মহাবীর আলেকজান্ডার যেভাবে মারা যান

Sep 24, 2017 11:14 am
মহাবীর আলেকজান্ডার

জি এম আদেলবেগ

খ্রিষ্টপূর্ব ৩২৩ অব্দের মে মাস। মহাবীর আলেক্সান্ডার তখন বাগদাদে। মেসিডোনিয়ার রাজা আলেক্সান্ডারের বয়স তখন ৩২। এরই মধ্যে তার ১৩ বছর কেটেছে মানুষের জানা পৃথিবীর অনেকটাই জয় করে। বিশ্ববাসীর কাছে তার পরিচয় দিগি¦জয়ী আলেক্সান্ডার নামে। সমভাবে তিনি সবার কাছে মহাবীর আলেক্সান্ডার, ‘আলেক্সান্ডার দ্য গ্রেট’। চার দিকে রাজ্যের পর রাজ্য জয় করে তিনি গড়ে তোলেন এক বিশাল সাম্রাজ্য, যার বিস্তৃতি মেসিডোনিয়া থেকে গ্রিস ও পারস্য সাম্রাজ্য ছাড়িয়ে ভারতের প্রান্ত পর্যন্ত। তার স্বপ্ন ছিল, তার বিশাল এ সাম্রাজ্যের আরো বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃতি ঘটাবেন। কিন্তু তার সে স্বপ্ন কখনোই বাস্তবে রূপ নেয়নি।


আলেক্সান্ডারের রাজ্য জয়ের এ অভিযানের শুরু হয় তখন, যখন তিনি পারস্য সাম্রাজ্য জয়ের আশায় অতিক্রম করেন হেলেসপন্ট তথা হেলেসপন্টাস প্রণালী। এর আরেক নাম দারদানেলিস প্রণালী। এ প্রণালীটি যুক্ত করেছে মরমরা সাগর ও এয়িজিন সাগরকে (অর্থাৎ গ্রিসের পূর্বাংশে ভূমধ্যসাগরের একটি বর্ধিতাংশকে)। বিজয়ী বীর আলেক্সান্ডার তিনটি বড় ধরনের যুদ্ধ করে ৩৩০ খ্রিষ্টপূর্বে পারস্য-নেতা তৃতীয় ডরিয়াসকে হত্যা করেন। আলেক্সান্ডার পারস্যবাসীদের পরাজয় ঘটায় ৩৩১ খ্রিষ্টপূর্বে। এরপর তিনি অগ্রসর হন আরো পূর্ব দিকে। ভারতের উত্তর-পশ্চিম দিকে। যেই তার কর্তৃত্ব চ্যালেঞ্জ করেছে, তাকেই পরাভূত করেন। তিনি তার সাম্রাজ্য ভারত ও পরবর্তী ভূখণ্ড পর্যন্ত বিস্তৃত করতেন, যদি না সেনাবাহিনী তার এ পরিকল্পনার বাধ না সাধত। সেনাবাহিনী জোর করে তার পূর্বমুখী অভিযান বন্ধ করে দেয়।


কয়েক বছরের সামরিক অভিযান শেষ করে আলেক্সান্ডার ফিরে আসেন বাগদাদে। এই সুযোগে তিনি বিশ্রাম নেন, তেমনি পরিকল্পনা করার সুযোগ পান তার পরবর্তী অভিযানের। ২৯ মে তিনি তার ঘনিষ্ঠ এক বন্ধুর আমন্ত্রণে এক ভোজসভায় যোগ দেন। দিনব্যাপী এ আয়োজনে আলেক্সান্ডার প্রচুর মদ পান করেন। তার ভালো লাগছে না, এ কথা বলে ঘুমুতে চলে যান। তার গায়ে প্রচণ্ড জ্বর। দ্রুত তার স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে। তিনি এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েন যে, বিছানায় যেতেও পারছিলেন না। বিশ্ববিজয়ী এই বীর এর দশ দিন পর মারা যান।


আলেক্সান্ডারের মৃত্যুর সঠিক কারণ জানা যায়নি। ইতিহাসবিদরা এ নিয়ে নানা বিতর্ক করেছেন শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে। কারো মতে, বিষের কারণে তার মৃত্যু। কারো মতে, ম্যালেরিয়ায় তিনি মারা গেছেন। কেউ বলেছেন, টাইফয়েডে। আবার নানাজন বলেছেন, অন্যান্য রোগের নাম। তবে সবাই এ ব্যাপারে একমত, আলেক্সান্ডার মারা যান খ্রিষ্টপূর্ব ৩২১ অব্দের জুনের প্রথম দিকে। তখন তিনি প্রচণ্ড জ্বরে ভুগছিলেন। টানা দশ দিন চলে এ জ্বর। তার মৃত্যুর পর তার সাম্রাজ্য খণ্ড খণ্ড করে ভাগ-বাটোয়ারা করে নিলেন তার জেনারেলরা। শিগগিরই ভেঙে চুরমার হয়ে যায় তার গড়া বিশাল সাম্রাজ্য।
গ্রিক ইতিহাসবিদ অৎৎরধহ আলেক্সান্ডারের মৃত্যুর সাড়ে তিন শ’ বছর পর আলেক্সান্ডারের মৃত্যুর একটা বর্ণনা দিয়ে গেছেন। যদিও তিনি আলেক্সান্ডারের সমসাময়িক ছিলেন না, তবু এই বর্ণনা তুলে ধরে জড়ুধষ উরধৎরবং অনুসরণ করে। এই রয়েল ডাইরিতে উল্লেখ রয়েছে আলেক্সান্ডারের অভিযানের সমকালীন কালপঞ্জি। আমরা অৎৎরধহ-এর বর্ণনা থেকে জানব আলেক্সান্ডারের মৃত্যুর কথা।
‘ক’দিন পর আলেক্সান্ডার সম্পন্ন করেন ডিভাইন সেক্রিফাইসের বা ঐশ্বরিক বলিদানগুলো। এই বলিদানের পরামর্শ যাজকরা তাকে দেন তার সৌভাগ্য অর্জনের লক্ষ্যে। রাতে তিনি কয়েকজন বন্ধুর সাথে প্রচুর মদ পান করেন। কেউ কেউ বলেন, তিনি চেয়েছিলেন ড্রিঙ্কিং পার্টি ছেড়ে বিছানায় যেতে। কিন্তু তখন গবফরঁং-এর সাথে তার দেখা হয়। মেডিয়াস ছিলেন তার সাথীদের মধ্যে সবচেয়ে বিশ্বস্ত। মেডিয়াস তাকে পার্টিতে থাকতে বললেন, কারণ তিনি থাকলে পার্টি ভালো হবে।


প্রথম দিন : ‘রয়েল ডায়েরিজ’ থেকে আমরা জানতে পারি, তিনি মদ পান করেন এবং এ সময় মেডিয়াসের সাথে হৈ-হুল্লোড় করে মদোৎসব পালন করেন। এরপর উঠে যান। গোসল করে শুতে যান ও ঘুমিয়ে পড়েন। এরপর আবার ফিরে আসেন মেডিয়াসের সাথে রাতের খাবার খেতে। গভীর রাত পর্যন্ত প্রচুর মদ পান করেন। পান শেষে আবার গোসল করে সামান্য খাবার খেয়ে শুতে যান। এরই মধ্যে তার শরীরে জ্বর উঠে গেছে।


দ্বিতীয় দিন : প্রতিদিনই তাকে কোচে করে বহন করে নেয়া হতো কাস্টমারি সেক্রিফাইস সম্পাদনের জন্য। এবং তা সম্পাদনের পর তিনি সন্ধ্যা পর্যন্ত শুয়ে থাকতেন মেন’স অ্যাপার্টমেন্টে। এই সময় তিনি তার অফিসারদের আগামী অভিযান ও সমুদ্রযাত্রা সম্পর্কে নির্দেশনা দেন স্থলবাহিনী প্রস্তুত করতে, এর পরদিন তার সাথে নৌযাত্রা শুরুর জন্য। এরপর তাকে কোচে করে নদী তীরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তিনি একটি নৌকায় ওঠেন। এবং এ নৌকা করে চলে যান বাগানে। সেখানে গোসল করে আবার বিশ্রামে যান।


তৃতীয় দিন : পরদিন আবার গোসল করে নির্দেশিত সেক্রিফাইস বা বলিদান সম্পন্ন করেন। এরপর নিজের কক্ষে ঢোকেন। শুয়ে শুয়ে কথা বলেন মেডিয়াসের সাথে। অফিসারদের পরদিন সকালে তার সাথে দেখা করার নির্দেশ দিয়ে সামান্য খাবার খান। তাকে বহন করে নেয়া হয় তার কক্ষে। সারা রাত শুয়ে থাকেন জ্বর নিয়ে।


চতুর্থ দিন : সকালে গোসল করেন এবং সেক্রিফাইস সম্পাদন করেন। নিয়ারকাস ও অন্যান্য অফিসারকে নির্দেশ দেন দু’দিন পর সমুদ্র অভিযানের জন্য তৈরি হতে।


পঞ্চম দিন : পরদিন তিনি আবার গোসল সেরে সেক্রিফাইস সম্পন্ন করেন। এরপরও তার দেহে অব্যাহত জ্বর থাকে। তারপরও তিনি অফিসারদের ডেকে আনেন এবং অভিযানে যাওয়ার জন্য সব কিছু তৈরি করতে বলেন। বিকেলে গোসলের পর তিনি বেশি অসুস্থ হয়ে পড়েন।


ষষ্ঠ দিন : পরদিন তাকে ডাইভিং প্লেসের হাউজে নেয়া হয়। সেখানে তিনি সেক্রিফাইস সম্পন্ন করেন। শরীর খারাপ সত্ত্বেও ঊর্ধ্বতন অফিসারদের ডেকে আনেন এবং অভিযানের ব্যাপারে নতুন করে নির্দেশনা দেন।


সপ্তম দিন : পর দিন দুর্বল থাকা সত্ত্বেও কোনোমতে সেক্রিফাইস সম্পন্ন করেন। তিনি জেনারেলদের হলে থাকতে বলেন। ব্রিগেডিয়ার ও কর্নেলরা থাকবেন সামনের দরজার কাছে। এবার তিনি খুব বেশি অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাকে বাগান থেকে ফিরিয়ে নেয়া হয় রয়েল অ্যাপার্টমেন্টে। অফিসাররা যখন প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের চিনতে পারলেন। কিন্তু তাদের সাথে একটি কথাও বলেননি।


নবম ও দশম দিন : রাতে তার শরীরে খুব বেশি জ্বর। আরেকটা দিন কাটল এভাবেই। পরদিন ও তারও পরদিন জ্বর থামেনি।


রয়েল ডায়েরিতে উল্লিখিত তথ্যমতে জানা যায়, সৈনিকরা তাকে দেখতে চান। কেউ কেউ তার মৃত্যুর আগে তাকে দেখতে চান। কেউ কেউ দেখতে চান এ কারণে যে, এরই মধ্যে রটে গেছে তিনি মারা গেছেন। তারা মনে করছিল, তার ব্যক্তিগত দেহরক্ষীরা তার মৃত্যুর ব্যাপারটা গোপন করছিলেন কিংবা তেমনি একটা কিছু হয়েছে।


সৈনিকদের অনেকেই দুঃখে-ক্ষোভে জোর করে তার কক্ষে ঢুকে পড়েন এবং আলেক্সান্ডারকে দেখতে থাকেন। তারা বলেন, সৈন্যরা যখন সারি বেঁধে তার পাশ দিয়ে যাচ্ছিল, তখন তিনি ছিলেন বাকরুদ্ধ। তবে তিনি সবাইকে স্বাগত জানান কখনো মাথা নেড়ে কিংবা চোখের ইশারায়।


রয়েল ডায়েরির তথ্য মতে, পিথন, অ্যাটালাস, ডেমোফোন, পিউসেন্টাস, ক্লিওমেনসেস, মেনডিয়াস ও সেলিউকাস রাত কাটান সেবাপিস মন্দিরে। তারা ঈশ্বরের কাছে প্রশ্ন রাখেন আলেক্সান্ডারকে তার রোগ নিরাময়ের প্রার্থনার জন্য মন্দিরে আনলে ভালো হবে কি না। বলা হয়, ঈশ্বরের জবাব ছিল আলেক্সান্ডারকে মন্দিরে আনা ঠিক হবে না। বরং তিনি যেখানে আছেন, তাকে সেখানে রাখাই ভালো। সাথীরা এ খবর নিয়ে এলো এবং অল্প সময় পর আলেক্সান্ডার মারা যান। আর এটাই ছিল তার জন্য উত্তম।’ টলেমি ও অ্যারিস্টো বোলাসের দেয়া তার মৃত্যুকাহিনীর এখানেই শেষ।