রাজনীতিতে বিএনপির বিকল্প জোট চায় সরকার

Aug 13, 2017 03:25 pm
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা


জাকির হোসেন লিটন

আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনীতিতে বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের বিকল্প একটি কার্যকর জোট চায় সরকার। সেই লক্ষ্যে ইতোমধ্যে নানামুখী তৎপরতাও শুরু হয়েছে। বিশেষ করে বিএনপি জোটের বাইরে থাকা সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে টার্গেট করেই এ তৎপরতা চলছে। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের কোনো কোনো শরিক দলকেও সেই জোটে ঠেলে দেয়া হতে পারে। এ ছাড়া বিএনপি জোটের শরিক কোনো কোনো দলকেও নানামুর্খী চাপের মাধ্যমে সেই জোটে অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে বলে আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র জানিয়েছে।


নির্বাচনকে সামনে রেখে চলা এসব তৎপরতায় সরকারের পরোক্ষ সমর্থন রয়েছে। শুধু তা-ই নয়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ মদদও রয়েছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক করতে ভোটের মাঠে বিএনপির বিকল্প এই জোটের দিকে নজর আওয়ামী লীগের। দশম সংসদ নির্বাচনের ধারাবাহিকতায় বিএনপি নির্বাচনী দরকষাকষিতে যদি আবারো নির্বাচন বর্জনের দিকে যায়, ভোটে যেন এর প্রভাব না পড়ে এবং নির্বাচন যেন অংশগ্রহণমূলক হয়, সে জন্যই সরকারবিরোধী একটি বড় রাজনৈতিক জোটের প্রয়োজন মনে করছে ক্ষমতাসীনেরা। আর এ জন্য জাতীয় পার্টির নেতৃত্বে রাজনীতিতে একটি বড় জোট গড়ে তেলার ব্যাপারে বেশ আগ্রহী সরকারের নীতিনির্ধারকেরা।


আওয়ামী লীগ ও সরকারের নীতিনির্ধারকেরা মনে করছেন, আগামী নির্বাচন খুবই জটিল, কঠিন ও তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হতে পারে। কারণ, ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জন করলেও এবারের নির্বাচনে বিএনপি জোট আসবে বলে তাদের বিশ্বাস। এ ছাড়া বিএনপির মতো একটি বড় রাজনৈতিক দল স্বেচ্ছায় ভোট বর্জন না করলে তাদেরকে ভোট থেকে বিরত রাখা কোনোভাবেই সম্ভব হবে না। আর বিএনপি নির্বাচনে আসলে নির্বাচনের আগে এবং পরের হিসাব-নিকাশও খানিকটা পাল্টে যেতে পারে। তবে দীর্ঘ দুই মেয়াদে ক্ষমতার বাইরে থাকা এবং সরকারের জেলজুলুম ও রোষানলের শিকার বিএনপির বিজয়কে কোনোভাবেই সরকার নিরাপদ মনে করছে না। সে জন্য রাজনীতির মাঠে বিএনপি জোটের বিকল্প একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক প্লাটফর্মকে বেশ অনুভব করছে সরকার।


আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, বিএনপিবিহীন দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে দেশ-বিদেশে অনেক সমালোচনা ছিল। কিন্তু এবার তারা সংসদের বাইরে; তাই আগামী নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণের চেয়ে ভোটারদের অংশগ্রহণকেই গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে শাসক দল। এ জন্য জাতীয় পার্টির নেতৃত্বে রাজনীতিতে বিএনপির বিকল্প আরেকটি জোট তৈরি হলে সরকারের কোনো আপত্তি থাকবে না; বরং এমন জোটকে সাধুবাদ জানাবে ক্ষমতাসীনেরা।


দলের নেতারা বলছেন, রাজপথে এমন বিকল্প জোট থাকলে বিএনপি নির্বাচনকালীন সরকার, নির্বাচনী ব্যবস্থা নিয়ে বেশি দরকষাকষি বা বড় কোনো আন্দোলন গড়ে তোলার সুযোগ পাবে না। বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্য থেকেই তাদের নির্বাচনে অংশ নিতে হবে। আর বিএনপি যদি আবারো নির্বাচন বর্জন করে, তাহলে ছোট দলগুলোকে নিয়ে গঠিত সরকারবিরোধী জোট ভোটের মাঠে থাকলে ফলাফল যা-ই হোক নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক করা যাবে।


এমন প্রেক্ষাপটে গত ১৩ জুলাই রাজধানীর উত্তরায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) সভাপতি আ স ম আবদুর রবের বাসায় চা চক্রে অংশ নেন কয়েকটি রাজনৈতিক দলের নেতারা। এর মধ্যে বিকল্প ধারার সভাপতি ও সাবেক রাষ্ট্রপতি এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক ও সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা মাহমুদুর রহমান মান্না এবং গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি সুব্রত চৌধুরীসহ বেশ কিছু রাজনীতিক সেই অনুষ্ঠানে অংশ নেন। পুলিশ চা চক্রের ওই অনুষ্ঠানে বাধা দিতে চাইলে তা রাজনীতিতে আলোচনায় আসে। তবে রবের বাসায় চা চক্রে বাধা প্রদানের বিষয়টি সরকারের স্রেফ রাজনৈতিক কৌশল বলে জানা গেছে।


এরপর এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর বাসায় আরেক দফা বৈঠকে বসেন তৃতীয় ধারার এই রাজনীতিকেরা। ওই বৈঠকে মাহমুদুর রহমান মান্না, আ স ম আবদুর রব, আবদুল মালেক রতন, সুব্রত চৌধুরী ছাড়াও সরকার ও মহাজোটের প্রধান শরিক জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান জি এম কাদের অংশ নেন। ফলে আবারো রাজনীতিতে আলোচনায় আসে তৃতীয় জোট গঠনের বিষয়টি। বৈঠকের বিষয়ে সুব্রত চৌধুরী জানান, বিএনপি ও আওয়ামী লীগের জোটের বাইরে আমরা নিজেরা এক হতে পারি কি না সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। জি এম কাদেরের উপস্থিতির বিষয়ে তিনি বলেন, জি এম কাদের জাপার পক্ষ থেকে আসেননি। তিনি বি. চৌধুরীর পরিবারের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে এসেছেন।


বিষয়টি নিয়ে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘গণতন্ত্রের শত ফুল ফুটছে, ভালো তো। এটাই গণতন্ত্রের বিউটি। জোট হবে, গ্রুপ হবে। এটা হতে থাক অসুবিধা কী? নির্বাচনকে সামনে রেখে যা হচ্ছে তা ভালো দিক। তারা তো সেখানে ষড়যন্ত্র করছে না। তারা জোট করছে। অসুবিধা কী? তবে শেষ পর্যন্ত এ মেরুকরণ কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, তা দেখতে অপেক্ষা করতে হবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘নির্বাচনে আদর্শগত বিষয়টা মুখ্য নয়। নির্বাচন হলো কৌশলগত ব্যাপার। এখানে আদর্শগতভাবে জোট না হয়ে কৌশলগত, সময়ের প্রয়োজনে নির্বাচনে জেতার জন্য জোট হয়।’


দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ বলেন, ‘সবসময়ই নির্বাচনকে ঘিরে নানা ধরনের রাজনৈতিক মেরুকরণ ও বলয় তৈরি হয়। এবারো কোনো জোট গঠন সেই বলয়েরই অংশ হয়ে থাকতে পারে। তবে আমরা চাই প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দল ও জোটের আদর্শ এবং কর্মকাণ্ড হোক দেশ ও জনগণের স্বার্থকে ঘিরেই। কিন্তু রাজনৈতিক দল ও জোটের আড়ালে দেশবিরোধী কোনো ষড়যন্ত্র হলে জনগণ বরদাশত করে না, অতীতে সেটা বারবার প্রমাণিত হয়েছে। তাই দেশের স্বার্থে, দেশের জনগণের কল্যাণে কোনো জোট বা দল আত্মপ্রকাশ করলে আমরা আরেকটি রাজনৈতিক দল হিসেবে তাদেরকে সর্বাত্মক সমর্থন ও সহায়তা করব। এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য।’


আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা আলাপকালে জানান, আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয় ছাড়া বিকল্প কিছু দেখছেন না তারা। নানা উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও রায় বাস্তবায়ন এবং আন্দোলনের মাঠে বিএনপির নিষ্ক্রিয়তায় দেশের আপামর জনগণ আবারো আওয়ামী লীগকেই বেছে নেবে বলে তাদের বিশ্বাস। তবে কোনো কারণে নির্বাচনে এর উল্টো কিছু ঘটলে তা আওয়ামী লীগের জন্য বেশ বড় ধরনের বিপদের কারণ হতে পারে বলে আশঙ্কা তাদের।

তাই নির্বাচনের ফলাফলে অনাকাক্সিক্ষত কিছু এড়াতে আওয়ামী লীগের বিকল্প কিছু নিয়েও চিন্তা করছেন সরকারের নীতিনির্ধারকেরা। এ ক্ষেত্রে বিএনপি জোটের বিকল্প শক্তিশালী এবং কার্যকর কোনো তৃতীয় রাজনৈতিক শক্তিকেই পছন্দ তাদের। আর বিকল্পধারা, জেএসডি, কৃষক শ্রমিক জনতা পার্টি ও নাগরিক ঐক্যসহ বেশ কয়েকটি দলের রাজনৈতিক জোট গঠনের প্রক্রিয়া সেই তৃতীয় শক্তির অংশ হতে পারে বলে মনে করছেন তারা।


আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র জানায়, শক্তিশালী তৃতীয় এই জোট গঠনের প্রক্রিয়াকে পূর্ণতা দিতে চান সরকারের নীতিনির্ধারকেরা। তারই অংশ হিসেবে সম্ভাব্য সেই জোটে নতুন করে মহাজোট ও সরকারের প্রধান শরিক জাতীয় পার্টিকে ঠেলে দেয়া হয়েছে। প্রয়োজনে জাসদের একটি অংশসহ আরো কয়েকটি দলকেও সেই জোটে অন্তর্ভুক্ত করে দেয়া হতে পারে। আর সব ঠিক থাকলে সরকারের পরামর্শে জাতীয় পার্টি সরকারের মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করে সরকারবিরোধী ভূমিকায় মাঠে নামবে।

এর মধ্য দিয়ে সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টির নেতৃত্বে বিএনপির বিকল্প একটি বড় রাজনৈতিক জোট গঠন সম্ভব হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। ফলে আওয়ামী লীগ আবারো ক্ষমতায় আসলে সেখানে বিরোধী দল হিসেবে জাতীয় পার্টি নেতৃত্বাধীন জোটই মাঠে থাকবে। আবার কোনো কারণে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে হেরে গেলেও বিএনপির বিকল্প হিসেবে এই জোটকেই নিরাপদ মনে হচ্ছে তাদের। অন্য দিকে এবার বিরোধী দলেও জায়গা না হলে একপর্যায়ে বিএনপি আরো দুর্বল হয়ে নিঃশেষ হয়ে যাবে বলে তারা মনে করছেন।


যেভাবেই হোক আগামী নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসতে চায়। তবে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে ক্ষমতায় বিএনপির বিকল্প হিসেবে আমরা অন্য কাউকে চাই। কারণ, বিএনপি এবার ক্ষমতায় আসলে হাওয়া ভবন বানিয়ে লুটপাট করবে, জঙ্গিবাদের বিস্তার ঘটবে, দেশের উন্নয়নের চাকা থেমে যাবে এবং সর্বোপরি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের হত্যা নির্যাতনে মেতে উঠবে। সে জন্য আমরা বিএনপির বিকল্প হিসেবে অন্য কাউকে চাই।


দলের নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, আগামী নির্বাচন নিয়ে বি চৌধুরী, মাহী বি চৌধুরী, কাদের সিদ্দিকী ও আ স ম আবদুর রবসহ অনেকের সাথে যোগাযোগ সর্বোপরি সমঝোতার চেষ্টা রয়েছে সরকারের। আর জাতীয় পার্টিকে দিয়েই তার পূর্ণতা দেখতে চান সরকারের নীতিনির্ধারকেরা।


তবে দীর্ঘ দিন ধরেই এসব দলের নেতারা দুই প্রধান দলের বাইরে তৃতীয় শক্তি গঠনের কথা বলে আসছেন। বিভিন্ন সময়ে তৃতীয় শক্তির গঠনের নানা চেষ্টাও ব্যর্থ হয়ে গেছে। পোড়খাওয়া এসব রাজনীতিক সাধারণ মানুষের সমর্থন আদায়ে সফল হননি। এবারো তাদের সেই চেষ্টা কতটুকু সফল হবে তা নিয়ে রাজনীতি বিশ্লেষকেরা সন্দিহান।