কার হাতে যাচ্ছে পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রন ?

Jul 28, 2017 06:03 pm
নওয়াজ ও ইমরান


আসিফ হাসান


পাকিস্তানের সর্বোচ্চ আদালত প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফকে সরকারি কোন দপ্তর পরিচালনার জন্য অযোগ্য ঘোষণা করার ঘণ্টা খানেকের মধ্যে তিনি পদত্যাগ করেছেন। ''রায় ঘোষণার পর, নওয়াজ শরিফ প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেছেন,'' নওয়াজ শরিফের দফতর থেকে দেয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়।


নওয়াজ শরিফের পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে আয়ের সাথে সম্পদের অসঙ্গতি থাকার অভিযোগ কেন্দ্র করে এই রায় দিল সুপ্রিম কোর্ট। ২০১৫ সালে পানামা পেপার্স ফাঁসের পর জানা যায় নওয়াজ শরীফের সন্তানরা বিদেশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত রয়েছে। পাঁচজন বিচারকের বেঞ্চ সর্বসম্মতিক্রমে এই রায় দেন।


নওয়াজ শরীফ, তার মেয়ে মরিয়ম এবং তার স্বামী সফদর, অর্থমন্ত্রী ইশরাক দারসহ আরো কয়েকজনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে মামলা দায়েরের পরামর্শ দিয়েছে আদালত। পাকিস্তানের ইতিহাসে কোন বেসামরিক প্রধানমন্ত্রী পাঁচ বছর মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেনি। ফলে এই রায়ের মধ্যদিয়ে পাকিস্তানের রাজনীতির ভবিষ্যত নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।

আপাতত নওয়াজের দলের কেউ প্রধানমন্ত্রী হলেও ২০১৮ সালের নির্বাচনে দেশটি কার নিয়ন্ত্রনে যাবে সেটি এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। নওয়াজের পদত্যাগে উতসব করছে ক্রিকেটার ইমরান খানের দল তেহরিক-ই-ইনসাফ পার্টি। ইমরান খানের দল এখন পাকিস্তানের প্রধান বিরোধী দল।তিনি নওয়াজের বিরুদ্ধে ছিলেন সোচ্চার। নওয়াজের পদত্যাগ রাজনীতেত তার অবস্থান আরো মজবুত করবে। তার পদত্যাগকে ইমরানের বিজয় হিসাবেও দেখা হচ্ছে।


এখন অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সম্ভাব্য বেশ কয়েকজনের নাম আসছে। এর মধ্যে সবার চেয়ে এগিয়ে রয়েছেন নওয়াজ শরীফের ভাই শাহবাজ শরিফ। এটি হলে তাকে পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রীর পদ ছাড়বে হবে। এই মুহূর্তে অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ। আরেকজন সম্ভাব্য হিসেবে ভাবা হচ্ছে, জাতীয় পরিষদের স্পিকার সরদার আইয়াজ সাদিক। যুক্তরাষ্ট্র থেকে পড়াশুনা শেষ করা ও শরীফ পরিবারের খুব কাছের লোক হিসেবে পরিচিত সংসদ সদস্য আহসান ইকবালও আছেন এই তালিকায়। বর্তমানে তিনি দেশটির পরিকল্পনা ও উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন।


শাহবাজ শরিফের দায়িত্ব গ্রহণের আগে অন্তর্বর্তীকালীন দায়িত্ব পালন করতে পারেন উপরের যে কোনো একজন। ভাই শাহবাজ শরীফের হাতে ক্ষমতার রশি থাকলে শরীফ পরিবার নিরাপদ বোধ করবে, সেটা বলাই বাহুল্য।

রাজনীতিতে ইমরান খানের চেয়ে প্রায় ১৭ বছরের সিনিয়র নওয়াজ শরিফ। তবে সেই ক্রিকেট দিনগুলো থেকেই তারা একে অপরের সাথে পরিচিত। শরিফ বা ইমরান কারো কাছেই রাজনীতি তখন প্রথম বিষয় ছিল না। এখন তাদের দু’জনের কাছেই রাজনীতি কেবল প্রধান বিষয়ই নয়, তারা একে অপরের সবচেয়ে বড় শত্রু। ২০১৩ সালের পর শীর্ষ পদটির জন্য তারা দু’জন আবারো মুখোমুখি হচ্ছেন। আর এর ফলাফল অনেকাংশেই নির্ভর করবে পানামাগেট মামলার রায়ের ওপর।


নওয়াজ এবং তার ভাই শাহবাজ শরিফ রাজনীতিতে এসেছিলেন তাদের ব্যবসায়ী পিতা মিয়া মোহাম্মদ শরিফের উপদেশে। অথচ তার নিজের রাজনীতিতে কোনো আগ্রহ ছিল না। মোহাম্মদ শরিফ নিজেকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখলেও জেনারেল জিয়াউল হক মন্ত্রিসভার কোনো কোনো সদস্যের পরামর্শে তিনি তার দুই সন্তানকে রাজনীতিতে পাঠান। জিয়া এক্ষেত্রে জাতীয়করণবিরোধী ভাবাবেগের সুযোগ নিয়েছিলেন। ভুট্টোর আমলে জাতীয়করণনীতির ফলে শরিফদের ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এর রেশ ধরেই মোহাম্মদ শরিফের বড় ছেলে নওয়াজ শরিফ রাজনীতিতে এলেন।


অন্যদিকে ইমরান খানও স্বীকার করেছেন, বেনজির ভুট্টোর প্রথম সরকার যদি শওকত খানুম ক্যান্সার হাসপাতাল প্রতিষ্ঠায় সমস্যা সৃষ্টি না করতেন, তবে তিনি হয়তো কখনোই রাজনীতিতে প্রবেশ করতেন না। তিনি ১৯৯৬ সালে তার পুরনো কয়েকজন বন্ধুর সাথে মিলে ‘ইনসাফ’ পার্টি গঠন করেন। লাহোরের জামান পার্কে তার বাসভবনে এই পার্টির যাত্রা শুরু হয়।


অবশ্য রটনা রয়েছে, সাবেক আইএসআই প্রধান মরহুম হামিদ গুলই পেছন থেকে কলকাঠি নেড়েছিলেন। তিনি প্রায় ১০০ খ্যাতিমান ব্যক্তিকে রাজনীতিতে যোগ দিয়ে একটি নিরপেক্ষ পার্টি গঠনে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন বলে বলা হয়ে থাকে।

নওয়াজ শরিফকে রাজনীতিতে নিজের অবস্থান সুসংহত করতে এবং পাকিস্তানের বৃহত্তম প্রদেশ পাঞ্জাব নিয়ন্ত্রণ করতে সহায়তা করেছে। একইভাবে ইমরান খানকে সুবিধা দিয়েছে ক্রিকেট। চাপ কিভাবে সামাল দিতে হয় এবং পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে থেকেও কিভাবে প্রতিপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে হয়, তিনি তা শিখেছেন ক্রিকেট থেকে।


তিনি পরপর দুটি পরাজয়ের পরও ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। তার প্রথম পরাজয়টি এসেছিল ২০১৩ সালের নির্বাচনে। তিনি বলেছিলেন, নির্বাচনে তার দল তেহরিক-ই-ইনসাফ পার্টি বিপুল জয় পাবে। তা হয়নি। তারপর ২০১৩ সালের নির্বাচনে কারচুপি তদন্তে বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবিতে ১২৬ দিনের অবস্থান ধর্মঘট করেন। কিন্তু সেটাও ব্যর্থ হয়েছিল।


তবে তার ক্রিকেট অভিজ্ঞতাই তাকে এবং তার কর্মবাহিনীর মনোবল চাঙ্গা রাখতে সহায়তা করেছে। তিনি সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন, পানামাগেট তাকে সেই সুযোগটি এনে দিয়েছে।


১৯৯২ সালের বিশ্বকাপে পাকিস্তানের সেমিফাইনালে যাওয়ার আশা পর্যন্ত ছিল না। কিন্তু বৃষ্টির ফলে তিনি সুযোগ পান এবং পাকিস্তানকে চ্যাম্পিয়ন করতে ভুল করেননি। এটাই ইমরানকে বারবার ঘুরে দাঁড়াতে সহায়তা করেছে। বেনজির ভুট্টোর অসময়ে নিহত হওয়ার পর পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) যে নাজুক অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তাতে করে ইমরান খানই প্রধান দুই ব্যক্তিত্বের একজন হিসেবে বিরাজ করতে থাকবেন।


রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে নওয়াজ শরিফেরও কম উত্থান-পতন ছিল না। এসব অবস্থা ও অভিজ্ঞতাই তাকে শক্ত রাজনীতিবিদে পরিণত করেছে। একসময় তাকে বিবেচনা করা হতো, ক্ষমতাসীনদের অনুগত। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় তিনি ওই অবস্থার অবসান ঘটাতে পেরেছেন।

গত তিন বছরে নওয়াজ আর ইমরান পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেই সময় কাটিয়েছেন। এখন হয়তো তাদের সামনে চূড়ান্ত যুদ্ধের সময় এসেছে।