কয়লা জ্বালানির কয়লা কাহিনী

Aug 08, 2017 01:42 pm
 বিদ্যুত কেন্দ্রে কয়লা

কয়লা হচ্ছে সবচেয়ে বেশি দূষণ ছড়ানো জীবাশ্ম জ্বালানি। তবুও পৃথিবীব্যাপী বছরে আট শ’ কোটি টন কয়লা জ্বালানো হয়। কারণ নোংরা হলেও সস্তা এই জ্বালানি। যদিও পৃথিবীর পরিবেশকে ভয়াবহভাবে দূষিত করছে এই জ্বালানি। প্রশ্ন উঠেছে, এর সমধান কী? বিদেশী সাময়িকী অবলম্বনে লিখেছেন হুমায়ুন সাদেক চৌধুরী

পৃথিবীব্যাপী যত বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয় তার ৪০ শতাংশই আসে কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে। পৃথিবীতে নিঃসরিত কার্বন ডাই অক্সাইড গ্যাসের ৩৯ শতাংশও আসে কয়লা জ্বালানি থেকে। প্রতি বছর কয়লাখনি দুর্ঘটনায় মারা যায় হাজার হাজার মানুষ, আর তার চেয়েও বেশি মারা যায় কয়লার ধোঁয়া থেকে সৃষ্ট বায়ুদূষণে।


এসব কারণেই পরিবেশবাদীরা বলে থাকেন, ‘ক্লিন (দূষণমুক্ত) কয়লা হলো একটি অবাস্তব কথা।’ আসলেই তাই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার দিকে তাকালেই বিষয়টি বোঝা যাবে। সেখানে অ্যাপালসিয়ান পর্বতের নিচের কয়লা তোলা হচ্ছে প্রতিদিন। আর কয়লাখনি থেকে বেরুচ্ছে এসিডযুক্ত হলদে পানি। চীনের রাজধানী বেইজিংয়ের কথাই ধরা যাক। এর উপকণ্ঠে বাতাস এতটাই ঘন, যা কোনো বিমানবন্দরের স্পোকিং লাউঞ্জের চেয়েও বেশি। এই ভয়াবহ বায়ুদৃষণের প্রধান কারণ কয়লা জ্বালানো। এর ফলে দেশটিতে প্রতি বছর ১০ লাখেরও বেশি মানুষের অকালমৃত্যু ঘটে।


তবে এসব সমস্যা নতুন নয়; সেই সপ্তদশ শতাব্দীর শিল্প বিপ্লবের সময়কার। সেই সময় যখন ওয়েলস ও নর্থাম্বারল্যান্ডের কয়লা দিয়ে ব্রিটেনে শিল্প বিপ্লবের আগুনটি প্রথম জ্বলে উঠেছিল, তখনই সরব হয়েছিলেন ইংরেজ লেখক জন এভেলিন। বলেছিলেন ‘লন্ডনে কটু গন্ধযুক্ত ও অন্ধকারময় ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ছে।’


এরও তিন শ’ বছর পর ১৯৫২ সালে, তার কথাটি প্রাণঘাতী রূপ নিয়ে একেবারে চোখের সামনে এসে দাঁড়ায়। সে বছর ডিসেম্বরে কয়লা জ্বালানি নিঃসৃত ধোঁয়ার হাল্কা একটি স্তর লন্ডনকে ছেয়ে ফেলে এবং কয়েক সপ্তাহ স্থায়ী হয়। এর প্রভাবে মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়ে শ্বাসকষ্ট এবং এতে পরবর্তী কয়েক মাসের কমবেশি ১২ হাজার মানুষ মারা যায়।


এ ঘটনারও চার বছর আগে, ‘১৯৪৮ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ও পেনসিলভানিয়ার ছোট শহর ডোনোরায় ঘটে আরেক ঘটনা। অক্টোবর মাসের এক সাপ্তাহিক ছুটির দিনে স্থানীয় হাইস্কুলের মাঠে ছিল এক ফুটবল প্রতিযোগিতা। স্বাভাবিকভাবেই মাঠে অনেক দর্শক। হঠাৎ দর্শকেরা অনুভব করল, না খেলোয়াড় না ফুটবল কিছুই দেখতে পাচ্ছে না তারা। কারণ কাছের এক কয়লাচালিত দস্তা কারখানার ধোঁয়া এসে মাঠটিকে ছেয়ে ফেলেছে। ওই দিন এবং তার পরের কয়েক দিনের মধ্যে শহরটির জনসংখ্যার অর্ধেক অর্থাৎ ছয় হাজার লোক অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং ২০ জন মারা যায়।


কয়লা এভাবেই তাকে জ্বালানোর ‘প্রতিশোধ’ নিয়ে থাকে। আমাদের জ্বালানির যত উৎস আছে, তার মধ্যে এটিই সবচেয়ে নোংরা ও প্রাণঘাতী। বিপরীতে আবার এটিই সবচেয়ে সস্তা। কাজেই কয়লা আমাদের জ্বালাতেই হয়। এ অবস্থা এশটি বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, কয়লা ছাড়া যখন চলা যাচ্ছে না, তখন এটিকে কি ‘ক্লিন’ (দূষণমুক্ত) করা সম্ভব? জবাব : না।


মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা গত বছর জুন মাসে ওয়াশিংটন ডিসিতে তার ক্লাইমেট স্পিচে জলবায়ুবিষয়ক বক্তৃতায় ঘোষণা দেন, ২০১৪ সালের জুন মাসের মধ্যেই এনভায়রনমেন্ট প্রটেকশন এজেন্সি (ইপিএ) একটি নতুন আইনের খসড়া প্রণয়ন করবে, যে আইনবলে যুক্তরাষ্ট্রেও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে লাগামহীন কার্বন দূষণের অবসান ঘটবে।


বারাক ওবামা ক্ষমতাসীন হন ২০০৯ সালে। তারপর থেকে তার কোনো ঘোষণায় পরিবেশবাদীরা এত আনন্দিত এবং আমেরিকান কয়লা ও বিদ্যুৎ খাতকে এতটা হতাশ হতে দেখা যায়নি। বস্তুত ডোনোরা শহরের ফুটবল মাঠের ঘটনাই প্রেসিডেন্ট ওবামাকে এ রকম ব্যবস্থা নিতে উদ্বুদ্ধ করেছে। আইনটির সুফল ইতোমধ্যেই দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে সালফার ডাই অক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড ও অন্যান্য ক্ষতিকর গ্যাস নির্গমন নাটকীয়ভাবে কমে এসেছে। তবে কার্বন-ডাই অক্সাইড, যা কি না বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রধান ‘আসামি’, তা এখনো বড় সমস্যা হয়েই থেকে গেছে।


জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে ২০১২ সালে বিশ্বে রেকর্ড পরিমাণ তিন হাজার ৪৫০ কোটি মেট্রিক টন কার্বন-ডাই অক্সাইড নিঃসৃত হয়। এ ক্ষেত্রে মূল ‘অবদান’ কয়লার। সস্তা প্রাকৃতিক গ্যাসের কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কয়লার চাহিদা কিছুটা কমে এলেও অন্য সবখানে, বিশেষ করে চীনে এর চাহিদা বেড়েই চলেছে। আগামী দুই দশকে বিশ্বব্যাপী কয়েক কোটি মানুষ প্রথমবারের মতো বিদ্যুৎ পাবে। বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে এই বিদ্যুতের বড় অংশই আসবে কয়লাচালিত কেন্দ্র থেকে। বিকল্প জ্বালানি উৎসের সন্ধান এবং প্রকৃতি সংরক্ষণের সর্বাত্মক উদ্যোগ সত্ত্বেও কয়লাকে অন্তত এ মুহূর্তে সরানো যাবে বলে মনে করা হচ্ছে না।উত্তর মেরুর বরফ কতটা গলছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা কতটুকু বাড়ছে, তাপপ্রবাহ কতটা উষ্ণতর হচ্ছে আমাদের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের এসব বিষয়ের সবই নির্ভর করছে পৃথিবী, বিশেষ করে আমেরিকা ও চীন, কয়লা নিয়ে কী করছে তার ওপর।


আমরা কি কয়লা পুড়িয়েই যাবো এবং বাতাসে কার্বন ছড়াতেই থাকব? নাকি কার্বনকে মুঠোবন্দী করার একটা পথ বের করব এবং তাকে মাটিতে পুঁতে ফেলব, যেমনটি আমরা করেছি জীবাশ্ম জ্বালানির সালফার ও নাইট্রোজেনের বেলায়! কার্বন স্টোরেজ বিশেষজ্ঞ, স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির গবেষক স্যালি বেনসন বলেন, ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি খুঁজে পাওয়া কিংবা কয়লা থেকে কার্বন নিঃসরণ কমানো সহজ নয়। আমাদের অনেকগুলো ‘এবং’ প্রয়োজন, ‘অথবা’ নয়।’ কার্বন সমস্যা এতটাই বিশাল!


চলুন যাওয়া যাক, ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার নিউ হ্যাভেনে। সেখানে ওহাইয়ো নদীর ধারে রয়েছে আমেরিকার ইলেকট্রিক পাওয়ার কোম্পানি বিদ্যুৎ প্রকল্প। স্থানীয় আপালোসিয়ান পর্বতের নিচ থেকে তারা প্রতি ঘণ্টায় ১০ লাখ পাউন্ড কয়লা তুলছে। খনি থেকে সবে তোলা কয়লা বার্জ অথবা কনভেয়র বেল্টে চলে আসছে বিদ্যুৎকেন্দ্রে। গল্ফ বল আকৃতির কয়লার টুকরোগুলো এনে ফেলা হচ্ছে ভেতরে। চার দিকে ছড়িয়ে আছে কয়লার গুঁড়ো; মুখে মাখার পাউডারের মতোই মিহি। এরপর কয়লা ফেলা হচ্ছে একটি বয়লারের ফায়ারবক্সে। বিশ্বের বৃহত্তম বয়লারগুলোর একটি এটি।

ইস্পাতের তৈরি বয়লারটিতে আস্ত স্ট্যাচু অব লিবার্টিকে সহজেই ঢুকিয়ে দেয়া যাবে। এই কেন্দ্রে রয়েছে বাষ্পচালিত তিনটি টারবাইন। তাতে নীল রঙের ওপর সাদা তারকা আঁকা। এই টারবাইনগুলো আমেরিকার সাতটি অঙ্গরাজ্যের এক কোটি ৩০ লাখ গ্রাহককে সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ সরবরাহ দিয়ে যাচ্ছে। বিদ্যুতের মূল্য প্রতি কিলোওয়াট/ঘণ্টায় ১০ সেন্ট মাত্র। এ হিসেবে এক গ্রাহককে মাসে কমবেশি ১১৩ ডলারের মতো বিল পরিশোধ করতে হয়।


কিন্তু ওই বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে প্রতি বছর যে ৬০ থেকে ৭০ লাখ মেট্রিক টন কার্বন ছড়িয়ে পড়ছে বায়ুমণ্ডলে, তার ক্ষতিপূরণ বাবদ এক পয়সাও (স্টে) দিচ্ছে না কেউ না গ্রাহক, না বিদ্যুৎ কোম্পানি। ফলে লাগামহীনভাবে কার্বন নিঃসরণ ঘটে চলেছে সবখানে। এটা হতে পারছে কারণ এ বিষয়ে কোনো আইন নেই আমেরিকায়। তবে ২০০৯ সালে হুঁশ হয় মার্কিন আইন প্রণেতাদের। সেবার গ্রীষ্মে তারা এ বিষয়ে একটি বিল পাস করে। ধন্যবাদ দিতে হয় আমেরিকান ইলেকট্রিক পাওয়ার (এইপি) কোম্পানিকেও। আইনটি হওয়ার সাথে সাথে তারাও তৎপর হয়।


ওই বছর অক্টোবরেই মাউন্টেনিয়ার প্ল্যান্ট (আমরা এতক্ষণ যে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির কথা বলছিলাম) কার্বন ব্যবস্থাপনার এক যুগান্তকারী উদ্যোগ নেয়। এর দেখভালের দায়িত্বে থাকে প্লান্টের ম্যানেজার চার্লি পাওয়েল। পাওয়েলের বাবা ভার্জিনিয়ার একটি কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রে ৩০ বছর কাজ করেছেন। পাওয়েল নিজেও মাউন্টেনিয়ারেই তার কর্মজীবন প্রায় কাটিয়ে দিলেন বলে। কাজেই নতুন পরীক্ষাটি দেখভালের দায়িত্বটি তার কাঁধেই চাপে। পাওয়েল বলেন, ‘বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজটি সহজ। আমরা কয়লা পোড়াই। তা থেকে বাষ্প হয়। তাতে টারবাইন ঘোরে।’ কিন্তু নতুন পরীক্ষাটি খানিকটা জটিল।


নতুন পরীক্ষার অংশ হিসেবে বিদ্যুৎকেন্দ্রের পেছনে একটি কেমিক্যাল প্লান্ট বসানো হয়। এটা বিদ্যুৎকেন্দ্রের দেড় শতাংশ ধোঁয়াকে ঠাণ্ডা করে তাকে ঢুকিয়ে দেয় অ্যামেনিয়াম কার্বোনেট যৌগের ভেতরে। কার্ব-ডাই অক্সাইডকে হজম করে ফেলে এই যৌগ। এরপর কার্বন-ডাই অক্সাইডকে ব্যাপকভাবে সঙ্কুচিত করে প্রবেশ করিয়ে দেয়া হয়। ওহাইয়ো নদীর তীরে মাটির এক মাইলেরও বেশি নিচে ছিদ্রযুক্ত বেলে পাথরের স্তরে।


এই পদ্ধটি বেশ কাজে দেয়। এভাবে এইপি গত দুই বছরে ৩৭ হাজার মেট্রিক টনেরও বেশি বিশুদ্ধ কার্বন-ডাই অক্সাইড কব্জা ও জমা করতে সক্ষম হয়। এই কার্বন এখন মাটির নিচে; বায়ুমণ্ডলে নয়। এটা হলো নির্গত কার্বনের এক শতাংশের চার ভাগের এক ভাগ মাত্র। তবে সবে তো শুরু। এইপি এখন পরিকল্পনা করছে তাদের প্লান্ট থেকে নির্গত কার্বনের চার ভাগের এক ভাগকে কব্জা করে পুঁতে ফেলার, যার পরিমাণ বার্ষিক ১৫ লাখ টন। এ কাজে ৩৩ কোটি ৪০ লাখ ডলার বিনিয়োগ করতে রাজি হয়েছে কোম্পানিটি (এইপি)। তাদের সাথে থাকবে মার্কিন সরকারের জ্বালানি বিভাগ। তবে সমস্যা দেখা দিয়েছে এইপির অর্থ সংস্থান নিয়ে। মার্কিন সিনেটে জলবায়ু পরিবর্তন বিলটি আটকে যাওয়ায় রাজ্যের সংশ্লিষ্ট অধিকারিকরা কোম্পানিকে বলে দিয়েছে যেন এই প্রযুক্তির ব্যয় বাবদ গ্রাহকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা না হয়। কেননা প্রযুক্তিটিই এখনো আইনসিদ্ধ হয়নি।


এ অবস্থায় ২০১১ সালের বসন্তকালে প্রকল্পটি বন্ধ করে দেয় এইপি। অথচ ছোট হলেও কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে নির্গত কার্বন গ্যাসকে সরাসরি আটকানোর এটিই ছিল বিশ্বের প্রথম পদ্ধতি। চীন ও ভারতসহ বিশ্বের অনেক দেশের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল এ উদ্যোগ। অসংখ্য কৌতূহলী মানুষ প্রতিদিন এটি দেখতে আসত। পাওয়েল বলেন, পদ্ধতিটি ভালোই কাজ করছিল। আমরা অনেককে বিষয়টি শিখিয়েও দিয়েছিলাম। কাজটি আবার শুরু করতে একটি বড় ধরনের ধাক্কা দেয়া লাগবে। প্রেসিডেন্ট ওবামার গত গ্রীষ্মের অঙ্গীকারটি এ ক্ষেত্রে বিরাট অগ্রগতি। তবে পাশাপাশি চাই প্রযুক্তিগত সহায়তাও।


কার্বন-ডাই অক্সাইডকে কব্জা করা এবং তাকে মাটির নিচে ছিদ্রযুক্ত পাথুরে স্তরে পুঁতে ফেলার বিষয়টি এর সমালোচকদের কাছে ‘টেকনো-ফিক্স ফ্যান্টাসি’র প্রযুক্তির রূপকথার মতো শোনালেও এই প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষায় গত ৩০ বছরে সাড়ে ছয় শ’ কোটি ডলার ব্যয় করেছে মার্কিন পরিবেশ বিভাগ। এ ছাড়া দেশটির তেল শিল্পখাত চার দশকেরও বেশি সময় ধরে সঙ্কুচিত কার্বন-ডাই অক্সাইডকে শূন্য তেলক্ষেত্রে প্রবেশ করিয়ে সেখানে আটকে থাকা তেল বের করে আনার কাজে লাগাচ্ছে। কানাডার গ্রেট প্লেইনসে এই পদ্ধতিটি এখন ভূগর্ভস্থ কার্বন মজুদের অন্যতম বৃহৎ কার্যক্রমে পরিণত হয়েছে।


মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডাকোটার একটি প্লান্ট ২০০০ সাল থেকে এ পর্যন্ত দুই কোটি মেট্রিক টন কার্বন-ডাই অক্সাইড কব্জা করা হয়েছে, যা দিয়ে কয়লাকে কৃত্রিম প্রাকৃতিক গ্যাসে পরিণত করা হয়। পরে এই গ্যাস দুই শ’ মাইল দূরে এক এলাকায় সরবরাহ করা হয়।
এখানেই কানাডীয় কোম্পানি সিনোভাস এনার্জি দু’টি শূন্য তেলক্ষেত্র ওয়েবার্ন ও মিডেল ফিল্ডসের গভীরে কার্বন-ডাই অক্সাইড গ্যাস ঢুকিয়ে দেয়। প্রতিটন কার্বনের বিপরীতে তেলক্ষেত্রের পাথর থেকে মেলে দুই থেকে তিন ব্যারেল তেল। পরে কার্বন-ডাই অক্সাইড গ্যাসগুলো আবার সেখানে মুজদ করা হয়। ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় এক মাইল গভীরে, শিলা ও লবণের দুর্গম স্তরে, সেগুলো এখনো আছে।


কিন্তু কত দিন? কার্বন-ডাই অক্সাইডের অনেক মজুদ শত কোটি বছর ধরে মাটির নিচে পড়ে আছে। এর কিছু কিছু খনন করে তেল কোম্পানিগুলোর কাছে বিক্রিও করা হয়েছে। তবে এই গ্যাসের আকস্মিক ও বিরাট অবমুক্তি মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর জন্য প্রাণঘাতী হতে পারে, বিশেষ করে সেই গ্যাসের সংগ্রহ ও মজুদ যদি সীমাবদ্ধ পরিসরে হয়। ওয়েবার্ন তেলকূপের কার্বন মজুদটি আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার নজরদারিতে আছে। সেখানে এবং বিশ্বের অন্যত্রও যে দু-চারটি কার্বন মজুদ রয়েছে, তাতে বড় ধরনের কোনো ছিদ্র (লিক) এ পর্যন্ত দৃশ্যমান হয়নি। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এ ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা একেবারেই কম কিংবা নেই বললেই চলে।


তবে সব বিজ্ঞানী ‘কম’ মানলেও ‘নেই’ মানতে রাজি নন। স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির মার্ক জোব্যাক ও স্টিভেন গোরলিক এরকম দু’জন। তাদের যুক্তি হলো যেসব তেলক্ষেত্রের পাথর ভঙ্গুর ও ত্রুটিপূর্ণ সেখানে কার্বন-ডাই অক্সাইড ঢোকাতে থাকলে ছোট ভূমিকম্প হতে পারে। এই ভূমিকম্পে অন্য কোনো ক্ষতি না হলেও এতে তেলক্ষেত্রের পাথরে ফাটল ধরে কার্বন-ডাই অক্সাইড বেরিয়ে আসার পথ তৈরি হতে পারে। শুধু তাই নয়, জোব্যাক ও গোরলিকের মতে, ‘কার্বন মজুদের ব্যাপারটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ।’ অবশ্য এ দু’জনও একটি বিষয়ে একমত যে, কোথাও কোথাও বেশ কার্যকরভাবে কার্বন মজুদ করা সম্ভব হয়েছে। যেমন উত্তর সাগরের (নর্থ সি) স্লেইপনার গ্যাসক্ষেত্রে। সেখানে ১৭ বছর ধরে সমুদ্র তলদেশের আধা মাইল নিচে প্রতি বছর প্রায় ১০ লাখ মেট্রিক টন কার্বন ঢুকিয়ে আসছে নরওয়ের তেল কোম্পানি স্ট্যাটল। সেখানে জায়গাটা এত প্রশস্ত যে, বাইরে থেকে প্রবেশ করানো কার্বন গ্রাস সেখানে কোনো চাপ তৈরি করতে পারেনি এবং কোনো রকম ভূমিকম্পের কিংবা রন্ধ্রপথ তৈরির আশঙ্কাও দেখা যায়নি।


ইউরোপীয় গবেষকদের ধারণা, ইউরোপীয় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে আগামী এক শ’ বছর পর্যন্ত নির্গত কার্বন-ডাই অক্সাইড গ্যাস উত্তর সাগরের তলায় পুঁতে ফেলা যাবে। মার্কিন পরিবেশ বিভাগ মনে করছে, তাদেরও অনুরূপ ক্ষেত্র আছে, যেখানে এক হাজার বছর পর্যন্ত নির্গত কার্বন ডাম্প করা যাবে। আরো এক ধরনের শিলাখণ্ডকে কার্বন ধারণের জন্য সম্ভাবনাময় মনে করা হচ্ছে। আইসল্যান্ড ও ওয়াশিংটনের কলাম্বিয়া নদীর অববাহিকায় বর্তমানে তা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে।


দেখা গেছে, কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে নির্গত কার্বন-ডাই অক্সাইড গ্যাস কব্জা করাটা বিরাট খরচের ব্যাপার। সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রের উৎপাদিত বিদ্যুতের ৩০ শতাংশই এ কাজে ব্যয় হয়ে যায়। এ অবস্থায় গবেষকেরা নতুন একটি পদ্ধতি খুঁজে বের করেছেন। তারা বলছেন, কয়লাকে জ্বালানোর আগে গ্যাসে পরিণত করে নিলে খরচ কমবে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন যেমন কার্যকরভাবে হবে, তেমনি কার্বন আলাদা করা যাবে সস্তায় ও সহজে। এ পদ্ধতি মাথায় রেখে যুক্তরাষ্ট্রের মিসিসিপি অঙ্গরাজ্যের কেম্পের কাউন্টিতে নতুন একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কাজ এগিয়ে চলছে। সেখানে কয়লা জ্বালানোর আগে তাকে গ্যাসে পরিণত করা হবে।


বিদ্যমান বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো, যেখানে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গুঁড়ো কয়লা জ্বালানো হয়, সেগুলোর জন্যও বিকল্প ভাবা হয়েছে। এ রকম একটি ভাবনা হলো, বাতাসের পরিবর্তে বিশুদ্ধ অক্সিজেনে কয়লা জ্বালানো হোক। এতে উৎপন্ন হবে ফ্লু গ্যাস, যা থেকে কার্বন-ডাই অক্সাইডকে সহজে বের করে আনা যাবে। ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার ন্যাশনাল এনার্জি টেকনোলজি ল্যাবরেটরিতে এ বিষয়ে কাজ করে চলেছেন গবেষক জিও রিচার্ডস। তিনি বলেন, বাতাস থেকে বিশুদ্ধ অক্সিজেন আহরণ অনেক খরচের ব্যাপার। তাই অক্সিজেন ধরার কাজে কিছু ধাতব, যেমন লোহা, ব্যবহার করছি এবং যেখানে কয়লা জ্বালানো হচ্ছে সেখানে পাঠিয়ে দিচ্ছি। এই পদ্ধতি কার্বন আটকানোর ব্যয় বিপুলভাবে কমিয়ে দেবে।


রিচার্ডস তার জীবনের ২৫ বছরেরও বেশি সময় ব্যয় করে চলেছেন এই কাজে কার্বন আটকানোকে কিভাবে আরো কার্যকর ও ব্যয়সাশ্রয়ী করা যায়। তিনি বলেন, আমি সেই স্বল্প ক’জন লোকের একজন, যারা মৌলিক পদার্থবিজ্ঞানকে প্রযুক্তিতে রূপান্তরিত করতে চায়।
তবে কয়েক দশক ধরে রাজনীতিবদদের দেখে দেখে এবং ‘জলবায়ু পরিবর্তন আদৌ কোনো সমস্যা কিন্তু জাতীয় কুতর্ক শুনে শুনে মাঝে মাঝে রিচার্ডস ভাবতে বসেন, যে সমাধানটি খুঁজে বের করার জন্য তিনি প্রাণপাত করছেন, তা যদি পাওয়াও যায়, তাকে কি সত্যিই কখনো কাজে লাগানো হবে?


কঠিন প্রশ্ন। যুক্তরাষ্ট্রে কয়লা পোড়ানোকে কম দূষণযুক্ত করতে যখন কাজ হচ্ছে, তখন চীন তার বিশাল কয়লা মজুদ নিয়ে বসে আছে আর বলছে, বিদ্যুৎ চাই এবং কয়লা না পুড়িয়ে কিভাবে তা পাব? সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে, সস্তা জ্বালানি হিসেবে কয়লা জ্বলবে আর আমাদের বায়ুমণ্ডলে ছড়াবে আরো কার্বন। পরিবেশ হবে আরো দূষিত। তবে পাশাপাশি আশার দিক হলো, বিজ্ঞানী ও গবেষকেরাও বসে নেই। নিরন্তর কাজ করে চলেছেন তারাও। ময়লা (দূষণ)বিহীন কয়লা হয়তো সম্ভব নয়, কিন্তু ময়লা যতটা সাফ করা যায়, সেটাই তাদের চেষ্টা। তাদের সাফল্যের ওপর অনেকাংশে নির্ভর করছে মানবজাতির ভবিষ্যৎ।