ভারত সরকার আমাদের সবার পেছনে গোয়েন্দা লাগিয়ে রেখেছে

Sep 04, 2017 01:34 pm
অরুন্ধতী রায়

[অরুন্ধতী রায়ের মতো আর কেউ ভারতের রাষ্ট্রশক্তির কঠোর সমালোচনা করেননি। তার সংগ্রামের সূচনা পোখরান (পরমাণু বোমার বিস্ফোরণস্থল) দিয়ে। এরপর সোচ্চার হন নর্মদা নদীর বাঁধ ইস্যুতে। কয়েক বছরে তার প্রতিবাদী ভূমিকা বিস্তৃত ছিল জনগণের আন্দোলন ও বিদ্রোহের নানা বিষয়ে এবং গোপনে তৎপর মাওবাদীদের ক্ষেত্রে। ভারতের সরকার, এলিট শ্রেণী, করপোরেট দানব এবং ইদানীং বিশ্ব অর্থ ও পুঁজিবাদের পুরো কাঠামোর বিরুদ্ধে অরুন্ধতী কলম চালিয়েছেন। আদালতের কথিত অবমাননার দায়ে তিনি ২০০২ সালে এক দিনের জেল খেটেছেন। ২০১০-এর নভেম্বরে অরুন্ধতীর নামে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা ঠুকে দেয়া হয়। কারণ তিনি আরো ক’জনের সাথে দিল্লিতে এক সেমিনারে বক্তব্য দিয়েছিলেন।

কাশ্মিরের ওপর আয়োজিত এই অনুষ্ঠানের বিষয় ছিল, আজাদি বা স্বাধীনতাই একমাত্র পথ। ইংরেজি সাহিত্যের সেরা পুরস্কার হিসেবে গণ্য, বুকার পুরস্কার অর্জন করে অনেক আগে থেকেই অরুন্ধতী আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সুপরিচিত। আমেরিকার নোয়াম চমস্কি, ব্রিটেনের রবার্ট ফিস্ক ও ইসরাইলের উরি আভনারির মতো ভারতের অরুন্ধতী রায় স্বৈরতন্ত্র, সাম্রাজ্যবাদ ও করপোরেট বিশ্বায়নের বিরুদ্ধে সর্বদাই সরব। অন্যদিগন্তের পাঠকদের জন্য এখানে দেয়া হলো অরুন্ধতীর একটি সাক্ষাৎকারের অংশবিশেষ। নিয়েছেন পানিনি আনন্দ। বাংলায় ভাষান্তর করেছেন মীযানুল করীম।]

 

প্রশ্ন : রাষ্ট্রদ্রোহিতা, বেআইনি কার্যকলাপ (প্রতিরোধ) আইন বা ইউএপিএ কিংবা সশস্ত্রবাহিনীর বিশেষ ক্ষমতা আইনের (এএফএসপিএ) মতো বিধানগুলোকে আপনি কোন দৃষ্টিতে দেখছেন? এসব আইন এমন এক দেশে প্রচলিত রয়েছে যাকে ‘বৃহত্তম গণতন্ত্র’ বলতে বলতে বিরক্ত করে ফেলা হচ্ছে।
অরুন্ধতী : ভারতের গণতন্ত্র সম্পর্কে আপনার এমন কথা শুনে আমি খুব খুশি। নিঃসন্দেহে এটা মধ্যবিত্তের গণতন্ত্র। কাশ্মির, মনিপুর বা ছত্তিশগড়ের মতো জায়গাগুলোতে গণতন্ত্র পাওয়া যায় না। কালোবাজারেও গণতন্ত্র থাকে না। ইউএপিএ হলো, সন্ত্রাস প্রতিরোধ আইন বা পোটার নব্য সংস্করণ। এটা করেছে বর্তমান ইউপিএ সরকার। আর এএফএসপিএ তো স্বেচ্ছাচারিতাপূর্ণ। এসব কালাকানুন পুরোপুরি দায়মুক্তি ভোগ করে জনগণকে বন্দী রাখা, এমনকি হত্যার সুযোগ দিচ্ছে সরকারকে। গণতন্ত্রে এ ধরনের কোনো আইনের জায়গা থাকা উচিত নয়। তবে যদ্দিন এসব কিছু মূল ধারার মধ্যবিত্ত শ্রেণীর অসুবিধা সৃষ্টি করছে না, যে পর্যন্ত এই আইনগুলো মনিপুর, নাগাল্যান্ড বা কাশ্মিরের জনগণের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয় কিংবা দরিদ্র জনগোষ্ঠী অথবা মুসলিম ‘সন্ত্রাসবাদী’রা হয় এর টার্গেট, তত দিন মনে হয় না যে, কেউ এসব আইন নিয়ে ভাবে।


প্রশ্ন : জনগণ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে, নাকি রাষ্ট্র নিজের জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছে? সত্তরের দশকের জরুরি অবস্থা সম্পর্কে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি কী? আগে শিখরা, এখন মুসলমানেরা অনুভব করে যে, তারা টার্গেটে পরিণত হয়েছে। সংখ্যালঘুদের এ অবস্থার ব্যাপারে কী মনে করেন?
অরুন্ধতী : কিছু লোক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত। অপর দিকে রাষ্ট্র যুদ্ধ করছে তার নাগরিকদের বেশির ভাগের বিরুদ্ধে। সত্তরের দশকের জরুরি অবস্থা সঙ্কটের জন্ম দিয়েছিল। কারণ ইন্দিরা গান্ধীর সরকার এত বোকা ছিল যে, তারা টার্গেট করেছিল মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীকে। নিম্নবিত্ত আর নাগরিক অধিকারহারা লোকজনের পর্যায়ে মধ্যবিত্তকে নামিয়ে ফেলা ছিল সে সরকারের বোকামি। এখন এ দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল আরো অনেক কঠোর জরুরি অবস্থার মতো পরিস্থিতির কবলে।

অবশ্য এই ‘জরুরি অবস্থা’ ঝালাই-সারাই, মেরামত ও মোছামুছির জন্য ওয়ার্কশপে পাঠানো হয়েছিল। সেখান থেকে আরো স্মার্ট-চটপটে, আরো দক্ষ ও কর্মক্ষম হয়ে এটা বেরিয়ে এসেছে। ভারতীয়রা সার্বভৌম জাতি হওয়ার পর থেকে ভারত সরকার যেসব যুদ্ধে নিয়োজিত, সেগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখুন। নিজের জনগণের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীকে ডাকার দৃষ্টান্তগুলোর প্রতি নজর দিন। যেমন নাগাল্যান্ড, আসাম, মিজোরাম, মনিপুর, কাশ্মির, তেলেঙ্গানা, গোয়া, বাংলা, পাঞ্জাব ও (শিগগিরই) ছত্তিশগড়। ভারত এমন এক রাষ্ট্র, যে অবিরাম যুদ্ধে লিপ্ত। আর ভারত রাষ্ট্র সর্বদাই উপজাতীয় লোকজন, খ্রিষ্টান, মুসলিম, শিখ প্রভৃতি সংখ্যালঘুর বিরুদ্ধে; তবে কখনো মধ্যবিত্ত ও উচ্চবর্ণ হিন্দুর বিপক্ষে নয়।


প্রশ্ন : রাষ্ট্র যদি চরম বামপন্থী ‘সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীগুলো’র বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেয়, সন্ত্রাসের দুষ্টচক্র কিভাবে ভাঙা যাবে?
অরুন্ধতী : মনে করি না যে, সন্ত্রাসবাদীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া অনুচিত এমন উপদেশ কেউ দিচ্ছেন। এমনকি ‘সন্ত্রাসবাদী’রা নিজেরাও তা দেয় না। কাজের আইনগত বা অন্যবিধ পরিণাম কী দাঁড়াবে, তা পুরো জেনেই তারা যা করার করছে। তারা তো সন্ত্রাসবিরোধী আইন বাতিল করতে বলছে না। যে সিস্টেম অবিচার-অসাম্য তৈরি করে, এর পরিবর্তনের জন্য ওরা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটাচ্ছে, লড়ছে। তারা নিজেদের ‘সন্ত্রাসবাদী’ মনে করে না। আপনি কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়াকে (মাওবাদী) সন্ত্রাসবাদী হিসেবে অভিহিত করলেও