ঈদুল আজহার গুরুত্ব

Aug 23, 2017 11:08 pm
হজ ও ঈদ উল আজহা

 

সৈয়দ আশরাফ আলী
ঈদ আরবি শব্দ। এর অর্থ হলো আনন্দ। নবী করিম হজরত মুহাম্মদ সা: ঈদকে উৎসব হিসেবে পরিচিহ্নিত করেছেন। তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেছেন, মুসলমানদের জন্য রয়েছে দু’টি উৎসব ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। যে পবিত্র ঘটনাকে স্মরণ করে ঈদুল আজহা প্রতি বছর উদযাপিত হয় তার সূত্রপাত ঘটে আজ থেকে তিন হাজার আটশত বছর আগে। কিন্তু প্রায় চার হাজার বছর আগে ওই অনন্য সাধারণ ঘটনাটি ঘটলেও পবিত্র ঈদুল আজহা আমরা যেভাবে উদযাপন করি তা শুরু হয় বস্তুত ১৩৮৪ সৌর বছর আগে।


মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশে ঐতিহাসিক হিজরত মাধ্যমে মদিনা শরিফে এসে ইসলামের নবী হজরত মুহাম্মদ সা: জানতে পারলেন যে, সেখানকার অধিবাসীরা (যাদের অনেকেই হিজরতের আগে ইসলাম কবুল করে মুসলমান হয়েছিলেন) দু’টি জাতীয় উৎসব পালন করে থাকে। হজরত আনাস রা: থেকে বর্ণিত একটি হাদিস থেকে জানা যায়, পারসিক প্রভাবে শরতের পূর্ণিমায় নওরোজ ও বসন্তের পূর্ণিমায় মিহিরজান নামে উৎসব দু’টি তারা বিভিন্ন ধরনের আনন্দ-আহাদ, খেলাধুলা ও কুরুচিপূর্ণ রঙ তামাশার মাধ্যমে উদযাপন করত। এ দু’টি উৎসবের মূল উদ্দেশ্য ও তাৎপর্য কি তা জানতে চাইলে তারা রাসূলুল্লাহ সা:-কে জানায় যে, ইসলামের আগে জাহিলিয়াতের যুগে তারা এই উৎসব দু’টি এ ধরনের হাসি-মশকরা ও আনন্দ-উল্লাসের মাধ্যমেই উদযাপন করত বিধায় একই প্রথা তাদের মধ্যে তখনো চালু ছিল।
উল্লেখিত উৎসব দু’টির রীতি-নীতি, চাল-চলন, আচার-ব্যবহার ছিল সম্পূর্ণরূপে ইসলাম পরিপন্থী। শ্রেণী-বৈষম্য, ধনী ও দরিদ্রদের মধ্যে কৃত্রিম পার্থক্য, ঐশ্বর্য-অহমিকা ও অশালীনতার পূর্ণ প্রকাশে অযাচিতরূপে দীপ্ত ছিল এ দু’টি উৎসব।


দু’টি উৎসবই ছিল ছয় দিনব্যাপী এবং সেই বারোটি দিন ভাগ করে দেয়া হতো বিভিন্ন শ্রেণীর লোকজনদের মধ্যে। কোনো একটি দিনকে চিহ্নিত করা হতো নওরোজ-এ হাসা কিংবা নওরোজ-এ বুজর্গ হিসেবে শুধু ধনীদের জন্য। সেদিন কোনো দরিদ্রের অধিকার ছিল না নওরোজ উৎসব উদযাপনের। এমনকি শালীনতাবিবর্জিত নর্তকীদের জন্যও একটি দিবস বিশেষভাবে পরিচিহ্নিত হতো। শুধু একটি দিবস আখ্যায়িত হতো নওরোজ-এ-আম্মা হিসেবে সাধারণ মানুষের জন্য। এই নওরোজ-এ-আম্মা ঘৃণার চোখে আমীর-ওমরা, ধনী ব্যক্তিরা বিবেচনা করত। সাধারণ, দরিদ্র, অসহায় মানুষরা কোনোক্রমে এই দিবসটি উদযাপন করত ব্যথা-বেদনা-লাঞ্ছনা মাধ্যমে।


জরথুস্ত্র প্রবর্তিত মিহিরজান নামক উৎসবটিও একইভাবে বিভক্ত রাখা হতো ছয় দিন ধরে। এর মধ্যেও ছিল মিহিরজান-এ-হাসা, মিহিরজান-এ-আম্মা প্রভৃতি দিবসগুলো।
বিশ্ববিখ্যাত মনীষী আল-বিরুনীর বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, একপর্যায়ে নওরোজ ও মিহিরজান উৎসব বিস্তৃতির পরিধিতে ব্যাপ্ত হয়ে পড়ে। ছয় দিনের পরিবর্তে ৩০ দিন ধরে এই উৎসব দু’টি উদযাপিত হতে থাকে। আল-বিরুনীর বর্ণনায় ছয়টি ‘গহনবার’-এর প্রতিটি পাঁচ দিনব্যাপী উদযাপন করা হতো।


কিন্তু ইসলাম তো এই বৈষম্যের, এই শ্রেণীভেদের, এই অশালীনতার স্বীকৃতি প্রদান করে না। প্রেক্ষিতে, শ্রেণী-বৈষম্যনির্ভর, শালীনতাবিবর্জিত, দম্ভ-অহমিকাচ্ছন্ন উৎসব দু’টির বিলুপ্তি ঘটিয়ে বৈষম্য-ভেদাভেদ দূর করার লক্ষ্যে ধনী-দরিদ্রের মহামিলনের প্রয়াসে মহানবী সা: প্রবর্তন করলেন দু’টি উৎসব ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। ব্যথিত ও উদ্বিগ্ন রাসূল সা: এরশাদ করলেন, আল্লাহতায়ালা তোমাদের জন্য এ দু’টি দিবস অপেক্ষা শ্রেয়তর ও মহিমাময় দু’টি দিবস নির্ধারণ করে দিয়েছেন। আর সে পুণ্যময় দিবস হলো ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। অতএব, আগের উৎসব দু’টি বন্ধ করে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার নির্দিষ্ট অনুষ্ঠানাদি পালন করো।
চিরতরে বন্ধ হয়ে গেল আরববাসী তথা মুসলমানদের নওরোজ ও মিহিরজান উৎসব উদযাপন। শ্রেণীবৈষম্য-বিবর্জিত, পঙ্কিলতা ও অশালীনতামুক্ত সুনির্মল আনন্দ উপভোগ শুরু হলো ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার পুণ্যময় দিবস দু’টিতে। জন্ম নিলো সুস্নিগ্ধ, প্রীতি-ঘণ সাম্য, ত্যাগ ও মিলনের উৎসব।


তবে একটি কথা অবশ্যই মনে রাখতে হবে ঈদ শব্দের অর্থ আনন্দ হলেও ঈদুল আজহা বল্গাহীন আনন্দ-উল্লাসের কোনো দিবস নয়। ঈদের সাথে সংযোজিত রয়েছে আরো একটি শব্দ আজহা যার অর্থ হলো ত্যাগ বা কোরবানি। ঈদুল আজহা বয়ে নিয়ে আসে অনুপম, অনন্য সাধারণ ত্যাগের মাধ্যমে অনাবিল আনন্দ। স্বভাবতই ত্যাগাশ্রয়ী আনন্দের এই পুণ্যময় দিবস বহু দেশে ঈদুল কোরবানি ও ঈদুল আল কবির নামেও আখ্যায়িত হয়ে থাকে। কোরবানির এই মহান দিবসকে অনেকে ইয়াম আন-নাহর নামেও অভিহিত করে।
ঈদুল আজহার মর্মকথা হলো তাকওয়া। তাকওয়ার চূড়ান্ত অর্থ হলো মুমিনের সেই সংকল্প যাতে প্রয়োজনবোধে সে তার সব কিছু, এমনকি নিজের জীবনটিও আল্লাহর পবিত্র নামে কোরবানি করতে সদা প্রস্তুত। কুরআন শরিফেও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষিত হয়েছে, ‘আল্লাহর নিকট পৌঁছায় না এর (কোরবানিকৃত পশুর) গোশত ও রক্ত, পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া। (২২:৩৭)


যে কোরবানির সাথে তাকওয়া এবং আবেগ ও অনুভূতি নেই, আল্লাহর দৃষ্টিতে সেই কোরবানির কোনো মূল্য নেই। মহান আল্লাহর কাছে ওই আমলই গ্রহণযোগ্য যার প্রেরণা দেয় তাকওয়া। কুরআন মজিদে এরশাদ হয়েছে, ‘অবশ্যই আল্লাহ মুত্তাকিদের কোরবানি কবুল করেন।’ (৫:২৭)
পবিত্র কাবার পুনর্নির্মাণকারী হজরত ইব্রাহিম খলিলুল্লাহ আ: ও হজরত ইসমাইল যাবিউল্লাহ আ:-এর মহান ও নজিরবিহীন আত্মত্যাগ, সৃষ্টিকর্তার প্রতি তাদের দ্বিধাহীন, অকুণ্ঠ আত্মসমর্পণ মানুষকে শিখিয়েছে যে, এই পার্থিব জীবনের সুখ-শান্তি নিতান্তই ক্ষণস্থায়ী। রাহমানুর রাহিমের সন্তুষ্টি লাভের মাধ্যমে আখেরাতের শান্তিই হচ্ছে অনন্ত, নিরবচ্ছিন্ন, চিরন্তন। পবিত্র কুরআনের ভাষায়, ‘কুল মাতাউদ্দুনিয়া কালিল, ওয়াল আখিরাতু খাইরুল লিমানিত্তাকা, ওয়ালা তুজলামুনা ফাতিলা।’ (৪:৭৭) ‘বল, দুনিয়ার সম্পদ স্বল্পকালের জন্য, পক্ষান্তরে আখেরাত মুত্তাকিদের জন্য উত্তম, সূত্র পরিমাণ তোমরা অবিবেচিত হইবে না।’


পিতা ও পুত্রের (সেই সাথে মাতা বিবি হাজেরারও) অবিস্মরণীয় ত্যাগ-তিতিক্ষা আরো শিক্ষা দেয় যে, আমাদের জীবন-মরণ, সুখ-শান্তি, ব্যথা-বেদনা, আনন্দ-আহাদ, নামাজ-ইবাদত সব কিছুই শুধু আল্লাহতায়ালার জন্য। তাই জবেহ করার সময় পবিত্র কুরআনের ভাষায় উচ্চারিত হয় : ‘কুল ইন্না সালাতি ওয়া নুসুকি
বাকি অংশ ১২ পৃষ্ঠায়
ওয়া মাহইয়া-ইয়া ওয়া মামাতি লিল্লাহি রাব্বুল আলামীন। লা শারিকালাহু ওয়া বিযা-লিকা ওয়া আনা আউয়ালুল মুসলিমীন।’ (৬:১৬২-১৬৩)
এটি দুঃখজনক হলেও সত্য যে, একশ্রেণীর দুর্বলচিত্ত মুসলমান আজকাল বাস্তববিবর্জিত যুক্তি-তর্ক মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করতে চায় যে, মাত্র তিন দিনের মধ্যে লাখো লাখো জীব জবেহ করা একটি বিরাট অপচয়। এই অপচয় না করে কোরবানির জন্য নির্দিষ্ট করে রাখা অর্থ দরিদ্রদের মধ্যে সুষ্ঠুভাবে বিতরণ করা হলে তারা তথা মুসলিম উম্মাহ অধিক উপকৃত হবে।


এই অসার যুক্তি কোনোক্রমেই গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ আমাদের একমাত্র আদর্শ হচ্ছেন সর্বকালের, সর্বযুগের, সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হজরত মুহাম্মদ সা:। তিনি নিজে সর্বদা কোরবানি করেছেন এবং সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোরবানি বর্জনকারীদের প্রতি সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন। হজরত আবু হুরায়রা রা: হতে বর্ণিত, নবী করিম সা: এরশাদ করেন, যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোরবানি করে না সে যেন আমার ঈদগাহে না আসে। (ইবনে মাজা)
অপর একটি বর্ণনা পাওয়া যায় হজরত যায়িদ ইবনে আকরামের রা: কাছ থেকে। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা:-এর সাহাবিরা জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহ রাসূল! এ কোরবানি কী? তিনি বললেন, ইহা তোমাদের পিতা ইব্রাহিম আ:-এর সুন্নত। তারা আবার বললেন, এতে আমাদের কী কল্যাণ নিহিত আছে? তিনি বললেন, এর প্রত্যেকটি পশমের বিনিময়ে একটি করে নেকি রয়েছে। তারা আবার জিজ্ঞাসা করলেন, বকরির পশমেও কি তাই? জবাবে তিনি বললেন, বকরির প্রতিটি পশমের বিনিময়েও একটি করে নেকি আছে। (আহমাদ ও ইবনে মাজা)


উম্মুল মু’মিনীন হজরত আয়েশা রা:-এর বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, রাসূলুল্লাহ সা: বলেন, কোরবানির দিন কোনো ব্যক্তি (কোরবানির পশুর) রক্ত ঝরানোর মতো আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয় ও পছন্দনীয় অন্য কোনো কাজই করতে পারে না। যবেহ করা জন্তু কিয়ামতের দিন তার শিং, পশম ও খুর নিয়ে উপস্থিত হবে। কোরবানির রক্ত মাটিতে পড়ার আগেই আল্লাহর দরবারে তা সন্তুষ্টির মর্যাদায় পৌঁছে যায়। অতএব তোমরা এতে মনের সুখ ও সন্তোষ নিবদ্ধ করো’ (তিরমিযি, ইবনে মাজা)


হজরত আয়েশা রা: থেকে বর্ণিত অপর একটি হাদিসে মহানবী সা: প্রিয় কন্যা হজরত ফাতিমা রা:-কে লক্ষ্য করে বলেন, তুমি ওঠ, তোমার কোরবানির কাছে উপস্থিত হও এবং তা দেখ। কেননা কোরবানির যে রক্ত প্রবাহিত হয় তার প্রতি বিন্দুর বিনিময়ে আল্লাহতায়ালা তোমার অতীত গুণাহ মাফ করে দেবেন। হজরত ফাতিমা রা: বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমাদের নিজ পরিবারবর্র্গের জন্য এটা কি বিশেষ ব্যবস্থা, আমাদের জন্য না সব মুসলমানের জন্য?’ নবী করিম সা: বললেন, না, বরং আমাদের ও সব সাধারণ মুসলমানের জন্য এ ব্যবস্থা।’ (বার্যযার)


প্রেক্ষিতে, এ কথা সহজেই উপলব্ধি হয় যে, ঈদুল আজহা নিছক কোনো আনন্দ উৎসব নয়। কোরবানির শাশ্বত মহামন্ত্রে উদ্বুদ্ধ হয়েই উদযাপন করতে হবে এই ত্যাগ ও মিলনের উৎসব। মনে রাখতে হবে, সাম্য, মৈত্রী, সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ববোধ প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যেই, দৈনন্দিন জীবনে যে হতাশা থাকে তা দূরীকরণের উদ্দেশ্যেই প্রবর্তিত হয়েছে ঈদুল আজহা উৎসব, যে উৎসবে কোরবানির মাধ্যমে প্রদর্শিত হয় আল্লাহ ভীতি। নিজের প্রিয়বস্তু উৎসর্গের মাধ্যমে প্রকাশিত হয় শ্রদ্ধাবনত, নিষ্ঠাবান মানুষের আল্লাহর কাছে পূর্ণ আত্মসমর্পণ। প্রস্ফূটিত হয়ে ওঠে নির্দিষ্ট পশু যবেহর মাধ্যমে আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টির ঐকান্তিক প্রয়াস। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের অনুপম, অতুলনীয় ভাষায় :
ওরে হত্যা নয়, আজ সত্যগ্রহ / শক্তির উদ্বোধন!
দুর্বল ভীরু চুপ রহো ওহে। / খামখা ুব্ধ মন।
ধ্বনি ওঠে রণি দূর বাণীর / আজিকার এ খুন কোরবানীর ।

প্রাণের যা তোর প্রিয়তম আজ যে সেসব আন
খোদার রাহে আজ তাহাদের করবে কোরবান
কি হবে ওই বনের পশু খোদারে দিয়ে
তোর কাম-ক্রোধাদি মনের পশু জবেহ কর নিয়ে।