চুক্তি অনুযায়ী, ভুটানের পররাষ্ট্রবিষয়ক বিষয়গুলোর দেখভাল করে ভারত। ফলে বাধ্য হয়েই ভারতের অনেক দাবি মেনে নিতে হয় ভুটানকে।

চীন কিন্তু স্বাধীন-সার্বভৌম ভুটান দেখতে চায়। ভুটান যতটা নিজের মর্যাদায় চলতে পারবে, ততটাই লাভ চীনের। এ কারণেই ভারতের জোরাজুরি নাকচ করে দিয়ে সীমান্ত প্রশ্নে সরাসরি ভুটানের সাথে আলোচনা চাইছে চীন। কিন্তু ভারতের তাতে সমস্যা আছে।


ভারত নিজে যা পারেনি, সেটাই এখন ভুটানের মাধ্যমে আদায় করে নিতে চাইছে। চীনের সাথে সীমান্ত নিয়ে যখন আলোচনা করেছিল, তখন তারা এই স্থানটির গুরুত্ব সম্ভবত উপলব্ধি করতে পারেনি। এ কারণে এই স্থানটি বাদ দিয়েই তারা চীনের সাথে চুক্তিতে সই করেছিল।
আবার ভুটান জানে, তাদের পক্ষে চীনা বাহিনীর মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। তারা সেটা চায়ও না। কিন্তু ভারতই তাদের এ পথে নামতে বাধ্য করেছে। ভুটানকে কিন্তু আরো আগে থেকেই ভারত তার স্বার্থে ব্যবহার করছে।

ভুটানি সামরিক বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও তহবিলের জোগান দেয় ভারত। এটা কিন্তু ভুটানের স্বার্থে তারা দেয় না। বরং চীনকে ঠেকানোর অগ্রবর্তী ঘাঁটি বিবেচনা করেই ভুটানি সেনাবাহিনীকে গড়ে তোলার আগ্রহ ভারতের।


কিন্তু দোকলাম নিয়ে যা হচ্ছে, তাতে সম্ভবত অনেক ভুটানিই অস্বস্তিতে রয়েছে। ভুটানিদের কাছে ওই জায়গাটির বিশেষ কোনো গুরুত্ব নেই। চীন বা ভারত যদি স্থানটি দখল করে নেয়, তবুও তাদের খুব বেশি কিছু যাবে-আসবে না। কিন্তু চীন ও ভারতের জন্য জায়গাটির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। এ স্থানটি হাতছাড়া হয়ে গেলে ভারতের সিকিম অরক্ষিত হয়ে পড়বে। আর স্থানটি ভুটানের মাধ্যমে ভারতের নিয়ন্ত্রণে চলে গেলে তিব্বতে মারাত্মক কৌশলগত বিপদে পড়ে চীন।

ভারতের চিকেন নেক নামে মুরগির গলাসদৃশ অংশটি ছিন্ন করা হলে যেমন অবশিষ্ট ভারত থেকে পূর্ব অংশটি ছিন্ন হয়ে যাবে, দোকলামের বিষয়টিও তেমন। এ কারণেই দুই পক্ষ অনড়। ভারত তাদের সৈন্য পাঠানোর পর আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু চীনের সরাসরি জবাব, আগে সৈন্য প্রত্যাহার, তারপর আলোচনা। পরে ভারতও জানিয়ে দিয়েছে, তারা সৈন্য প্রত্যাহার করবে না। ফলে দুই পক্ষ হয়তো অন্যান্য স্থানেও তাদের শক্তি প্রকাশ ঘটাতে পারে। ফলে পুরো এলাকায় তার প্রভাব পড়তে পারে। এই ইঙ্গিতও দিয়েছে উভয় পক্ষ। এমনকি চীনা এক সামরিক বিশেষজ্ঞ এমনও বলেছেন, এর জের ধরে কাশ্মিরে চীনাদের প্রবেশ ঘটতে পারে।


সাম্প্রতিক সময়ে ভারত যেভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে গাঁটছড়া বাঁধছে, তাতে করে চীনের পক্ষে ছাড় দেয়া আরো কঠিন হয়ে পড়েছে। অরুণাচল, দালাই লামা প্রভৃতি ইস্যুর রেশ ফুরাতে-না-ফুরতে দোকলাম ইস্যু সামনে এসেছে। এতে করে আরেক দফা উত্তেজনাই সৃষ্টি হয়েছে।