নারীর ক্ষমতায়ন : অন্য রকম দৃষ্টান্ত

Aug 06, 2017 10:09 pm
 মার্ভে কাভাকসি

মীযানুল করীম

তুরস্কে ক্ষমতাসীন এরদোগান সরকার এবং তিনি নিজেও প্রায় প্রতিদিন আন্তর্জাতিক মিডিয়ার খবর হচ্ছেন। তার বিভিন্ন পদক্ষেপ বিশ্বে নানাভাবে আলোচিত হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে এবারের একটি সিদ্ধান্ত বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। তুরস্ককে উগ্র সেকুলারিজমের দীর্ঘকালীন ধারা থেকে মুক্ত করার ক্ষেত্রে যেমন, তেমনি আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সম্পর্কের বেলায়ও আঙ্কারার একেপি সরকারের পদক্ষেপটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

তা হলো, বহুলালোচিত সেই সাবেক মহিলা এমপি মার্ভে কাভাকসি মালয়েশিয়ায় তুর্কি রাষ্ট্রদূত নিযুক্ত হয়েছেন। তুরস্ক ও মালয়েশিয়া- দুটোই বর্তমান মুসলিম বিশ্বের দু’টি অগ্রণী দেশ। বিশেষ করে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে তারা প্রথম সারিতে অবস্থান করছে। হিজাবশোভিতা কাভাকসি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মালয়েশিয়ায় মহাদেশের সর্বপশ্চিমের দেশ তুরস্কের প্রতিনিধিত্বের গুরুদায়িত্ব পালন করবেন।

তুরস্কের বহুলালোচিত পার্লামেন্ট সদস্য মার্ভে কাভাকসি নিকট অতীতে নির্যাতিত ও অপমানিত হয়েছেন এবং শুধু পার্লামেন্টের সদস্যপদই নয়, তুরস্কের নাগরিকত্বও হারিয়েছিলেন। এসব কিছুই হয়েছিল কট্টর সেকুলার শাসনামলে এবং তার অটুট বিশ্বাস ও আদর্শনিষ্ঠার কারণে। সেই আপসহীন নারী মালয়েশিয়ায় স্বদেশের রাষ্ট্রদূত নিযুক্ত হয়ে আরেক রেকর্ড গড়েছেন। মুসলিম অধ্যুষিত তুরস্কে ইসলামের নির্দেশমাফিক হিজাব পরিধানের মাধ্যমে পার্লামেন্টে তিনি মূলত নারীর সমানাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করেছেন। আর এখন মুসলিম বিশ্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশের প্রধান কূটনৈতিক প্রতিনিধি হিসেবে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম রাষ্ট্রে তার নিযুক্তিকে আধুনিক বিশ্বে নারীর ক্ষমতায়নের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রূপে গণ্য করা হচ্ছে।

হিজাব বা মস্তকাবরণ পরিধান করা ইসলামের শিক্ষাগুলোর একটি। এই ধর্মের অনুসারী মহিলারা এর অনুসরণ করাই স্বাভাবিক। কারণ এটা তার অবিচ্ছেদ্য অধিকার। অন্য ধর্মাবলম্বীদের ক্ষেত্রেও তাদের নিজ নিজ ধর্মপালনের অধিকার দেয়া রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য। কিন্তু তুরস্কের মতো কোনো কোনো দেশে সেকুলারিজম বা ধর্মনিরপেক্ষতার নামে এতই বাড়াবাড়ি করা হয়েছে যে, ধর্ম পালন না করার সব সুযোগ দেয়া হলেও ধর্ম পালনে পদে পদে দেয়া হয়েছে নানা রকম বাধা। তুরস্ক একটি ঐতিহ্যবাহী মুসলিম রাষ্ট্র হলেও সেখানে পৌনে এক শতাব্দী ধরে উগ্র সেকুলার রাষ্ট্রশক্তি প্রধানত ইসলামকেই টার্গেট করে তাদের অপতৎপরতা চালিয়েছে। কথিত নিরপেক্ষতার আড়ালে ইসলামবিদ্বেষীদের এহেন গোঁড়ামি অনৈতিক ও অগণতান্ত্রিক।

এটা নিঃসন্দেহে মৌলিক অধিকার ও মানবাধিকারের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। আধুনিক সভ্য জগতে কোনো সরকার এমন পদক্ষেপ নিতে পারে না। যা হোক, তুরস্কে একেপি সরকার জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসার পর একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে নতুন হাওয়া বইতে শুরু করেছে। সে দেশের জনগণের অনুসৃত ধর্ম তথা তাদের লালিত বিশ্বাস ও মূল্যবোধ আবার মর্যাদা পাচ্ছে। নারীর হিজাব পরার অধিকার প্রতিষ্ঠা এর একটি নজির।

তুরস্কে ১৯২৪ থেকে একাদিক্রমে গোঁড়া সেকুলার শাসন অব্যাহত ছিল পঞ্চাশের দশকে আদনান মেন্দারেসের কয়েক বছরের শাসনকাল ছাড়া। হিজাব বা মহিলাদের মস্তকাবরণের ওপর রাষ্ট্রীয় খড়গ নেমে আসে প্রথমে ১৯৮০ সালে। তখন সেনাপ্রধান কেনান এভরান সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ক্ষমতা জবরদখলের পর সরকারি প্রতিষ্ঠানে হিজাব পরা নিষিদ্ধ করেন। হিজাব সমর্থক দলগুলোর জনপ্রিয়তা যত বেড়েছে, সরকার ততই শঙ্কিত হয়ে এই নিষেধাজ্ঞাকে কঠোরতর করেছে। এক সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেও হিজাব হলো নিষিদ্ধ। দেশজুড়ে হিজাবের পক্ষে ব্যাপক বিক্ষোভ সত্ত্বেও একগুঁয়ে সরকার তার সিদ্ধান্ত বদলায়নি।

মার্ভে কাভাকসি ধর্মপ্রাণ তো বটেই, সেই সাথে আধুনিক উচ্চশিক্ষার অধিকারী। বিশ্বখ্যাত হার্ভার্ড ভার্সিটির ডিগ্রিধারী এই সংগ্রামী নারী ওয়াশিংটনে জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি ও হোয়ার্ড ইউনিভার্সিটির প্রফেসর ছিলেন। তবে পাশ্চাত্যের চাকচিক্য কিংবা ‘সর্বোন্নত দেশ’-এর আকর্ষণ তাকে ধরে রাখতে পারেনি। কাভাকসি স্বদেশ ও স্বজাতির প্রতি দায়িত্ববোধ থেকে তুরস্কে ফিরে এলেন। রাজনীতির মাধ্যমেই দেশের জনগণের কল্যাণে কাজ করতে হবে এমন দৃঢ় প্রতিজ্ঞা তিনি পোষণ করতেন। সে মোতাবেক ইসলামি আদর্শে বিশ্বাসী ভার্চু পার্টি থেকে ইস্তাম্বুলের এমপি নির্বাচিত হন এপ্রিল, ১৯৯৯ সালে। এর পরই ২ মে তিনি মাথায় স্কার্ফ দিয়ে পার্লামেন্ট সদস্য হিসেবে শপথ নেয়ার জন্য গ্র্যান্ড ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি ভবনে প্রবেশ করেন, কিন্তু সেকুলার ও বামপন্থীরা তার ধর্মীয় অধিকারটুকুও বরদাশত করতে রাজি হননি। স্কার্ফ বা হিজাব পরিহিতা কাভাকসিকে দেখেই ‘ডেমোক্র্যাটিক লেফট পার্টি’র (ডিএলপি) এমপিরা ন্যূনতম ভদ্রতার মাথা খেয়ে ‘বেরিয়ে যাও’ বলে কাভাকসির উদ্দেশে চিৎকার করে ওঠেন। তারা এমনকি তাকে শপথ নিতে পর্যন্ত দেননি। অথচ সুষ্ঠু নির্বাচনে তিনি জনগণের ম্যান্ডেট পেয়েই পার্লামেন্ট সদস্য হয়েছিলেন। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী বুলেন্ত এসেভিট ডিএলপি দলের নেতা হিসেবে চরম সঙ্কীর্ণতা ও গোঁড়ামির প্রমাণ রেখেছিলেন তখন। তিনি দলের অসহিষ্ণু এমপিদের শান্ত করার কোনো চেষ্টা না করে উল্টো ‘বিপ্লবী বক্তৃতা’ ঝাড়তে থাকেন এ ভাষায় ‘এটা রাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করার জায়গা নয়। এই মহিলাকে লাইনে আনুন।’

‘প্রগতিশীল’রা প্রতিনিয়ত ধর্মীয় স্বাধীনতা, চিন্তা ও বিশ্বাসের স্বাধীনতাসহ মানুষের মৌলিক অধিকারের প্রবক্তা রূপে নিজেদের জাহির করেন। অথচ তারাই মার্ভে কাভাকসির গণতান্ত্রিক অবিচ্ছেদ্য অধিকার সে দিন তুর্কি আইনসভায় পদদলিত করেছিলেন। তাদের নেতা ও সরকারপ্রধান এসেভিটের ‘ফতোয়ামাফিক’ বেলাইনে চলে যাওয়ায় কাভাকসিকে শুধু পার্লামেন্ট থেকে নয়, দেশ থেকেও বহিষ্কার করা হলো। ধর্মনিরপেক্ষতার নামে এমন অসভ্যতার দৃষ্টান্ত সমকালীন বিশ্বে বিরল।
মার্ভে কাভাকসি তার পুরনো কর্মস্থল যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান এবং অচিরেই সেখানকার নাগরিকত্ব অর্জন করেন। মেয়ে ফাতিমার ভাষায়- ‘আম্মা বিরাট ত্যাগের পরিচয় দিয়েছেন। পার্লামেন্ট থেকে তাকে ভয়ঙ্করভাবে বাইরে ছুড়ে ফেলার পর মা, বোন আর আমার নতুন জীবন শুরু হলো বিদেশে। যুক্তরাষ্ট্রে আমরা আগের চেয়ে আরো দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হলাম যে, আরো উৎসাহ ও অধ্যবসায়ের সাথে আমাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের অনুসরণ করে যাবো। সব সময়ই আমাদের লক্ষ্য ছিল ও আছে- কমিউনিটি ও উম্মাহসহ বিশ্বমানবতার সেবা করা।’

তুরস্কে দশকের পর দশক বজায় ছিল প্রগতি ও ধর্মনিরপেক্ষতার ধ্বজাধারী গোষ্ঠীর স্বেচ্ছাচারী শাসন। অটোমান সুলতানের সেনা কর্মকর্তা মোস্তফা কামালের নেতৃত্বে ১৯২৩ সালে নতুন তুর্কি রাষ্ট্রের যাত্রার সূচনা। তৎকালীন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে কামাল জনসমর্থন নিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হয়েছিলেন। ‘রুগ্ণ’ তুরস্ককে আধুনিকতার পথে ‘শক্তিশালী’ করার লক্ষ্যে কামাল ‘খিলাফত’ উৎখাত করেছিলেন ঠিকই, তবে ‘জমহুরিয়াত’ (গণতন্ত্র) দিয়ে সে শূন্যস্থান পূরণ করেননি। বরং ১৯৩৮ সালে তার মৃত্যু পর্যন্ত তো বটেই, এর পরও অনেক দিন তুরস্কে গণতন্ত্র ছিল না; ছিল কার্যত একদলীয় কর্তৃত্ববাদী শাসন।

পরে গণতন্ত্র এলেও স্থায়ী হতে পারেনি অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সামরিক বাহিনীর প্রত্যক্ষ শাসন আর বশংবদ বিচার বিভাগ ও বিকৃত আইন পরিষদের মাধ্যমে পরোক্ষ সেনা শাসনের কারণে। ১৯৬০ সালে জেনারেল জামাল গুর্সেল এবং ১৯৮০ সালে জেনারেল কেনান এভরান সেনা অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা দখল করেন। সামরিক শাসনের পরও তারা এবং তাদের সমমনা সেকুলাররাই যুগ যুগ ধরে তুরস্ক শাসন করেছেন। অনেক সময় তা করা হয়েছে বেসামরিক পোশাকে এবং গণতন্ত্রের সেøাগান দিয়ে। বিগত শতকের শেষ দিকেও চলছিল এমন একটি শাসনামল। এই প্রেক্ষাপটে মার্ভে কাভাকসির মতো সাহসী নারী বিশ্বমিডিয়ার শিরোনাম হয়েছিলেন।

এ প্রসঙ্গে কাভাকসির কন্যা ফাতিমা আবু শানাব লিখেছেন, ‘১৯৯৯ সালের ২ মে; তখন আমার বয়স মাত্র ৯ বছর। একটি ছোট্ট মেয়ে হিসেবে সেদিন দেখেছি আমার মা মার্ভে কাভাকসি বীরের মতো পার্লামেন্টে প্রবেশ করলেন। তুরস্কের নাগরিকদের অনেকের হৃদয়েই ছিল তার স্থান। তাকে নির্যাতিত হতে হলো। তাকে যেন লাথি মেরে পার্লামেন্ট থেকে বের করে দেয়া হয়েছিল। ‘তিনি সেকুলার রাষ্ট্রের প্রতি হুমকি’ এই অভিযোগে তার নাগরিকত্ব পর্যন্ত কেড়ে নেয়া হলো। আমি সেদিন ভেবেছি, মা এত মহৎ কোনো কাজ করেছেন যে, তিনি সব সময় ওই মুসলিম মহিলাদের প্রতীক হয়ে থাকবেন, যারা মাথায় স্কার্ফ পরিধান করে থাকেন। লাল ও সাদা রঙের রেখা টানা এই নেভি হেডস্কার্ফ শুধু এক টুকরো কাপড় নয়। সেদিন এই টুকরো কাপড় হয়ে উঠেছিল হিজাব নিষিদ্ধ করার বিরুদ্ধে সংগ্রামের প্রতীক। একই বিশ্বাসের অনুগামী যে অসংখ্য মানুষ স্বাধীনভাবে বাঁচতে চেয়েছেন, তাদের প্রতিনিধিত্ব করেছে মাথা ঢাকার বস্ত্রখণ্ডটি। আমার মা নীরবে বীরত্ব প্রদর্শন করেছেন সে দিন।’

মার্ভে কাভাকসি পার্লামেন্টে অসহিষ্ণু ও মতান্ধ প্রতিপক্ষের চরম অসৌজন্য ও ক্ষমতার নগ্ন অপব্যবহারের শিকার হয়েছিলেন ১৯৯৯ সালে। তখন তিনি ছিলেন তুরস্কের প্রখ্যাত রাজনীতিক অধ্যাপক নাজমুদ্দীন এরবাকানের Virtue Party (Welfare Party-এর উত্তরাধিকারী) থেকে সদ্যনির্বাচিত সংসদ সদস্য। এরবাকান দেশের একজন প্রবীণ ও অভিজ্ঞ রাজনীতিক হিসেবে বিভিন্ন সময় সেকুলার সরকারের উগ্রবিদ্বেষের মুখে বিভিন্ন নামে দল গঠন করে ইসলামি আদর্শে সমাজ গঠনের আন্দোলন করেছেন। তিনি সর্বাধিক পরিচিত ছিলেন ন্যাশনাল স্যালভেশন পার্টি বা মিল্লি সালামি পার্টির নেতা হিসেবে। পরে রেফাহ পার্টি নামেও কাজ করেছেন।

এক সময় ছিলেন উপপ্রধানমন্ত্রী। ’৯০-এর দশকে জনগণের রায়ে দেশ চালনার দায়িত্ব নিয়ে প্রধানমন্ত্রী হলেও সামরিক বাহিনীর অন্যায় হস্তক্ষেপে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন। ১৯৯৭ সালের ১৮ জুন তুরস্কের ইতিহাসের এই ন্যক্কারজনক ঘটনা ‘উত্তরাধুনিক অভ্যুত্থান’ হিসেবে অভিহিত। তুর্কি জনগণ তাদের দীর্ঘ দিনের তিক্ত অভিজ্ঞতায় আর অভ্যুত্থান ঘটিয়ে সশস্ত্রবাহিনী যেন কলঙ্কিত না হয়, সে জন্য গত বছর ১৫ জুলাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাথে সাথে ব্যর্থ করে দিয়েছে কিছু সেনাকর্মর্তার ক্ষমতা দখলের প্রয়াস।

যা হোক, ১৯৯৭ সালের ব্যতিক্রমী সে অভ্যুত্থানে সেনাকর্মকর্তারা প্রত্যক্ষভাবে ক্ষমতা নেয়াকে নিরাপদ মনে করেননি, বরং তারা জনসমর্থিত সরকারকে চাপের মুখে তাড়িয়ে দিয়ে পছন্দসই সরকার গঠনে মেতে ওঠেন। এ জন্য তারা ’৯৭ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে গণতান্ত্রিক সরকারকে ভীষণ হুমকির মুখে রেখেছিলেন। মতান্ধ মিডিয়া কাজে লাগিয়ে এবং চরম সেকুলার দলগুলোকে উসকে উর্দিধারীরা এমন অবস্থার সৃষ্টি করেন, বৃদ্ধ এরবাকান পদত্যাগে বাধ্য হলেন। এরপরও ‘ইসলামপন্থী’ রাজনৈতিক মহলকে ভীষণ চাপে থাকতে হয়, যারা সেকুলারদের দৃষ্টিতে ‘রক্ষণশীল’।

এমন পরিস্থিতিতেই ’৯৯ সালে মার্ভে কাভাকসি দেশের প্রধান নগর ইস্তাম্বুল থেকে পার্লামেন্টে নির্বাচিত হন। তার ক্ষমতাদর্পী প্রতিপক্ষ এটা মেনে নিতে পারেনি। তিন বছর পর জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (একেপি) প্রথমবারের মতো সরকার গঠন করে ‘ভূমিধস বিজয়’ অর্জন করে। তবে বহুকাল ধরে সংসদ, মিডিয়া, বিচারালয়, সশস্ত্রবাহিনী, একাডেমিক অঙ্গন ও সাংস্কৃতিক মহলে হিজাববিরোধী সেকুলার শক্তি এতটাই জেঁকে বসেছিল যে, একেপি সরকার সহজে এর ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে পারেনি। তবে দীর্ঘ দিনের বিতর্কের পর ২০১০ সালে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এবং ২০১৩ সালে রাষ্ট্রীয় সব প্রতিষ্ঠান থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে হিজাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা। আর হিজাবের অধিকার কায়েমের আন্দোলনের পুরোধা মার্ভে কাভাকসি ২০ বছর পর ফিরে পেলেন তার নাগরিকত্ব। সম্প্রতি মন্ত্রিসভা এ মর্মে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।

ওয়াকিবহাল মহলের অভিমত, তুরস্কের রাষ্ট্রদূতদের এখন আগের চেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। এটা এক দিকে যেমন সমস্যা, তেমনি যোগ্য কূটনীতিকদের সামনে সম্ভাবনার দ্বারও উন্মুক্ত করে দিয়েছে। একজন তুর্কি ভাষ্যকারের মতে, দু’টি কারণে তুরস্কের কূটনীতিকদের দায়িত্ব বেড়ে গেছে। প্রথমত, তুরস্কের বর্তমান সরকার দেশকে আঞ্চলিক নেতৃত্ব প্রদানের নয়া যুগে প্রবেশ করাতে উন্মুখ। এটা নিশ্চয়ই একটি বিরাট কাজ। দ্বিতীয়ত, বিশেষ করে একেপির এই সরকার এবং তার নেতা এরদোগানের বিরুদ্ধে পশ্চিমা তথা আন্তর্জাতিক মিডিয়ার প্রচারণা ব্যাপক ও জোরালো। এর কার্যকর মোকাবেলা সহজ না হলেও তা করার সর্বাত্মক উদ্যোগ নেয়াই আঙ্কারার করণীয়।


তুরস্কের বর্তমান সরকারের যারা সাফল্য চান, তারা মনে করেন, আন্তর্জাতিক সব বাধাবিপত্তি, বিরোধিতা ও সমালোচনার মোকাবেলা করে জাতীয় স্বার্থ, তুরস্কের আঞ্চলিক নেতৃত্ব এবং বিশ্বসম্প্রদায়ের মাঝে সে দেশের জোরালো উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশে তুরস্কের প্রতিনিধি হিসেবে কূটনীতিকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ দিক দিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তি মালয়েশিয়ায় তুর্কি রাষ্ট্রদূত মার্ভে কাভাকসি জাতির প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবেন বলে তার শুভাকাঙ্ক্ষীদের বিশ্বাস।