প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে সরকার যা করতে চায়

Aug 23, 2017 04:32 pm
 প্রধান বিচারপতি


নাবিল ফারহান

ষোড়শ সংশোধনী বাতিল রায় ও পর্যবেক্ষণ নিয়ে প্রধান বিচারপতির সাথে সমঝোতার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর ক্ষমতাসীন দলে ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে। এখন প্রধান বিচারপতিকে সরিয়ে দেয়ার বিকল্প নিয়ে ভাবা হচ্ছে। যদিও প্রধান বিচারপতিকে নিজ উদ্যেগে রায় সংশোধন অথবা পদত্যাগের জন্য ২৪ আগস্ট পর্যন্ত সময় দেয়া হয়েছে।

এরমধ্যে আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাবেক আইনমন্ত্রী আব্দুল মতিন খসরু, ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ প্রধান বিচারপতির সাথে সাক্ষাত করার পর সর্বশেষ প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা গওহর রিজভী সাক্ষাত করেছেন। ক্ষমতাসীন দলের নেতারা বলছেন এসব উদ্যেগে আশাব্যঞ্জক কোনো অগ্রগতি হয়নি।
এরপর থেকে প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের একাধিক মন্ত্রী প্রধান বিচারপতির ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন ‘জাতির পিতা দেশ স্বাধীন করেছিলেন বলেই আজকে উচ্চ আদালত আছে এবং অনেকে এখানে বসতে পেরেছেন। আর নিয়োগ দেন কে? মহামান্য রাষ্ট্রপতি।’ প্রধান বিচারপতিকে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি যাঁকে নিয়োগ দিলেন, তিনি আবার রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা কেড়ে নিতে চাইছেন, যে ক্ষমতা সংবিধান রাষ্ট্রপতিকে দিয়েছে। সেটা দেওয়া হচ্ছে না বলেই যত রাগ আর গোসসা।’ সংসদ সদস্যদের নিয়ে ‘অশালীন’ মন্তব্য করা হয়েছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, এটা তো উচ্চ আদালতের দায়িত্ব না।...জনগণের প্রতিনিধিরাই সংসদ সদস্য। জনগণ হচ্ছে ক্ষমতার মালিক। এ কথাটা ভুললে চলবে না।


প্রধান বিচারপতিকে ‘মানসিক ভারসাম্যহীন’ বলে মন্তব্য করেছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক। তিনি বলেছেন, ‘আমি মনে করি, তিনি (প্রধান বিচারপতি) মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছেন। আমরা মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন করব তাকে পরীক্ষা করানো হোক, ডাক্তার দেখানো হোক, তার মানসিক ভারসাম্য ঠিক আছে কি না। তিনি যেসব কথাবার্তা বলছেন, তাতে পাগল ছাড়া এমন কথা কেউ বলতে পারে না।’

জানা গেছে প্রধান বিচারপতির ওপর নানা ভাবে চাপ সৃষ্টির উদ্যেগ নেয়া হয়েছে। ‘অসদাচরণ’ ও ‘শপথ ভঙ্গ’ প্রমাণে বেশ কিছু অভিযোগ জোগাড় করছে সরকার। আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র জানায়, রায় ও পর্যবেক্ষণ নিয়ে প্রধান বিচারপতির কঠোর সমালোচনা, সমঝোতা বৈঠক ও নানামুখী চাপের মুখে প্রধান বিচারপতি নিজ অবস্থান বদলাতে পারেন বলে মনে করা হচ্ছিল। কিন্তু প্রধান বিচারপতির দেয়া বক্তব্যে তার কোনো ইঙ্গিত বহন না করে উল্টো সরকার ও প্রধানমন্ত্রীকে হুমকি দেয়া হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।


সে জন্য রায় ও পর্যবেক্ষণ প্রত্যাহারে কোনো ধরনের সংলাপ, সমঝোতার দিকে না গিয়ে বিকল্প ব্যবস্থার দিকেই যেতে চান সরকারের নীতিনির্ধারকেরা। এর অংশ হিসাবে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের নেতা ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস প্রধান বিচারপতিকে ২৪ আগস্ট পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়েছেন। এর মধ্যে পর্যবেক্ষণ প্রত্যাহার না করা হলে এক দফা আন্দোলনের দিকে যাবেন বলেও হুমকি দিয়েছেন তিনি।


রায়ের পর্যবেক্ষণ প্রত্যাহারে প্রধান বিচারপতির সাথে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের গোপন বৈঠক ব্যর্থ হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে রাষ্ট্রপতির সাথে দেখা করেন ওবায়দুল কাদের। পরে গত ১৬ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই রাষ্ট্রপতির সাথে দেখা করেন। এ বৈঠকে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক ছাড়াও অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমও উপস্থিত ছিলেন।


ষোড়শ সংশোধনীর রায় ও পর্যবেক্ষণ নিয়ে সৃষ্ট পরিস্থিতি নিরসনে কোন পদ্ধতি অনুসরণ করা যেতে পারে, তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে ওই বৈঠকে। জানা গেছে, ষোড়শ সংশোধনীর রায়ে প্রধান বিচারপতি যেসব পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন অথবা সম্প্রতি যেসব বক্তব্য-বিবৃতি দিয়ে যাচ্ছেন, তাতে স্বীয় পদে থেকে বিচারপতি তার শপথ ভঙ্গ করেছেন কি না, সে বিষয়ে রাষ্ট্রপতির দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে ওই বৈঠকে। এ ছাড়া ষোড়শ সংশোধনীর রায় নিয়ে যে পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে, তা নিরসনে রাষ্ট্রপতি কোনো সমাধান দিতে পারেন কি না, তা নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয় বৈঠকে।


এরপর থেকে আওয়ামীলীগের নেতারা প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে শপথ ভঙ্গের অভিযোগ আনছেন। সরকারের উচ্চ পর্যায়ে সংবিধানের ৯৭ অনুচ্ছেদ নিয়েও বিস্তর আলোচনা চলছে। তবে এসব পদ্ধতি অনুসরণ করার প্রয়োজন পড়লে সে ক্ষেত্রে প্রতিক্রিয়া কী হয়, তা নিয়েও ভাবা হচ্ছে। এসব পদ্ধতি অনুসরণ করা হলে পরবর্তী পরিস্থিতি আরো বেশি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে কি না, তা বুঝে ওঠার চেষ্টা চলছে সরকারের ভেতরে। এই ইস্যুতে সমঝোতার পথ অনেকখানি রুদ্ধ হয়ে পড়েছে। ফলে বিষয়টি মীমাংসার জন্য সরকারের হাতে যে পদ্ধতি রয়েছে, তা অনুসরণ করলে কী পরিস্থিতি দাঁড়াবে, তা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে।’

তবে প্রধান বিচারপতির বিচারিক ‘অসদাচরণ’ ও ‘শপথ ভঙ্গের’ বিষয় নিয়েই এখন সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে আলোচনা হচ্ছে। রাজপথের পাশাপাশি আইনিভাবেও প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার বিরুদ্ধে ‘অসদাচরণের’ কিছু অভিযোগ জোগাড় করছে সরকার। এ ক্ষেত্রে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে তদন্তের জন্য রাষ্ট্রপতিকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দেয়া হতে পারে। কিন্তু এ প্রক্রিয়া কতটা কার্যকর হবে তা নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের মধ্যেও সংশয় রয়েছে।