কেমন আছে আরব বসন্তের দেশ

Aug 10, 2017 08:38 pm
তিউনিসিয়ায় বিপ্লবের আগুনে সবচাইতে বড় জ্বালানি ছিল বেকারত্ব

হুমায়ুন সাদেক চৌধুরী

আরব বসন্তের কথা মনে আছে? আজ থেকে ছয় বছরেরও বেশি আগের কথা। তিউনিসিয়ার রাজধানীতে হঠাৎ জ্বলে উঠল আগুন, আর তাতে পুড়ে আত্মাহুতি দিলো এক তরুণ। তার নাম মোহাম্মদ বোয়াজিজি। সে রাস্তায় এটা-সেটা বিক্রির ব্যবসা করত। কিন্তু পুলিশ তাকে আর রাস্তায় বসতে দবে না। কিন্তু এই সামান্য ব্যবসাটুকুও করতে না পারলে বোয়াজিজি খাবে কী? প্রতিবাদী তরুণ বোয়াজিজি চরম সিদ্ধান্ত নিলো, না খেয়ে মরার চাইতে আগুনে পুড়ে মরাই ভালো। তা-ই হলো। আত্মাহুতি দিলো বোয়াজিজি।

ঘটনাটি ওখানেই শেষ হতে পারত। কিন্তু শেষ হলো না, বরং শুরু হলো। বোয়াজিজিকে পোড়াল যে আগুন, সে আগুন ছড়িয়ে গেল সবখানে। তিউনিসিয়া নামের দেশটির লাখো লাখো প্রতিবাদী তরুণ রাস্তায় নেমে এলো। তারা আর স্বৈরশাসক জাইন আল-আবেদিন বেন আলীকে শাসন ক্ষমতায় দেখতে চায় না। তাকে এবার সরতেই হবে।

বেন আলীকে সরতেই হলো, জয় হলো জনতার। পশ্চিমা বিশ্ব এর নাম দিলো ‘আরব বসন্ত’। তারপর আরব বসন্তের হাওয়া ছড়িয়ে পড়ল আরব দুনিয়ার আরো দেশে। সেই হাওয়ার তোড়ে উড়ে গেল ওসব দেশের অনেক কিছু। লিবিয়া, সিরিয়া এবং ইয়েমেন তারই জ্বলন্ত ছবি। ‘বসন্ত’ ওখানে ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিয়ে উড়িয়ে দিয়েছে ও দিচ্ছে পুরো দেশ ও জাতিকে। মনোরম শীতল হওয়া নয়, ‘বসন্ত’ ওখানে হলো কালব্যাধি এবং তা রূপ নিয়েছে মহামারীর।

এ-ই যখন অবস্থা, তখন আরব বসন্তের উৎসভূমি তিউনিসিয়া কেমন আছে? সেখানে কি সত্যিকার বসন্তের হাওয়া বইছে? জনতার স্বপ্ন কি পূরণ হয়েছে? নেমে এসেছে কি সুখ ও সমৃদ্ধি?


এসব প্রশ্নের জবাব এক কথায় দেয়া কঠিন। তবে এটা ঠিক, তিউনিসিয়ায় আরব বসন্ত লিবিয়া, সিরিয়া এবং ইয়েমেনের মতো ঝড়ো হাওয়ায় রূপ নেয়নি, বরং দেশটি স্বৈরতন্ত্র থেকে শান্তিপূর্ণভাবে এবং এখন পর্যন্ত স্থিতিশীলভাবে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় উত্তরণ ঘটাতে পেরেছে। বিপ্লবের এটা একটা বড় সাফল্য।

তিউনিসিয়ায় বিপ্লবের আগুনে সবচাইতে বড় জ্বালানি ছিল বেকারত্ব। লাখ লাখ তরুণ ছিল সে দেশে। যারা চাচ্ছিল কোনো রকম হলেও একটা কর্মসংস্থান। তা কি তারা পেয়েছে? এ প্রশ্নের এক কথায় জবাব- ‘না’। উপযুক্ত শিক্ষাগত যোগ্যতা ও প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা নিয়েও অনেকে ঠিক কাজটি পাচ্ছেন না। আর নতুনদের তো কথাই নেই। বেকারত্বের হার পৌঁছেছে ৪০ শতাংশে; যা স্বৈরাচারী বেন আলীর আমলের চাইতেও বেশি।

এই সর্বগ্রাসী বেকারত্বের সুযোগ নিচ্ছে এক শ্রেণীর দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা। চাকরির জন্য মরিয়া হয়ে ওঠা তরুণদের তারা যেন-তেন একটা চাকরি দিচ্ছে ঠিকই, তবে তার জন্য নিচ্ছে দুই হাজর থেকে তিন হাজার দিনার পর্যন্ত ঘুষ। এটা একটি স্থায়ী চাকরির কয়েক মাসের বেতনের সমান।


এসব দেখেশুনে হতাশা নেমে এসেছে তিউনিসিয়ানদের মাঝে। সবখানেই মানুষের মুখে একটাই কথা, এ দেশে থেকে লাভ নেই। এ দেশে থেকে কিছু হবে না।

কেন হবে না- খোঁজ নিতে গিয়ে পর্যবেক্ষকদের সামনে চলে এসেছে আরেক চিত্র। তারা দেখেন, সবাই যে চাকরি খুঁজছে তা নয়, কেউ কেউ ব্যবসা করারও চেষ্টা করেছে এবং ব্যর্থ হয়েছে। এ রকম একজনের নাম মোহাম্মদ। ২৭ বছর বয়সী এই তরুণ বিপুল উৎসাহ নিয়ে ক্ষুদ্র ব্যবসায় নেমেছিলেন। কিন্তু নেমে দেখেন, সামনে বাধার বিন্ধ্যাচল। সেই পাহাড় ডিঙাতে চাই সরকারের তরফ থেকে কিছু সহযোগিতা। কিন্তু সরকারের দিক থেকে তেমন কোনো উদ্যোগ নেই।

মোহাম্মদ অবশ্য তাতেও হাল ছেড়ে দেননি। তিনি ‘লড়াই’ চালিয়ে যেতে চান। তবে তিউনিসিয়ায় এরকম আশাবাদী ও লড়াকু মোহাম্মদের সংখ্যা একেবারেই কম। বেশির ভাগই এখন দেশে থেকে দেশকে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখে না, তারা স্বপ্ন দেখে তিউনিসিয়া ছাড়ার, ভিন্ন কোনো উন্নত দেশে চলে যাওয়ার। কারণ, তারা চোখের সামনেই দেখছে দেশে ধনী-দরিদ্র বৈষম্য ক্রমেই বাড়ছে। ধনী আরো ধনী হচ্ছে, গরিব আরো গরিব। তারা বলে, সরকার সম্পদ পুঞ্জীভূত করছে, কিন্তু জনগণের দিকে নজর দিচ্ছে না। কেউ কেউ তো এমনো বলে, অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানে বিপ্লব ব্যর্থ হয়েছে। এর চাইতে বেন আলীর আমলই ভালো ছিল।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অসাফল্যের পাশাপাশি রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও সরকার স্বৈরাচারী মনোভাবের প্রকাশ ঘটাচ্ছে। নির্যাতন, নিপীড়ন ও দুর্নীতি রয়ে গেছে আগের মতোই। সম্প্রতি জীবনমান উন্নয়নের দাবিতে বিক্ষোভরত মানুষদের দাবি বা কথা না-শুনে সরকার শক্তি প্রয়োগ করে তাদের দমন করেছে। এতে একজন নিহত, বহু আহত এবং অনেকে কারাবন্দী হয়েছে। কারাবন্দীদের ওপরও বর্বর নির্যাতন চলছে বলে অভিযোগ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো।

বাকস্বাধীনতার ওপর হামলাও ক্রমেই বাড়ছে। যে কেউ সরকারের কোনো অন্যায়ের বিরুদ্বে মুখ খুললেই তাকে কোনো না কোনো অজুহাতে পাকড়াও করা হচ্ছে। সংবাদিক ও ব্লগাররাই এর সবচাইতে বড় শিকার। প্রায়াই তাদেরকে সেনাবাহিনী ও পুলিশের ‘বিরোধিতা’ করার অভিযোগে গ্রেফতার করা হচ্ছে।

এ অবস্থায় অনেকে মনে করছেন, তিউনিসিয়ায় জনতার বিপ্লব সফল হয়নি। আবার অন্য অনেকের মত হলো- বিপ্লব এখনো স¤পূর্ণ হয়নি। তাই কী? ইতিহাস বলে, যে কোনো বিপ্লবই এক সময় কায়েমি স্বার্থবাদীদের হাতে চলে যায়। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, তিউনিসিয়ায়ও সেই ইতিহাসেরই পুনরাবৃত্তি ঘটছে বলেই মনে হচ্ছে।

গণতান্ত্রিক নির্বাচন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা তিউনিসিয়ান বিপ্লবের একটা অসাধারণ সাফল্য। এর মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে, জনগণ চাইলে সাফল্য অর্জন সম্ভব। কিন্তু তারা যদি তার পরিবর্তে দেশ ছেড়ে পালানোর কথা ভাবে, যদি তারা রাজনৈতিক প্রক্রিয়া থেকে নিজেদের একেবারে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে, তাহলে কিছুই হবে না।

পর্যবেক্ষকদের অভিমত, জনগণের দিক থেকে ক্রমাগত চাপ দিয়েই যেতে হবে, নিজেদের কণ্ঠস্বর বিরতিহীনভাবে শাসকগোষ্ঠীর কানে পৌঁছাতে হবে। তবেই আসবে পরিবর্তন, যে পরিবর্তনের কাক্সক্ষা ছিল বিপ্লবের প্রাণমূলে এবং যে পরিবর্তন হবে টেকসই।