মার্কিন কোম্পানির স্বার্থরক্ষায় যেভাবে আরব দেশগুলো এক হয়েছে

Aug 15, 2017 04:19 pm
ট্রাম্প-সালমান

নিজেদের মধ্যে আভ্যন্তরিন বিরোধ থাকলেও মার্কিন স্বার্থরক্ষায় সমান তৎপর উপসাগরীয় দেশগুলো। কাতারের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করে অবরোধ আরোপকারী চার আরব দেশ জানিয়েছে চলমান এই সংকটে মার্কিন কোম্পানিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। কাতারের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য মার্কিন কোম্পানির বিরুদ্ধে তারা কোনও পদক্ষেপ নেবে না। বিষয়টির সঙ্গে সম্পর্কিত চারটি সূত্রের মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পেরেছে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স।


কাতারের সঙ্গে আরব দেশগুলোর কূটনৈতিক সংকটের পর থেকেই বিদেশি কোম্পানিগুলো দ্বিধায় রয়েছে। অনেক বিদেশি কোম্পানির উভয় পক্ষের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। ফলে এই সংকটে তাদের ভূমিকা কেমন হবে তা নিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তা বিরাজ করছিল।
এই অবস্থায় সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিসর ও বাহরাইনের পক্ষ থেকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসনের কাছে একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে।

জুলাই মাসে পাঠানো এই চিঠিতে মার্কিন কোম্পানি আরবজোটের অবরোধে ক্ষতিগ্রস্ত হবে না বলে নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। সূত্র জানিয়েছে, একই ধরনের নিশ্চয়তা দিয়ে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নকেও চিঠি দেওয়া হয়েছে আরব আমিরাতের পক্ষ থেকে।
চিঠিতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানির সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী চার দেশ। চলমান অবরোধে এই সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।
চিঠির বিষয়ে আবু ধাবিতে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। অবরোধ আরোপকারী চার দেশের পক্ষ থেকেও চিঠির বিষয়ে মন্তব্য পাওয়া যায়নি।


জুলাই মাসে কূটনৈতিক সংকট নিরসনের উপসাগরীয় আরব দেশে ৪ দিনের সফরে আসেন টিলারসন। সংকট নিরসন নিয়ে উভয় পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেন তিনি। উল্লেখ্য, ৫ জুন সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও মিসর কাতারের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে। এতে করে কাতার জল, স্থল ও আকাশপথে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। সন্ত্রাসবাদে সহযোগিতার অভিযোগে সৌদি নেতৃত্বের অভিযোগে এ অবরোধ আরোপ করা হয় কাতারের বিরুদ্ধে। যদিও কাতার এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।


ইতোমধ্যে সৌদি আরব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ১১০ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্রচুক্তিসহ আরো ৩০০ বিলিয়ন ডলারের নানা ধরনের বিনিয়োগ চুক্তি করেছেন। সৌদি আরবের সাথে এই অস্ত্র চুক্তি সম্ভবত কোনো দেশের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় অঙ্কের অস্ত্র বিক্রির চুক্তি। ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সৌদি বাদশাহ উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়েছেন। স্কার্ফছাড়া মেলানিয়া ট্রাম্পের সাথে হাত মিলিয়েছেন।


ট্রাম্পের সৌদি আরব সফরে জিসিসি দেশগুলোর সাথে যে ৩০ বছর মেয়াদি কৌশলগত সর্ম্পকের চুক্তি হয়েছে তাতে এ দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব রক্ষার যেমন প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে, তেমনি ইরানকে সন্ত্রাসী কার্যক্রমের উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। মার্কিন প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে জিসিসি দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগ ও নিরাপত্তা সহযোগিতার সম্পর্ক আরো ঘনিষ্ঠ করার ব্যাপারে একমত হয়েছে। অর্থাৎ এ কৌশলগত সম্পর্কের ভিত্তিতে আরব দেশগুলোতে ট্রাম্প প্রশাসন আরো বিপুল পরিমাণ অস্ত্র বিক্রির সুযোগ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছেন।


২০১৬ সালের পর থেকে সৌদি অর্থনীতি নাজুক পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছে। ২০১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র তেল উৎপাদন শুরু করে। বিশ্বব্যাপী তেলের দাম পড়ে যায়। সৌদির তেল রফতানি ৫০ শতাংশ কমে যায়। ২০১৪ সালের জুনে যেখানে ব্যারেল প্রতি তেলের দাম ছিল ১১০ ডলার, ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে দাম হয় ২৭ ডলার। এখন এ বিরূপ পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে পারেনি সৌদি আরব। তেল উৎপাদন বাড়িয়ে দেয়ার পাশাপাশি অন্যান্য খাত থেকে আয় বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।

অর্থনীতির চেয়ে নিরাপত্তা এখন সৌদি আরবের জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ। একদিকে ইরানকে মোকাবেলা, সীমান্তবর্তী ইরাকে অব্যাহতভাবে ইরানের প্রভাব বেড়ে যাওয়া এবং আইএসের নামে দলছুট নানা সশস্ত্র সংগঠনের তৎপরতা সৌদি আরবের জন্য বিশাল এক মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।


মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সৌদি আরবের অস্ত্র ও তেল বাণিজ্যর এ সম্পর্ক অনেক পুরনো। ১৯৩৩ সালে স্ট্যান্ডার্ট ওয়েল অব ক্যালোফিার্নিয়ার তেল অনুসন্ধানের অনুমতির মধ্যদিয়ে। পরে ১৯৫০ সালে এটি সউদি আরব এবং অ্যারবিয়ান আমেরিকান ওয়েল কোম্পানি (আরামকো) নামে পরিচিতি পায়। ১৯৪৫ সালে বাদশাহ আব্দুল আজিজ ইবনে সউদ সুয়েজ খালে ইউএসস মারফিতে প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের সাথে বৈঠক করেন। এ বৈঠকে সৌদি আরবের নিরাপত্তা ও তেল সম্পদ নিয়ে দুই দেশের দীর্ঘ মেয়াদি বন্ধুত্ব নিয়ে আলোচনা হয়। অবশ্য এর আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দাহরানে একটি সামরিক ঘাঁটি গড়ার প্রস্তাব দেয়।


সেই থেকে মার্কিন ঈগলের চোখে দুনিয়া দেখছে সৌদি আরব। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য হয়ে উঠেছে এক রক্তস্নাত জনপদ। রিপাবলিকানদের সাথে সৌদি আরবের সম্পর্ক তেল বাণিজ্যর মতো পুরনো। ট্রাম্পকে আগলে রেখেছেন বিভিন্ন তেল কোম্পানির সাবেক নির্বাহীরা। বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্সটিলারসন ছিলেন এক্সনমবিলের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী। আসলে বাণিজ্যের পুরনো সম্পর্ক ধরেই ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে সৌদি আরবের ঘনিষ্ঠতা বাড়ছে। শেষ কথা হলো সৌদি আরবের নিরাপত্তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দেবে কিন্তু বিনিময়ে দিতে হবে বিপুল পরিমাণ অর্থ।