দেবালয়া

Aug 21, 2017 12:23 pm
ভিটি মানে ভিক্টোরিয়া টার্মিনাসের বর্তমান নাম ছত্রপতি শিবাজি টার্মিনাস


বুলবুল সরওয়ার

ঊনবিংশ শতাব্দীর ভারতীয় ব্রিটিশরা সব কিছুর নামকরণ করার চেষ্টা করেছে তাদের মহারানীর নামে। বোম্বে নামার আগেই তা টের পেয়েছিলাম। তাই ভিটি, মানে ভিক্টোরিয়া টার্মিনাসে নামতে হবে শুনে মোটেই অবাক হইনি। বরং অবাক হয়েছিলাম প্রিন্স অব ওয়েলসের মিউজিয়াম দেখে। যাক, যুদ্ধ না করা ভারতজয়ী-পুঙ্গবরা তাহলে সবাই নারীভক্ত নয় পুরুষের প্রেমিকও কেউ কেউ আছে!


স্যার প্লিজ, বেরিয়ে যাওয়ার সময় আপনার মন্তব্য লিখতে ভুলবেন না। অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান কিউরেটর আংরেজের চেয়েও নিপুণ ইংরেজিতে আরজি জানালে আমি এমনভাবে মাথা ঝাঁকালাম যে ও আর এমনকি? তুমি কোন জমানায় পাওয়া দু-ফোঁটা বীর্যের জোরে যদি এখনো নিজেকে ফিরিঙ্গি ভাবতে পারো, আমি আমার তেরো-গুষ্ঠিতে পাওয়া পূর্ব-অধিকারে না হয় ফার্সিতেই দু-কলম লিখে দেবো!


কিন্তু তা আর হলো না। গাইড মেয়েটা এমনিতেই সুন্দরী, তার ওপর মেজাজ খুব চড়া। ভয়ে নাকি বয়সদোষে, জানি না তারুণ্যকেই বেছে নিলাম। বুড়ি কিউরেটরকে সামান্য বাউ করেই গট গট বেরিয়ে এলাম তরুণী আগাথার পেছনে।
এও খ্রিষ্টান। তবে স্বদেশী। হিন্দি-ইংরেজি তো জানেই, দুই-চার লাইন বঙ্গালও জানে। কার কাছে শিখেছো জানতে চাইলে এমনভাবে গীতাঞ্জলির নাম বলল যে বাঙালির ঘরে ঘরে সে বই সকাল-সন্ধ্যা পাঠ হয়। তবু ভালো গীতা-কুরআনের নাম বলেনি!

গাড়িটা ভারি মজার। সাধারণ ট্যুরিস্ট বাস। মিনি বলাই ভালো। তবে মেয়েদের মিনির নি¤েœর দিকে খোলা; এর ঊর্ধ্বাঙ্গ। মানে, ছাদ আছে ঠিকই, তবে সে শুধু খুঁটিকে আগলে রাখার জন্য। জানালার বালাই নেই; দুয়ার-বাতায়নের প্রশ্নই ওঠে না। তবে নিন্দুকেও স্বীকার করবেন, বিদেশীদের জন্য এরচেয়ে ভালো বাহন আর হয় না। যারা কেবল অন্যের ঘরে উঁকি মারতে উদগ্রীব, মানে ওই পর্যটক তাদের জন্য আরো উদার কিছু দিতে গেলে স্রেফ জেল-কাণ্ডের কথাই মনে আসে। ব্যাসদেব ঠাকুর কি সে-লেখা আজো শেষ করেছেন? কলেজ স্ট্রিট দূরে থাক, বাংলাবাজারেও তো তার কোনো চোরাগোপ্তা হদিস পাইনি।

ভিটি মানে ভিক্টোরিয়া টার্মিনাসের বর্তমান নাম ছত্রপতি শিবাজি টার্মিনাস আসলেই অসাধারণ এক নির্মাণ। নিও-গথিক এই ইমারত শুধু যে ইংরেজের দম্ভ প্রকাশ করেছে, তাই না তারা যে নিউটনেরও জাত, তারও স্বীকৃতি দিচ্ছে। এখান থেকেই কুসংস্কার-জাত ব্যর্থ-যুদ্ধ সিপাহি বিপ্লবের চার বছর আগের এপ্রিল মাসের ষোলো তারিখ বিকেল সাড়ে তিনটায় রওনা হয়েছিল ভারতের প্রথম রেল। মাত্র কয়েক মাইল ছিল তার যাত্রা মানে থানে পর্যন্ত। কিন্তু কেউ এ-কথা অস্বীকার করতে পারবে না যে, সেই থেকেই শুরু হয়েছিল মহাভারতের খুদে হয়ে যাওয়ার কোশেশ। রাইট ভ্রাতৃদ্বয়ের পর বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় সাফল্য রেলগাড়ি ঝমাঝম, পা রাখলে আলুর দম, শেরশাহ সুরীর গ্র্যান্ড-ট্রাঙ্ক রোড আর ডাক-ঘোড়াকে পেছনে ফেলে দিয়ে লুটেরা ট্রেন এসে জাঁকিয়ে বসল। সম্রাট-কবি বাবর যেমন ভাগ্যাহত ভবঘুরে থেকে দিল্লিশ্বর হয়েছিলেন কামানের জোরে রেলও ইংরেজের বেহিসাব-লুটপাট আর বিকিকিনির সব কায়দা-কুশলের বিনিময়ে পুরো দেশটাকে হাতিয়ে নেবার বিসমিল্লাহ করে দিলো।


ভিক্টোরিয়া টার্মিনাল একটু দেরিতে নির্মিত হলে হয়তো এর পেছনে কেবলই ঐতিহাসিকেরা খুঁত খুঁজে পেতেন কিন্তু বর্তমান ভারতের ব্যস্ততম এই স্টেশনে এমনই ভিড় যে দুই মিনিট দাঁড়িয়ে যেখানে একটা ফটো তুলবারও জো নেই; আর অতীতের পৃষ্ঠা! তো সেই লাখো-লাখো সৈন্য মরে কাতারে কাতার শুমার করিয়া দেখি পঞ্চাশ হাজারের ভিড় ঠেলেই আগাথা আমাদের কানে-চুলে ধরে ঝটপট একটা গ্রুপ ছবি তুলেই ফেলল। হতভম্ব আমার মনে পড়ল নেপোলিয়নের বাণী : একজন সুন্দরী নারী চাইলে একদল উচ্ছৃৃঙ্খল সৈনিককেও হাঁটুর নিচে দাবিয়ে রাখতে পারে।


তত্ত্বালোচনার আগেই আমাদের গাড়ি পৌঁছে গেল আরব সাগরের পাড়ে। যেখানটায় আমরা নামলাম তার প্রসিদ্ধ পরিচয় ইন্ডিয়া গেট। এখানেই ভারতীয় প্রশাসন মহারানী ভিক্টোরিয়া আর তদীয়-স্বামী ও ভূভারতের সম্রাট প্রিন্স অব ওয়েলসকে স্বাগত জানিয়েছিল ১৯১১ সালে। যদিও এখন ইন্ডিয়া গেটের চেয়ে হোটেল তাজই উজ্জ্বল; আর কে-ই বা ইতিহাসের মোচড়ে-মোচড়ে ঘুরপাক খেয়ে মরতে আগ্রহী? কেউ না। তাই বোম্বের নব্বই ভাগ লোকের মতো আমারও প্রায় অজানা ছিল যে পশ্চিম-ভারতের এই মধ্যমার আদি-নাম কংকান ও মধ্য-কংকানের সাতটি খুদে-দ্বীপ নিয়েই আস্তে আস্তে বোম্বে গড়ে উঠেছে সেই ১৪৯৮ থেকে যখন গুজরাটের সুলতান দয়া পরবশে দান করেছিলেন পর্তুগিজদের ভূমি-বিচ্ছিন্ন এই বন-জঙ্গল সেখানে ডাকাতি করার কিছুই নেই বলে।

আসলেই কিছু ছিল না তখন এই সুন্দরী রমণীর। তাই সুন্দরীতমা ডাচ রাজকন্যা ক্যাথরিন ডি ব্রাগানজাকে বউ হিসেবে পেয়ে যতটা খুশি হয়েছিলেন ব্রিটিশ যুবরাজ চার্লস-টু, ততটাই অখুশি হয়েছিলেন যৌতুক হিসেবে সাতটি আবর্জনাময়-নিষ্ফলা দ্বীপ পেয়ে। রাগে-দুঃখে মাত্র দশ পাউন্ডে সেগুলো ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে লিজ দিয়ে যেন বাঁচলেন বিয়ের সাত বছর যেতে-না-যেতেই ১৬৬৮তে। আর মুফতে লাভ করা কোম্পানি দ্বীপে পা ফেলেই গঙ্গা-যমুনা-সরস্বতীকে এক-সুতায় বাঁধতে লেগে গেল। গঙ্গা হলো সমুদ্দুর, যমুনা হলো ভূভাগ। আর সরস্বতী আগামীর মহাভারত অর্থাৎ ব্রিটিশরাজ। তো সেই বিচ্ছিন্ন সাতটি দ্বীপের চারটি ছিল মা-ভারতের কোলে; তিনটি দূরে-দূরে। সেগুলোকে গামছা-বেঁধেই একত্র নাম হলো বোম্বাই। আধুনিক হিন্দুরা যদিও মুম্বা-দেবীকে আই (মা) ডেকেই নাম দিতে চায় মুম্বাই; কিন্তু ইতিহাস বলে বোম্বাই এসেছে পর্তুগিজ বোম-বাহিয়া, মানে ‘সুন্দর-সৈকত’ থেকে।


ব্রিটিশরা অবশ্য বোম্বে স্টেটের রাজধানীকেই আদর করে মুম্বাই ডেকে গলায় পরিয়েছে রানীর সীতাহার কুইন্স নেকলেস। যার কেতাদুরস্ত নাম ‘মেরিন ড্রাইভ’। সেই নেকলেসেরই শুরু এই ইন্ডিয়া গেট থেকে দু-চার শো পা এগিয়ে আমি যেখানে দাঁড়িয়ে আছি তারই সামনে থেকে।
আগাথা অ্যাংলো নয়, শুধু খ্রিষ্টান। কিন্তু বিয়ে করেছে মুসলমানকে। সে ছেলে কর্মী বলেই কি না কে জানে আগাথার সাইজ বিশাল। ইংরেজি, মারাঠি, হিন্দি, জাপানি এবং কিয়ৎ কিয়ৎ বঙ্গালও জানে। আর জানে ইতিহাস। মাস্টাররা তার পরীক্ষা নিলে কী হতো জানি না, তবে আমি তাকে শুরুতেই এ-প্লাস নাম্বার দিয়েছি। শুধু ভারতীয় নারী-গাইডরা নয়, মারমুখী জর্দানি সুন্দরীরাও প্রশংসায় খুশি হন তো আমি কোনো আক্কেলে কম নম্বর দেবো? লাভের মধ্যে ক্ষতি যা হলো, তা হলো বাকি সহযাত্রীদের ঈর্ষা ও নারীদের জ্বলুনি। বোম্বাই মরিচের মতো তার সাইজ বিরাট না হলেও ঝালের পরিমাণ যে কম নয়, তা আগাথাও টের পেল। দেরি না করে সে সবাইকে তুলে দিলো নৌকায় যাও সমুদ্র থেকে ছবি তোল।


সবার মতো আমিও সে মৌজে শামিল হয়ে গেলাম। আরব সাগরের অনাবিল সৌন্দর্যের ভেতর-থেকে-দেখা রানী-মুম্বাই তার যে অপরূপ রূপ দেখিয়ে দিলো তা কখন যে ভুলিয়ে দিলো আগাথাকে আর তার প্রিয় ইউরোপকে। আমি হারিয়ে গেলাম সেই বিশাল মহানগরী আর তার উদরের দুই কোটি মানুষের ভিড়ে। শিল্পনগরী মুম্বাই গিলে নিলো আমার সত্তা; আমার স্বাতন্ত্র্য আর আমার আগাথাকেও।

দার্জিলিংয়ের ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার পর ভেবেছিলাম আর ভারত যাবো না। কিন্তু চায়নার অপরূপ সৌন্দর্য আর হিমালয়ের অসাধারণ নান্দনিকতা এক দিকে যেমন আমার নেশা বাড়িয়ে দিয়েছে, তেমনি প্রতিতুলনায় ভারতের মিথ ও নিসর্গকে এগিয়ে রেখেছে কয়েক কদম। এই টান অস্বীকার করতে না পেরেই ঝিলামের তীর ধরে হাঁটতে হাঁটতে ভেবেছি রাভি আর ইরাবতীর কথা; আর স্বপ্নে হেঁটেছি ফিলিস্তিন কিন্তু সর্বত্রই তার নানা বাধা আর সঙ্কট কেউ ভিসা দেয় তো, পাসপোর্ট নিষিদ্ধ হয়ে যায়; কারো ক্ষমতা পাসপোর্টেই ‘না-করে’ দেয়ায় সুতরাং ফিরে ফিরে আসি ভারতেই।

তাতে আনন্দ যতই বাড়–ক না কেন, লেখকের খ্যাতি কমে বৈ বাড়ে না। কিন্তু মানুষ তো আর লেখকের চেয়ে ছোট নয়। সে তার মনের টানকে অস্বীকার করবে কি করে? আমিও তাই বোঝার আগে উঠে বসেছি গীতাঞ্জলিতে। তেত্রিশ ঘণ্টার জার্নি ছত্রিশ ঘণ্টায় শেষ করলাম চা-গরম, ইডলি-সিঙ্গাড়া-ফ্রুটির ঝাঁঝে-ভাঁজে, আর অপরিচিত মানুষের সুবেশী-কুবেশী চেহারায় চোখ বুলিয়ে। বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা, অন্ধ্র, মধ্য প্রদেশ ছেড়ে শেষপর্যন্ত ঢুকলাম অশেষ-মহারাষ্ট্রে।


জার্নি যেন শেষ হওয়ারই নয়! আটাশ বছর বয়সী আকবর কী করে এত বড় সাম্রাজ্যকে এক করেছিলেন আল্লাহ মালুম! বেটা আসলেই মুঘল-ই-আজম!
ভিটিতে নেমে ভিরমি খাওয়ার জোগাড়। অফিসযাত্রীরা তো আছেনই, পর্যটকেরাও যেন মাছির মতো কাঁঠালে ভিড় জমিয়েছেন। শুনেছিলাম, বোম্বের নারীরা সৌন্দর্যে যেমন অতুলনীয়া, স্বয়ংবরায়ও তেমনি। কিন্তু মিছিলের মাঝে কি আর মিনতিকে খুঁজে পাওয়া যায়! মিনতিকে চিনলেন না? আরে, আমাদের আগাথা! সে যে পরদিন সেই চিরায়ত-কৈফিয়তই দেবে তা জেনেও জিজ্ঞাসু চোখে চাইলাম। জবাবে যা সে বলল, তা শুনলে আপনাদেরও আক্কেল গুড়–ম হবে। আমি তো ভেবেছিলাম অমিতাভ বচ্চন নামছেন তোমাকে তো আমি হাজারবার দেখেছি; মানে তোমার মতো হাজার জনকে।


এরপর আর কথা চলে, বলুন?
হোটেলটা খুবই ভালো কিন্তু খরুচে থ্রি-স্টার। আমি সাধারণত বাজেট হোটেলে উঠি এবং যত দূর সম্ভব বাজারের ভেতরে থাকতে চাই। এর সুবিধা হলো হাজাগজা মানুষের কোনো খামতি থাকে না; আর চায়ের স্টল থাকে বেশুমার। রাতদুপুরেও যদি গরম পানির নেশা লাগে তো সমস্যা তো হয়ই না; বরং চার-ইয়ারি আড্ডাও হামেশাই জুটে যায়। কিন্তু সাহিল মোটেই সে রকম হোটেল নয়। কাবাব ও শরীরের জোগান যথেষ্ট থাকলেও কবিতার উপাদান একেবারেই কম আর আমি অতি-সাহেবি কেতা-গুঁতায় বিরক্তও অনেক। তাই নিরুপায় সিরাজউদ্দৌলার মতো গোলাম হোসেনকেই ভরসা মেনে ফোন উঠালাম
হ্যালো?
বলুন, কে বলছেন।
আমার নাম। চিনতে পারছেন?
কেন নয়, মাই ডিয়ার, কেন নয়!


ববিতার গলায় যথেষ্ট উষ্ণ আন্তরিকতা। মনের জোর আমার কম থাকা সত্ত্বেও ভাবলাম বলি তোমার কি একটু সময় হবে? কিন্তু লাজুক পুরুষের যেমন সব ফলেই তিন-পোকা আমার অবস্থাও তেমনি। এ কথা-সে কথা বলে বলে সময় পার করেও আসল কথাটা বলা হলো না। ফোন রেখে দিয়ে চুপচাপ ছাদ দেখতে লেগে গেলাম। বোম্বের ছাদের কি কোনো বিশিষ্টতা আছে? নানা রাজ্যের গরুর শিঙের মতো নানা বংকিম ও মোটা-চিকনে? খুঁজতে কেবল কালক্ষেপণই সার হলো, আলীবাবার গুহার হদিস মিলল না। হঠাৎ করে আমার ষড়রিপু চমকে দিয়ে বেজে উঠল টেলিফোন। আমি প্রায় ছিটকে পড়তে পড়তে সাহিলের পালঙ্ক আকড়ে ধরলাম আর কাঁপা হাতে টেনে নিলাম ফোনের রিসিভার।


ববিতার ফোন! বিস্ময়ে হতবাক আমি যেন স্বপ্নের ঘোরে শুনতে পেলাম ডোন্ট অরি। আই উইল একম্পানি ইউ নেক্সট থ্রি-অর-ফোর ডেজ।
আমার কান দু’টি কি আমার? ওরা কি ঠিকঠাক আছে? নাকি মিথ্যেই সেখানে অমৃতের সুধা ঢালছে কোনো অজানা অপ্সরা... ডোন্ট অরি, ডোন্ট অরি।
প্রাচীন বাংলায় অরি মানে শত্রু। অথচ সেই শব্দটিই কানে মধুবর্ষণ করে মনকে বলল শেকসপিয়রে ঈমান আনো। ইংরেজরা শাসনে মন্দ হলেও সাহিত্যে উত্তম কুমার।


আনুগত্য গ্রহণ করার মধ্যেই দু-চোখ ছেপে ঘুম নেমে এলো। তৃপ্তি ও প্রত্যাশার বাতাস তো বসন্তকেও হার মানায় আমি কোন স্যার? সুতরাং আগাথার ব্যবহার যত রূঢ়ই হোক, পাশে ববিতা থাকলে ওসবে কে পরোয়া করে!


আগেই বলেছি ভিটি স্টেশন এক আশ্চর্য নির্মাণ। আমি কেবল মুসলমান হলে বলতাম এ আমার শত্রু-নির্মাণ। কিন্তু যে তার জীবনের উল্লেখযোগ্য অংশ কাটিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের অন্দরে-বন্দরে, সে কোন ধৃষ্টতায় আল-আজহারের সাথে একে তুলনীয় না করে পারে? সেই একই পীত-কৃষ্ণ স্টাইলের নির্মাণ; একই আঙরাখা। শুধু যদি ধর্মটা এক হতো তো থ্রি মাস্কেটিয়ার্সের মতো লাফ দিয়ে এপার-ওপার করে লন্ডন থেকে ফ্রান্সে পৌঁছে যেতাম। এ বেলা সে ভাগ্য হলো না বলে রাগ করে শেষে হোটেল তাজের ব্যালকনিতেই পা রাখলাম।

উর্দিতে উদীয়মান সূর্যের মতো ঝকমকে দারোয়ান দৌড়ে এলো : ইধার নোই! তফাৎ যাও। ইয়ে ফাইভ স্টার হোটেল।
যেন আমরা ভেতো-বাঙ্গাল, ফাইভ-স্টার কই দেখবো। মেজাজটাই খিচড়ে যাচ্ছিল। কিন্তু তার জওয়ান-জবরদস্ত বার্তা অন্তিমে পৌঁছার আগেই যে কারণে মিইয়ে গেল সে দিকে তাকাতেই দেখি রেলগাড়িতে কাল দেখা পরনে ঢাকাই বাঙালি বধূয়া আজ হাঁটু-দৃশ্যমান স্কার্ট, বক্ষ-উন্নাসিক ব্লাউজ আর রাজস্থানী-রঙিন ভ্যানিটি ব্যাগ ঝুলিয়ে প্রায় নূরজাহানের ভঙ্গিতে আঙুল তুলছেন হি ইজ মাই গেস্ট। ডোন্ট স্টপ; হাই সারোয়ার!


আমি প্রায় লা-জওয়াব চোখ ঘুরিয়ে একটু-আগে বেমক্কা ভিজিয়ে দেয়া প্যান্ট আর হিংসুটে আরব সাগরকে মনে মনে অভিশম্পাৎ দিয়ে হাত বাড়িয়ে বললাম, হাউ ডু ইউ ডু, ববিতা? এভরিথিং অলরাইট?
ইটস ওকে! বড় সানগ্লাসের কোনার সামান্য ফাঁক গলে রঙিন কাঁচের নিষেধাজ্ঞাকে তুড়ি মেরে তার চোখ অব্যক্ত চোখে যেন ইশারা দিলো শয়তান তো তুমিও দেখছি কম না!
তাজ হোটেলে ঢোকা মানেই পকেট-সাফ। দেখলাম ববিতাও সেটি জানে। আমাকে কোমর ডুবিয়ে দেয়া সোফায় বসিয়ে, হিন্দুস্তান টাইমসে ভাসিয়ে সে গট গট করে রিসেপশনে চলে গেল।


আমি তার দিকে তাকাবার চেয়ে হোটেলের ছাদে তাকানো নিরাপদ বোধ করি। সেখানে তাকিয়ে হাসছেন হোসেন। জি-হ্যাঁ, মকবুল ফিদা হুসেন ভারতীয় চিত্রশিল্পের রাজকুমার। মকবুলের ছবি যে কেবল ছবি নয়, নারীর চেয়েও রমণীয়, তা বুঝলাম ববিতার কনুই ঝাঁকুনি খেয়ে অ্যাই যে বিচ্ছিন্ন-বাঙ্গাল, অত আর দেয়ালের নারী দেখতে হবে না ট্যাক্সি এসে গেছে আর আমিও মরিনি। চলো।
ইন্ডিয়া-গেট আর তাজ হোটেল পাশাপাশি। একটি ব্রিটিশের গর্ব, আরেকটি ভারতের গৌরব। সামান্য গিয়ে ট্যাক্সি ডানে ঘুরতেই শুরু হয় মেরিন ড্রাইভ সেই অসাধারণ চন্দ্রহার। প্রায় সত্তর ডিগ্রি বৃত্তের চার পাশটা তেমন সাজানো না হলেও সন্ধ্যা থেকে তার বাহার যেন লক্ষেèৗয়ের বাঈজি। ঘাঘড়ার ঝলসানিতেই নেশা ধরে যায় বোতলের ফেনার আলাপ বাদ।


ট্যাক্সির নরমে দুই চোখ বুজে আরাম করার ইচ্ছে দুই দিকের চাপে উবে গেল। উত্তর-পশ্চিম-দক্ষিণমুখী ইংরেজি সি-বর্ণের সি-বিচ যেন ভারতসম্রাজ্ঞী ভিক্টোরিয়ার গলা ছেড়ে হামলে পড়ল ববিতার গলায়। আমি ঘুরে বসে জানতে চাই: এ জায়গার নামই কি নরিমান পয়েন্ট?
জি-হাঁ, সাহিব। ইসিকা নাম নরিম্যান পয়েন্ট। চোস্ত জবানে আমার দৃষ্টি কেড়ে নিলো রবীন্দ্রদাড়ির শিখ ড্রাইভার।
থোড়া রোখো-না, সিংজি আমার আগ্রহ টের পেয়ে ববিতার গলায় মধু ঝরে।


ছায়া দেখে গাড়ি দাঁড় করায় ড্রাইভার পাম-সারির নিচে। গাড়ির খুপড়ি ছেড়ে নেমে আসতেই মনে হলো আরবসাগর-দুহিতা আমায় জড়িয়ে ধরতে উদগ্রীব। আমি যদি তার সাদর আলিঙ্গনকে প্রত্যাখ্যান করি খবর আছে, সে তা আগেভাগেই জানিয়ে দিচ্ছে হুহুঙ্কারে।
চৌকা-সিমেন্টের দুই-চারটে ব্লক পার হয়ে কাছে যেতে প্রায় ভিজে গেলাম। বঙ্গললনা যেন সতিনের ওপর রাগ করেই ঝমঝমিয়ে উঠল : এবার কি আমি তোমায় ওড়না দিয়ে মুছিয়ে দেবো? যত্তসব!


ভাবি বলি : তোমরা ওড়না বুকে থেকেও যা দেখিয়ে বেড়াচ্ছে, তা সরিয়ে নিলেই কার কী ক্ষতি? বাঙালি তরুণদের তোমরা দুর্গা-সরস্বতীর দেহের ভূগোল দেখিয়েই তো ইতিহাস থেকে সরিয়ে রাখলে; আজ না হয় সে জ্ঞান হাতে-কলমে শিখব। আমি কি ডরাই সখি ভিখারী রাঘবে?


আমার ক্রুদ্ধ অবস্থা দেখে শিখজি হেসেই খুন। রবীন্দ্রনাথও যে মানুষ ছিলেন, দিব্যি বুঝতে পেরে আমি বাদামের ঠোঙা বাড়িয়ে বললাম : জনাব, চলবে?


হেসে সে দুই-চারটে হাতে নিয়ে গাড়ি ছাড়ল। মুখে তার বাদামের চেয়ে কথা বেশি। এই ড্রাইভ তৈরি হয়েছে ‘আশি বছর’ আগে। মহারানী ভিক্টোরিয়া যখন ভারতের রানী হতে এসেছিলেন সেই উনিশ শো দছ-কি-বারোতে। নরিম্যান পয়েন্টের পর হলো চৌপাঠি বিচ।
চৌপাঠি নাম কেন?


ড্রাইভার লা-জওয়াব। কিন্তু রানী ভিক্টোরিয়ার এক স্বজাতি ফোড়ন কাটল ওসব জিজ্ঞাসা না করে তোমার চোখ দুটো খুলে রাখো, আর কান পেতে শোনো বিচ কী বলে। পরে আমি সব বুঝিয়ে দেবো। ওকে?
চৌপাঠির পামতলায় ড্রাইভার নিজে থেকেই গাড়ি দাঁড় করাল : যান, বাবুজি দেখে আসুন।
অনিচ্ছা সত্ত্বেও ববিতা নামল। কেন তার অনীহা বোঝার চেয়ে তার সঙ্গলাভে এগিয়ে গেলাম সামনে। ভেজা ভেজা বিস্তীর্ণ বালুর ময়দান। টেস্ট ঘোষণা ছাড়াই প্রায় আট-দশটি ক্রিকেট টুর্নামেন্ট চলছে। চারটি ওয়াচ টাওয়ারের মাচা-আসন শূন্য না আছে নাইট রাইডার, না পামেলা অ্যান্ডারসন। দুঃখ নিয়ে বললাম : চা হবে নাকি এক কাপ, ম্যাডাম?


এতক্ষণে সর্পিণী তার ফণা তুলল : খাও খাও। তোমার আগাথা-ক্রিস্টি বুঝি এই-ই শিখিয়েছে গত দুই দিনের গাইডিংয়ে? ট্যাক্সি বিল দেখে আবার অক্কা পেও না। শিখের সাথে লাগলে শ্রীঘর বেশি দূরে থাকে না।
এতক্ষণে আমার হুঁশ হলো। কিন্তু সে হুঁশ বিলের চেয়ে অনেক বেদনাকাতর হয়ে উঠল কলকাতার বাঙালিদের কৃপণতার কাহিনী স্মরণ করে। সহসাই উজ্জ্বল স্বর্ণালোকিত সকালের স্বর্ণের-চেয়ে-উজ্জ্বল তরুণী যেন সেই করুণ স্মৃতির রাহুগ্রাসে ম্লান হয়ে গেল।
পথ থেকে দু’টি থাম্প্স-আপের বোতল নিয়ে আবার সেই শিখজির সচলায়তনে উঠে বসলাম।
এই টুর্নামেন্টই কি চৌপাঠির সব?


আমার প্রশ্নে সিংজির হাসি মোটরের শব্দকেও হার মানিয়ে দিলো। কী বলেন স্যার, আসুন সন্ধ্যায় আলোতে। জেনানাদের ঠেলে ঢুকতেই পারবেন না। আশ্চর্য হয়ে যাবেন, পানি-পুরি ভেল-পুরিয়ালাদের দৌরাত্ম্যে। অর্ডার নেয়া হয়ে গেলেই ব্যাস ভাব করবে আপনি লঙ্কার-রাবণ। সাপ্লাই ট্রেন যখন এসে পৌঁছবে, তার আগেই হয়তো রিফিউজিদের জান-কাবার।
কারণ কী, সিংজি?

কারণ হলো আগাম পয়সা। শালারা অর্ডারের সাথে সাথে পয়সাটাও অগ্রিম নেয় তো, তাই। পুরা ভারতে আপনি চৌপাঠির চেয়ে চালাক কোনো পুরিওয়ালা পাবেন না হ্যাঁ।


না-না, অতটা খারাপ বলো না, সিংজি। ববিতার কণ্ঠে মৃদু আপত্তি।
শেষ মোড় ঘুরতেই ট্যাক্সিকে আমি দাঁড়াতে বললাম। ববিতা হতভম্ব। আমি তার উদ্ভাসিত পোশাক ও যৌবনের জেল্লা উপেক্ষা করে বললাম, ট্যাক্সিটা ছেড়ে দাও। আমি এখান থেকেই আবার উল্টো দিকে হাঁটব।
এই রিজ রোড থেকে নরিম্যান পয়েন্ট? এই রোদ্দুরে?


আমি আরব সি’র সি-বিচের সি-বে’র দক্ষিণ-পূর্ব কোনায় দাঁড়িয়ে বললাম, এ ছাড়া কী উপায়?
গাছতলায় গাড়ি দাঁড় করিয়ে সে বলল : শোনো বন্ধু, কাব্য করার অনেক সময় পাবে। সন্ধ্যার আগে তোমাকে আমি এখানেই নামিয়ে দিয়ে যাবো।
কেন?


কারণ এখানে বসে যদি তুমি সন্ধ্যা না দেখো, কুইন্স নেকলেস নামও বুঝবে না; আর সেই মহাপ্রতাপশালী কুইনকেও না। সন্ধ্যায় এই মেরিন ড্রাইভের গা ঘেঁষে যাওয়া রোড জুড়ে হাজার-হাজার বাতি না জ্বললে তুমি কী করে বুঝবে মহারানী ভিক্টোরিয়ার গলার মালা কেমন ছিল? আর তা কতটা উজ্জ্বল?
তোমার চেয়েও বেশি?
সাইজে হয়তো না, তবে শক্তিতে ওই সূর্য-দেবতার পাশে রাতের মিটিমিটি জোনাকী!
যদিও, মহাকাশে ঝুলে থাকা হাজার নক্ষত্র দেখেও কেউ বুঝবে না যে ওর একটাই আমার বেশভুষা ভিজিয়ে একসা করে দিচ্ছে!
এখনো তো আসলটা ভেজেনি; ভিজবে যখন, তখন বুঝবে!
এরপর আর কথা চলে না। নারীদের বেশ-ভেজা যেমন বিপজ্জনক, ভেজানোর তৃঞ্চা আরো ভয়ানক। সুতরাং আমি ববিতাকেই মেনে নিলাম।

মেরিন ড্রাইভের প্রায়-পুরোটা ঘুরে ট্যাক্সি বাম দিকে ঘুরছে। ববিতা বলল, পেছন দিকে তাকিয়ে দেখো।
যে নরিম্যান পয়েন্টে গাড়ি থামিয়েছিলাম, তা এখন ঝাপসা হয়ে গেছে। বিশাল ইমারতগুলোকে মনের চোখে চিহ্ন দিয়ে না রাখলে তা ভিটি স্টেশনের আমজনতার মতো হারিয়ে যেত। আমি বিস্ময় লুকাতে না পেরে বলি : ওমা, এত বড়?
বোঝো এবার, রানীর নেকলেস যদি এত বড় হয়, মুখটা কী ছিল?


আমি ঝটিতে একবার তার সুস্পষ্ট দেহের দিকে তাকাকেই সে হাত দিয়ে আমার চোখ ঠেসে ধরল। সামনে তাকাও। বোম্বেটে সব দস্যুদের ধরতে সত্যজিৎ ও ব্যোমকেশের নায়কেরা মালাবার হিলে যায়। এখানে সতর্ক থাকা জরুরি।
গাড়ি ওপরে উঠছে। যানজটও আছে। তবে শিহরণ লাগছে সাগর থেকে পাহাড়ে উঠে যেতে। আহা আমাদের বাটালি হিল থেকেও চট্টলা-সমুদ্রকে এভাবে দেখা যেত। কই সে পাহাড়; আর কই সে পতেঙ্গা! কিন্তু মন আমার খোঁচা মারল কেন ডিসি হিল তো এ রকমই অত হাহাকার কিসের? আমিও মেনে নিলাম মনকে।
রোড সাইনে দেখলাম কস্তুরবা গান্ধী পার্কের ডিরেকশন। খালি-গা, ছিন্ন বসন, গোল-চশমার লাঠি হাতের লোকটি আমার চোখের সামনে হাজির হয়ে গেল। আশ্চর্য মানুষের জীবন। যে ত্যাগ না করে, সে কিছু পায় না।


তুমি কাঁদছো? অজান্তে আমাকে মৃদু আঘাত করে ববিতা। ছ্যাঁকা-লাগা হাত ধরার আগেই ঝটিতে সরিয়ে নিলো ববিতা। আমি দ্রুত বলি : না না, চোখে ময়লা গেছে! দ্রুত মিথ্যা বলেও ফেঁসে যাই আমি।
জিন্নাহর বাড়ি বন্ধ দেখেই এত হাহাকার অথচ এই শতভাগ ধর্মনিরপেক্ষ জিন্নাহকে নিয়েই তোমাদের মারামারি-কাটাকাটি। আচ্ছা, বলো তো ববিতা সিরিরিয়াস কণ্ঠে বলে : জিন্নাহ তো উর্দুভাষীও নন। তবু তার ওপর তোমাদের এত রাগ কেন?
তিনি যে উর্দুই একমাত্র রাষ্ট্রভাষার ঘোষণা দিলেন। আমরা তো আর তোমাদের মতো মরাধরা না, আমরা হলাম শের-ই-বাংলা। বুঝতে হবে তো!
এই নাহলে কবি! চলো, নামি।


ট্যাক্সি বিদায় করে আমরা পার্কে ঢুকি। এই পার্কে বাপুজির অনেক সভা হয়েছে। ভারতকে ‘বিভাগ’ থেকে বাঁচাতে না পারার ব্যর্থতা তাকে যতটা কষ্ট দিয়েছে, তার চেয়ে অনেক বেশি বেদনা দিয়েছে নিজের ধর্ম নিজ দেশেই স্থাপন করতে না পারার জন্য। নিজে অব্রাহ্মণ হওয়ার কারণে জাতীর পিতা হলেও ভারতেকে তিনি মুক্ত করতে পারেননি ধর্মের জাতপাত আর অস্পৃশ্যতার তীব্র কুটিল হিংস্র কুসংস্কার থেকে। আমি ফিরে তাকাই আরেক ব্যর্থ নেতা জিন্নাহর বাড়ির দিকে।
আমার উদাস দৃষ্টি আর ভেজা চোখ ববিতাকে বিষণœ করে দেয়ায় আমি সচেতন হই। বলি : আচ্ছা মেরিন ড্রাইভ কত বড়?
প্রায় সাড়ে চার কিলো।


চৌপাঠি কোনটা? শুধু ওই মাঝের সবুজটুকু নানা লেখায় যার বর্ণনা আসে? নাকি পুরোটা?
না না, ওই যে মাঝ বরাবর যেখানে পামগাছ দেখলে আর ওয়াচ টাওয়ার, ওটাই চৌপাঠি। রোজ রাতে গানের আসর বসে ওখানে।
প্রফেশনাল, না অ্যামেচার।
দুটোই।
কী রকম?


শিল্পী আর নাটুকেরা তো মুম্বাই আসতেই থাকে, যাদের মধ্যে শতকরা দু’জনও শেষ পর্যন্ত টেকে না। এদের মধ্যে সিনেমা-শিল্পীরা যায় বারে-ক্লাবে; আর শিল্পীরা আসে এখানে। ওস্তাদ বড়ে গোলাম-আলী তার জীবনের উল্লেখযোগ্য অনেক রাত ওই চৌপাঠিতে কাটিয়েছেন। এক দিকে যেমন উচ্চাঙ্গসঙ্গীত ভালোবাসতেন, অন্য দিকে তেমনি সমুদ্র। সাধে কি আর বড়ে খাঁ হয়েছেন?
বুঝলাম, বাঙালি ললনার পেটে বিদ্যেও কম না! খোঁচা মারার জন্য বললাম, ম্যাডাম কি মালাবার নিয়েও দু’চার কথা বলবেন?
ববিতা হেসে বলল : ফরমাইয়ে, জনাব-এ-আলা।


আমার হিন্দির দৌড় ইয়ে-উয়ে পর্যন্তই; উর্দুতে হ্যায়-নেহি তক। সাবধানে তাই নিজের দেশে ফিরলাম : এর নাম মালাবার হিল কেন? মালাবার তো জানি কেরলের একটি এলাকা।
যথার্থই জানো। ওখানকারই কিছু বণিকেরা এলাকাটি কিনেছিল। পরে পর্তুগিজ আর ফ্রেঞ্চদের সাথে পেরে উঠলেও ইংরেজদেরকে ঠেকাতে না পেরে মোটা দামে বিক্রি করে দেয়। অষ্টাদশ শতাব্দীর শুরুতে বোম্বের ইংরেজ গভর্নর এলফিনস্টোন এখানে তার বাংলো গড়ার পরই এটি পশ হতে শুরু করে।
এখনো কি এটি পশ এরিয়া?
ওমা, কী বলো, তুমি? টাটা-বিড়লা ছাড়া কেউই এখানে আর বাড়িঘর কিনতে পারে না এত দাম!
ব্রিটিশদের আগে কারা ছিল?

আমি অত জানি না, বাপু। তবে হাজার বছর আগে শিলহারা রাজারা এখানে মন্দির গড়েছেন বলে জনশ্রুতি। এরপর আসে মুসলমানরা প্রথমে মামলুকরা; পরে পর্তুগিজরা। মুঘলদের পতনের বেশ পরে এটি যায় ইংরেজদের অধীনে। এরপর আবার মহারাষ্ট্র ও গুজরাটের গন্ডগোল। ব্যাস আমার জ্ঞান এ পর্যন্ত। আর কিছু বলতে পারবো না।
পার্সিরা কবে এলো?
ও টাওয়ার অব সায়লেন্স দেখে মনে হচ্ছে?

আমি মাথা নাড়ি।
ভাবছিলাম, সুন্দরী কোনো রম্ভার কাহিনী শুনতে চাইবে; তা কী সব বেরসিক প্রশ্ন করো!
কথা বলতে বলতে আমরা দেখে ফেললাম কস্তুরবা-গান্ধী পার্ক। আশ্চর্য কোমল সবুজ উদ্যান। সযতœ পরিচর্যায় লালন করা হয়েছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর মানুষের তৈরি বৃক্ষ-ভাস্কর্য। খুলনার প্রেমকাননের মতো জীবিত গাছের বাঘ-ভালুক তো আছেই গালিভার সাইজের জুতা-বিল্ডিংও আছে তিনতলা উঁচু। সে জুতার সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠে দেখি উত্তাল ঊর্মীমালায় সুশোভিত কুইনস নেকলেস হীরক-দূতিতে ডাকছে।


ঘুরে আমরা উত্তর পাশে যাই। ভারতের শ্রেষ্ঠ ধনী আম্বালার অদ্ভুত ডিজাইনের সিঁড়ি-বাড়ি আর কুয়ালা লামপুরের টুইন টাওয়ারের মতো দাদরের ইম্পেরিয়াল টাওয়ার পুরো শহরের মাথার ওপর দিয়ে হাতছানি দিচ্ছে চিরায়ত আহ্বানে।
টাওয়ার অব সায়লেন্স পাশেই। ঘন সবুজ উদ্যানে ঢাকা পার্সি কবরস্থান। মুম্বাইয়ের আদি এলাকার অন্যতম। যদিও দেখা বা ঢোকা পুরোপুরি নিষেধ। এরা এসেছিল স্থলপথে আর বণিকেরা এসেছিল জলপথে।


আমার মনে পড়ে গেল আরবীয় নাবিকদের অদ্ভুত সমুদ্রজ্ঞানের কথা। শ্রীলঙ্কা বা সিলোনকে তারা ন্যায়-অন্যায়ের সীমানা বানিয়ে ছিলেন। আরব সাগর শান্ত একটা ছোট্ট অংশ বাদে আর বঙ্গোপসাগর চঞ্চল। মালাক্কার পর চায়না-সিকে তারা নাম দিয়েছিলেন ‘বিদ্রোহী’। সত্যিই তাই! আরব সাগরের বিচ ঢালু এবং মাদ্রাজে দেখেছি সেখানকার বিচ ভয়ঙ্কর ধারালো এবং খাড়াও বটে। শুনেছি, তার সেই হিং¯্র চোয়াল শেষ হয়েছে মধ্য-উড়িষ্যায় নবাব সিরাজের পদপ্রান্তে।
একটি দোলনার ওপর বসতে বসতে বলল ববিতা শাহরুখ খান হবে নাকি বিনোদ খান্না?
কোনটা লাভজনক?
দুটোই। শাহরুখ ও মাধুরীকে পেয়েছে; বিনোদও।
আমি কাকে পাচ্ছি?


ববিতাকে। সে এমন ভ্রু-ভঙ্গিতে কথা বলল যেন সত্যি সত্যিই সে ববিতা।
আমি বলি : ম্যাডামের কি জানা আছে বোম্বের ববিতা ছাড়াও একজন ববিতা দুনিয়ায় আছেন?
জি জনাব, জানি বলেই তো বলছি কাকে নেবেন? সত্যজিতের ববিতা, নাকি কারিনা কাপুড়ের মা?
আপাতত কফি আর ঝালমুড়ি নেই, তারপর ওই জগতে যাওয়া যাবে।
তথাস্তু! বলে চিৎকার করে উঠল ববিতা ভেলপুরি, ইধার আও।
হ্যাংগিং গার্ডেনের কিছু স্থানে খাওয়া বারণ। আমরা নিরাপদ স্থানে সরে গেলে ববিতা বলে : মুম্বাই শহরে আইন করে দেয়া উচিত ঝালমুড়ি কিনলে চুমু ফ্রি। ভেলপুরী-পানিপুরীতে কোলাকুলি।
আমি হাঁ। কেন এ প্রস্তাবনা, ম্যাডাম?


দেখ বিকেল হলেই বুঝবে। এ শহরে ওদেরই রাজত্ব। মনে হয় মুম্বাইয়ের নারীরা কেবল ওই খেয়েই বাঁচে।
আমি হাসতে হাসতে বিষম খাই। ববিতা আমার মাথায় হালকা চাপড় মেরে বলে : কে অসময়ে স্মরণ করছে বাপু? তাকে বলে দাও ইউ আর বিজি উইদ ববিতা অব মুম্বাই।
আমি কাশতে কাশতেই বলি : নো নো, শি ইজ ওল্ড।
ও-মাই-গড! দেখিয়ে দেবো ওল্ড না নিউ?
আমি তার হাত টেনে ধরে বলি চলো, ট্যাক্সি নাও।
কোথায় যাবে?
সালমান খানের বাড়ি।
সে তো আমি যাবো। তুমি না যাবে দিপীকা পাড়ুকোনকে দেখতে?
ভেবেছিলাম কিন্তু যাবো না।
কেন, কেন?
মই আনিনি যে!
মই? মই দিয়ে কী হবে?
চুমু খেতে লাগবে। আমার উচ্চতা মাত্র পাঁচ-ফুট-পাঁচ।
ববিতা হাসতে হাসতে আমার গায়ে গড়িয়ে পড়ে।