যাজকদের যৌন নিপীড়ন নিয়ে যা বললেন পোপ

Aug 17, 2017 06:56 pm
পোপ ফ্রান্সিস


ক্যাথলিক ধর্মগুরুদের হাতে শিশুদের ওপর যৌন নিপীড়ন নিয়ে তুমুল আলোচনা চলছে।এসব ঘটনাকে যাজকদের অস্বাভাবিক বিকৃতি বলে উল্লেখ করেছেন পোপ। তিনি বলেন এটা চার্চের শিক্ষার বিপরীত। একটা ভয়ঙ্কর পাপ। যেসব যাজক এমন অপরাধীদের রক্ষার চেষ্টা করেছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ‘ফাদার, আই ফরগিভ ইউ: অ্যবিউজড বাট নট ব্রোকেন’ শিরোনামে নতুন এক বইয়ের ভূমিকায় এসব কথা বলেছেন পোপ ফ্রান্সিস। বইটি লিখেছেন সুইস নাগরিক ড্যানিয়েল পিটেট। আট বছর বয়সে তিনি প্রথম একজন যাজকের হাতে ধর্ষিত হন।  বিল্ড নামের একটি জার্মান দৈনিকে বইটিতে লেখা পোপ ফ্রান্সিসের ওই ভূমিকা প্রকাশিত হয়।


যাজকদের হাতে যৌন নিপীড়নের ঘটনার বিরুদ্ধে বরাবরই সোচ্চার পোপ ফ্রান্সিস। এ ধরনের ঘটনা সহ্য না করার ব্যাপারে তিনি একাধিকবার নিজের প্রতিশ্রুতির পুনরাবৃত্তি করেছেন। তবে তার প্রতিশ্রুতির সমালোচনা করেছেন ঘটনার শিকার ব্যক্তিরা। তারা বলছেন, এ ব্যাপারে ভ্যাটিকানের আরও অনেক কিছু করণীয় রয়েছে।


ভূমিকায় পোপ ফ্রান্সিস লিখেছেন, ঘটনার শিকার শিশুদের এমন ভাগ্যবিড়ম্বনা তার হৃদয়কে নাড়া দেয়। যেসব যাজক দায়িত্ব পালনকালে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে তাদের ব্যাপারে আমরা খুবই দৃঢ় পদক্ষেপ নেবো। যেসব বিশপ এবং কার্ডিনাল এদের রক্ষা করেছে; তাদের ব্যাপারেও একই পদক্ষেপ নেওয়া হবে। অতীতেও একাধিকবার তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নজির রয়েছে।


কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্যসহ দুনিয়ার নানা প্রান্তে বিভিন্ন সময় যাজকদের হাতে শিশুদের ওপর যৌন নিপীড়নের অভিযোগ উঠেছে। অস্ট্রেলিয়ার চার্চগুলোর যাজকদের বিরুদ্ধে হাজার হাজার শিশুকে যৌন নিপীড়নের প্রমাণ মিলেছে। চলতি বছরের গোড়ার দিকে চালানো এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, গত ছয় দশকে শিশুকামী যাজকদের হাতে দেশটিতে প্রায় চার হাজার ৪৪০ জন শিশু যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার শিশুদের যৌন নিপীড়নের অভিযোগ তদন্তে গঠিত 'রয়্যাল কমিশন'-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৫০ সাল থেকে ২০১০ সালের মধ্যে ক্যাথলিক যাজকরা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশুদের ওপর যৌন নিপীড়ন চালিয়েছে। আর ১৯৮০ সাল থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে ৪ হাজার ৪৪০ জনেরও বেশি ব্যক্তি ক্যাথলিক চার্চে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ তুলেছেন। এসব ঘটনায় এক হাজার ৮৮০ জন যাজক জড়িত ছিলেন বলে জানিয়েছে কমিশন। এই যাজকদের মধ্যে ৯০ ভাগই পুরুষ। বাকি ১০ ভাগ নারী।


যৌন নিপীড়নের শিকার একজন জানিয়েছে, সে যাজক শিক্ষকের কাছে ক্লাসরুমেই নির্যাতনের শিকার হয়েছে। ওই সময় ক্লাসরুমে থাকা বাকি শিক্ষার্থীদের অন্যদিকে তাকিয়ে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।


অস্ট্রেলিয়ার চার্চগুলোর যাজকদের বিরুদ্ধে হাজার হাজার শিশুকে যৌন নির্যাতন করার প্রমাণ মিলেছে এক সমীক্ষায়।
একটি প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, গত ছয় দশকে শিশুকামী যাজকদের হাতে দেশটিতে প্রায় চার হাজার ৪৪০ জন শিশু যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে।  সিডনিতে এ তথ্য প্রকাশ করে অস্ট্রেলিয়ার শিশুদের যৌন নিপীড়নের অভিযোগ তদন্তে গঠিত 'রয়্যাল কমিশন'।


প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে ১৯৫০ সাল থেকে ২০১০ সালের মধ্যে ক্যাথলিক যাজকদের শিশুদের ওপর যৌন নিপীড়ন চালিয়েছে। আর ১৯৮০ সাল থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে ৪ হাজার ৪৪০ জনেরও বেশি ব্যক্তি যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়ার দাবি করেছে।
এ সব ঘটনায় এক হাজার ৮৮০ জন যাজক জড়িত ছিলেন বলে জানিয়েছে কমিশন। আর যাজকদের মধ্যে ৯০ ভাগই পুরুষ এবং ১০ ভাগ নারী।
বলা হচ্ছে অস্ট্রেলিয়ার মোট ক্যাথলিক যাজকদের সাত শতাংশই শিশু যৌন নিপীড়নের সঙ্গে জড়িত।
অস্ট্রেলিয়ার যাজকদের বিরুদ্ধে ব্যাপকহারে শিশুকামীতার অভিযোগ তদন্তে ব্যাপক চাপ তৈরি হওয়ায় ২০১২ সালে ঘটনার তদন্তে রয়াল কমিশন গঠিত হয়।


কমিশনের পক্ষ থেকে প্রথমে যাজকদের কাছে যৌন নিপীড়নের শিকার ব্যক্তিদেরর জবানবন্দি নেওয়া হয়।
যৌন নিপীড়নের শিকার একজন জানিয়েছে, সে তার ক্যাথলিক খ্রিস্টান ব্রাদার শিক্ষকের কাছে তার ক্লাসরুমেই নির্যাতনের শিকার হয়েছে। ওই সময় ক্লাসরুমে থাকা বাকি শিক্ষার্থীদের অন্যদিকে তাকিয়ে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
তদন্ত প্রতিবেদনে অন্য একটি ঘটনায় জানা যায়, একজন যাজক একটি মেয়েকে ছুরি হাতে হুমকি দিয়েছেন এবং শিশুদের তার দুই পায়ের মাঝখানে 'নিলডাউন' করাতেন।


কমিশনের প্রধান আইনজীবী গেইল ফারনেস বলেছেন, যৌন নিপীড়নের শিকার শিশুদের মধ্যে মেয়েদের গড় বয়স সাড়ে ১০ বছর এবং ছেলেদের ক্ষেত্রে সাড়ে ১১ বছর।
মি: ফারনেস জানিয়েছেন "অস্ট্রেলিয়া জুড়ে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে এক হাজারেরও বেশি ক্যাথলিক প্রতিষ্ঠান শনাক্ত করা হয়েছে।"
তিনি জানান, " যৌন নিপীড়নের ঘটনাগুলো প্রায় একই রকম।শিশুদের অবজ্ঞা করা হয়েছে বা শাস্তি দেওয়া হয়েছে। এমনকি সেইসব অভিযোগ নিয়ে কোনও তদন্তও হয়নি এবং যাজক ও ধর্মীয় ব্যক্তিরা নিজেদের পথে এগিয়ে গেছে। গির্জার প্রশাসন বা সমাজ তাদের অতীত সম্পর্কে কিছুই জানতে পারেনি।"


২০১৩ সালে গঠিত রয়্যাল কমিশন যৌন নিপীড়নের শিকার কয়েক হাজার ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা বলে । পুরো অস্ট্রেলিয়াজুড়ে শিশু যৌন নিপীড়নের বিষয়ে চার্চ, এতিমখানা, স্পোর্টিং ক্লাব, তরুণ গ্রুপ এবং স্কুলগুলোতেও শুনানি করে।
অ্যানথনি এবং ক্রিসি ফস্টার এর দুই মেয়ে ক্যাথলিক চার্চে যাজকদের দ্বারা যৌন নিপীড়নের শিকার হয়। মিসেস ফস্টারের মতে চার্চগুলোতে এরকম অপরাধী লুকিয়ে আছে।


"দীর্ঘ সময় ধরে এরা শিশুদের ওপর যৌন অত্যাচার চালিয়েছে, চার্চ কোনও ব্যবস্থা নেয়নি বা প্রয়োজনও বোধ করেনি। বছরের পর বছর ধরে শিশুদের এই ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে" এবিসি নিউজকে বলেন মিসেস ফস্টার।
কাউন্সিলের প্রধান নির্বাহী ফ্রান্সিস সুলিভান রয়াল কমিশনকে বলেছেন, "শিশুদের ওপর যৌন নিপীড়নের যে সংখ্যা পাওয়া যাচ্ছে তা ভয়াবহ, পীড়াদায়ক এবং কোনভাবেই এটি সমর্থন করা যায় না"। মি: সুলিভানের মন্তব্য "এসব ঘটনায় ক্যাথলিক হিসেবে লজ্জায় আমাদের মাথা হেট হয়ে গেছে"।


অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ ক্যাথলিক যাজক কার্ডিনাল জার্জ পেলকেও প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়েছে। তিনি বর্তমানে ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের সদর দফতর ভ্যাটিকানের অর্থ বিভাগের প্রধান। অস্ট্রেলিয়ায় আর্চ বিশপের দায়িত্ব পালনকালে যে শিশু যৌন নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছিল তাতে কী পদক্ষেপ নিয়েছে চার্চ কর্তৃপক্ষ-এমন প্রশ্নের মুখেও পড়েছেন তিনি।
ভিক্টোরিয়া রাজ্যে ১৯৭০ থেকে ১৯৮০ সালের মধ্যে যাজকদের বিরুদ্ধে যে শিশু যৌন নিপীড়নের অভিযোগ উঠেছিল সেটি সামলানোর বিষয়ে পক্ষপাতের জন্য অভিযুক্ত কার্ডিনাল জার্জ পেল।


ফিলিপাইনের যাজকদের যৌন কেলেঙ্কারি ফাঁস করলেন দেশটির সাবেক এক খ্রিস্টান ধর্মগুরু। তিনি জানান, ফিলিপাইনের ক্যাথলিক গির্জাগুলোতে যৌন নিপীড়ন একটি ক্রমবর্ধমান সমস্যা। এসব ঘটনায় সম্পৃক্তদেরও কোনো ধরনের শাস্তির মুখোমুখি করা হয় না।

বর্তমানে এ ধরনের ঘটনা তদন্ত করছেন অস্কার ক্রুজ নামের অবসরপ্রাপ্ত ওই আর্চবিশপ। তিনি বলেন, ‘হ্যা, হ্যা, হ্যা... শিশুদের প্রতি যৌন নিপীড়ন এবং সমকামিতার ঘটনা আরো বাড়ছে। এটা একটা ঘৃণ্য অপরাধ।’

গত কয়েক শতক ধরেই ফিলিপাইনে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছে ক্যাথলিক গির্জা। দেশটির ১০ কোটি মানুষের ৮০ শতাংশেরও বেশি ক্যাথলিক খ্রিস্টান।

আল জাজিরার সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে ‘ইমেলডা’ নামের এক তরুণী জানান- তিন বছর আগে তার বয়স যখন ১৫, তখন এক যাজকের হাতে যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছিলেন তিনি। পরে পুলিশ স্টেশনে অভিযোগ করলে গ্রামের গির্জা ইমেলডাকে দেড়শ ডলার দিয়ে অভিযোগ প্রত্যাহার করিয়ে নেয়।

ওই তরুণী বলেন, ‘আসলেই প্রথমে আমি তাদের দেয়া অর্থ নিতে চাইনি। কারণ আমি জানতাম, নিপীড়নকারী যাজকের পক্ষ থেকেই এটা আমাকে দেয়া হচ্ছে। পরে তাদের পীড়াপীড়িতে ওই অর্থ নিতে বাধ্য হই।’

ক্যাথলিক গির্জার আইন বিশেষজ্ঞ জেইম আকাকোসো জানান, কোনো ধর্মযাজককে যৌন নিপীড়নের অভিযুক্ত করা হলেও তাকে তার পদ থেকে সরানো হয় না।