কূটনৈতিক চাপে ভারত

Aug 09, 2017 07:23 pm
চীনের প্রভাব আরো বেড়ে যেতে পারে এমন শঙ্কার মধ্যে রয়েছে নয়াদিল্লি


আলফাজ আনাম

চীনের সাথে সীমান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে এখন বড় ধরনের কূটনৈতিক চাপে পড়েছে ভারত। চীন-ভুটান সীমান্তের ডোকলামে সামরিক উত্তেজনার মধ্যে ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে নিবিড় কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে বেইজিং। একই সাথে এসব দেশের সাথে ভারত যে আগ্রাসী নীতি গ্রহণ করেছে, তাও সামনে আনা হচ্ছে। ফলে ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলোতে চীনের প্রভাব আরো বেড়ে যেতে পারে এমন শঙ্কার মধ্যে রয়েছে নয়াদিল্লি।


ভারত ও ভুটানের মধ্যে ৭০ বছর ধরে ‘বিশেষ সম্পর্ক’ রয়েছে বলে নয়াদিল্লি দাবি করে থাকে। ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রথম বিদেশসফর শুরু করেছিলেন ভুটান থেকে। মৈত্রী চুক্তির আওতায় দেশটির নিরাপত্তার দায়িত্বও ভারতের বলে দাবি করা হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করে ভারতের পর্যবেক্ষকেরা মনে করছেন, দেশটি এখন ভারতের প্রভাববলয় থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে। ভুটানের ভূখণ্ডে অবস্থান করে ভারতের সৈন্যরা চীনের মুখোমুখি দাঁড়ালেও ভারতের পক্ষে সরাসরি কোনো অবস্থান নেয়নি ভুটান।

ভারত দাবি করে আসছে ভুটানের আমন্ত্রণে ও নিরাপত্তার স্বার্থে ভারতের সৈন্যরা অবস্থান করছে। কিন্তু ভুটান ভারতের পক্ষে অবস্থান না নিয়ে এ ব্যাপারে নীরবতা পালন করছে। অপর দিকে চীন বলছে, ভারতের সৈন্যরা ভুটানের ভূখণ্ড পেরিয়ে চীনের ভূখণ্ডে প্রবেশ করেছে।
এ দিকে ভুটানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতের বিরুদ্ধে তীব্র জনমত গড়ে উঠেছে। ভুটানের অনেক নাগরিক মনে করেন, দেশটির স্বাধীন ও সার্বভৌম অস্তিত্বের ক্ষেত্রে ভারত বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে চীনের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হচ্ছে ভুটানের নিরাপত্তার স্বার্থে নয়, চীনের ভূখণ্ডে ইচ্ছাকৃতভাবে ভারতের সৈন্যরা অবস্থান করছে।

দ্রুত এই সৈন্য সরিয়ে নেয়া না হলে যুদ্ধের হুমকিও দেয়া হয়েছে। ডোকালামে ভারতের কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ থাকা খুবই জরুরি। কারণ এর সাথে উত্তর-পূর্ব ভারতের নিরাপত্তার প্রশ্নটি জরুরি। এই সীমান্ত দিয়ে চীনা সৈন্যরা আসাম পর্যন্ত চলে আসতে পারে, যা ভারতের মূল ভূখণ্ডের সাথে সংযুক্ত শিলিগুড়ি করিডোরকে হুমকি মুখে ফেলতে পারে।


চীনের সাথে ভুটানের কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে অনানুষ্ঠানিকভাবে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে বেইজিং। ডোকলামে ভারতের সৈন্য সমাবেশের আগে ভারতে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূতের স্ত্রী থিম্পু গিয়ে ভুটানের রাজমাতার সঙ্গে দেখা করে এসেছেন। চীনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা ২০ বছর ধরে দিল্লিতে ভুটানের দূতাবাসে গিয়ে তাদের সঙ্গে দেখা করে থাকেন। চীনের এসব তৎপরতায় হিমালয়ের পার্বত্য দেশ ভুটানকে ঘিরে দুশ্চিন্তা বাড়ছে ভারতের। এর বাইরে পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও বাংলাদেশের সাথে চীনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ভারত শঙ্কার চোখে দেখে আসছে।

ভুটান পরিস্থিতি নিয়ে নয়াদিল্লিতে পাকিস্তান ও নেপালের রাষ্ট্রদূতের সাথে একাধিক বৈঠক করেছেন চীনা রাষ্ট্রদূত। ভারতের বিরোধী রাজনীতিকেরা অভিযোগ করছেন মোদি সরকার প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে। সিনিয়র কংগ্রেস নেতা, সাবেক এমপি ও কূটনীতিক মণিশঙ্কর আয়ার বিবিসিকে বলেন, ‘একটি প্রাণোচ্ছল গণতন্ত্র হিসেবে ভুটানের বিবর্তন হয়েছে খুব দ্রুত। ফলে তাকে আর আগের মতো শুধু একটি রাজতন্ত্রশাসিত দেশ হিসেবে দেখলে চলবে না, সেখানেও যে বিবিধ রাজনৈতিক মতামত জন্ম নিচ্ছে সেটাকেও স্বীকৃতি দিতে হবে। বন্ধু হিসেবে ভুটান যাতে দূরে সরে না যায় সে জন্য আমাদের কূটনীতিকে হতে হবে বহুমাত্রিক। আর আমাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে চাপিয়ে দেয়া চলবে না মোটেই, কারণ ভুটানেও অনেকেই সেটা পছন্দ করেন না।’


বেশ কিছু দিন থেকে ভুটানের পররাষ্ট্রনীতিতে স্বাধীন ভূমিকা গ্রহণের নীতি লক্ষ করা যাচ্ছে। চীনের বেল্ট ওয়ান রুটের বিকল্প হিসেবে দক্ষিণ এশিয়ার চার দেশ বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত ও নেপালের (বিবিআইএন) মধ্যে সড়ক যোগাযোগ স্থাপনের একটি উদ্যোগ নিয়েছিল ভারত। এসব দেশের মধ্যে মোটর ভেহিক্যাল এগ্রিমেন্টের ব্যাপারে দেশগুলো সম্মত হলেও ভুটান এ ধরনের চুক্তি করতে অস্বীকার করছে, যা ভারতের উপ-আঞ্চলিক সড়ক যোগাযোগ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার উদ্যোগকে ভেস্তে দিয়েছে।


এর মধ্যে নেপাল-ভারত সম্পর্কেও নতুন করে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। ভুটানের সঙ্গে যেমন ভারত ও চীনের সীমান্ত রয়েছে, তেমনই নেপালের সঙ্গেও ভারত ও চীনের সীমান্ত অন্তত দু’টি জায়গায় মিলেছে। এর মধ্যে ভারতের উত্তরাখণ্ড রাজ্যের সঙ্গে নেপালের পশ্চিমাংশের সীমানা যেখানে মিলছে, সেই লিপুলেখ এলাকাকে নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। নেপাল ও ভারত লিপুলেখকে নিজেদের এলাকা বলে দাবি করে। এই সীমান্ত দিয়ে ভারত ও চীনের মধ্যে পণ্য পরিবহনের চুক্তি রয়েছে।

এখন এই সীমান্তপথ নিয়ে নেপালের সাথে আলোচনার ইঙ্গিত দিয়েছে চীন। অর্থাৎ সীমান্তপথটিকে নেপালের ভূখণ্ড হিসেবে যদি চীন স্বীকার করে নেয়, তা হবে ভারতের জন্য কৌশলগত আরেকটি বিপর্যয়। এমন পরিস্থিতিতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ ১০ আগস্ট বিম্সটেক পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সম্মেলনে যোগ দিতে কাঠমান্ডু যাচ্ছেন। ধারণা করা হচ্ছে, কাঠমান্ডুতে প্রতিবেশী দেশগুলোতে চীনের প্রভাব কমিয়ে আনার জন্য তিনি প্রচেষ্টা চালাবেন। যদিও ভারত তাতে কতটা সফল হবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।


সুষমার সফরের পরেই নেপালে যাচ্ছেন চীনের উপপ্রধানমন্ত্রী ওয়াং ইয়াং। ১৪ আগস্ট কাঠমান্ডু পৌঁছে তিনি নেপালি নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। ইতোমধ্যে নেপাল চীনের বেল্টওয়ান সড়ক যোগাযোগ নেটওয়ার্কে সংযুক্ত হয়েছে। নেপালের অবকাঠামো নির্মাণে ভারতের চেয়ে চীনের বিনিয়োগ এখন বেশি। নেপালে একটি ভারতপন্থী সরকার ক্ষমতায় থাকার পরও চীনের কূটনৈতিক তৎপরতা ভারতকে দারুণভাবে শঙ্কিত করে তুলেছে।


শুধু নেপাল বা ভুটান নয় শ্রীলঙ্কাতেও ভারতের প্রভাব কমে আসছে। গত সপ্তাহে ভারত মহাসাগরে শ্রীলঙ্কার কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ হাম্বানতোতা সমুদ্রবন্দরের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে চীনের একটি কোম্পানি। এই বন্দরটি চীনের আর্থিক সহযোগিতায় শ্রলঙ্কার রাজাপক্ষে সরকারের সময় নির্মাণ করা হয়। ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই বন্দরটি পরিচালনার দায়িত্ব থেকে চীনকে দূরে রাখার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে। চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর নিয়ে ভারতের বিরূপ মনোভাবের মধ্যে চীন এখন নেপাল ভুটান ও শ্রীলঙ্কার সাথে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করার উদ্যোগ নিয়েছে।

ভারতের সাথে ছোট প্রতিবেশী দেশগুলোর বিরোধপূর্ণ ইস্যুতে চীন যে এসব দেশের পাশে দাঁড়াবে তার ইঙ্গিতও এখন স্পষ্ট। ভারতের অনেক বিশ্লেষক মনে করেন চীন এখন প্রতিবেশী দেশগুলো দিয়ে ভারতের ওপর চাপ সৃষ্টির কৌশল নিয়েছে। এত দিন এসব দেশ ভারতের প্রভাববলয়ের মধ্যে থাকলেও তার দিন মনে হয় শেষ হয়ে আসছে। প্রতিবেশী ছোট দেশগুলোর সাথে সমমর্যাদার সম্পর্ক গড়ে তুলতে না পারলে এসব দেশ থেকেও ভারত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে।