প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের যে বর্ননা কুরআনে দেয়া হয়েছে

Jul 22, 2017 08:20 am
জমিন বা স্থলভাগের পরিসর ক্রমান্বয়ে কমে আসছে সমুদ্রের বিস্তারের মাধ্যমে

 

আহমদ ওয়াহাজ সিদ্দিকী

বিশ্ব আজ বিপদের সম্মুখীন। পরিবেশের মহাবিপর্যয় থেকে কোনো কিছুই পৃথিবীকে রক্ষা করতে পারবে না। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃস্থানীয় কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের দু’জন বিজ্ঞানী দুনিয়াকে দ্ব্যর্থহীন হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। মানবসভ্যতা হুমকির মুখোমুখি বিশ্বে উষ্ণতাবৃদ্ধির কারণে। অভিযোগ উঠেছে, জাতিসঙ্ঘের জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত আন্তঃসরকার প্যানেল (আইপিসিসি) সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কাকে হালকা করে দেখছে। জানা যায়, হিমবাহ ও মেরু অঞ্চলের বরফ গলার পরিণতিতে এটা হচ্ছে। আইপিসিসি ভবিষ্যদ্বাণী করেছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ৪০ সেন্টিমিটারের মতো বাড়তে পারে। বাস্তবে ২১০০ সালের মধ্যে এই বৃদ্ধি কয়েক মিটার হওয়াও বিচিত্র নয়।


আমরা যদি পবিত্র কুরআনের দিকে তাকাই, তাহলে দেখব সেই সপ্তম শতাব্দীতেই এই আসমানি কিতাব সতর্ক করে দিয়ে বলছে, পৃথিবী বিপন্ন। ‘তারা কি দেখে না যে, ক্রমশ আমরা তাদের জমিনকে এর বহিঃপরিসরের দিক দিয়ে সঙ্কুচিত করছি’ (সূরা রা’দ, আয়াত ৪১)? কুরআন শরীফে আরো বলা হয়েছে, ‘তারা কি দেখে না, আমরা তাদের জমিনকে ক্রমশ চার দিক থেকে হ্রাস করে আনছি? তা হলে তারা কিভাবে বিজয়ী হবে?’ (সূরা আম্বিয়া, আয়াত ৪৪)


জমিন বা স্থলভাগের পরিসর ক্রমান্বয়ে কমে আসছে সমুদ্রের বিস্তারের মাধ্যমে। লিথোস্ফেরিক বিবর্তন তত্ত্ব মোতাবেক, সমুদ্রের তলদেশ বাইরের দিকে প্রসারিত হচ্ছে পানির নিচে অবস্থিত বিস্তীর্ণ জরফমব থেকে। এই জরফমব হলো, ভূপ্রকৃতির এমন একটি রূপ, যা একটি উঁচু প্রলম্বিত রেখার মতো এবং এর দুই পাশে ঢালু হয়ে ভূমি নেমে গেছে। মার্কিন ভূতত্ত্ববিদ হ্যারি এইচ হেস সর্বপ্রথম ষাটের দশকের প্রথম দিকে এই তত্ত্ব উপস্থাপন করেছিলেন (কলাম্বিয়া এনসাইক্লোপিডিয়া)।


সমুদ্রের তলদেশ ক্রমশ বিস্তৃত হওয়ার প্রথম কারণ হলো একটি প্রক্রিয়া, যখন তলদেশের দু’টি ‘প্লেট একটি অন্যটি থেকে সরে যায়। তখন প্লেটের শিলা ভেঙে যায় এবং প্লেটের সীমানাজুড়ে ভূমিকম্প সঙ্ঘটিত হয়। অগ্ন্যুৎপাত ঘটলে প্লেটের ফাটলে, অর্থাৎ মহাসমুদ্রের তলদেশে পর্বতের দীর্ঘ সারি জেগে ওঠে। সার্বিকভাবে বলা যায়, সাগরের বিস্তৃত তলদেশ মূলত আগ্নেয়গিরির নিঃসৃত লাভা দ্বারা গঠিত (কলম্বিয়া এনসাইক্লোপিডিয়া)।


সেই অতীতের সপ্তম শতাব্দীতে কেউ এসব বিষয় স্বপ্নেও ভাবত না। অথচ তখন আল কুরআনে এ ব্যাপারে বর্ণিত হয়েছে। কুরআন বলছে, যখন মহাসমুদ্রগুলো উত্তাল করে তোলা হবে (সূরায়ে তাকবির, আয়াত ৬)।


১৯৮৯ সালে সৌদি আরবের ইসলামি গবেষণা, ইফতা ও দাওয়াত নির্দেশনা দফতর সংশোধন ও পুনঃপ্রকাশ করেছে ‘আল কুরআনের অর্থ’-এর ভাষ্য। সেখানে ৫৯৭৫ নম্বর ব্যাখ্যামূলক টিকায় ওই প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, আরবিতে এটাকে ‘সুজ্জারাত’ বলা হয়। মহাসমুদ্রগুলো এখন তাদের সীমারেখার মধ্যে থাকলেও উত্তাল হয়ে উঠবে এবং টগবগ করতে থাকবে। তখন সাগরের পানি স্থলভাগের সব কিছুই গ্রাস করে নেবে। বিখ্যাত ভাষ্যকার ইবনে কাছির মহাসাগর সম্পর্কে লিখেছেন, ‘যখন এটা রূপ নেবে প্রজ্বলিত অগ্নির।’


বিজ্ঞান-পূর্ব সেসব যুগে ‘টগবগ করে ওঠা সাগরের পানি’র বিষয়টি কেউ বুঝে উঠতে পারেনি। কিন্তু এখন বিজ্ঞান আল কুরআনের সত্যতাকেই তুলে ধরছে এবং সাগরতলে অগ্ন্যুৎপাতের সন্ধান পেয়েছে।


বর্তমানে এটা রয়েছে সীমিত পর্যায়ে। তবে আগ্নেয়গিরি বিস্ফোরিত হয়ে নিঃসরণ ঘটতে পারে। তখন মহাসমুদ্রের পানি টগবগ করে ফুটবে এবং দুনিয়াটাই দেবে ডুবিয়ে। ইতোমধ্যেই আমরা সুনামির অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি। এই সুনামি বিরাট বিপর্যয় বয়ে এনেছে এবং কেড়ে নিয়েছে লাখো লাখো প্রাণ।


বিজ্ঞানীদের অভিমত, আমাদের এই গ্রহটার আসন্ন ধ্বংসের অন্য কারণ হলো, বিশ্বের উষ্ণতা। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, মহান সৃষ্টিকর্তা এই পৃথিবীকে কয়েক স্তরবিশিষ্ট বায়ুমণ্ডল দিয়ে ঘিরে দিয়েছেন।


এই স্তরগুলোর সর্বনিম্নটির নাম ট্রপোস্ফিয়ার। এটা ভূপৃষ্ঠ থেকে শুরু করে দশ কিলোমিটার ওপর পর্যন্ত বিস্তৃত। প্রকৃতপক্ষে মানবজাতির যাবতীয় কর্মকাণ্ড বায়ুমণ্ডলের এই স্তরেই সীমাবদ্ধ।


এর ওপরের স্তরটি স্ট্রাটোস্ফিয়ার নামে অভিহিত। এর বিস্তৃতি বায়ুমণ্ডলে ভূপৃষ্ঠের ১০ কিলোমিটার ওপর থেকে ৫০ কিলোমিটার ওপরে পর্যন্ত। এই স্তরের একাংশে ওজোন গ্যাস পুঞ্জীভূত রয়েছে, যা পৃথিবীর উপরিভাগ থেকে ১৫-৩০ কিলোমিটার উচ্চতায় অবস্থিত।
ওজোনের একটি অণুতে অক্সিজেনের তিনটি পরমাণু থাকে। এর প্রতি ১০ মিলিয়ন বা এক কোটি অণুতে দুই মিলিয়ন বা ২০ লাখ অণু স্বাভাবিক অক্সিজেনের। এটা বায়ুমণ্ডলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। ওজোন স্তরটি সূর্য রশ্মির বিকীরণ আংশিকভাবে হলেও শোষণ করে নেয়। ফলে সূর্য থেকে বিচ্ছুরিত অতি বেগুণি রশ্মি পৃথিবীতে আসতে বাধা পায়।


বিজ্ঞানীরা গবেষণায় দেখতে পেয়েছেন, বায়ুমণ্ডলের ওজোনস্তর ক্ষয়ে যাচ্ছে। এর কারণ ক্লোরোফ্লুরোকার্বন বা সিএফসি গ্যাস। এর যৌগগুলোর আয়ুষ্কাল এত দীর্ঘ যে, বাতাস এগুলোকে স্ট্রাটোস্ফিয়ারে বয়ে নেয়ার সুযোগ পায়। তদুপরি সিএফসি স্থিতিশীল হওয়ায় শক্তিশালী অতিবেগুনি রশ্মি পড়লে সিএফসি যৌগ ভেঙে যায়। ফলে সিএফসি অণু থেকে ক্লোরিনের পরমাণু নির্গত হয়। আর ক্লোরিনের একেকটি পরমাণু ওজোনের লক্ষাধিক অণু ধ্বংস করে দিতে সক্ষম। এ কারণে বায়ুমণ্ডলে ওজোন স্তর হচ্ছে ক্ষয়প্রাপ্ত।


এর একটি দৃষ্টান্ত হলো, ১৯৮০ সাল থেকে বছর বছর অ্যান্টার্কটিকা বা দক্ষিণ মেরু অঞ্চলের ওপর ওজোন স্তরের গহ্বর বিস্তৃত হচ্ছে। তদুপরি, গবেষকরা উল্লেখ করেছেন উত্তর আমেরিকাসহ কয়েকটি অঞ্চলের বায়ুমণ্ডলে ওজোন স্তর ক্ষয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় বিশ্বজনীন উষ্ণতা এবং বিপজ্জনক জলবায়ু পরিবর্তন ঘটছে। এর প্রভাবে মেরু অঞ্চলে বরফ গলে যাচ্ছে দ্রুত।


উত্তর গোলার্ধে গ্রিনল্যান্ডে হিমবাহ ও বরফ এবং দক্ষিণ গোলার্ধে অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশের পশ্চিমাংশে বরফ সাক্ষ্য দিচ্ছে ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রাজনিত দ্রুত পরিবর্তনের।


সর্বশক্তিমান আল্লাহতায়ালা বলেন, বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে স্থলভাগে ও সমুদ্রে মানুষের কর্মকাণ্ডের পরিণামে (সূরায়ে আর রূম, আয়াত ৪১)।
সিএফসি কিংবা কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণ হচ্ছে ‘মানুষের কর্মকাণ্ডের পরিণাম।’ এতে এক দিকে ওজোন স্তরের ক্ষতি হচ্ছে; অপরপক্ষে পৃথিবীতে বাড়ছে উষ্ণতা।


যুক্তরাষ্ট্রের নাসার গডার্ড ইনস্টিটিউট ফর স্পেস স্টাডিজের ডিরেক্টর জেমস হ্যানসের অভিমত : সাম্প্রতিককালে গ্রিন হাউজ গ্যাস নিঃসরণ পৃথিবীকে নাটকীয়ভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বিপজ্জনক পরিস্থিতির সম্মুখীন করছে। এটা চলে যেতে পারে নিয়ন্ত্রণের বাইরে। তখন মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর জন্য বিরাট বিপদ সৃষ্টি হবে। কার্বন ডাই অক্সাইডসহ বিভিন্ন গ্রিন হাউজ গ্যাসের মানবসৃষ্ট নিঃসরণ বন্ধ করার কঠোর প্রয়াসই জলবায়ুকে বিগত এক মিলিয়ন বছরের মতো কিংবা তার কাছাকাছি পর্যায়ে রাখতে পারে।


যেসব কর্মকাণ্ড মানব জাতিকে বিপদাপন্ন করছে, সেগুলো কি আমাদের বিজ্ঞানীরা নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হবেন? আমরা আল কুরআনে দেখতে পাই : যে দিন এই পৃথিবী অন্য এক পৃথিবীতে রূপান্তরিত হবে এবং আসমানগুলোতেও ঘটবে পরিবর্তন, সে দিন... (সূরা ইবরাহীম, আয়াত ৪৮)।


কুরআন শরীফে আরো অনেক আয়াত আছে, যেগুলো এই বিশ্বজগতের ধ্বংসের দিকে ইঙ্গিত করছে। তবে যা অজানা, তা হলো কখন এটা ঘটবে।
ভাষান্তর : মীযানুল করীম