ক্ষমতাসীন দলে উদ্বেগ : প্রধানবিচারপতিকে নিয়ে যা বলছেন নেতারা

Aug 22, 2017 04:04 pm
 প্রধানমন্ত্রী ও প্রধানবিচারপতি

নাবিল ফারহান

বিচারপতিদের অপসারণ সংক্রান্ত সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় নিয়ে সরকার ও বিচার বিভাগ এখন মুখোমুখি অবস্থানে।
পরিস্থিতি ক্রমান্বয়ে আরও জটিল আকার ধারণ করছে। প্রধানমন্ত্রী ও সরকারি দলের নেতাদের বক্তব্য থেকে বুঝা যাচ্ছে তারা এখন প্রধান বিচারপতির অপসারণের পথ খুঁজছে। ক্ষমতাসীন দলের নেতারা প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে এক ধরনের শঙ্কার মধ্যে আছেন। তিনি যেভাবে সংসদ সদস্যদের অপরিপক্ক (ইমম্যাচিউর) ও সংসদের অকার্যকর বলে মন্তব্য করেছেন তাতে তাদের মধ্যে প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে এক ধরনের সন্দেহ ও অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে।

এরমধ্যে তিনি পাকিস্তানে উচ্চ আদালতের রায়ে প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের পদত্যাগের প্রসঙ্গ আনার পর তাদের উদ্বেগ আরো বেড়েছে। প্রধান বিচারপতির মনে আসলে কী আছে তা নিয়ে আওয়ামীলীগের নেতারা উদ্বিগ্ন। প্রধান বিচারপতি আদালতে শুনানীকালে বলেন, ‘আমরা বিচার বিভাগ ধৈর্য ধরছি, যথেষ্ট ধৈর্য ধরছি।’ এ সময় তিনি আরো বলেন, ‘পাকিস্তানেও আদালত প্রধানমন্ত্রীকে ইয়ে (অবৈধ) ঘোষণা করে।’


পাকিস্তানের সঙ্গে তুলনা করায় প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার কঠোর সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘ওই হুমকি আমাকে দিয়ে লাভ নেই।’ তিনি বলেন, সব সহ্য করলেও পাকিস্তানের সঙ্গে তুলনা তাঁরা কিছুতেই সহ্য করবেন না।
এই রায়ে বহু অবান্তর ও স্ববিরোধী কথাবার্তা থাকার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী রায়ের বিভিন্ন ত্রুটি জাতির সামনে তুলে ধরার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, জনগণের আদালত বড় আদালত। জনগণের আদালতকে কেউ অস্বীকার করতে পারে না।


গত রোববার সর্বোচ্চ আদালতে অন্য একটি মামলার শুনানির প্রসঙ্গ টেনে গতকালের আলোচনায় প্রধান বিচারপতির উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সব সহ্য করা যায়, কিন্তু পাকিস্তানের সঙ্গে তুলনা করলে এটা আমরা কিছুতেই সহ্য করতে পারব না। পাকিস্তান রায় দিল দেখে কেউ ধমক দেবে, জনগণের কাছে এর বিচার চাই।’ তিনি বলেন, ‘আজকে পাকিস্তানের সঙ্গে কেন তুলনা করবে? পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কেন তুলনা করবে?’


আওয়ামী লীগের সভাপতি বলেন, ‘জাতির পিতা দেশ স্বাধীন করেছিলেন বলেই আজকে উচ্চ আদালত আছে এবং অনেকে এখানে বসতে পেরেছেন। আর নিয়োগ দেন কে? মহামান্য রাষ্ট্রপতি।’ প্রধান বিচারপতিকে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি যাঁকে নিয়োগ দিলেন, তিনি আবার রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা কেড়ে নিতে চাইছেন, যে ক্ষমতা সংবিধান রাষ্ট্রপতিকে দিয়েছে। সেটা দেওয়া হচ্ছে না বলেই যত রাগ আর গোসসা।’ সংসদ সদস্যদের নিয়ে ‘অশালীন’ মন্তব্য করা হয়েছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, এটা তো উচ্চ আদালতের দায়িত্ব না।...জনগণের প্রতিনিধিরাই সংসদ সদস্য। জনগণ হচ্ছে ক্ষমতার মালিক। এ কথাটা ভুললে চলবে না।


বাসস জানায়, শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা এখন দেখতে পাচ্ছি উচ্চ আদালত থেকে নানা ধরনের বক্তব্য, রাজনৈতিক কথাবার্তা এবং হুমকি-ধমকি। আমার মাঝে মাঝে অবাক লাগে, যাদের আমরা নিজেরাই নিয়োগ দিয়েছি, রাষ্ট্রপতিই নিয়োগ দিয়েছেন এবং নিয়োগ পাওয়ার পরে হঠাৎ তাদের বক্তব্য শুনে এবং সংসদ সম্পর্কে যে সমস্ত কথা বলা হচ্ছে, সংসদ সদস্য যারা তাদেরকে “ক্রিমিনাল” বলা হচ্ছে। সেখানে ব্যবসায়ী আছে, সেটাও বলা হচ্ছে। কেন, ব্যবসা করাটা কি অপরাধ?’ প্রশ্ন তোলেন প্রধানমন্ত্রী। ‘এভাবে সংসদকে হেয় করা এবং সংসদকে নিয়ে নানা ধরনের মন্তব্য করা, এর অর্থটা কী?’


প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার বক্তব্যের দিকে ইঙ্গিত করে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘পাকিস্তান আর বাংলাদেশ এক জিনিস নয়। যারা উদাহরণ দিতে গিয়ে পাকিস্তানকে টেনে আনছেন, তাদের ইতিহাস ও দেশটির বর্তমান পরিস্থিতি পাঠ করতে হবে।


প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহাকে সাংবিধানিক পদটি ছেড়ে রাজনীতিতে নামার আহ্বান জানিয়েছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতা মাহাবুব-উল আলম হানিফ। তিনি বলেছেন, একজন বিচারপতি হয়ে বিচারালয়ে বসে এত কথা বলার কী প্রয়োজন আছে? আপনি যদি রাজনীতি করতে চান, বিচারলায় ছেড়ে এসে রাজনীতির মাঠে নামুন, কথা বলুন, জনগণ শুনবে। সাংবিধানিক ওই পদে থেকে আপনি রাজনৈতিক কথা বলতে পারেন না। আর বলা মানেই সংবিধানের শপথ ভঙ্গের অভিযোগে অভিযুক্ত হন আপনি।


প্রধান বিচারপতিকে ‘মানসিক ভারসাম্যহীন’ বলে মন্তব্য করেছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক। তিনি বলেছেন, ‘আমি মনে করি, তিনি (প্রধান বিচারপতি) মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছেন। আমরা মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন করব তাকে পরীক্ষা করানো হোক, ডাক্তার দেখানো হোক, তার মানসিক ভারসাম্য ঠিক আছে কি না। তিনি যেসব কথাবার্তা বলছেন, তাতে পাগল ছাড়া এমন কথা কেউ বলতে পারে না।’


সোমবার (২১ আগস্ট) গাজীপুরের কালিয়াকৈরে এক আলোচনা সভায় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী এসব কথা বলেন। জাতীয় শোক দিবস ও ২১ আগস্টকে স্মরণ করে কালিয়াকৈর উপজেলা ও পৌর আওয়ামী লীগ এর আয়োজন করে। প্রধান বিচারপতির উদ্দেশ্যে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশ এক ও অভিন্ন। তুমি পাকিস্তানিদের হয়ে হুমকি দেখাও কত বড় দুঃসাহস তোমার? কত বড় ধৃষ্টতা।’
খাদ্যমন্ত্রী এ্যাড. কামরুল ইসলাম বলেছেন, প্রধান বিচারপতি রাজনৈতিক বিবেচনাই তারা নিয়োগ দিয়েছিলেন। বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক বলেছেন, প্রধান বিচারপতি একাধিকবার শপথ ভঙ্গ করেছেন। তাকে প্রধান বিচারের আসন থেকে সরিয়ে দেয়া না হলে তার মেয়াদের আগামী ৫ মাসের মধ্যে বড় ধরণের কিছু ঘটতে পারে।


যুব মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদক অপু উকিল বলেছেন, ‘আমরা জানতে পারছি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা স্বাধীনতার সময় শান্তি কমিটিতে ছিলেন। এ শান্তি কমিটির প্রধান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিলো হিন্দু নিধন। একজন হিন্দু কিভাবে শান্তি কমিটিতে যোগ দেন? ফলে তিনি হিন্দু নন।’ তিনি আরো বলেন, ‘সুরেন্দ্র কুমার সিনহা ষড়যন্ত্র করছেন, তিনি বিএনপি সুরে কথা বলছেন। আমরা তার অপসারণ চাই।

কৃষিবিদ ইস্টটিটিউট মিলনায়তনে যুব মহিলা লীগ আয়োজিত আলোচনা সভায় অপু উকিল এসব কথা বলেন।
সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ বলেছেন, সামনে বিরাট পরীক্ষা, ভয়ঙ্কর বিপদ। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যরিস্টার মওদুদ আহমেদ এই রায় ঘিরে চলমান ঝড়ের মুখে রীতিমতো সরব হয়ে উঠেছেন। তিনি বলেছেন, উচ্চ আদালতের দেয়া রায়ের বিরুদ্ধে সরকার ও সরকারি দল প্রমাণ করেছে, তারা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা চায় না। এমনকি তিনি এর আগে বলেছেন, সরকার বিচার বিভাগের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। ব্যরিস্টার মওদুদ আহমেদ সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হকের বক্তব্যের জবাবে বলেছেন, ভাবতে লজ্জা লাগে, তিনি প্রধান বিচারপতি ছিলেন।


এর আগে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ও আইনমন্ত্রী আনিসুল হককে নিয়ে বৈঠক করেছেন। তারও আগে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের প্রধান বিচারপতি ও রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করে দলের অবস্থান এই ইস্যুতে পরিষ্কার করেছেন।