মোদি কাশ্মিরে আতঙ্ক ছড়াচ্ছেন

Jul 25, 2017 04:08 pm
ইয়াসিন মালিক

 

ভারত অধিকৃত কাশ্মিরের একসময়ের সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামী ইয়াসিন মালিক। গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকে উপত্যকার সশস্ত্র আন্দোলনের সূচনালগ্নে অস্ত্র হাতে লড়াই করেছেন মাতৃভূমিকে মুক্ত করার জন্য। পরে সশস্ত্র সংগ্রামের পথ ছেড়ে রাজনৈতিক আন্দোলনে জড়িত হলেও স্বাধীনতার দাবি ও কাশ্মিরিদের অধিকার আদায়ে অটল আছেন আগের মতোই। বর্তমানে জম্মু ও কাশ্মির লিবারেশন ফ্রন্টের (জেকেএলএফ) চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে কথা বলেছেন কাশ্মির পরিস্থিতি, স্বাধীনতা সংগ্রাম, ভারত সরকারের ভূমিকাসহ বিভিন্ন বিষয়ে


গত বছর ভারতীয় বাহিনীর ক্রসফায়ারে বুরহান ওয়ানির মৃত্যুর পর কাশ্মিরে সৃষ্ট পরিস্থিতিকে কেমন মনে হচ্ছে আপনার?
ভারত সরকার সব ধরনের রাজনৈতিক আন্দোলনের পথ বন্ধ করেছে যার ফলে জনগণ বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে। কাউকে মতামত বা বক্তব্য প্রকাশ করতে দেয়া হচ্ছে না। শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী যুবকদের পুলিশ স্টেশনে নিয়ে নির্মমভাবে নির্যাতন করা হচ্ছে। পুলিশ স্টেশনগুলো তামাশার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। যে কারণে তারা অস্ত্র হাতে তুলে নিচ্ছে এবং গণবিস্ফোরণ হচ্ছে। আবারো প্রতিবাদ দমনে নিরাপত্তাবাহিনী ব্যবহার করছে ভারত। শতাধিক লোককে তারা মেরেও ফেলেছে। শত শত লোক চোখ হারিয়েছে। জেলে আছে হাজার হাজার কাশ্মিরি। ১৯৪৭ সাল থেকে কাশ্মিরে সশস্ত্রবাহিনীর হামলা ও ভয়ের মধ্যে বেঁচে থাকতে হচ্ছে।


গত বছর বিক্ষোভের সময় হুররিয়াত নেতা সাইয়েত আলী শাহ গিলানি, মিরওয়াইজ ওমর ফারুক ও আপনি যৌথ প্রতিরোধ আন্দোলনের জন্য একতাবদ্ধ হয়েছেন। এটি কিভাবে হলো এবং ভবিষ্যতে কিভাবে চলবে?
১৯৯৩-৯৪ সাল থেকেই আমরা একতাবদ্ধ ছিলাম, পরে পৃথক হয়েছি। আমরা বুঝতে পেরেছি, ভারত সরকার আমাদের জনগণের ওপর যে নির্যাতন চালাচ্ছে তার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদের সময় এটি। এসব ঘটনার বিরুদ্ধে একক শক্তি দরকার, তাই আশা করি এই ঐক্য বজায় থাকবে। আমরা আরো শক্তিশালী হওয়ার চেষ্টা করছি।


কাশ্মিরের ভবিষ্যৎ প্রশ্নে যেকোনো আলোচনা চারটি বিষয়ে বিভক্ত হয়ে যায় গণভোট, পাকিস্তানপন্থী, ভারতপন্থী ও স্বায়ত্তশাসন। বিষয়টি আপনি কিভাবে দেখেন?
এটি কে ঠিক করবে? সবচেয়ে ভালো পন্থা হচ্ছে নিজেদের সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার। জনগণ সম্মিলিতভাবে ঠিক করতে তারা পাকিস্তানের সাথে যাবে, ভারতের সাথে যাবে, নাকি স্বাধীন সত্তা গঠন করবে। এটি জনগণের মাধ্যমে ঠিক হওয়া উচিত, কারো একক সিদ্ধান্তে নয়। আমাদের অবশ্যই গণতান্ত্রিক পন্থার রায় মেনে নিতে হবে।


কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং বলেছেন, গণভোটের ধারণা সেকেলে হয়ে গেছে। এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?
একটি চুক্তি (২৬ অক্টোবর, ১৯৪৭) রয়েছে যা ভারত ও কাশ্মিরের মধ্যে একমাত্র সংযোগ। ভারতীয় সরকার আমাদের আশ্বাস দিয়েছিল যে ওই চুক্তিটি অস্থায়ী এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে কাশ্মিরের জনগণ নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। শ্রীগনগরের লাল চকে ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওয়াহের লাল নেহরু বলেছিলেন, ‘আপনাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার দিতে আমি অঙ্গীকার করেছি। এমনকি এটি যদি আমাদের বিরুদ্ধেও ব্যবহৃত হয়, আমাকে সঙ্কটেও ফেলে তথাপি আমি তা করবে’। তিনি একই কথা পার্লামেন্টেও বলেছেন। তারপর তিনি বিষয়টি জাতিসঙ্ঘে উত্থাপন করেছেন।


আজকে যখন কাশ্মিরের জনগণ তাদের অধিকারের দাবিতে রাস্তায় নেমেছে, ভারত সরকার দমনপীড়ন চালাচ্ছে। তরুণদের নির্যাতন করে মেরে ফেলা হচ্ছে। কাশ্মিরে এখন এ সবই হচ্ছে। এতে এটিই প্রমাণিত হয় যে, ভারত গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচারের নীতিতে বিশ্বাস করে না।


সম্প্রতি ভারতীয় সেনাপ্রধান বিপিন রাওয়াত বলেছেন, পাথর নিক্ষেপকারীরা স্বাধীনতাকামী গেরিলাদের রক্ষার চেষ্টা করছে। তার এই বক্তব্যকে কিভাবে দেখছেন?
লক্ষ করুন এখানে একটি রাজনৈতিক গণবিক্ষোভ চলছে। ভারতীয় বাহিনী নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীদের ওপর নির্বিচারে ছররা গুলি ও টিয়ার শেল নিক্ষেপ করছে। বিক্ষোভকারীরা শুধু পাথর ব্যবহার করছে। পাথরের আঘাতে কোনো ভারতীয় সৈন্য মারা যায়নি, অথচ তারা একশোর বেশি লোককে মেরে ফেলেছে। হাজার হাজার লোক আহত হয়েছে, কয়ক শো ব্যক্তি তাদের চোখের আলো হারিয়েছে। এসবে মনে হয় কাশ্মিরের পুরো একটি প্রজন্মকে ভারত সশস্ত্র সংগ্রামের দিকে ঠেলে দিতে চায়।


কাশ্মির সঙ্ঘাতকে এখন একটি ধর্মীয় সঙ্ঘাত হিসেবেও দেখা হচ্ছে। আপনি কী মনে করেন?
কাশ্মির ইস্যু হচ্ছে জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের ব্যাপার। এ ক্ষেত্রে প্রত্যেকের ভোট দেয়ার অধিকার থাকবে তা সে মুসলিম, হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, দোগরা, পণ্ডিত যে সম্প্রদায়েরই হোক। যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের আত্ময়িন্ত্রণের অধিকার বিষয়ে ভোট দেয়ার ক্ষমতা রয়েছে। আমাদের অবস্থানও তেমন। জনগণই সিদ্ধান্ত নেবে তারা কোন পদ্ধতির শাসন চায়।


বিজেপির সরকার পরিচালনা কেমন মনে হয় আপনার?
শুধু যে কাশ্মিরের জনগণ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে তা নয়। মুসলিম, খ্রিষ্টান, দলিত, লেখক, শিল্পী, বুদ্ধিজীবী সবাই নিজ নিজ পরিচয় নিয়ে শঙ্কায় আছে। রাষ্ট্রের সমালোচনা করলেই তাকে টার্গেট করা হচ্ছে। কাশ্মিরেও প্রতি সপ্তাহে নতুন নতুন আক্রমণাত্মক বিবৃতি দিতে দেখি তাদের। আমি জানি না বিজেপি কী ধরনের রাজনীতি চায়। এমন একটা সময় ছিল যখন মানুষ ভাবত অটল বিহারি বাজপেয়ি তার স্বভাবসুলভ কাব্যিক বক্তৃতায় সমস্যার সমাধান করবে। কিন্তু এখন বিজেপি শুধু সঙ্ঘাত চায়, তারা কাশ্মিরের সাধারণ জনগণের আশা-আকাক্সক্ষা ভেঙে দিতে চায়। তাই কাশ্মিরিরা সিদ্ধান্ত নিয়েছে এটি হতে দেবে না।


বাজপেয়ি ও মোদির শাসনকে কিভাবে তুলনা করবেন?
বাজপেয়ি কবি ছিলেন। জনগণের ভালোবাসার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আকাক্সক্ষা ছিল তার। মোদি চান জনগণের আতঙ্ক হতে, যারা তার নাম শুনলেই ভয় পাবে। এটাই পার্থক্য।


কাশ্মির ইস্যুতে শান্তি আলোচনার কোনো সম্ভাবনা দেখেন আপনি?
 আমার মনে হয় না, কারণ ভারত সরকার দাম্ভিকতা ও আগ্রাসী ভাষা নিয়ে চলছে। এর মধ্যে আশার আলো দেখা কিভাবে সম্ভব?


ভারতীয় জনগণের উদ্দেশে আপনার বক্তব্য কী?
তাদের কাছে আমার আবেদন থাকবে ভারতীয় মিডিয়ার চোখ দিয়ে কাশ্মিরকে না দেখার। আপনি যদি কাশ্মিরকে দেখতে ও বুঝতে চান, দয়া করে এখানে আসুন। কাশ্মিরিরা শান্তিপ্রিয়। আমাদের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করছে ভারত। আমরা শুধু আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার চাই, কিন্তু বিনিময়ে আমাদের হত্যা করা হচ্ছে। যদি দক্ষিণ এশিয়ায় প্রকৃত শান্তি প্রতিষ্ঠা হয়, ভারত ও পাকিস্তান লাভবান হবে, সাথে কাশ্মিরও।


কাশ্মিরিরা নির্বাচনপ্রক্রিয়াকে কিভাবে দেখছে? শ্রীনগরের উপনির্বাচনে মাত্র ৭ শতাংশ ভোট পড়েছে, অনন্তনাগের ভোট অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে গেছে।
 কাশ্মিরের জনগণ ভারত সরকারের ওপর সন্তুষ্ট এটি বোঝাতে ভারত নির্বাচনকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। মূল ধারার সব দলই জনগণকে বলে নির্বাচনের মাধ্যমে কাশ্মির সমস্যার সমাধান হবে না, এটি শুধু বিদ্যুৎ-পানি-সড়কের জন্য। তাই ভারতীয় রাষ্ট্রের সহযোগী হতে না চাওয়ার কারণেই জনগণ ভোট বয়কট করে। এটি ভারতের জন্য একটি বার্তা যে, কাশ্মিরিদের স্বাধীনতা আন্দোলনকে ভারতীয় নির্বাচনপদ্ধতি দিয়ে নিভিয়ে দেয়া যাবে না।


শ্রীনগরের উপনির্বাচনের সময় ছড়িয়ে পড়া অস্থিরতা এখনো বিভিন্নভাবে চলছে। এখন কাশ্মিরের ছাত্রছাত্রীরাও প্রতিবাদে নেমেছে। এর কারণ কী?
 এটা দুর্ভাগ্যজনক যে ভারতীয় বাহিনী কাশ্মিরের ছাত্রদেরও নির্যাতন থেকে রেহাই দেয় না। তারা পলওয়ামা ডিগ্রি কলেজে ঢুকে ছাত্রদের নির্মমভাবে পিটিয়েছে। যে ঘটনা সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের রাস্তায় নামতে বাধ্য করেছে। দেখুন তাদের কিভাবে রাস্তায় পেটানো হয়েছে। এক ছাত্রী এখনো হাসপাতালের আইসিইউতে আছে। চারশোর বেশি শিক্ষার্থী আহত হয়েছে। এরা সেই রাষ্ট্রের বাহিনী যারা বলে যে, তারা কাশ্মিরের শিক্ষার ব্যাপারে আন্তরিক। এখন তারা কলেজ বন্ধ করে দিয়েছে। ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও বন্ধ করে দিয়েছে।


সূত্র : দ্য ওয়ার
ভাষান্তর : আহমেদ বায়েজীদ