নির্বাচনমুখী রাজনীতি প্রস্তুতি দুই দলে

Jul 16, 2017 10:23 pm
আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দ্ইু শিবিরেই নির্বাচনকেন্দ্রিক ভাবনা শুরু করেছে


মঈন উদ্দিন খান

রাজনীতিতে নির্বাচনমুখী আবহ সৃষ্টি হয়েছে। প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দ্ইু শিবিরেই নির্বাচনকেন্দ্রিক ভাবনা শুরু করেছে। বড় এই দু’টি দলের জন্য নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু না হলেও একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগের পরিস্থিতি কী হবে, অন্দরমহলে কোনো সমঝোতা হচ্ছে কি না, বিএনপির আন্দোলন ফের কঠোর হবে কি না এ নিয়ে নানা আলোচনা ঘুরপাক খাচ্ছে। এসব গুঞ্জন কিংবা আলোচনার ওপর ভর করে সামনের দিনগুলোতে সম্ভাব্য কিছু মেরুকরণের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। বেগম খালেদা জিয়া লন্ডন সফর শেষে দেশে ফেরার পর রাজনীতি নতুন মোড় নিতে পারে। দেয়া হবে সহায়ক সরকারের ফর্মুলা। অপরদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভোট চাইছেন। নেতাকর্মীদের নির্বাচনী প্রসতুতি নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।


নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানামুখী আলোচনা, রাষ্ট্রপতির সাথে রাজনৈতিক দলগুলোর সংলাপ ও সার্চ কমিটি গঠনের পর প্রধান নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্ব পান সাবেক সচিব কে এম নুরুল হুদা। ২০০৬ সালে অবসরে যাওয়া নুরুল হুদা নির্বাচন কমিশনার হিসেবে সাথে পেয়েছেন সাবেক অতিরিক্ত সচিব মাহবুব তালুকদার, সাবেক সচিব রফিকুল ইসলাম, অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজ কবিতা খানম ও অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শাহাদৎ হোসেন চৌধুরীকে।


১৯৭৩ ব্যাচের সরকারি কর্মকর্তা নুরুল হুদার বাড়ি পটুয়াখালীতে। বর্তমান সরকারের সময়ে ঢাকা সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় এবং সংসদ সচিবালয় যুগ্মসচিব ও অতিরিক্ত সচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রশাসনের কর্মকর্তা হিসেবে বেশ কয়েকবার নির্বাচনী দায়িত্বও পালন করেন তিনি। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার আমলে দীর্ঘ দিন ওএসডি থাকার পর ২০০৬ সালে সচিব হিসেবে অবসরে যান তিনি।

নুরুল হুদা নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন গঠনের পর আওয়ামী লীগ স্বাগত জানিয়েছে। কিন্তু বিএনপি ক্ষুব্ধ ও হতাশা প্রকাশ করেছে। এখন এ ব্যাপারে নি:শ্চুপ।


বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে এই মুহূর্তে ‘কঠোর’ আন্দোলন করে দাবি আদায়ের বিষয়টি ভাবছে না দলটি। আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েই এগোনোর চিন্তা করছেন। নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের রূপরেখা তুলে ধরার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। দলের একটি হাইপ্রোফাইল কমিটি সহায়ক সরকারের রূপরেখা নিয়ে কাজ করছে। দল ও দলের বাইরের থিংকট্যাংকদের সাথে কথা বলে ইতোমধ্যে এই প্রক্রিয়া বহু দূর এগিয়েছে।

বিএনপির নেতারা মনে করছেন, শুধু নির্বাচন কমিশন শক্ত হলে বা শুধু নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ হলেই হবে না, নির্বাচনকালীন যে সরকার থাকবে তাকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ হতে হবে। একটি সহায়ক সরকারের অধীনে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে এবং সব দলের কাছে গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক হতে হবে সেই নির্বাচন।

রাজনৈতিক এই দরকষাকষির পাশাপাশি দুই দলেই চলছে নির্বাচনের প্রস্তুতি। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ শুরু করেছে ব্যাপক গণসংযোগ। চলছে নেতাদের সাংগঠনিক সফর। পাশাপাশি দলের অভ্যন্তরীণ বিরোধ মেটাতে শুরু হয়েছে নানা তৎপরতা। নেতারা শুধু রাজনৈতিক কর্মসূচিতেই নয়, অংশ নিচ্ছেন বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানেও। নিজ নির্বাচনী এলাকা ছাড়াও জেলা-উপজেলায় নিয়মিত উপস্থিতি বেড়েছে কেন্দ্রীয় নেতাদের। এসব অনুষ্ঠানে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তুলে ধরছেন তারা। এর মাধ্যমে কার্যত আগামী নির্বাচনের মাঠ গুছিয়ে আনছে ক্ষমতাসীনেরা। এমনকি নির্বাচনী ইশতেহার তৈরির দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ টানা দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় আসে। এতে দেশের ভেতর-বাইরে দলটি বেশ সমালোচিতও হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে নানা কৌশলে বিরোধী দলকে দুর্বল করে এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের প্রচারণার মাধ্যমে ধীরে ধীরে প্রতিকূল অবস্থা কাটিয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন দলটির নীতিনির্ধারকেরা। তাদের মতে, বহির্বিশ্বের সঙ্গেও আশানুরূপ সম্পর্ক উন্নয়ন করতে সমর্থ হয়েছে বর্তমান সরকার। এর পরও যাতে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের কোনো নেতিবাচক প্রভাব আগামী নির্বাচনে না পড়ে, তা সামনে রেখেই আগাম প্রস্তুতি শুরু করেছে ক্ষমতাসীনেরা। পাশাপাশি আগামী নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হলে আগের রাজনৈতিক সংস্কৃতি অনুযায়ী ক্ষমতাসীন হওয়ায় আওয়ামী লীগের বিপক্ষে ফল যেতে পারে এমন আশঙ্কা থেকেও আগাম প্রস্তুতির শুরু করেছে দলটি। অর্থাৎ নির্বাচনের ফল নিজেদের পক্ষে রাখতে কোনো ধরনের ঝুঁকি নিতে চায় না আওয়ামী লীগ।

গত ১৪ জানুয়ারি দলের এক সভায় আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রস্তুতি নিতে নেতাকর্মীদের নির্দেশ দেন আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘আমরা তিন বছর পূর্ণ করে চার বছরে পা দিয়েছি। টানা আট বছর। কাজেই এখনকার পথ হবে আরো কঠিন। এখন থেকেই নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে হবে।’

গণসংযোগ এবং প্রচারণার পাশাপাশি দলের অভ্যন্তরীণ বিরোধ মেটাতেও তৎপর হয়েছে আওয়ামী লীগ। দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের যেখানেই যাচ্ছেন দলের বিভেদের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করছেন। বিরোধ মেটাতে কাজ করছেন সাংগঠনিক সম্পাদকেরা। বিরোধপূর্ণ এলাকায় গিয়ে কিংবা তাদের সঙ্গে ফোনে কথা বলে দ্বন্দ্ব মেটানোর চেষ্টা করছেন তারা। নেতারা প্রকাশ্যে বক্তব্যেই বলছেন, আওয়ামী লীগ ঐক্যবদ্ধ থাকলে কেউই তাদের হারাতে পারবে না। তা ছাড়া বিরোধ কমে গেলে বিদ্রোহী প্রার্থীর হাত থেকেও রেহাই পাওয়া যাবে বলে মনে করছেন দলটির শীর্ষনেতারা।

অপর দিকে নানা শঙ্কা ও প্রতিকূলতা সত্ত্বেও আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ঘরোয়াভাবে প্রস্তুতি শুরু করেছে বিএনপি। এ লক্ষ্যে একটি কর্মপরিকল্পনাও তৈরি করছে দলটির হাইকমান্ড। এরই অংশ হিসেবে পুরোদমে চলছে দল পুনর্গঠনের কাজ। নির্বাচনে ইতিবাচক ফল আনতে ঢেলে সাজানো হচ্ছে সব উইং। এরই মধ্যে প্রায় অর্ধেক সাংগঠনিক জেলার নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। মূল দলের পাশাপাশি অঙ্গসংগঠনের মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিগুলোও পুনর্গঠন করা হচ্ছে। পাশাপাশি সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকা, নির্বাচনী ইশতেহার তৈরিসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর প্রাথমিক কাজ শুরু করেছেন দলটির সংশ্লিষ্টরা।

সব দুর্বলতা ও ভুলত্রুটি শুধরে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে আগামী নির্বাচনী মাঠে নামতে চায় দলটি। বিএনপি নেতারা মনে করছেন, নির্বাচনে ইতিবাচক ফলের জন্য শক্তিশালী সংগঠনের বিকল্প নেই।


আগামী নির্বাচনের ইশতেহারও তৈরির কাজও শুরু করেছে বিএনপি। একটি যুগোপযোগী ইশতেহার দেয়ার পরিকল্পনা করছে দলটি, যাতে তা সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য হয়। তবে প্রস্তুতির পাশাপাশি দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মামলার গতিপ্রকৃতি ও এ নিয়ে সরকারের কৌশল চিন্তায় ফেলেছে বিএনপিকে। মামলায় সাজা দিয়ে খালেদা জিয়াকে আগামী নির্বাচন থেকে বাইরে রাখা হবে, এমন গুঞ্জনও আছে। বিএনপিকে ভাঙতেও নানা তৎপরতা শুরু হয়েছে বলে কেউ কেউ বলছেন।