বিশ্বের কাছে এক রোহিঙ্গা কৃষকের আহবান

Sep 10, 2017 11:46 pm
মোহাম্মদ

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের বুতিদং শহরের বাসিন্দা মোহাম্মদ সোয়ে। ১২ দিন আগে তিনি জীবন বাঁচাতে শহর ছেড়ে পালিয়ে এসেছেন বাংলাদেশে। চট্টগ্রামের একটি উদ্বাস্তু শিবিরে বসে আলজাজিরার প্রতিনিধি কেটি আর্নল্ডের কাছে বর্ণনা করেছেন তাদের জীবন, বর্তমান পরিস্থিতি ও বিশ্ববাসীর প্রতি রোহিঙ্গাদের আকুতি-

আরো অনেক রোহিঙ্গার মতো আমিও ছিলাম বুতিদংয়ের একজন কৃষক। সেখানে আমাদের পছন্দমতো পেশা গ্রহণ কিংবা শিক্ষার অধিকার ছিল না। পুলিশ, সেনবাহিনী কিংবা উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন কোনো পেশায় আমাদের চাকরির সুযোগ ছিল না। আমরা কৃষিখামারে কাজ করতাম কিংবা জঙ্গল থেকে বাঁশ সংগ্রহ করতাম। তবু কোনো মতে দিন পার করতাম; কিন্তু দুই দিন আগে সেনাবাহিনী ও স্থানীয় বৌদ্ধরা আমাদের গ্রামে এসে আমাদের ওপর এলোপাতাড়ি গুলি চালাতে শুরু করে। একের পর এক ঘরবাড়িতে আগুন দিতে থাকে তারা। মুখে গুলি লেগে ঘটনাস্থলেই নিহত হয় আমার ভাই। আমরা বাকিরা বাধ্য হই পালাতে, ধরতে পারলে আমাদেরও মেরে ফেলত। অজানার উদ্দেশ্যে চলতে লাগলাম আমরা। টানা ১০ দিন হাঁটার পর বাংলাদেশে এসে পৌঁছলাম।

আমার মা ৮০ বছরের বৃদ্ধ। তিনি প্যারালাইসিস ও অ্যাজমা রোগী। পুরো ১০ দিনের পথ তাকে কাঁধে নিয়ে হেঁটে এসেছি। পথে আমরা তিনটি নদী পাড়ি দিয়েছি নৌকায় আর বাকি পথ হাঁটা ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। যেকোনো সময় সেনাবাহিনীর সামনে পড়ার ভয় ছিল, যারা দেখলেই গুলি করবে। জঙ্গলে যেখানে ঘুমিয়েছি সেখানে ছিল অনেক বন্য পশুর আনাগোনা। এমন আরো অনেক বাধা পেরিয়ে পথ চলতে হয়েছে, কিন্তু জীবন বাঁচানোর তাগিদে সব কিছু তুচ্ছ করে এগিয়ে চলেছি। অবশেষে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে পৌঁছেছি। বাংলাদেশে এসে আপাতত অনেকটা স্বস্তিতে আছি। বাড়ি ফিরে গেলে যেকোনো সময় নিহত হতে পারি। তাই এখানে জীবন নিরাপদ। কিন্তু বাংলাদেশ আমাদের জন্য সম্পূর্ণ নতুন। এ দেশের কিছুই আমরা চিনি না, আমরা অশিক্ষিত, এখানে কী করার অনুমতি পাবো তাও জানি না। কাজেই মিয়ানমারে শান্তি ফিরে এলে দেশে ফিরে যাওয়াকেই বেছে নেবো আমরা।

আমি জানি সারা বিশ্বই দেখছে রোহিঙ্গাদের এ দুরবস্থা, কিন্তু কেউ মিয়ানমার সরকারকে আমাদের বিরুদ্ধে সহিংসতা বন্ধে চাপ দিচ্ছে না। তারা যেকোনো সমাধানে আসতে চায় না সেটি নিশ্চিত, না হয় এত দিনে তার পদক্ষেপ দেখতে পেতাম। কিন্তু কেন বিশ্ব সম্প্রদায় তাদেরকে চাপ দিচ্ছে না? বিশ্বাবাসীর কাছে বলতে চাই, সব মানুষ সমান। ধর্ম আমাদের মধ্যে ভেদাভেদ সৃষ্টি করে না। বৌদ্ধরা ও আমরা একই রক্ত-মাংসের তৈরি। কাজেই তারা যদি মিয়ানমারে নিরাপদে ও শান্তিতে বাস করতে পারে, আমরা কেন পারব না? আমরা সবাই মানুষ, সমান অধিকার নিয়েই জন্ম নিয়েছি।

ভাষান্তর : আহমেদ বায়েজীদ