মাশরাফি কেন জনপ্রিয়

Jul 20, 2017 12:32 pm
বাংলাদেশের এযাবৎকালের সেরা অধিনায়ক


হাসান শরীফ

টগবগে, ক্ষিপ্র আর আগ্রাসী  এটাই তার ট্রেডমার্ক। বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সত্যিকারের টাইগার তিনি। শৈশব আর কৈশোরের ডানপিটে কৌশিক এখন বাংলাদেশ দলের কান্ডারি মাশরাফি বিন মর্তুজা। তার প্রধান পরিচিতি তিনি একজন ফাস্ট বোলার। নড়াইল এক্সপ্রেস পরিচিতি পেয়েছেন। কিন্তু মাঝে মাঝে মনে হয় তিনি আসলেই একজন ব্যাটসম্যান। বিশেষ করে টেস্ট ম্যাচে মাঝে মাঝে তিনিই যেন দলের ভরসা হয়ে দাঁড়ান। বাংলাদেশকে মর্যাদার আসনে বসানোর দায়িত্বটা নিজের কাঁধে বেশ ভালোভাবেই গ্রহণ করেন।

তার নৈপূণ্যে উদ্দীপ্ত হয় সবাই। আর এখন তিনি বাংলাদেশের এযাবৎকালের সেরা অধিনায়ক। কেবল বাংলাদেশই নয়, তার মতো নেতা পাওয়া বিশ্বের যেকোনো দলের জন্যই গর্বের বিষয়। দলকে তিনি একাই উজ্জীবিত করতে পারেন, সেরাটা বের করে নিতে পারেন সহজাত দক্ষতায়। এই কারনে তিনি সব সময় থাকছেন বির্তকের উর্ধ্বে। বাংলাদেশের ক্রিকেট টিমে নেতৃত্বের গুনাবলীর কারনে সাবেক ও বর্তমান উভয় ক্রিকেটারদের কাছে তার বিশেষ মর্যাদা।


তার ক্যারিয়ার অনেক পেসারের চেয়ে অনেক বেশি নাটকীয়তায় ভরা। বল করেন প্রায় ১৩০ কিলোমিটার বেগে। ইনজুরি তাকে অনেকবারই পেছনে টেনে ধরেছে। বাঁ পায়ের হাঁটুতেই তিনবার অস্ত্রোপচার করতে হয়েছে। এছাড়া দলের বাজে পারফরমেন্সও তাকে কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছাতে দেয়নি। কিন্তু তারপরও প্রতিনিয়ত সঞ্চিত অভিজ্ঞতা তাকে আরো বেশি শক্তিশালী, আরো বেশি কঠোর এবং আরো আরো ভালো খেলোয়াড়ে পরিণত করেছে।


শৈশব আর কৈশোরে মাশরাফি ছিলেন ডানপিটে এক ছেলে। বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে চলা চিত্রা নদী ছিল তার প্রথম প্রেম। এই নদীতেই তিনি ঘন্টার পর ঘন্টা সাঁতার কাটতেন। তাছাড়া নারকেল গাছে চড়া, ২০ ফুট উঁচু ব্রিজ থেকে লাফিয়ে নদীতে পড়াসহ আরো অনেক দুরন্ত কাজ করতেন। এমনকি মোটরবাইক নিয়েও রাস্তায় রাস্তায় ম্যাজিক দেখাতে মজা পেতেন। এসব কারণেই তাকে সবাই ‘পাগলা’ নামে ডাকতো। তিনি নিজেও ভাবতেন, তার মাথায় হয়তো কিছুটা ‘ছিট’ আছে।


ছোটবেলায় ফুটবল এবং ক্রিকেট দুটাই খেলতেন। ক্রিকেটে তার পুরোপুরি মত্ত হওয়াটা ঘটেছে আকস্মিকভাবে। এমনিতে তিনি নড়াইল ছেড়ে যেতে চাইতেন না। তার এক আত্মীয় ছিলেন ঢাকা মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের কোচ। এক ম্যাচে মোহামেডানের খেলোয়াড় স্বল্পতা দেখা দিলে তিনি তাকে ডাকেন। নড়াইল থেকে এক ঘন্টা দূরত্বে অনুষ্ঠেয় একটি ম্যাচে তাকে খেলাতে অনেক কোশেশ করতে হয়। কাশিম সিটির বিরুদ্ধে সেই ম্যাচে তিনি ৬ উইকেট নিয়ে মেধার পরিচয় দেন। সেই সূত্রে অনুর্ধ্ব ১৭ জোনাল ক্যাম্পে ডাক পান। সেখান থেকে ম্যালকম পেরেইরা তাকে শ্রীলংকা ট্যুরে মনোনীত করেন। তারপর অনুর্ধ্ব ১৯ দলে এবং শেষ পর্যন্ত জাতীয় দলে জায়গা হয়। বাংলাদেশের প্রধান বোলারে পরিণত হতে তার সময় লাগেনি। তবে এক্ষেত্রে অ্যান্ডি রবার্টসের ভূমিকাও ছিল।


অধিনায়কত্ব পাওয়ার াগে তার অবিস্মরণীয় পারফরমেন্সের মধ্যে আছে একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ভারতের বিরুদ্ধে দুটি জয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা। আর ভারত ও শ্রীলংকার বিরুদ্ধে টেস্টে দলকে ইনিংস পরাজয়ের লজ্জা থেকে বাঁচানো।


২০০৪ সালে ইঞ্জুরির কারণে দেড় বছর পর দলে ফেরার পর ২৬ ডিসেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের শততম একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচে ভারতের ওপর কার্যকর আঘাত হেনেছিলেন। একেবারে প্রথম ওভারে তৃতীয় বলেই তিনি ডেঞ্জারম্যান হিসেবে পরিচিত বীরেন্দ্র সেহবাগকে সরাসরি বোল্ড করে দিয়েছিলেন শূন্য রানে। সেই ম্যাচে মাস্টার ব্যাটসম্যান শচিন টেন্ডুলকার ও “দি ওয়াল” খ্যাত রাহুল দ্রাবিড় বিশ্রামে থাকায় সেহবাগের ওপরই নির্ভর করেছিল ভারত। তাই সেহবাগের আউট শুধুমাত্র একটি উইকেটেরই পতন ছিলো না। এর অর্থ ছিলো সুদূরপ্রসারী এই আউটের সাথে সাথেই সৌরভ বাহিনীর উপর মানসিক প্রভাব পড়ে। ফ্লাডলাইট আর স্থানীয় দর্শকদের বাহবা ধ্বনিতে একদিকে টাইগাররা যেমন উদ্দীপ্ত হয়ে উঠে, তেমনি ভারতীরা ডিফেন্সিভ অবস্থানে চলে যেতে বাধ্য হয়। বাংলাদেশ এক অবিস্মরণীয় জয় পায়।


২০০৭ সালে তার দুরন্ত নৈপুণ্যে বিশ্বকাপে ভারতকে হারায় বাংলাদেশ। এখানেই শেষ নয়, এরপর চট্টগ্রামে ভারতের বিরুদ্ধে টেস্টে মাশরাফি ৯১ বলে ৭৯ রানের একটি দুরন্ত ইনিংস উপহার দেন। ৭টি চার ও ৩টি ছয় দিয়ে সাজানো তার নয়ন জুড়ানো ইনিংসের বদৌলতেই বাংলাদেশ প্রথম টেস্টে ফলো-অনের লজ্জা থেকে রক্ষা পায়। মাশরাফি যখন শেষ ব্যাটসম্যান হিসেবে আউট হন, বাংলাদেশের স্কোর তখন অনেকটা ভদ্রোচিত। কেননা, তার দুরন্ত ইনিংস এবং শাহাদাতের সঙ্গে নবম উইকেটে রেকর্ড ৭৭ রানের জুটি টাইগারদের ‘লজ্জা’ নিবারণ করে। অবশ্য শুধু লজ্জা নিবারণ বললে ভুল হবে, তার এই ইনিংসটির সুবাদেই ম্যাচটিতে পরাজয়ের শংকা থেকে মুক্তি পায় বাংলাদেশ।

ম্যাচে শচিন টেন্ডুলকার এবং সৌরভ গাঙ্গুলি সেঞ্চুরি করলেও ম্যান অব দি ম্যাচের পুরস্কারটি পান মাশরাফি। ভারতের এক সিনিয়র সাংবাদিক মাশরাফির ইনিংস দেখার পর তাকে এ মুহূর্তে উপমহাদেশের অন্যতম সেরা ক্রিকেটারের স্বীকৃতি দিতে কুণ্ঠিত হননি। এখানেই শেষ হয়নি। মিরপুুরে দ্বিতীয় টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসেও তিনি দুর্দান্তভাবে ৭০ রান করে পরাজয়ের ব্যবধান কমিয়ে আনেন।


বাংলাদেশের প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে পরপর তিনটি একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচে ম্যান অব দি ম্যাচের সম্মান লাভ, প্রথম বাংলাদেশী বোলার হিসেবে একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ৬ উইকেট লাভ, টেস্টে ৯ উইকেট জুটিতে সর্বাধিক রান (শাহাদাত হোসেনের সাথে ৭৭ রান) ইত্যাদি তার উল্লেখযোগ্য কৃতিত্বের অংশবিশেষ।


তার ক্যারিয়ারে মুগ্ধতার আবেশ সৃষ্টিকারী মুহূর্ত যেমন আছে, তেমনি আছে কিছু দুঃস্বপ্ন। সবচেয়ে বাজে ঘটনাটি ঘটেছিল ২০০৬ সালে জিম্বাবুয়ে সফরকালে। শেষ ওভারে তার থেকে ১৭ রান নিয়ে জিম্বাবুয়ে ম্যাচটি জিতে নিয়েছিল। তবে তিনি সেদিনই প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, এমন দিন আর আসবে না।


তার বয়স এখন মাত্র ২৫ বছর। আরো অনেক সময় বাকি আছে। বাংলাদেশ যেমন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নবীন। মাশরাফিও এই দলে নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধিত্ব করছে। প্রাথমিক ধকল সামলিয়ে নিয়ে বাংলাদেশ এখন লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। এই পথ চলাতে মাশরাফি অবশ্যই অনন্য সৈনিক। ‘নড়াইল এক্সপ্রেসের’ কাছে বাংলাদেশ আরো অনেক কিছু পাবার আছে।