শাকিরার পূর্বপুরুষ কী মুসলমান ছিলেন

Sep 22, 2017 02:16 pm
শাকিরা


মাহমুদ শুকাইর
অনুবাদ : নাজিব ওয়াদুদ

শাকিরার ছবি

এবার দিয়ে সাতবার হলো আমার চাচাতো ভাই ইসরাইলি অভ্যন্তরীণ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ফটকে লাইনে দাঁড়াল। উদ্দেশ্য কিছু কাগজপত্র নবায়ন করা। সেগুলো ছাড়া এয়ারপোর্ট দিয়ে বিদেশে যাওয়া যাবে না। সে সাধারণত ভোর ছ’টায় পৌঁছে। কিন্তু ততক্ষণে লম্বা লাইন পড়ে যায়। কেউ কেউ তো মধ্যরাতে গিয়ে লাইনে দাঁড়ায়। সুতরাং সে শেষ পর্যন্ত একটা ইসরাইলি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শরণাপন্ন হলো। প্রতিষ্ঠানের পরিচালক মহোদয় একবার চেষ্টা করতে চাইল। ভবনে ঢোকার জন্য একটা অ্যাপয়েন্টমেন্টের ব্যবস্থা করল সে। এই সুযোগ অর্জন করতে জেরুসালেমের লোকদের বছরের পর বছর দুর্ভোগ পোহাতে হয়।


এবার আমার জ্ঞাতি অভ্যন্তরীণবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দফতরে পৌঁছল খুবই আত্মবিশ্বাস নিয়ে। সত্যি বলতে কি, সেখানে একগাদা লোককে অসভ্যের মতো পরস্পরকে ঠেলাঠেলি করতে দেখে তার সব আশা-ভরসা উবে গিয়েছিল। দু’জন যুবক যেভাবে সবাইকে ঠেলে এগিয়ে যেতে চাচ্ছিল! কোনো রকমে তাদের গুঁতো থেকে নিজেকে রক্ষা করল। সে গোলমাল এড়াতে চাচ্ছিল। তাই যুবক দু’টিকে তাদের ইচ্ছেমতো কাজ করায় বাধা দিলো না। সে তার দুর্ভোগের কথা আমাকে ছাড়া আর কাউকে বলেনি। কারণ সে চাচ্ছিল তার প্রতিবেশীরা জানুক যে, সে একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, এবং তার জন্য সব দুয়ার খোলা।


জানালার লোহার শিকের ওপার থেকে প্রহরীর চিৎকার ভেসে এলো : ‘তালহা শাকিরাত!’
আমার জ্ঞাতি তৎক্ষণাৎ জবাব দিলো : ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ! এই যে, আমি, আমি তালহা শাকিরাত।’
প্রহরী দরোজা খুলে ধরল। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে প্রতীক্ষারত জনতার মধ্যে ঈর্ষা সৃষ্টি করে আমার জ্ঞাতি আত্মবিশ্বাসের সাথে প্রবেশ করল। প্রহরী তার দিকে এক মুহূর্ত তাকিয়ে বলল, ‘শাকিরাত! তুমি কি শাকিরাকে চেনো?’
আমার জ্ঞাতি মুহূর্তের দ্বিধা সরিয়ে বলল : ‘অবশ্যই। সে আমাদের পরিবারের মেয়ে।’


প্রহরী বেশ প্রভাবিত হলো। বলল, ‘আমি তার একজন ফ্যান, আমি তার গান পছন্দ করি, তুমি কি তা জানো?’
‘কিভাবে জানব?’ সে উত্তর করল। ‘তবে আমি আপনাকে তার কিছু গান উপহার দিতে পারি। সে কয়েক সপ্তাহ আগে আমার কাছে পাঠিয়েছে।’ আমার জ্ঞাতি প্রহরীর সাথে হ্যান্ডশেক করার জন্য হাত বাড়াল, প্রহরীও তার হাত এগিয়ে দিলো, বলল, ‘আমি রনি।’
‘আর আমি তালহা শাকিরাত,’ আমার জ্ঞাতি বলল। তারপর সে ভবনের সিঁড়ির দিকে এগুলো, তার আনন্দ লাগছিল এই ভেবে যে, শাকিরার সাথে সম্পর্কের ব্যাপারটা তার কাজে লেগেছে। সে তার দাদা শাকিরাতের প্রতি কৃতজ্ঞ, এ জন্য যে, তার নামটা এই রকম, নইলে শাকিরার সাথে তার সম্পর্ক এতটাই দূরের যে, তা দিয়ে অভ্যন্তরীণবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রহরীর সাথে সম্পর্ক গড়া এতটা সহজ হতো না, আর এখানে পৌঁছতেও পারত না। সে স্বপ্নও দেখেনি।


আমার জ্ঞাতি এই সম্পর্কের ওপর তার আশাকে সংস্থাপন করেছে, কারণ অভ্যন্তরীণবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সেবা তার খুব দরকার, পরিবারের অন্য সদস্যদের মতো।
এখন একজন প্রহরীর সাথে আমার জ্ঞাতির প্রকাশ্য সম্পর্ক সৃষ্টি হয়েছে (হ্যাঁ প্রকাশ্য ব্যাপারটার ওপর আমার জ্ঞাতি জোর দিচ্ছে, কারণ সে চায় না কেউ বলুক যে, দখলদারদের সাথে কোনো গোপন যোগাযোগ আছে তার), এটা তার জন্য একটা সুযোগ সৃষ্টি করেছে, সে এমন একজন ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছে যে কিনা অভিযোগ করতে পারছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বাইরে তার আত্মীয়স্বজন এবং বন্ধুবান্ধব অব্যাহতভাবে হয়রানির শিকার হয়ে চলেছে।


আমার ভাইটি একটি মিনিটও নষ্ট করল না। ভবন ত্যাগ করার সাথে সাথে সে নিকটস্থ দোকানে গেল এবং শাকিরার সর্বসাম্প্রতিক গানের ক্যাসেট কিনল। সেগুলোকে খুব যত্ন করে বাড়ি নিয়ে গেল সে। কয়েক ঘণ্টা ধরে শেষ পর্যন্ত গানগুলো শুনল, এবং তারপর তার পিতাকে বলল, এই গায়িকা তাদের পরিবারের একজন মেয়ে। খবরটা শুনে সাথে সাথেই অসন্তোষ প্রকাশ করলেন চাচা। কারণ কেউ তার পরিবারের সুনাম সম্পর্কে কটাক্ষ করবে তা তার অসহ্য। যা-ই হোক, এর ফলে যে অবাক কাণ্ড ঘটেছে পিতাকে সে গল্প শুনিয়ে ব্যাপারটার মীমাংসা করতে সচেষ্ট হলো আমার জ্ঞাতি (বলা বাহুল্য, আমার চাচাও কয়েক মাস যাবৎ চেষ্টা করে চলেছেন অভ্যন্তরীণবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে ঢোকার জন্য)।

সেই প্রহরী রনির কথা শোনাল, বলল, সে শাকিরার ফ্যান। সে এ কথা বলতেও ভুলল না যে, শাকিরা সঙ্গীত জগতে বিরাট সাফল্য অর্জন করেছে এবং শাকিরাত পরিবার এই সম্পর্ককে ব্যবহার করে ফায়দা পেতে পারে। আমার চাচা অনুধাবন করতে পারলেন যে, যা তিনি শুনলেন তা যদি সত্যি হয় তাহলে কিছু লাভ হতেও পারে। তখন তিনি ঘাড় উঁচু করে তার ছেলের কাছে শাকিরা সম্পর্কে আরো তথ্য জানতে চাইলেন, বংশতালিকা সম্পর্কে যতটুকু তিনি জানেন তার সাথে সেসব তথ্য মিলিয়ে নিতে চাইলেন। কিছু দ্রুত পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর আমার চাচা তার গেস্টরুমে আসীন প্রতিবেশীদের নিশ্চিত করলেন যে, শাকিরার দাদা সত্যি সত্যিই শাকিরাত বংশের সদস্য ছিলেন, আল্লাহ তাকে মাগফিরাত দান করুন! পৈতৃক সম্পত্তি নিয়ে গোলযোগকে কেন্দ্র করে তিনি তার ভাইদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করেছিলেন। তিনি লেবাননে চলে গিয়েছিলেন। সেখানে প্রেমে পড়েছিলেন এক খ্রিষ্টান সুন্দরী মেয়ের, ধর্মান্তরিত হয়ে তাকেই বিয়ে করেছিলেন। তিনি হজরত ঈসা আলাইহিস সালামের ধর্ম প্রতিপালন করতেন। তাদের সন্তানদেরই একজন শাকিরার পিতা। যদি শাকিরা গান গেয়ে এই বিস্ময়কর খ্যাতি অর্জন না করত তাহলে শাকিরাত বংশের এই শাখাটি অজ্ঞাতই থেকে যেত, আমাদের প্রতিবেশীরা তার সম্পর্কে কিছুই জানতে পারতেন না।


প্রতিবেশীরা শাকিরা সম্পর্কে চুলচেরা বর্ণনা করতে লাগল। আমার চাচা বিব্রত বোধ করতে লাগলেন। মেয়েটিকে একটা চরিত্রহীনা হিসেবে চিত্রিত করা হতে লাগল, সম্ভবত এই জন্য যে তার বসবাস পৃথিবীর পশ্চিম গোলার্ধে (‘সে দেশের নাম কলম্বিয়া, জনাব!’ আমার চাচা বলতেন, যেন কিছুটা গর্জনের সুরে)। এই অভিশপ্ত মেয়েটি যদি এখানে বাস করত, আমাদের এই প্রতিবেশে, তাহলে আমার চাচা তাকে প্রায়-উলঙ্গ অবস্থায় নাচতে-গাইতে দিতেন না। আমার চাচা বিশ্বাস করতেন না যে শাকিরা উলঙ্গপ্রায় অবস্থায় টেলিভিশনে আসে। তিনি টেলিভিশন দেখেন না, কিন্তু অনেকেই তাকে বলেছে যে তারা শাকিরাকে ছোট পর্দায় দেখেছে, উন্মুক্ত পেট, পা দুটো ডায়মন্ডের মতো উজ্জ্বল। সেসব কথা শুনে অবিশ্বাস করার দুঃসাহস হতো না তার। কিন্তু কোনো না কোনোভাবে আলোচনার মোড় ঘুরিয়ে দিতে চেষ্টা করতেন নাচ-গান থেকে সুন্দর অতীতের স্মৃতিচারণের দিকে। তিনি শাকিরার দাদার সাহসের কথা বলতেন, কিভাবে তিনি এক সন্ধ্যায় একটা হায়েনার সম্মুখে পড়েও ভয় পাননি, বরং তাকে হত্যা না করা পর্যন্ত লড়াই করেছেন জন্তুটার সাথে, তারপর তার চামড়া ছাড়িয়ে এনে সামান্য দামে বিক্রি করেছেন।


যখন চাচা একেবারে একা থাকতেন তখন প্রতিবেশীদের কথা নিয়ে ভাবতেন। তারা সত্যি সত্যিই তাকে প্রায়-উলঙ্গ অবস্থায় নাচতে না দেখলে সে কথা বলত না। ব্যাপারটা নিয়ে তিনি তার ছেলের সাথে আলোচনা করতেন এবং কখনো কখনো শাকিরাকে কঠোর ভাষায় অভিশাপ দিতেন। আমার জ্ঞাতি সাহস করে বলতে পারেনি যে আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্টের ছেলের সাথে শাকিরার প্রেম চলছে। সে কথা জানতে পারলে চাচা সম্ভবত তার বাড়ির দেয়ালে টাঙানো শাকিরার ছবিটা ফেলে দিতেন। ছবিটা কিনে এনেছিল আমার জ্ঞাতি। ছবিটা ছাপা হয়েছিল একটা সংবাদপত্রে। সেটা একজন ফটোগ্রাফারের কাছে নিয়ে গিয়ে বড় আকারে প্রিন্ট করিয়ে নিয়েছে সে। ছবিটা সে গেস্টরুমে টাঙাতে চেয়েছিল। কিন্তু চাচা রাজি হননি। বলেছেন, ‘সেটা একটা বাড়াবাড়ি হবে। কেননা গেস্টরুমে বিভিন্ন জায়গা থেকে সব সময় বাইরের লোক আসে, সেখানে আমাদের মেয়েদের ছবি ঝুলবে তা মেনে নেয়া যায় না।’


আমার জ্ঞাতি আর কথা না বাড়িয়ে সেটা মেয়েদের একটা ঘরে টাঙিয়ে দিয়েছে। চাচা সেটা করতে দিয়েছেন। (সেটা সম্ভবত এই আশায় যে, জর্ডানে যাওয়ার অনুমোদনসম্পন্ন একটা পরিচয়পত্র পেতে এটা কাজে লাগবে। ইসরাইলিরা জেরুসালেম দখল করার পর তিনি যে পরিচয়পত্র পেয়েছিলেন সেটা সম্প্রতি হারিয়ে গেছে।) কিন্তু তিনি ছবিটার অংশবিশেষ একটা শাল দিয়ে ঢেকে দিয়েছেন, শাকিরার চুল ও উন্মুক্ত কাঁধ আড়াল করতে। তিনি এটা করেছেন শাকিরা এবং তার বংশের সুনাম রক্ষা করার জন্য, আর যেসব মেয়ে বাইরে থেকে আসে তারা যেন ফিরে গিয়ে বাজে কথা না ছড়ায়।


এটাই শাকিরার একমাত্র ছবি নয়। আমার জ্ঞাতির অফিস এই তরুণী গায়িকার ছবিতে ছয়লাব। আমি মাঝে মধ্যে বেড়াতে গিয়ে দেখেছি। মুসাফাহ করার জন্য হাত বাড়িয়ে আমি তার দিকে এমন অভিযোগের দৃষ্টিতে তাকাতাম যেন সে কুকুর, আর সে আমার দিকে এমনভাবে তাকাত যেন আমি আমি একটা গর্দভ। সে বলত : ‘তুমি একেবারেই সেকেলে মানুষ। কেন তুমি সময়ের সাথে একটু তাল মিলিয়ে চলো না? সময় বদলে গেছে, আমরা এখন ইন্টারনেট এবং বোমার যুগে বাস করছি ভায়া!’ তার অফিস এমন সব জিনিসপত্রে ভর্তি যা আধুনিকতার পরিচায়ক। সে যখন টেলিফোনে অনবরত কথা বলে চলে তখন আমি ডেস্কে কম্পিউটারের মনিটরে কী ঘটে চলেছে তা বুঝতে চেষ্টা করি। কিন্তু আমি কিছুই শিখিনি, মাঝে মধ্যে সে ঘৃণ্য ভঙ্গিতে হেসে উঠত, তারপর মনিটরের দিকে তাকাত। সম্ভবত আমার সাথে কথা না বলা বা আমার প্রশ্নের উত্তর এড়ানোর জন্য এ রকম করত সে।


আমার জ্ঞাতির এ রকম অনেক সম্পর্ক ছিল, তার বিশ্বাস এগুলো তার কাজে লাগবে। উদাহরণস্বরূপ, যখন আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্টের ছেলের সাথে শাকিরার প্রেমের খবরটি ছড়াল তখন তা এক মুহূর্তের বেশি আমার মনে ঠাঁই পায়নি। কিন্তু আমার চাচাতো ভাইটি সাথে সাথে ইন্টারনেট নিয়ে বসে পড়েছে। উদ্দেশ্য এটাকে ভবিষ্যতে কাজে লাগানোর উপায় বের করা। ‘এই ছোট্ট খবরটা দিয়ে শুরু করে,’ সে আমাকে বলল, ‘আমি আর্জেন্টিনার সাথে গভীর সম্পর্ক স্থাপন করব। কোনো আর্জেন্টিনীয় কোম্পানির স্থানীয় এজেন্ট হওয়ার সর্বাত্মক চেষ্টা চালাব, এবং একদিন আমি গোটা পূর্ব আরবে আর্জেন্টিনার অনারারি কনসাল বনে যাব!


আমি বিদ্রপাত্মক হাসি হাসতাম, সে-ও হাসত এবং আমাকে মুখ ভেংচে বলত : ‘তুমি নেহাতই একটা নির্বোধ!’ (অবশ্য এর মাধ্যমে সে আমাকে গর্দভ বলতে চাইত)।
আমার জ্ঞাতির মাথায় অদ্ভুত অদ্ভুত সব চিন্তার উদয় হতো। সে একবার আমাকে চ্যালেঞ্জ করে বলল : ‘আমি আমার বাড়িতে দশজন পুরুষ এবং দশজন মহিলাকে লাঞ্চের জন্য দাওয়াত করতে পারি। আমি তাদের শূন্য প্লেটে শূন্য পাত্র থেকে খাবার পরিবেশন করব। তারা পরিতুষ্টির সাথে খাবে এবং বাড়ি ফিরে অতিভোজনের জন্য অজীর্ণতে ভুগবে!’


তার বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তি ও আধুনিক কালের গতিপ্রকৃতির ওপর তীক্ষন নজরদারির বড়াই করে সে বলে : ‘যা সব বাস্তবতা তোমার প্রয়োজন তার সব তুমিই সৃষ্টি করতে পারো এবং একই সাথে এসব বাস্তবতার প্রতি মানুষের বিশ্বাস জন্মাতে পারো। এসব বাস্তবতাকে স্পর্শ করা যায় না বা এর অস্তিত্ব বৈষয়িক জিনিস দিয়ে প্রমাণ করা যায় না! গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, পার্থিবতা সম্পর্কে তোমার বিচারবোধ, দক্ষতা ও বিচক্ষণতা থাকতে হবে।’ বিশেষ কারণে আমি আমার জ্ঞাতির সাথে এ নিয়ে বাজি ধরা এড়িয়ে চলি।


অবশ্য আমার চাচা বাজি ধরলেন। তিনি নিশ্চিত যে, রনি, সেই প্রহরী, তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনাই জানাবে। তিনি তখন তাকে শাকিরার দাদার গল্প শোনাবেন। বলবেন যে, বংশের এই ধারাটি অনেক দিন ধরে সঙ্গীতপ্রেমিক ও গান-পাগল হিসেবে পরিচিত। সে কারণে শাকিরার নাচগানের অসম্ভব প্রতিভা কোনো আশ্চর্যের বিষয় নয়। যদি সময় হয়, অর্থাৎ রনি সময় দেয়, তাহলে তিনি তার নিজের সাথে শাকিরার দাদার সম্পর্কের বিষয়টি তুলে ধরবেন। চাচা বাজি ধরলেন, তিনি নিশ্চিত যে একটা নতুন পরিচয়পত্র এবার পাচ্ছেন, আম্মানে যেতে পারছেন একটা জর্ডানি অনুমতিপত্র জোগাড় করতে, এবং স্পেন ভ্রমণে যেতে পারছেন। সেখানে কয়েকটা সপ্তাহ কাটাবেন তিনি। চাচা কথাগুলো এমন গর্বের সাথে বলেন যে লোকেদের মধ্যে কৌতূহল জাগে।

তিনি বলেন : ‘আমি আমাদের মেয়েকে দেখতে স্পেনে যাচ্ছি!’ প্রতিবেশীরা জানে যে তার সব ক’টি মেয়ে এখানেই থাকে, কাছেই। তাই তারা সাথে সাথে জিজ্ঞেস করে : ‘আপনাদের এই মেয়েটা কে?’ ‘শাকিরা!’ তিনি গর্বের সাথে উত্তর দেন, ‘স্পেনে তার একটা মনোরম বাড়ি আছে। প্রত্যেক বছর কয়েক মাস সেখানে বাস করে সে।’


চাচা শাকিরার সাথে দেখা করেই সন্তুষ্ট হবেন না (যদিও পরিবারের সদস্যদের সামনে তাকে ‘বাজে মেয়ে’ আখ্যায়িত করে বলেন, ‘নর্তকী কোথাকার!’), কারণ তিনি হজ পালনের জন্য হিজাজে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে এ জন্য অপো করছেন। আমার চাচা ধর্মীয় নির্ধারিত কোনো দায়িত্ব পালনে কখনো ত্র“টি করেন না। যেমন প্রত্যেক দিন পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করেন। অবশ্য যৌবনে কিছু পাপ করেছেন বলে অনুশোচনা হয় তার। একবার ব্যবসায় হাত লাগিয়েছিলেন। জলপাই তেলের মৌসুমে গ্রামে গিয়ে পঞ্চাশ ক্যান তেল কিনতেন। বিশেষ গুদামে সেগুলো মজুদ করে রাখতেন। আর যখন বিক্রির জন্য বের করতেন তখন তা এক শ’ ক্যানে পরিণত হতো (প্রতারণার চতুর কৌশল ছিল তার)। তিনি জানতেন বিক্রির সময় লোকেরা জিজ্ঞেস করবে সেটা খাঁটি কি না, তাই গোপনে ঘাড়ে জলপাইয়ের তেল লাগিয়ে ডলতে ডলতে কসম খেয়ে বলতেন : ‘আমার ঘাড়ের কসম, এটা খাঁটি জলপাই তেল!’ তারা তাকে বিশ্বাস করত। চাচা আমার কাছে এই গোপন কথা প্রকাশ করেছিলেন তার অপরাধবোধ কাটানোর জন্য, এবং বলেছিলেন : ‘আমি হজ করব যেন খোদা আমার পাপ মার্জনা করেন।’


চাচা অন্য পাপও কিছু করেছিলেন। এক দিন ভোরে তিনি দুধওয়ালীর ডাকে বাড়ির দরজা খুলেছিলেন। মেয়েটির ছিল দিঘল, চমৎকার দেহবল্লরী, বিশেষ কোনো কিছু জিজ্ঞেস না করে তিনি তার বুকের দিকে হাত দিলেন। দুধওয়ালী পেছনে সরে গিয়ে বলল, ‘কী নির্লজ্জ, জঘন্য মানুষ আপনি!’ চাচা বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে ভাবতে লাগলেন, পরকালে কোন মুখে তিনি প্রভুর সামনে দাঁড়াবেন? আর তার অবস্থাই বা কী হবে যখন দাফন-কাফনের পর দুই ফেরেশতা তার পাপের কথা উল্লেখ করে প্রশ্ন করবে : ‘বলো, কেন সেই দুধওয়ালী তোমাকে জঘন্য বলে গাল দিয়েছিল?’ তার এই পাপের কথা চাচা বলেননি, আমি এটা শুনেছি তার বয়সী লোকদের কাছে। তিনি জোর দিয়ে বলতেন, তিনি আর কোনো পাপ করেননি। কিন্তু তার আরো পাপের কথা শোনা যায়।


যথেষ্ট সতর্ক মানুষ হওয়া সত্ত্বেও আমার চাচা এই বাজি ধরেছিলেন। একাধিকবার আমি তাকে তার ছেলের দ্রুত যশ ও সম্পদ লাভের উচ্চাকাক্সার কথা শুনে অবাক হতে দেখেছি। তিনি তাকে পরামর্শ দিতেন : ‘শোন বাপ, ধীরে চল! তড়িঘড়ি হলো শয়তানের কুমন্ত্রণা।’ কিন্তু এইবার, চাচা কেন যেন তার সতর্কতাকে ফুঁ মেরে বাতাসে উড়িয়ে দিলেন এবং বাজি ধরলেন। একদিন ভোরে ছেলেকে সাথে নিয়ে তার পরিচয়পত্র নিতে গেলেন অভ্যন্তরীণবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে। আমি তাদের সাথে গিয়েছিলাম, কৌতূহল চাপতে না পেরে। আমরা গেলাম ভোরেই, তবে একটু দেরি করে, কারণ আমার জ্ঞাতির স্থির বিশ্বাস যে রনি, সেই প্রহরী, আমাদের দেখেই ছুটে আসবে এবং সাথে সাথে লোহার প্রধান ফটকটা আমাদের জন্য খুলে ধরবে। আমরা ভবনে পৌঁছে খুব আহত হলাম। দেখলাম সূর্যের নিচে গরমের মধ্যে ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে এক দঙ্গল মানুষ। আমার জ্ঞাতি জানালার লোহার গ্রিলের দিকে তাকাল, লম্বা ব্লন্ডচুলো এক লোককে দেখিয়ে গর্বিত ভঙ্গিতে বলল : ‘ওইটা হচ্ছে রনি।’ আমার চাচা অভ্যর্থনাসূচক হাত তুললেন কিন্তু কেউ প্রত্যুত্তর করল না। ‘ও ব্যস্ত। এটাসেটা নিয়ে সব সময় ব্যস্ত থাকে সে,’ আমার জ্ঞাতি ব্যাখ্যা দিলো এবং বলল : ‘আমাদের একটু অপক্ষো করতে হবে যতক্ষণ পর্যন্ত না সে আমাদের দেখতে পায়।’ চাচা জিজ্ঞেস করলেন : ‘শেষ কবে তার সাথে দেখা হয়েছে তোমার?’ ‘দুই সপ্তাহ আগে,’ আমার জ্ঞাতি উত্তর দিলো, ‘আমি তাকে শাকিরার গানের একটা কালেকশন দিতে এসেছিলাম।’ চাচা একটু স্বস্তি পেলেন, কিন্তু কিছুণের মধ্যেই তাকে উদ্বিগ্ন দেখাতে লাগল।


ভবনের জানালা ও দরজার মুখে ভিড় করে থাকা লোকগুলো থেকে আমার জ্ঞাতি কিছুটা আলাদা হওয়ার চেষ্টা করল। সে পায়ের পাতার ওপর ভর করে দাঁড়াল, মাথার ওপর হাত তুলল, এবং রনি দেখতে পাবে এ আশায় নাড়াতে লাগল। দালানের ভেতরে ঢুকতে দেয়ার অনুরোধ জানানো লোকগুলোকে ধমকাতে ব্যস্ত রনি। তাকে আবার ডাকার আগে কিছুণ অপক্ষো করাই শ্রেয় মনে করল আমার জ্ঞাতি। দেরি হচ্ছে দেখে রাগ প্রকাশ করতে গলা খাঁকারি দিলেন চাচা। এতে বিরক্ত হলো আমার জ্ঞাতি, কিন্তু তাকে কিছু বলতেই হলো। তাই সে চিৎকার করে ডাকল: ‘রনি!’ প্রথমে সে কিছু নিচু কণ্ঠে ডাকল, তাতে রনির দৃষ্টি আকর্ষণ করা গেল না। সে পুনরায় ডাকল, বেশ নাছোড়বান্দার মতো, এবং কিছুটা আস্থার সাথে : ‘রনি!’ তারপর আমার জ্ঞাতি আবার ডাকল তাকে, এবার কিছুটা আহত স্বরে : ‘রনি!’ আমার জ্ঞাতি বয়সোচিত কাণ্ডজ্ঞান ও যুক্তি আনতে চেষ্টা করল তার কথায় ও কণ্ঠে, এবং ডাকল : ‘রনি সাহেব! রনি সাহেব!’ রনি দ্রুত আমার জ্ঞাতির দিকে তাকাল, তারপর কোনো কারণে মুখ ফিরিয়ে নিলো। আমার জ্ঞাতি তার চেষ্টার পুনরাবৃত্তি করল কয়েকবার, কয়েক ভাষায় : ‘মা স্লোম্খা, আদন রনি? কেমন আছেন, রনি সাহেব? কিফ হালাক, ইয়া সায়্যিদ রনি?’ বোঝা গেল যে রনি তার কথা শুনতে পাচ্ছে কিন্তু পাত্তা দিচ্ছে না। রনি, সেই প্রহরীর এই অবহেলা আমার চাচা সহ্য করতে পারলেন না। তিনি তীè কণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠলেন : ‘এই যে রনি সাহেব। এ দিকে তাকান!’ রনি তার তীক্ষন চিৎকার শুনে রাগী ভঙ্গিতে তার দিকে ঘুরল, বলল : ‘কী বলতে চান? বলেন।’


চাচা কণ্ঠে স্নেহ ও আশা জাগিয়ে বললেন : ‘আমার ছেলে তালহা আপনাকে ডাকছে।’ ‘আপনার ছেলে কী চায়? বলুন,’ রনি বলল। আমার জ্ঞাতি উত্তেজনা কমাতে হাসল। কিন্তু রনির স্মৃতিকে অভিশপ্ত নিদ্রা থেকে জাগানোর আশায় আমার চাচাকে শেষ তীরটা ছুড়তেই হলো : ‘আমরা শাকিরার আত্মীয়। হেঁই, বন্ধু, তুমি কি আমাদের ভুলে গেছো?’ আমার জ্ঞাতি নীরবতার সুযোগ নিয়ে বলল : ‘রনি সাহেব, আমাদের ভেতরে ঢোকার অনুমতি দিন।’


রনি ক্রুদ্ধ স্বরে বলল : ‘অপেক্ষা করতে হবে! আমি ব্যস্ত আছি! আমি এখন আপনাদের দিকে নজর দিতে পারছি না!’ উদাসীনভাবে সে অন্য দিকে ঘুরল। আমি আমার জ্ঞাতির দিকে তাকালাম : ‘কুকুর!’ সে আমার দিকে তাকাল : ‘গাধা!’ এবং আমরা কোনো বাক্য বিনিময় করলাম না।


আমার জ্ঞাতি নিজেকে তিন দিন লোকচক্ষুর আড়াল করে রাখল। এই সময়ের মধ্যে একদিন সে ঘরের দেয়াল থেকে শাকিরার ছবি নামিয়ে মেঝেতে প্রচণ্ডভাবে ছুড়ে ফেলল। কাচ চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে চার দিকে ছড়িয়ে পড়ল। আমার চাচার স্পেন ভ্রমণ করা হলো না, হজ করতে হিজাজে যাওয়াও হলো না।


আমার জ্ঞাতি? সে আমাকে বলল, সে রনি, মানে সেই প্রহরীটার কাছে যাবে আরেকবার, বংশের মেয়েটির গানের একটা কালেকশন নিয়ে যাবে সাথে। প্রিয় শাকিরা খোদা তাকে হেফাজত করুন!

[মাহমুদ শুকাইরের জন্ম ১৯৪১ সালে জেরুসালেমে, সেখানেই বড় হন। ১৯৬৫ সালে দামেস্ক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শন ও সমাজবিজ্ঞানে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। পেশা শিকতা ও সাংবাদিকতা। ইসরাইলি সরকার তাকে দু-দু’বার জেলে পাঠায়। ১৯৭৫ সালে তাকে দেশ থেকে বিতাড়ন করা হয়। বৈরুত, আম্মান ও প্রাগে নির্বাসিত জীবনযাপন করার পর ১৯৯৩ সালে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন। সেখানেই এখন তার বসবাস। ছোটগল্পকার হিসেবে তিনি বিশেষ খ্যাতিমান। এখন পর্যন্ত তার ছোটগল্পের বইয়ের সংখ্যা ছয়। শিশুদের জন্য লিখেছেন ১২টি বই ও জীবনীগ্রন্থ। লিখেছেন টিভি সিরিয়াল, নাটক এবং অসংখ্য কলাম ও নিবন্ধ।]