যেভাবে জন্ম আল জাজিরার : আরব রাষ্ট্রগুলো কেন আলজাজিরার প্রতি বৈরী

Jul 15, 2017 03:03 pm
দোহায় আল জাজিরার হেড কোয়ার্টার

 

আরব বিশ্বের অনেক নেতাই মিডিয়ার কভারেজে খুুশি নন। পুরনো ক্ষমতাকাঠামোকে ধসিয়ে দেয়ার জন্য তারা মিডিয়াকে দায়ী করে থাকে। এরই প্রকাশ ঘটেছে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ কয়েকটি দেশে আলজাজিরা নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তে। কেন এমনটা হচ্ছে?

এ নিয়ে টিআরটি ওয়ার্ল্ড কথা বলেছে কমিউনিকেশন বিশেষজ্ঞ তারেক চেককাউইয়ের কাছে। অনুবাদ করেছেন মোহাম্মদ হাসান শরীফ


দুই দশক আগে যাত্রা শুরুর পর থেকেই আলজাজিরা নিউজ নেটওয়ার্ক ছিল আরব ভাষাভাষী বিশ্বের ওপর সৌদি আরবের আধিপত্য চ্যালেঞ্জ করার ছোট্ট কাতারি প্রয়াসের কেন্দ্রবিন্দুতে। মরক্কোয় বেড়ে উঠতে থাকা কিশোর হিসেবে তারেক মার্কিন নিউজ চ্যানেল সিএনএনের মাধ্যমে ১৯৯১ সালে সাদ্দাম হোসেনের ইরাকে মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলোর বোমা ফেলা দেখতেন। ওই যুদ্ধে সিএনএনই ছিল একমাত্র বড় সম্প্রচারকারী। কয়েক বছর পর ২০০৩ সালে তিনি ইরাকে আরেকটি যুদ্ধ দেখলেন। তবে এবার আরব মিডিয়ার খবর প্রচার করছিল। তারেক এর পর থেকে মিডিয়ার ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। অকল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মিডিয়া ও কমিউনিকেশন্সে পিএইচডি নেন তারেক।

তিনি দি নিউজ মিডিয়া অ্যাট ওয়ার : দি ক্লাশ অব ওয়েস্টার্ন অ্যান্ড আরব নেটওয়ার্কস ইন দি মিডল ইস্ট বইয়ের লেখক। বর্তমানে কাতারের জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করেন। চলতি সপ্তাহের শুরুতে বৈদেশিক নীতিবিষয়ক নানা ইস্যু নিয়ে ব্যবধান বাড়তে থাকার প্রেক্ষাপটে কাতারের সাথে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিসর ও বাহরাইন। আবারো আরব রাজতন্ত্র ও স্বৈরাচারীদের রোষানলে পড়ে আলজাজিরা।


প্রশ্ন : কাতারের নিঃসঙ্গতার একটি কারণ কি আলজাজিরা?


তারেক : আলজাজিরার ধারণাটি কাতারের চিন্তাধারার ফসল নয়। বাস্তবতা হলো, ১৯৯৩ সালে বিবিসির (ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং করপোরেশন) সাথে মিলে সৌদি আরব ‘অরবিট’ নামে একটি মিডিয়া সংস্থা বের করতে চেয়েছিল। এর ফলেই আত্মপ্রকাশ ঘটে আলজাজিরার। কিন্তু সৌদি রাজপরিবার নিয়ে বিবিসি কিছু বিতর্কিত খবর সম্প্রচার করার পর আইডিয়াটি বাতিল করা হয়। বিবিসি ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন সাংবাদিককে প্রশিক্ষণ দিয়েছিল। প্রকল্পটি যখন বাতিল করা হলো, তারা তখন কিছু দিতে প্রস্তুত। কাতারি নেতৃত্ব এটাকে সুযোগ হিসেবে নিয়ে ওই সাংবাদিকদেরই আলজাজিরা নামে তার নতুন সংবাদ সংস্থায় কাজ করার আহ্বান জানাল। এ কারণেই প্রকল্পটি নিয়ে একেবারে প্রথম দিন থেকে কাতার ও সৌদি আরবের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যায়।


প্রশ্ন : আরব বিশ্বে কাতারের প্রভাব বিস্তারের একটি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল আলজাজিরা?


তারেক : ১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকে ফিরে যাওয়া যাক। কাতার তখন ছিল মূলত সৌদি আরবের অনুগত রাষ্ট্র। দোহার পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ করা হতো রিয়াদে। ১৯৯৫ সালে রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ হামাদ বিন খলিফা আল সানি ক্ষমতায় আসার পর ওই অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। কাতার তার নিজের জাতীয় স্বার্থের আলোকে সৌদি আরবকে বাদ দিয়েই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে থাকে। ফলে ওই সময় শুরু হওয়া অনেক প্রকল্পের একটি হলো আলজাজিরা। পরিবর্তনের উপাদানগুলোর মধ্যে শিক্ষা ও সংস্কৃতির নানা উপাদানও ছিল। বহু স্তরের একটি প্রকল্প এটি। আর এটিই বিভিন্ন দেশের মধ্যে কাতারের অবস্থান অনেক উঁচুতে নিয়ে যায়। পররাষ্ট্রনীতিতে এই স্বতন্ত্রতা সৌদি আরব হজম করতে পারেনি। আমি মনে করি, কাতার দেখেছে, সৌদি আরব এগোচ্ছে না। রিয়াদ হলো স্থবির, কঠোর। তার শিক্ষাব্যবস্থা দুর্বল। কারিগরি ক্ষেত্রে আধুনিকায়নের কোনো চেষ্টাই নেই।


প্রশ্ন : আলজাজিরার এস্ট্যাবলিশমেন্টের পেছনে আর কী আছে?
তারেক : স্বাধীন দেশ হিসেবে কাতার তার প্রতিবেশীদের প্রচণ্ড চাপে ছিল। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ১৯৯৫ সালের শেষ দিকে এবং ১৯৯৬ সালের প্রথম দিকে অভ্যুত্থানচেষ্টায় সমর্থন দিয়েছিল সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত [পিতার চেয়ে অনেক বেশি আজ্ঞাবহ ছেলেকে দিয়ে অভ্যুত্থান চালানোর চেষ্টা করা হয়]। এই গোপন কার্যক্রমে উত্তেজিত হয়ে কাতার তার নিজস্ব নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উদ্যোগী হয়।


প্রশ্ন : আরব বিশ্বে কিভাবে আলজাজিরা সবচেয়ে জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যমে পরিণত হলো?


তারেক : এর সহজ কারণ হলো, তারা যথার্থ সাংবাদিকতার মানদণ্ড অনুসরণ করে। এটা অনন্য আরব সংবাদমাধ্যম। তারা বিশ্লেষণভিত্তিক তথ্য সরবরাহ করে, প্রমাণ উপস্থাপন করে, বাস্তবে কী ঘটছে, তার ওপর সত্যিকারের প্রতিবেদন প্রকাশ করে। অন্য সংবাদমাধ্যমগুলো শাসকেরা কী চায়, তার আলোকে সংবাদ পরিবেশন করে। আলজাজিরা এই নীতি অনুসরণ করে না। প্রথমবারের মতো আরবরা সরকারি অবস্থান থেকে ভিন্ন কিছু দেখার সুযোগ পেল। আলজাজিরা বিভিন্ন বিষয়ের ওপর (উদাহরণ হিসেবে দুর্নীতি এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের কথা বলা যেতে পারে) আলোচনা ও বিতর্কের আয়োজন করতে সক্ষম হয়। ইসলামপন্থী, বামপন্থী, ভিন্নমতালম্বীরাও কথা বলার সুযোগ পেল। আরব বিশ্বে এমন ঘটনা এই প্রথম। এটাই ছিল আলজাজিরার সফলতা।


প্রশ্ন : আরব বসন্তের সময় আলজাজিরা পরিকল্পিতভাবে গণবিক্ষোভ প্রচার করেছে?


তারেক : কোনো কিছুই পরিকল্পিত ছিল না। তিউনিসিয়া, মিসর ও লিবিয়ায় যা কিছু ঘটছিল, সেসবই আলজাজিরা প্রচার করেছিল। কোনো কিছুই নিজের আবিষ্কার ছিল না। যেসব স্থানে বিক্ষোভ হচ্ছিল, আলজাজিরার সাংবাদিকেরা সেসব স্থানে গিয়ে সেগুলো কভার করেছে। চ্যানেলটি ¯্রফে সাংবাদিকতার দায়িত্ব পালন করেছে। আমি বলছি না, তারা নিখুঁত ছিল। অনেক সময় তারা অন্যদের তুলনায় একটি দলকে বেশি প্রচার করেছে। তবে সাধারণভাবে অন্যদের চেয়ে তাদের কভারেজ ছিল অনেক ভালো। সৌদি প্রিন্স ও ব্যবসায়ী আল ওয়ালিদ বিন তালাল একেবারে ভিন্নভাবে পার্থক্যটি তুলে ধরেছেন : ‘আলজাজিরা হলো জনগণের চ্যানেল, আর আল আরাবিয়া হলো শাসকদের চ্যানেল।’


প্রশ্ন : কিন্তু আলজাজিরা কি পক্ষপাতহীন ছিল?


তারেক : হ্যাঁ। কিছু কিছু ক্ষেত্রে আলজাজিরার প্রচার পক্ষপাতমূলক ছিল। প্রথমেই বলে নেই, আরব বসন্তে প্রধান সংবাদমাধ্যমগুলোর অন্যতম ছিল আলজাজিরা। যাদের কথা শোনা যেত না, তাদের কথা তারা প্রচার করেছে। এর মানে হলো, লিবিয়া, তিউনিসিয়া ও মিসরের মতো স্থানে স্বৈরাচারদের বিদায় করার কাজে মারাত্মক বিপদে ছিল এসব লোক। আলজাজিরা আরব বিশ্ব এবং এর বাইরের দুনিয়ার দর্শকদের মতামত তুলে ধরতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে আলজাজিরা। বাহরাইন বা ওমানের ঘটনার ব্যাপারে একই কথা বলা যেতে পারে। কিন্তু প্রচার করা হয়নি, এমন নয়। প্রচারের হয়তো কোনো কোনোটিকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। আর আলজাজিরা অসত্য তথ্য পরিবেশন করেনি বা সত্যের বিকৃতি করেনি। প্রতিবিপ্লবের পর কী ঘটছে সেদিকে দেখা যাক। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে মিসর ও লিবিয়ায় যারা ক্ষমতায় ফিরে এসেছে, তারা আলজাজিরাকে ঘৃণা করে। কারণ তারা মনে করে, বিরোধী আন্দোলনকে শক্তি দান করতে পারে আলজাজিরা।


প্রশ্ন : আলজাজিরা কি মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রভাবে ছিল?


তারেক : পুরো আরব বিশ্বের সাংবাদিকদের জন্য আলজাজিরার দুয়ার খোলা ছিল। বিভিন্ন ধর্ম ও ব্যাকগ্রাউন্ডের লোকজন এতে যোগ দিয়েছে। তাদের কেউ ছিল বাম ঘরানার, কেউ কেউ মুসলিম ব্রাদারহুড বা অন্যান্য ইসলামি সংস্থার সাথে সম্পর্ক থাকার জন্য পরিচিত ছিল। একপর্যায়ে আমি সিদ্ধান্ত গ্রহণপ্রক্রিয়ায় মুসলিম ব্রাদারহুডের কিছু প্রভাবও দেখেছি। তবে সময়ের পরিক্রমায় ওই প্রভাব টিকে থাকতে দেখিনি আমি।


প্রশ্ন : সৌদি ও আমিরাতিরা ভিন্ন মতবিরুদ্ধ, কিন্তু কাতার তা নয়?


তারেক : সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত যে কেবল বিক্ষোভ কিংবা ভিন্নমতের বিরোধী তা-ই নয়, তারা বিরোধী কোনো ধারাই চায় না।


এ কারণেই তারা একেবারে শুরু থেকেই আলজাজিরার বিরুদ্ধে ছিল। কারণ এই নেটওয়ার্কটি ভিন্ন মতের প্রতিনিধিত্বকারী অতিথিদের আমন্ত্রণ জানাচ্ছিল। সৌদিরা কেবল তাদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রচার চায়। তাদের কথা হলো তুমি হয় আমার সাথে, নয়তো আমার বিরুদ্ধে। আমি বলছি না যে, কাতারে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিখুঁত। তবে আমরা কিছুটা পর্যায় পর্যন্ত ভিন্নতা প্রকাশ করতে পারি। সৌদি আরবে সহিষ্ণুতার মাত্রা শূন্য।


সূত্র : টিআরটি ওয়ার্ল্ড