প্রবাস নাকি প্রতারণা

Jul 30, 2017 10:23 pm
দুষ্টচক্রের হাতে পড়ে বহু মহিলা প্রতারিত হচ্ছে

 

সাবিরা সুলতানা


আলেয়া বেগম (ছদ্মনাম) বহু চেষ্টার পর সৌদি আরব গিয়েছিলেন অর্থ রোজগার করার জন্য। আর সেজন্য তাকে পুরো ৩ লাখ টাকা তুলে দিতে হয়েছিল আদম বেপারির হাতে। নিজের সর্বস্ব বিক্রি করার পরও ধার করতে হয়েছিল ২ লাখ টাকা।

বিদেশ গেলেই অনেক টাকা রোজগার করবেন। সেই অর্থ দিয়ে ঋণ শোধ করার পরও নিজের ছোট ছোট চার সন্তান এবং অসুস্থ স্বামীকে সুন্দর ও নিরাপদ জীবন দেবেন। অনেক আশা আর স্বপ্ন নিয়ে আলেয়া পা বাড়িয়ে ছিলেন প্রবাসের পথে। কিন্তু বিদেশের মাটিতে পৌছাতে না পৌছাতেই তার সব স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে যায়।

আদম বেপারি চুক্তি অনুযায়ী কাজ না দিয়ে তাকে এক হাসপাতালে আয়ার চাকরি দেয়। সেই সঙ্গে নিয়ে নেয় তার পাসপোর্ট। তখন বাধ্য হয়েই তাকে কাজ করতে হয়েছে তাদের ইচ্ছামতো। প্রতিদিন ১৬-১৭ ঘণ্টা ডিউটি করতে হতো হাসপাতালে। বর্জ্য পরিষ্কার করতে হতো। সে কাজ করতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন। কিন্তু কোনো উপায় নেই, সুস্থ হয়ে আবারও তাকে সেই কাজেই ফিরে যেতে হয়।

অন্যদিকে বেতন খুবই কম। মাসে বাংলাদেশী টাকায় মাত্র আড়াই হাজার টাকা। এ টাকায় ঘরভাড়া, খাওয়া অন্যান্য খরচ জোটানোই দায়, দেশে কী পাঠাবেন। কিন্তু ফিরে আসারও কোনো উপায় নেই। তাই দীর্ঘ পাঁচটা বছর খেয়ে না খেয়ে অনেক কষ্ট করে কিছু টাকা জমিয়ে অনেক চেষ্টার পর দেশে ফেরত আসেন। ঋণের বোঝা এখনো মাথায়। মায়ের সান্নিধ্য ছাড়া বড় হওয়া সন্তানগুলোর জীবনও এই পাঁচ বছরে অনেকটা এলোমেলো হয়ে গেছে।


দুষ্টচক্রের হাতে পড়ে প্রতিবছর বহু মহিলা এভাবে বিদেশে যাওয়ার নামে প্রতারিত হচ্ছে। এদের একটা বড় অংশ পাচার হয়ে যায় এবং তাদের ঠাঁই হয় নাইট ক্লাবগুলোতে।

চাকরি দেয়ার নাম করে এসব মহিলাদের বিদেশে বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে নিয়ে যাওয়ার পর এসব আদম বেপারিরা তাদের পাসপোর্ট কেড়ে নেয় এবং কাজ দেয় খুব নিম্নমানের কোনো একটা প্রতিষ্ঠানে অথবা কোনো নাইট ক্লাবে কাজ করতে বাধ্য করে। পাসপোর্ট-ভিসা কাছে না থাকার কারণে অন্যকোথাও কাজও করতে পারে না।

একদিকে দেশে ফিরে আসার রাস্তা বন্ধ অন্যদিকে বেঁচে থাকার তাগিদে অধিকাংশ নারী এ কাজ করতে বাধ্য হয়। নাইট ক্লাবগুলোতে পাহারা ব্যবস্থা এত কঠোর থাকে যে কেউ পালিয়েও যেতে পারে না।


মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর নাইট ক্লাবগুলোতে বাংলাদেশী নারীদের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাচ্ছে। এ নিয়ে উদ্বিগ্ন এসব দেশে বসবাসকারী অন্য বাংলাদেশী প্রবাসীরাও। পাচারকারী এই সব চক্রের খপ্পরে পড়ে প্রতিনিয়ত সর্বস্বান্ত হচ্ছে অসংখ্য নারী। তাদের অনেকেই সর্বস্ব হারিয়ে ফিরে আসছে দেশে আবার কেউ কেউ চিরতরে হারিয়ে যাচ্ছে প্রবাসের অন্ধকার গহ্বরে।

তাই এ ব্যাপারে এখন থেকেই কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। বিশেষ করে সরকারের পক্ষ থেকে নারী শ্রমিকদের বিদেশ যাওয়ার ব্যাপারে স্পষ্ট বিধি-নিষেধ ও নীতিমালা তৈরি ও প্রয়োগ করতে হবে। সেই সঙ্গে বিদেশ যেতে ইচ্ছুক নারীদের সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। তা নাহলে বিষয়টি দেশের জন্য একটা জটিল পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।