ডিভাইড অ্যান্ড রুল পলিসির শিকার সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর

Aug 10, 2017 05:34 pm
মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর

 

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু

রোমানরা খ্রিস্টপূর্ব ৫৫ সালে ব্রিটেন জয় করার পর ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ পলিসি প্রয়োগ করে দেশটির ওপর দীর্ঘ ৪০০ বছর ধরে শাসন পরিচালনা করেছিল। কিন্তু রোমান যাঁতাকলে পিষ্ট ব্রিটিশরা ক্রমে সাহসী হয়ে তাদের ঔপনিবেশিক প্রভুর বিরুদ্ধে লড়াই করে এবং এক পর্যায়ে বিদেশী শাসন মুক্ত করতে সক্ষম হয় নিজেদেরকে। ব্রিটেন থেকে রোমের পতনে ভূমিকা পালন করেছিল কার্থেজ, হুন, উত্তর আফ্রিকান ও মধ্য এশীয়রা। যারা ব্রিটিশের মতোই রোমান সাম্রাজ্যের গোলামি থেকে মুক্তি পেতে উদগ্রীব ছিল।

ব্রিটেনকে দীর্ঘ চার শতাব্দী ধরে দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে রাখার ক্ষেত্রে গ্রিক দার্শনিক সিসেরোর অবদান ছিল যথেষ্ট। সিসেরো বলেছেন, ‘বীভৎস, কদর্য শ্বেতাঙ্গরা দাসত্বের জন্যই যথোপযুক্ত।’ রোমানরা এতে উদ্বুদ্ধ হয়েছিল এবং ব্রিটেনে নিজেদের অধিকার পাকাপোক্ত করতে সেখানে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করেছিল এবং উন্নত সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিল। এ সবই সম্ভব হয়েছিল তাদের ‘বিভেদ সৃষ্টি করে শাসন করার’ নীতি বাস্তবায়নের ফলে। বহু শতাব্দী পর ব্রিটিশ রাজশক্তি ভারত দখল করে তাদের সাবেক প্রভুর শেখানো নীতিকে সফলভাবে প্রয়োগ করেছিল ধর্ম ও কুসংস্কারে বহুধাবিভক্ত ভারতীয়দের ওপর।


১৮৫৭ সালে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ শুধু ভারতে নয়, সমগ্র বিশ্বেও সবচেয়ে ক্ষমতার অধিকারী একটি পরাশক্তি ছিল। সে জন্য দখলকৃত রাষ্ট্রে পরাভূত জনগোষ্ঠীর ওপর তাদের আদেশ, আইন ও সভ্যতা চাপিয়ে দেয়াকে অন্যায় বলে ভাবেনি। কিন্তু এসবের বিরুদ্ধে যখন প্রতিরোধ গড়ে উঠতে থাকে, তখন তাদের বোধ জাগে যে, তাদের নীতি ও কার্যকলাপ অন্যের ক্ষেত্রে যথার্থ নয়, বরং নিপীড়ন ও শোষণের নামান্তর। ১৮৫৭ সাল ছিল ব্রিটিশ শোষণ-নিপীড়ন থেকে মুক্ত হয়ে দেশবাসীর জীবন ও বিশ্বাসকে রক্ষা করার লক্ষ্যে পরিচালিত সশস্ত্র সংগ্রাম সূচনার সময়, যাকে যথার্থই ব্রিটিশের বিরুদ্ধে ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম হিসেবে বিবেচনা করা হয়।


এখন থেকে ১৫০ বছর আগে ১৮৫৭ সালের ১১ মে মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর ফজর নামাজ শেষে লাঠিতে ভর দিয়ে পায়চারি করার সময় লক্ষ করেন যমুনার ওপারে ধূলির কুন্ডলি। খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ৩০০ অশ্বারোহী মিরাট থেকে দিল্লিতে চলে এসেছে সেখানে ব্রিটিশ অফিসারদের বিরুদ্ধে বন্দুক উঁচিয়ে। তাদের আগমনের উদ্দেশ্য বাদশাহকে তাদের নেতৃত্ব গ্রহণের জন্য সম্মত করানো। তাদের বক্তব্য অত্যন্ত সহজ, ‘ইংলিশরা এ দেশের সব ধর্ম উৎখাত করতে এসেছে... যেহেতু তারা হিন্দু, মুসলিম উভয়ের শত্রু সে জন্য তারা ঐক্যবদ্ধ হয়েছে ব্রিটিশদের হত্যা করে এ দেশবাসীর জীবন ও বিশ্বাস রক্ষা করতে।’


১৮৫৭ সালে ভাতজুড়ে বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ার বহু আগে থেকেই ব্রিটিশ বাহিনীতে দেশীয় সৈন্য ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্রিটিশবিরোধী ক্ষোভ দানা বাঁধতে শুরু করেছিল। ক্ষোভ কী পর্যায়ে উপনীত হলে শুধু বেঙ্গল আর্মির মোট ১ লাখ ৩৯ হাজার সিপাহির মধ্যে ৭ হাজার ৭৯৬ জন ছাড়া সবাই বিদ্রোহে যোগ দেয় তা সহজে অনুমেয়।


বিশ্বজুড়ে ঔপনিবেশিক শাসকদের কৃত অপরাধের ব্যাপারে যে আলোচনা ও পর্যালোচনা হচ্ছে তার পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমান প্রজন্মের ব্রিটিশরা লজ্জার সাথে স্বীকার করবে যে, তাদের পূর্বপুরুষরা কী ধরনের প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশকে তাদের উপনিবেশে পরিণত করেছিল। সপ্তদশ শতাব্দীতে মোগল শাসকদের কাছ থেকে বাণিজ্যসুবিধা লাভের জন্য যাদেরকে ধরণা দিতে হয়েছে, তারা সে সুযোগ লাভ করার পর ফণা বিস্তার করতে শুরু করে এবং বিভিন্ন রাজ্যের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নাক গলাতে থাকে ও নানা ফন্দিফিকির, চক্রান্তের আশ্রয় নিয়ে দেশটির প্রভু বনে যায় এবং মুসলিম রাজশক্তিকে দাসত্বের পর্যায়ে নামিয়ে আনে।

এটি সম্ভব হয় অষ্টাদশ শতাব্দীতে ব্রিটেনে রক্ষণশীল দল ক্ষমতায় আসার পর ভারতের সাথে শুধু বাণিজ্যিক সম্পর্ক রাখার নীতি পরিবর্তনের ফলে। ডিউক অব ওয়েলিংটনের ভাই লর্ড ওয়েলেসলি ভারতের গভর্নর জেনারেল হিসেবে নিয়োগ লাভ করে ১৭৯৮ থেকে ১৮০৫ সাল পর্যন্ত। তার দায়িত্ব পালনকালে ভারত থেকে মুসলিম রাজশক্তিকে সমূলে উৎখাত করার ব্রিটিশ লক্ষ্য কার্যকর করতে গ্রহণ করেন ‘ফরোয়ার্ড পলিসি’, যাতে মুসলমানরা ব্রিটেনের ক্রমশ বিশ্বশক্তিতে পরিণত হওয়ার পথে কোনো বাধা হয়ে না দাঁড়ায়।


কিন্তু ওয়েলেসলির ‘ফরোয়ার্ড পলিসি’ শিগগিরই খ্রিস্টবাদের আশীর্বাদপুষ্ট হয়। ব্রিটিশ রক্ষণশীলরা ভারতে শুধু তাদের নিজস্ব আইনই নয়, বরং তাদের মূল্যবোধ, বিশ্বাস ও আদর্শ চাপিয়ে দিতে চেষ্টা চালায়। খ্রিস্ট আইনের সাথে সঙ্ঘাতপূর্ণ ভারতীয় আইনগুলো একে একে বাতিল করা হতে থাকে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একজন পারিচালক চার্লস গ্রান্ট এমনকি এ কথা পর্যন্ত লিখেন, ‘আমাদের শুধু এ উপসংহারে পৌঁছাই যথেষ্ট হবে না যে, আমাদেরকে শুধু মুনাফা অর্জনের জন্যই এশীয় ভূখ দেয়া হয়েছে, এখানকার অধিবাসীরা, যারা দীর্ঘকাল ধরে নানা কুসংস্কার ও অন্ধ ধারণায় আচ্ছন্ন তাদের মাঝে বিশ্বাসের আলো জ্বালানোও আমাদের কাজ।’


ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ একের পর এক মুসলিম রাজ্যগুলোকে তাদের সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করছিল। ১৮৫৬ সালে তারা অযোধ্যা আক্রমণ করে ও দখল করে নেয়। এ জন্য তারা ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিল লন্ডনে তাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অযোধ্যার মুসলিম শাসকগোষ্ঠী সম্পর্কে সম্পূর্ণ মনগড়া, অতিরঞ্জিত কাহিনী ফেঁদে। পরে ব্রিটিশের পক্ষে অযোধ্যা আক্রমণে অংশগ্রহণকারী অফিসার ব্রিটিশ পার্লামেন্টে সাক্ষ্য দেন যে, অযোধ্যা সম্পর্কে বর্ণিত কাহিনী ছিল কাল্পনিক এবং তা করা হয়েছিল আক্রমণের যৌক্তিকতা প্রমাণ করার জন্য। এই অফিসার, যার নাম ছিল রবার্ট বার্ড তিনি আরো উল্লেখ করেন, ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি শুধু ভূমিকর আদায়ের উদ্দেশ্যেই অযোধ্যাকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সাথে সংযুক্ত করেনি বরং তারা এ রাজ্যটিকে বিবেচনা করেছে সদ্য আবিষ্কৃত জনহীন দ্বীপের মতো, যা নিজেদের ইচ্ছামাফিক ব্যবহার করার অধিকার তারা অর্জন করেছে।’


দেশীয় রাজ্যগুলোকে কোম্পানি কর্তৃক লাভজনকভাবে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়েছিল আরো আগে থেকেই। গভর্নর জেনারেল লর্ড ড্যালহৌসির (১৮১২-১৮৬০) সময় থেকে। তিনি তার ‘ডকট্রিন অব লেপস’ নীতি কাজে লাগিয়ে পিতার সিংহাসনে দত্তক নেয়া পুত্রের আরোহণ করার বহু বর্ষ ধরে আচরিত হিন্দু রীতিকে রহিত করে ১৮৪৮ সালে সাতারা, ১৮৫৩ সালে ঝাঁশি এবং ১৮৫৪ সালে নাগপুর সংযুক্ত করেন। এর ফলে কোম্পানির বিরুদ্ধে ক্ষোভ ক্রমেই বেড়ে চলেছিল।


১৮৫৭ সালে বিদ্রোহের প্রথম বিস্ফোরণে সিপাহিদের হাতে দিল্লিতে ব্রিটিশ নারী-পুরুষ ও শিশু নিহত হয়। এটি শতবর্ষব্যাপী শ্বেতাঙ্গদের নিপীড়ন ও শোষণের অনিবার্য বহিঃপ্রকাশ ছিল বলা চলে। কিন্তু মাত্র চার মাসের ব্যবধানে দিল্লি পুনর্দখল করে ব্রিটিশরা বেসামরিক লোকদের ওপর যে হত্যালীলা চালিয়েছিল তা তাদের উন্নত ও সভ্য জাতি হিসেবে যে অহঙ্কার তা ম্লান করেছে। তদুপরি দিল্লিবাসী কখনোই বিদ্রোহীদের আন্তরিকভাবে সমর্থন করেনি।


সিপাহি বিদ্রোহ বা ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে এ বিষয়গুলো সামনে নিয়ে এসেছেন উইলিয়াম ড্যালরিম্পেল তার ‘দি লাস্ট মোগল : দি ফল অব এ ডাইন্যাস্টি, দিল্লি, ১৮৫৭’ গ্রন্থে। দীর্ঘ চার বছর ধরে গবেষণা চালিয়ে সিপাহি বিদ্রোহের এমন সব খুঁটিনাটি তথ্যের সমাহার ঘটিয়েছেন, যার ফলে সেই দুর্ভাগ্যজনক চারটি মাস এবং পরে বাহাদুর শাহ জাফরের বিচার পর্যন্ত ঘটনাবলি পাঠকের সামনে জীবন্তভাবে উপস্থিত হয়েছে। ড্যালরিম্পেল একটি বিয়োগান্ত ঘটনাকে তার স্বভাবসুলভ বর্ণনারীতি, সাহিত্যিক সৃজনশীলতা ও পাি ত্য দিয়ে উপস্থাপন করায় পাঠক স্বয়ং তার কাহিনীর পাত্রে পরিণত হয়েছেন।


তিনি সম্ভবত প্রথমবারের মতো তুলে ধরেছেন যে দিল্লির পতনের পর ব্রিটিশ সৈন্যরা কী নৃশংসতা ও হিংস্রতায় প্রতিশোধ নিয়েছে এবং দিল্লিতে লুণ্ঠন চালিয়েছে। বিদ্রোহের সূচনায় দিল্লিতে বসবাসরত ব্রিটিশ মহিলারা ধর্ষিত হয়েছিল বলে দীর্ঘকাল ধরে যে অপবাদ দেশীয় সিপাহিদের ওপর আরোপ করা হচ্ছিল, ড্যালরিম্পেল ঐতিহাসিক প্রমাণ দিয়ে তা খ ন করেন। সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর নগরীর ব্রিটিশ নারী, পুরুষ ও শিশুদের প্রাসাদে আশ্রয় দিয়ে বিদ্রোহীদের হুমকির মাঝেও তাদের হত্যা করার উদ্দেশ্যে বিদ্রোহীদের হাতে তুলে দিতে অস্বীকার করেন। কারণ ইসলামের বিধান অনুসারে ঠান্ডা মাথায় কোনো মানুষকে হত্যা করা সমগ্র মানবতাকে হত্যা করার শামিল। যুদ্ধ চলাকালেও ইসলামে সাধারণ মানুষের জীবন ও সম্পত্তি রক্ষা করার নির্দেশ রয়েছে, এমনকি পানির উৎস, ফসলের মাঠ, খাদ্যশস্য ধ্বংস করাও ইসলামে নিষেধ করা হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাদশাহ জাফর তার আশ্রিতদের রক্ষা করতে পারেননি। দিল্লি পতনের পর তার বিরুদ্ধে ব্রিটিশরা প্রহসনের বিচার করে এই হত্যাকাে র জন্য তাকে দোষী সাব্যস্ত করেছিল।


বাহাদুর শাহ জাফর হয়তো ইসলামের ইতিহাস থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন যে, মহান সালাহউদ্দিন খ্রিস্টান ক্রুসেডারদের পরাজিত করে জেরুসালেম পুনর্দখল করার যুদ্ধে ও নগরী দখল করার পরও সাধারণ খ্রিস্টান, এমনকি ক্রুসেডারদের পর্যন্ত কোনো ক্ষতি না করে তাদেরকে নিরাপদে নগরী থেকে বের হয়ে যাওয়া নিশ্চিত করেছিলেন। অথচ জেরুসালেম যখন ক্রুসেডারদের হাতে পড়েছিল তখন মুসলমানদের রক্তে নগরীর রাস্তা প্লাবিত হয়েছিল। দিল্লি দখল করে ব্রিটিশ বাহিনী দিল্লিবাসীর ওপর অনুরূপ হত্যালীলাই চালিয়েছিল।


স্কটল্যান্ডে এক গ্রামে জন্মগ্রহণকারী ড্যালরিম্পেল তার ১৮ বছর বয়সের আগে কখনো নিজ এলাকার বাইরে কোথাও যাওয়ার সুযোগ পাননি। আর যখন সে সুযোগ পেলেন তখন অন্যতম সেরা একজন ভ্রমণকাহিনী লেখক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করে ফেলেন। তার প্রথম গন্তব্য ছিল ভারত এবং দ্রুত ভারতের প্রেমে পড়ে যান তিনি। ভারত সফরের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি লিখেন ‘সিটি অব জিনস, দি এজ অব কালি, হোয়াইট মোগলস, ফ্রম দি হোলি মাউন্টেন। কিন্তু ভ্রমণের নেশা তাকে সাধারণ পর্যটকের চোখে দেখে সাধ মেটানোর কৌতূহলের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে পারেনি বলেই তার পক্ষে ইতিহাসবিদদের চোখ এড়িয়ে যাওয়া কিংবা ইতিহাসে স্থান না পাওয়ার মতো বিবেচিত উপকরণগুলোকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে তার গ্রন্থে স্থান দিয়েছেন।এ ক্ষেত্রে তিনি ইতিহাসবিদদের চেয়েও অনেক বেশি অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছেন। তার বর্ণনাভঙ্গি ও ভাষার সাবলীলতা ইতিহাসের মতো বিষয়কেও সাহিত্যমানে উত্তীর্ণ করেছে এবং তিনি নন্দিত হয়েছেন।


লালকেল্লা পরিদর্শনে গিয়ে ড্যালরিম্পেল বিষাদগ্রস্ত হয়ে পড়েন। ১৮৫৭ সালে ব্রিটিশ সৈন্যরা লালকেল্লা পুনর্দখল করে জাঁকজমকপূর্ণ হারেম ভবনগুলো ভেঙে ফেলে তৈরি করে ব্যারাকের সারি। স্থাপত্যকর্মবিশারদ এক ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ জেমস ফার্গুসন দুঃখ করে বলেছেন, ‘মোগল প্রাসাদগুলো ধ্বংস করা ছিল অপ্রয়োজনীয় নাশকতা।’ ড্যালরিম্পেল ঐতিহাসিক বিষয়ের পরিমাণ ও নিদর্শনের বিপুলতার দিক থেকে দিল্লিকে তুলনা করেছেন রোম, কায়রো ও ইস্তাম্বুলের সাথে। ক্ষয়ে ক্ষয়ে পড়ছে, এমন সৌধ, প্রাচীন মসজিদ বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ধ্বংসাবশেষ এমন সব জায়গায় দেখা যায়, যা সেখানে থাকতে পারে বলে ধারণাও করা যায় না। রাস্তার কোনো মোড়ে, পৌর উদ্যানে অথবা গলফ কোর্টসের জঙ্গলের মাঝে সহসাই চোখে পড়বে এমন নিদর্শন এবং দিল্লিজুড়ে এত নিদর্শন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে, যা কোনো ইতিহাসবিদকে বহু রূপে বহুকাল ধরে ব্যস্ত রাখতে পারে।


অষ্টাদশ শতাব্দীজুড়ে দিল্লি ক্ষয়িষ্ণুতার চরমে উপনীত হয়েছিল। নগরীর যেকোনো দিকে মাইলের পর মাইলব্যাপী ৬০০ বছরের প্রাচীন সৌধ ও অট্টালিকার সারি এসব এমন এক কালের নিদর্শন যখন দিল্লি ছিল কনস্টান্টিনোপল ও ক্যান্টনের মধ্যবর্তী অবস্থানে বৃহত্তম নগরী। হাম্মামখানা, উদ্যান প্রাসাদ, সহস্র স্তম্ভের মিলনায়তন, সুবিশাল গম্বুজ, মুসল্লিশূন্য মসজিদ, পরিত্যক্ত সুফি দরগাহ মনে হবে কোনো যুগের ধ্বংসাবশেষের শেষ নেই। ১৭৯৫ সালে লেফটেন্যান্ট উইলিয়াম ফ্রাংকলিন লিখেছেন, ‘যত দূর চোখ যায়, দেখা যাবে উদ্যান, অট্টালিকা, মসজিদ ও কবরস্থানের ধ্বংসাবশেষ, যা থেকে দিল্লির সমৃদ্ধি সম্পর্কে ধারণা করা যায়। নগরীর এক কালের পরিবেশ ছিল মনোরম, সেই বিখ্যাত নগরীকে এখন অবয়বহীন ধ্বংসস্তূপ ছাড়া আর কিছু মনে হবে না।’


ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অফিসাররা, বিশেষ করে দিল্লিতে তাদের প্রথম দিকে ধ্বংসাবশেষের মাঝেই তাদের বসবাসের জায়গা করে নেন। তখন অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ ভাগ। কিছু অফিসার ছিলেন সহানুভূতিশীল ও ভাববাদী ধরনের, যারা মোগল দরবারে আচরিত রীতিরেওয়াজে অভিভূত ও আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। ডেভিড অক্টারলোনি নামে একজন রেসিডেন্ট ভারতীয় পোশাক পরতে শুরু করেন, গালিচার ওপর বসে তাকিয়ায় হেলান দিয়ে থাকেন এবং নল দিয়ে হুক্কা টানতে শুরু করেন। তার এক পাশে বড় একটি হাতপাখা নিয়ে দাঁড়াত এত ভৃত্য, আরেক পাশে হুক্কা নিয়ে অপেক্ষা করত হুক্কা বরদার। এ ব্যাপারে অক্টারলোনি একা ছিলেন না। তার অনেক সহকর্মীও মোগল আদবকায়দা রফত করে ফেলেছিলেন। ভারতে ব্রিটিশ কমান্ডার-ইন-চিফের স্ত্রী মারিয়া নাজেন্ট দিল্লি সফরে এসে শ্বেতাঙ্গ অফিসারদের এহেন কর্মকাে শঙ্কা প্রকাশ করেন। তিনি লিখেন, “ব্রিটিশ রেসিডেন্ট ও তার সহকর্মীরা সবাই ‘নেটিভ’ হয়ে গেছেন। ... এ ছাড়া মেসার্স গার্ডনার ও ফ্রেজার দীর্ঘ দাড়ি-গোঁফ রেখেছেন। তারা গরু বা শূকরের গোশত ভক্ষণ করেন না এবং তারা যতটা খ্রিস্টান ঠিক ততটাই হিন্দু।”
‘দি লাস্ট মোগল’ দিল্লি নগরী থেকে ড্যালরিম্পেলের অনুপ্রেরণা ও কৌতূহলের ফসল।

এ গ্রন্থটির মূল বিষয় একটি প্রশ্নকে কেন্দ্র করে আবর্তিত যে, ভারতীয় ও ব্রিটিশদের মধ্যে বিরাজিত সহজ সম্পর্ক যা ফ্রেজারের সময়ে অত্যন্ত স্পষ্ট ও চোখে পড়ার মতো ছিল, তা ঊনবিংশ শতাব্দীতে ব্রিটিশদের অধীনে কেন বর্ণবাদে রূপ নিলো? উইলিয়াম ড্যালরিম্পেল মনে করেন দেশীয় ও ব্রিটিশদের সচ্ছন্দ সহাবস্থানের পরিপন্থী হিসেবে কাজ করেছে দু’টি বিষয়। প্রথমত, ব্রিটিশ শক্তির উত্থান কারণ তারা স্বল্প সময়ের মধ্যে ভারতে ফরাসিদের পরাজিত করেছিল এবং সব প্রধান ভারতীয় প্রতিপক্ষও নতি স্বীকারে বাধ্য হয়েছিল। শক্তির পরিবর্তিত ভারসাম্য অতি দ্রুত ছদ্মাবরণে সাম্রাজ্যবাদী ঔদ্ধত্যের পর্যায়ে উপনীত করেছিল।


দ্বিতীয়ত, উগ্র খ্রিস্টবাদের উত্থান এবং এর ফলে ব্রিটিশ দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মচারীদের উইলে দেখা যায় যে, ভারতীয় মহিলাদের স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করে স্থায়ীভাবে তাদের সাথে বসবাসের রীতি অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ ভাগ পর্যন্ত থাকলেও ঊনবিংশ শতাব্দীতে তা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।


১৮৫০-এর দশক থেকেই বহু ব্রিটিশ অফিসার মোগল দরবারের বিলুপ্তির পরিকল্পনা আঁটছিলেন এবং ভারতবাসীর ওপর খ্রিস্টধর্ম চাপিয়ে দেয়ার পাঁয়তারা করছিলেন। এই কা জ্ঞানহীনতা চরমে ওঠে ১৮৫৭ সালে মহীরুহে পরিণত হয়। সেসবের বিচারে সিপাহি বিদ্রোহ ছিল ব্রিটিশদের দ্বারা সৃষ্ট এবং জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে তা জনপ্রিয় সশস্ত্র সংগ্রামে রূপ নিয়েছিল। এ সংগ্রামের প্রকৃতি ও পরিণতি দু’টিই নির্ধারিত হয়েছে স্থানীয় লোকদের দ্বারা এবং স্থানীয় পরিস্থিতি, আবেগ ও অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতেই এসব পরিচালিত হয়েছে।
বিখ্যাত মোগল রাজধানী যখন সাংস্কৃতিক বিকাশের উল্লেখযোগ্য একটি পর্যায়ে উপনীত, তখনই সে নগরীটি পরিণত হলো যুদ্ধক্ষেত্রে। বিদ্রোহীদের সমর্থন বা হস্তক্ষেপ করার মতো অবস্থায় কোনো বিদেশী সেনাবাহিনী ছিল না এবং বিদ্রোহীদের গোলাবারুদ ছিল সামান্য, কোনো অর্থ ও রসদের সরবরাহ ছিল না।

নগরীর বাইরে যে বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্যের সৃষ্টি করেছিল তা নগরী অবরোধের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে। দিল্লি অবরোধ ব্রিটিশের জন্য ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে স্টালিনগ্রাদ অবরোধের মতো। দু’টি শক্তির জন্যই জীবন-মরণের লড়াই। কারো পিছু হটার উপায় নেই। নিহতের সংখ্যা অকল্পনীয় এবং উভয় পক্ষে সৈন্যরা শারীরিক ও মানসিক সহ্যশক্তির চরম এক পর্যায়ে উন্নীত। শেষ পর্যন্ত ১৮৫৭ সালের ৪ সেপ্টেম্বর ব্রিটিশ বাহিনী তড়িঘড়ি করে সংগৃহীত শিখ ও পাঠানদের মিলিত বাহিনীর সাহায্যে দিল্লির ওপর হামলা চালিয়ে নগরী দখল, ধ্বংস, লুণ্ঠন ও নগরবাসীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশকে হত্যা করে। যারা কোনো মতে জীবন রক্ষা করতে পেরেছিল তাদেরকে নগরী থেকে বিতাড়ন করা হলো। মোগল রাজপরিবার শান্তিপূর্ণভাবে আত্মসমর্পণ করলেও ১৬ জন রাজপুত্রকে নামেমাত্র বিচার করে হত্যা করা হয়। তিনজনকে ঠা া মাথায় গুলি করে হত্যা করা হয়।


শেষ মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরকে বন্দী করে তারই প্রাসাদের ছোট্ট একটি কক্ষে আটকে রাখা হয় এবং তিনি ব্রিটিশদের দর্শনীয় বস্তুতে পরিণত হন। তাকে পুরনো প্রাসাদের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে বিচারের মুখোমুখি করা হয় এবং শাস্তি দেয়া হয় নির্বাসনের। তার নির্বাসনস্থল রেঙ্গুনের উদ্দেশে দিল্লি ছেড়ে যাওয়ার সাথে সাথে ভারতে ৭০০ বছরের মুসলিম শাসনের ইতিহাসের ওপর সিলমোহর পড়ে। বাহাদুর শাহ জাফর ক্ষমতাহীন নামেমাত্র শাসক হিসেবে টিকে থাকলেও তিনি ছিলেন ‘খলিফা’ অর্থাৎ পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধি। দিল্লিবাসী কখনো কসম কাটলে নিজ নিজ ধর্মের বাণীর সাহায্য নেয়ার পরিবর্তে ‘সম্রাটের সিংহাসনের’ নামে কসম কাটত। দেশীয়রা দিল্লির বাদশাহকে প্রভু বিবেচনা করত, আর বিদেশীরাও এমনকি ব্রিটিশ গভর্নর জেনারেল পর্যন্ত তাকে কুর্নিশ করত। অতএব তার নির্বাসন এ দেশবাসীর জন্যও বড় ধরনের শাস্তি ছিল।


ড্যালরিম্পেল সিপাহি বিদ্রোহে ব্রিটিশ বাড়াবাড়িকে তুলে ধরেছেন দলিল-প্রমাণের ভিত্তিতে। তখনকার ব্রিটিশ রাজনীতিবিদ ও নীতিনির্ধাকরা সিপাহি বিদ্রোহের পেছনে মুসলিম উগ্রবাদের অনুসন্ধান করেছেন। কিন্তু প্রকৃত সত্য ছিল, বিদ্রোহে অংশগ্রহণকারী অধিকাংশ দেশীয় সিপাহিই ছিল হিন্দু। অত্যাচারী ইংরেজদের বিতাড়নে তারা মুসলিম নেতৃত্ব গ্রহণ করে মুসলমানদের পাশাপাশি অভিন্ন শত্রুর বিরুদ্ধে লড়তে দ্বিধা করেনি। ব্রিটিশ রাজনীতিবিদরা একবারও বিচার-বিশ্লেষণ করে দেখার প্রয়োজন অনুভব করেননি যে, তাদের গৃহীত বৈদেশিক নীতির পরিণতি ছিল সঙ্ঘাত ও রক্তপাত। পাশ্চাত্য সশস্ত্র সঙ্ঘাত প্রতিরোধ করতে এখনো ভিন্ন দেশে হামলা চালিয়ে ও দেশ দখল করে নিজেদের পক্ষে যুক্তি প্রদর্শন করে। আর যারা নিজ দেশকে বিদেশী স্বার্থের ঘাঁটি হিসেবে দেখতে চায় না, তাদেরকে হত্যা করে এবং সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করে।


১৮৫৭ সালের শিক্ষা পরিষ্কার। কেউ চায় না যে ভিন্ন বাবাদর্শের কেউ তাদের ওপর হামলা চালাক। বন্দুকের ভয় দেখিয়ে দেশ দখল করা যেতে পারে, কিন্তু দখলকৃত দেশের জনগোষ্ঠীর ওপর বিজয়ী শক্তির ভাবাদর্শ চাপিয়ে দেয়া যায় না। ১৯৫৭ সালের বিদ্রোহ ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষকে এ শিক্ষা নিতে বাধ্য করেছিল, সে শিক্ষা থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল শিক্ষা নিতে পারত। কিন্তু তারা সে শিক্ষা না নিয়ে তাদের আগ্রাসী তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের গৃহীত নীতি পুরনো একটি প্রবাদভিত্তিক, ‘তুমি আমার পক্ষে না থাকলে ধরে নেয়া হবে যে তুমি আমার বিরুদ্ধে।’ পাশ্চাত্যের কূটনীতি দ্বৈত রূপ লাভ করেছে প্রোপাগান্ডা ও সরাসরি আঘাত, যা যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ইরাক ও আফগানিস্তানে হামলার ক্ষেত্রে অনুসৃত হয়েছে। যেখানে জনগণ স্বৈরাচারী শাসকের হাত থেকে নিস্তার পেতে চায়, যুক্তরাষ্ট্রসহ পাশ্চাত্য সেখানে স্বৈরতন্ত্রকে মদদ দেয়। শাসক যখন পাশ্চাত্যের স্বার্থ দেখতে অস্বীকৃতি জানায় তখন পাশ্চাত্য তাকে তাদের শিকারে পরিণত করে।


১৮৫৭ সালের শিক্ষার পর ১৮৫৮ থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত ৯০ বছর ভারতে ব্রিটিশ শাসন তুলনামূলকভাবে সফল ছিল। অবশ্য বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা যে ঘটেনি তা নয়, অতি উৎসাহী ব্রিটিশ সেনা অফিসারের নেতৃত্বে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাে র মতো ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু সব কিছু নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রেখে শেষ পর্যন্ত নিরাপদ ভারত থেকে বিদায় নিতে সক্ষম হয়েছিল ব্রিটিশ পক্ষ। কিন্তু মনস্তাত্ত্বিক বিভেদ যা ঘটার তারা তা ঘটিয়েছিল। বহু পি ত প্রাচ্যের ইসলাম ও পাশ্চাত্যের সাম্রাজ্যবাদকে পরস্পরের অতি কাছাকাছি, বিপজ্জনকভাবে নিবিড় সম্পর্কে জড়িত বলে বর্ণনা করেন। হজরত ইব্রাহিম আ:-এর আদর্শে উদ্বুদ্ধ বিশ্বের তিনটি প্রধান ধর্মবিশ্বাসের অনুসারীরা পরস্পর যুক্তি ও ঘৃণার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করেছে। এটিও এক ধরনের পারস্পরিক নির্ভরশীলতা বলে অনেকে মনে করেছেন। এভাবেই বজায় থাকবে মানব সভ্যতার মাঝে ভারসাম্য।


ব্রিটিশ গোলামির শৃঙ্খল থেকে এ দেশবাসীর প্রথম সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রাম ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের ওপর উইলিয়াম ড্যালরিম্পেলের ‘দি লাস্ট মোগল’ অত্যন্ত তথ্যসমৃদ্ধ গ্রন্থ। তার উপস্থাপনার বৈশিষ্ট্যের কারণে পাঠক নিজেকে বিদ্রোহের সময় সংঘটিত কোনো ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে দেখতে পায়, যেন মোগলদের পতন তার উপস্থিতিতেই সংঘটিত হয়েছে।