যুক্তরাষ্ট্রে মুসলমানদের ওপর বৈষম্য বাড়ছে

Jul 28, 2017 07:52 pm
মুসলিম হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে থাকাটা আগের তুলনায় কঠিন হয়ে পড়েছে



আদিবা শাইয়ারা


যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করা মুসলমানরা এখন নানা ধরনের বৈষম্যর শিকার হচ্ছে। শুধুমাত্র মুসলিম পরিচয়ের কারনে একাধিক হত্যাকান্ডের ঘটনাও ঘটেছে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী প্রায় অর্ধেক মুসলমান গত কয়েক বছরে কোনো না কোনোভাবে বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। দেশটির গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিউ রিসার্চ সেন্টারের এক জরিপে এই তথ্য উঠে এসেছে ।এর আগে কাউন্সিল অন আমেরিকান ইসলামিক রিলেশনস (সিএআইআর) এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর মুসলিম বিদ্বেষী ঘটনা বেড়ে ৯১ ভাগে দাঁড়িয়েছে।


পিউ রিসার্চ সেন্টারের গবেষকেরা এক হাজার একজন মুসলমানের সঙ্গে ফোনে কথা বলে এই গবেষণা করেছেন। জরিপে অংশ নেওয়া তিন-চতুর্থাংশ মুসলমান বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রে মুসলমানরা ব্যাপক বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। ৭৪ ভাগ উত্তরদাতা মনে করেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁদের প্রতি ‘বিরূপ’ মনোভাব পোষণ করেন। ২০১১ সালে এ ধরনের গবেষণায় দেখা গিয়েছিল, ৬৪ শতাংশ মুসলমান মনে করতেন, তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তাঁদের প্রতি বিরূপ ছিলেন।


জরিপে দেখা যায়, মুসলমানরা সামাজিকভাবে উদার হচ্ছেন। ৪৮ শতাংশ মুসলমান বলেছেন, তাঁরা বিগত কয়েক বছরে বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। অর্ধেক মুসলমান মনে করেন, মুসলিম হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে থাকাটা আগের তুলনায় কঠিন হয়ে পড়েছে।


মুসলমানদের সন্দেহের চোখে দেখা হয়—এ ধরনের বৈষম্যই সবচেয়ে বেশি হয়। ৩২ শতাংশ উত্তরদাতাই এ ধরনের বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। ১৯ ভাগ মুসলমানকে বিমানবন্দরে আলাদা নিয়ে তল্লাশি ও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। ১৮ ভাগ উত্তরদাতাকে খারাপ নামে সম্বোধন করা হয়েছে। ১০ ভাগ মুসলমানকে নিরাপত্তা বাহিনীর লোকজন আলাদা করে তল্লাশি করেছেন। ৬ ভাগ লোক শারীরিক আক্রমণের শিকার হয়েছেন।


জরিপে অংশ নেওয়া এই অভিবাসী মুসলমানরা বলেছেন, এই পরিস্থিতিতে তাঁদের আশপাশের পরিবেশ এবং লোকদের ব্যাপারে অতিরিক্ত সতর্ক থাকতে হচ্ছে। নিজে কী পরিস্থিতিতে আছেন? পাশের লোকটি ইসলাম সম্পর্কে কী ধারণা পোষণ করেন? এ ধরনের বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখতে হয়।


পুরুষের তুলনায় নারী মুসলমানরা বেশি সংখ্যায় মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রে মুসলমান হিসেবে বাস করা কঠিন হয়ে পড়েছে। আর যাঁদের পোশাকে মুসলমান বোঝা যায়, বিশেষ করে হিজাব পরেন, তাঁরা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন বেশি।


পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০০৭ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের সময় থেকে বৈষম্য বাড়তে থাকে। ২০১১ সালে বারাক ওবামার সময় কিছু কিছু ক্ষেত্রে বৈষম্য কমে আসে কিংবা একই পর্যায়ে স্থির থাকে। কিন্তু ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর থেকে পরিস্থিতির অবনতি হতে শুরু করে।


তবে এর বিপরীত চিত্রও আছে। জরিপের ৪৯ ভাগ উত্তরদাতা বলেছেন, ধর্মীয় পরিচয়ে বৈষম্যের বিপরীতে তাঁদের প্রতি সমর্থনও বাড়ছে।
গত নভেম্বরের নির্বাচনে বেশির ভাগ মুসলমান ডেমোক্রেটিক পার্টির হিলারির পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন। ফলে খুব সম্ভবত ট্রাম্পের শাসনে তাঁরা ক্ষুব্ধ এবং মনে করছেন দেশ ভুল পথে এগোচ্ছে।


ক্ষমতায় আসার পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কয়েকটি মুসলিমপ্রধান দেশের নাগরিকদের বিরুদ্ধে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। এটিকেও ভালোভাবে নেননি মার্কিন মুসলমানরা।


অপরদিকে মানবাধিকার গ্রুপ কাউন্সিল অন আমেরিকান ইসলামিক রিলেশনস বলছে যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর মুসলিম বিদ্বেষী ঘটনা বেড়ে ৯১ ভাগে দাঁড়িয়েছে। গত বছরের প্রথম ছয় মাসের তুলনায় চলতি বছরের এই সময়ে বেড়েছে ২৪ ভাগ। কেবল মুসলিম হওয়ার কারণেই তাদের ওপর হামলা, নির্যাতন ও খুনের সংখ্যা বাড়ছে।

মুসলিমদের নিয়ে কাজ করা মানবাধিকার গ্রুপ কাউন্সিল অন আমেরিকান ইসলামিক রিলেশনস (সিএআইআর)এর এক প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে এই খবর জানিয়েছে আল-জাজিরা।


মানবাধিকার গ্রুপটি ২০১৩ সাল থেকে এ নিয়ে কাজ করছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতা নেওয়ার পর গত ছয় মাসে মুসলিমবিদ্বেষী ঘটনা চরম মাত্রায় বেড়েছে। শুধু মুসলিম হওয়ার কারণে যুক্তরাষ্ট্রে হামলা, আক্রমণ, নির্যাতন ও খুনের শিকার হচ্ছে ইসলাম অনুসারীরা।


সিএআইআর জানায়, তাদের রেকর্ডে থাকা ২০১৩ সাল থেকে এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্যে দেখা গেছে ২০১৭ সালেই মুসলিমবিদ্বেষী ঘটনা বেশি ঘটেছে। ২০১৭ সালের প্রথম ছয় মাসে যা প্রায় ১০০ ভাগ বেড়ে গেছে। এ ছাড়া ২০১৬ সালের প্রথম ছয় মাসের তুলনায় ২০১৭ সালের একই সময়ে মুসলিমদের বিরুদ্ধে পক্ষপাতমূলক অপরাধ সংগঠনের ঘটনা বেড়েছে ২৪ শতাংশ।


সিএআইআরের সমন্বয়ক জয়নাব আরাইন বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ক্যাম্পেইন ও ট্রাম্প প্রশাসন এক ধরনের ধর্মান্ধতা ও ঘৃণা ছড়িয়েছে, যার ফলে আক্রোশের শিকার হয়েছে আমেরিকান মুসলিম ও অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়।’


যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামভীতি প্রশমনে কাজ করছেন জয়নাব আরাইন। শুধু ইসলাম ধর্মের অনুসারী হওয়ায় মুসলিমদের বিরুদ্ধে মার্কিনিদের মধ্যে যে ভীতি তৈরি হয়েছে, তাই ইসলামভীতি। ‘ইসলাম মানে কুসংস্কার, মুসলিম নামে সন্ত্রাস’- এমন ধারণার ফলে মুসলিমদের বিরুদ্ধে হেট ক্রাইম বেড়ে গেছে। জয়নাব আরাইন আশঙ্কা করছেন, ২০১৭ সালে মুসলিমবিদ্বেষী ঘটনার বিরল রেকর্ড সৃষ্টি হবে।


ইসলামভীতির ফলে ২০১৭ সালের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত মুসলিমরা বেশি লাঞ্ছিত ও অপদস্ত হয়েছে। তবে এসব ঘটনার বেশির ভাগ জীবনের জন্য হুমকি নয় বলে মনে করে সিএআইআর। এরপর আছে হেট ক্রাইম। অপরাধ না করেও শুধু মুসলিম হওয়ার কারণে শারীরিকভাবে আক্রমণের শিকার হওয়া বা তাদের সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি করার ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।


মুসলিমবিরোধী ৩৪৭টি ঘটনার শিকার হওয়া ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্ত করা গেছে। এদের মধ্যে ৫৭ শতাংশ পুরুষ এবং ৪৩ শতাংশ নারী। সিএআইআরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৫ সালের তুলনায় ২০১৬ সালে মুসলিমবিদ্বেষী সহিংসতার ঘটনা ৪০ শতাংশ বেড়েছিল। নির্যাতনের বেশিরভাগ ঘটনা ঘটেছে রাস্তায়, সড়কে কিংবা বাস,ট্রেন স্টেশনে।


২০১৫ সালের তুলনায় ২০১৬ সালে মুসলিম বিদ্বেষী ঘটনা ৪০ শতাংশ বেড়েছে।