নোবেল নিয়ে যেভাবে রাজনীতি হয়

Sep 25, 2017 03:49 pm
নোবেল কারা পায়

গোলাপ মুনীর

নোবেল পুরস্কার। বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ বিষয়ভিত্তিক সাংবৎসরিক কিছু পুরস্কার। ১৮৯৫ সালে সুইডিশ শিল্পপতি ও উদ্ভাবক আলফ্রেড নোবেল মারা যান। তার রেখে যাওয়া অর্থ ও উইল বলে এ পুরস্কার প্রবর্তন করা হয়। এখন এ পুরস্কার দেয়া হচ্ছে সেই সব ব্যক্তি বা সংস্থাকে, যারা মানব জাতির সেবায় অবদান রেখেছেন পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, চিকিৎসা, সাহিত্য ও শান্তির ক্ষেত্রে। গণিত, দর্শন ও সমাজবিজ্ঞানের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে এ পুরস্কারের বাইরে রাখা হয়েছে।

আলফ্রেড নোবেলের স্মরণে প্রবর্তিত ‘ব্যাংক অব সুইডেন প্রাইজ ইন ইকোনমিক সায়েন্স’ নোবেল পুরস্কারের সাথে সম্পর্কিত। নোবেল পুরস্কারের সমকক্ষ গণিক বিষয়ক ‘আবেল পুরস্কার’ চালু হয়েছে ২০০৩ সালে। অর্থনীতির ওপর নোবেল-সমকক্ষ পুরস্কার এবং অর্থনীতি বিজ্ঞান বিষয়ক নোবেল স্মরণ পুরস্কার চালুর বৈধতা প্রশ্নে বিতর্ক উঠেছে। নোবেল পুরস্কার কার্যকর করা হয় ১৯০১ সালে। এরপর শত বছর পেরিয়ে গেছে। প্রতি বছর বিভিন্ন বিষয়ে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার গৌরব অর্জন করছেন। অখ্যাত থেকে বিখ্যাত হয়ে উঠেছেন। কিন্তু এই নোবেল পুরস্কার নির্বাচন প্রক্রিয়া, মনোনয়ন দান, নোবেল বিজয়ী, নোবেল পাওয়া থেকে ব্যক্তিবিশেষকে বঞ্চিত করা ইত্যাদি বিষয়ে বিতর্ক আর অভিযোগের শেষ নেই। এর পেছনে বিজারক হিসেবে কাজ করেছে রাজনীতিসহ নানা ধরনের বাস্তবতা।

কোনো কোনো নোবেল বিজয়ী বিতর্কিত হয়েছেন বিতর্কিত রাজনৈতিক বিতর্কের জন্য। বিতর্ক এসেছে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দ্বন্দ্ব সূত্রে। কখন স্থানীয় কর্তৃপক্ষের অভিযোগ ছিল এ পুরস্কারের মাধ্যমে জাতীয় বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা হয়েছে। বিতর্ক আছে নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটির সদস্য নির্বাচনের পদ্ধতি-প্রক্রিয়া নিয়ে। সেজন্য এমন পরামর্শও আসছে নরওয়ের রাজনীতিকদের নিয়ে নোবেল কমিটি গঠনের বদলে এর আন্তর্জাতিকায়ন করা হোক। শত বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা এই নোবেল পুরস্কার নিয়ে সৃষ্ট বিতর্কের বিস্তারিতে যেতে হলে প্রয়োজন হবে এক মহাকাব্য রচনার। সে দিকে যাওয়ার অবকাশ অন্তত এখানে নেই। তাই এখানে বিচ্ছিন্ন বিতর্কিত কয়েকটি বিষয়ের ওপর আলোকপাতের প্রয়াস পাবো।


১৯০১ সালের পর থেকে অনেক ক্ষমতাধর রাষ্ট্রনায়ক ও রাজনীতিক পেয়েছেন নোবেল শান্তি পুরস্কার। নোবেল পুরস্কারের ইতিহাসে প্রথম যে রাষ্ট্রনায়ক নোবেল পান, তিনি হচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজভেল্ট। তিনি এ পুরস্কার পান ১০৬ সালে। নরওয়ের পার্লামেন্ট ১৮৯৭ সালে প্রথম নোবেল কমিটি নিয়োগ দেয়। এ কমিটির সব সদস্যই ছিলেন নরওয়ের সক্রিয় রাজনীতিক। তখন নরওয়ের একটি সরকার ছিল, তবে নরওয়ে পুরোপুরি স্বাধীন ছিল না। দেশটি ছিল সুইডিশ-নরওয়েজিয়ান ইউনিয়নের অধীন, আর বৈদেশিক বিষয়াবলি ছিল সুইডিশদের নিয়ন্ত্রণে। নরওয়ের অনেক পার্লামেন্টেরিয়ান আন্তর্জাতিক শান্তি আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন, এদের অনেক নোবেল কমিটিতেও ছিলেন। এরা সমর্থন জানিয়েছিলেন ‘ইন্টারন্যাশনাল পিস ব্যুরো’ এবং ‘ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়ন’-এর কার্যক্রমের প্রতি।

১৯০১-১৯০৫ সময়ে ফ্রেডারিক পাসি, এলি ডকুমান, চার্লস এলবার্ট গোবাটা, স্যার উইলিয়াম, ব্যান্ডাল ক্রেমার এবং বাথা ভন সুটনার নোবেল পুরস্কার পান। দেখা গেছে, এরা সবাই উল্লিখিত এ দু’টি সংগঠনের সাথে সত্যরূপে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। এদের সরকারের নীতি নির্ধারণের ওপরও প্রভাব ছিল খুবই কম। অতএব এদের নোবেল পুরস্কার নিয়ে স্বাভাবিক বিতর্ক ওঠে সে সময়। তেমনি রুজভেল্টের নোবেল শান্তি পুরস্কার নিয়ে অভিযোগ ছিল এ ধরনের একজন ব্যক্তিকে এ পুরস্কার দেয়া কখনোই উচিত ছিল না। ১৯০৫ সালে শান্তিপূর্ণভাবে ভেঙে দেয়া হয় নরওয়ে-সুইডিশ ইউনিয়ন। আর নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান হন নরওয়ের প্রথম পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এক বছর পর নোবেল শান্তি পুরস্কার দেয়া হয় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টকে। ১৯০৫ সালে জাপান-রাশিয়া যুদ্ধে তিনি মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করলেও তিনি ‘শান্তির দূত’ বলে পরিচিত ছিলেন না।

স্পেন-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে ১৮৯৮ সালে তিনি আমেরিকার ক্যাবালরি রেজিমেন্টের কিউবা অভিমুখে অভিযানের নেতৃত্ব দেন। পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দৃঢ় প্রত্যয় ঘোষণা করেন সামরিক শক্তি বলে যুক্তরাষ্ট্রকে ‘গ্রেট পাওয়ার’ করে তোলার। অনেক আমেরিকান তার নোবেল পাওয়াকে রহস্যজনক বলে মন্তব্য করেন। তখন ‘নিউইয়র্ক টাইমস’ পর্যন্ত মন্তব্য করেছিল : Prize was awarded .... to the most warlike citizen of the United States'। তবে এ কথা ঠিক নোবেল কখনোই চাননি, কোনো দেশের ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী কিংবা রাজা নোবেল শান্তি পুরস্কার পাক। ১৯০৬ সালের পুরস্কার পাবার মতো আরো যোগ্য প্রার্থী ছিলো। ছয়টি সংগঠন ও ২৩ জন ব্যক্তি মনোনয়ন পেয়েছিলেন। পরবর্তীকালে মনোনীতদের মধ্য থেকে ছয় জন নোবেল শান্তি পুরস্কার পান।


১৯৭৩ সালে নোবেল কমিটি পুরস্কার বিজয়ীর নাম ঘোষণার পরপর ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে। সে বছর যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র সচিব হেনরি কিসিঞ্জার এবং প্যারিস শান্তি সম্মেলনে উত্তর ভিয়েতনাম প্রতিনিধিদলের মুখপাত্র লি ডাক থো’র নাম বিজয়ী হিসেবে ঘোষণা করা হয়। নোবেল কমিটির যেসব সদস্য তাদের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছিলেন, এ দু’জনকে পুরস্কার বিজয়ী ঘোষণার পর পদত্যাগ করেন। তখন নরওয়ে জুড়ে সংবাদপত্রের লেখালিখিতে এ পুরস্কার দেয়ার বিষয়টিকে অতিমাত্রায় বিতর্কিত বলে সমালোচনা করা হয়। বিদেশের সংবাদপত্রগুলোতে এর সমালোচনা চলে। এবং কমিটির সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের প্রতি নরওয়ের রাজনীতিকদের সমর্থনও ছিল খুবই কম। নরওয়ের পার্লামেন্ট ‘স্টোর্টিং’ ১৯৭৩ সালের ১৮ অক্টোবরে ভিন্ন মত পোষণকারী দুই সদস্যের কাছ থেকে পদত্যাগপত্র পায়।

বামপন্থী সমাজবাদী কমিউনিস্টদের নির্বাচনী জোট ‘সোশ্যালিস্টিক ভ্যালগরফান্ড’-এর একজন প্রতিনিধি স্টোর্টিংয়ে নোবেল কমিটির গঠন ও এর কর্তব্য বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার দাবি তোলেন। স্টোর্টিং প্রেসিডিয়াম নোবেল পুরস্কারের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, আলফ্রেড নোবেলের উইল এবং নোবেল ফাউন্ডেশনে সংবিধির একটি পর্যালোচনা করে। ১৯৭৪ সালের মে মাসে পদত্যাগী দুই সদস্যের স্থলে নতুন সদস্য নিয়োগ নিয়ে স্টোর্টিংয়ে তুমুল বিতর্ক হয়। স্টোর্টিংয়ের নির্বাচক কমিটির বেশির ভাগ সদস্য চেয়েছিলেন কিসিঞ্জার অথবা লি ডাক .. নিয়ে ব্যাপক আলোচনা এড়াতে। তাদের জোর তাগিদ ছিল, আলোচনা শুধু নোবেল কমিটি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সীমিত রাখতে। এবং শুধু নতুন সদস্য বেছে নিতে। তাদের অভিমত ছিল, তাদের এমন কিছু করা উচিত নয়, যাতে এমন ধারণা জন্মে যে নরওয়ের পার্লামেন্ট তথা স্টোর্টিং নোবেল কমিটির কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করতে চায়।

তা সত্ত্বেও সোশ্যালিস্ট প্রতিনিধি তিনটি প্রস্তাব রাখেন : প্রথমত নোবেল কমিটির অবশিষ্ট তিন সদস্যকেও বদলাতে হবে। দ্বিতীয়ত, কমিটির আন্তর্জাতিকায়ন দরকার। প্রতিটি নরডিক দেশ (ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড, নরওয়ে ও সুইডেন) থেকে একজন করে সদস্য নিতে হবে। এবং তৃতীয়ত, নোবেল কমিটির জন্য পার্লামেন্ট সদস্যরা বৈধ নির্বাচক হবেন না। স্টোর্টিং বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের ওপর ভিত্তি করে প্রস্তাব তিনটি বাতিল হয়ে যায়। এবং নতুন যে দু’জন সদস্য নিয়োগ পান তাদের একজন ছিলেন পার্লামেন্ট সদস্য এবং সেই সাথে স্টোর্টিংয়ের প্রেসিডিয়ামেরও সদস্য। এখনো অনেকে মনে করেন নোবেল কমিটিকে রাজনীতিমুক্ত করতে হলে ভবিষ্যৎ নোবেল কমিটি গঠনে পার্লামেন্টারিয়ানদের এ প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা দরকার। তবে ১৯৭৭ সালে নোবেল কমিটির পূর্বনাম ‘নোবেল কমিটি অব দ্য নরওয়েজিয়ান স্টোর্টিং’ পরিবর্তন করে বর্তমান নাম ‘নরওয়েজিয়ান’ ‘নোবেল কমিটি’ রাখা হয়। সে বছর থেকে এটা প্রথা হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, কোনো স্টোর্টিং সদস্য আর নোবেল কমিটির মেম্বার হবেন না। কিন্তু, কমিটি সদস্য নিয়োগে আনুষ্ঠানিক বিধির কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। কমিটির আন্তর্জাতিকায়ন ঘটেনি। এখনো কমিটিতে সাবেক এমন পার্লামেন্টারিয়ানদের নেয়া হয়, যাদের দীর্ঘ রেকর্ড রয়েছে সক্রিয় রাজনীতির।
মহাত্মা গান্ধীকে কখনোই নোবেল শান্তি পুরস্কার দেয়া হয়নি। এ নিয়ে ভারতীয়দের চরম ক্ষোভ রয়েছে। তারা মনে করে যেকোনো বিবেচনায় গান্ধী ছিলেন নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার যথার্থ দাবিদার। ব্রিটেনের রাজনৈতিক কারসাজির কারণেই গান্ধীকে তা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে বলে ভারতীয়দের অভিযোগ। অনেক নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ীও স্বীকার করেছেন, তাদের বহু আগেই গান্ধীকেই এ শান্তি পুরস্কার দেয়া উচিত ছিল। ১৯৮১ সালের ১০ ডিসেম্বর অসলোতে নোবেল শান্তি পুরস্কার গ্রহণ অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে দালাইলামা বলেন, তিনি গান্ধীর জীবন থেকে শিক্ষা নিয়েছেন, অনুপ্রাণিত হয়েছেন। উল্লেখ্য, দালাই লামা প্রতিষ্ঠিত করেছেন পরিবর্তনের জন্য আধুনিক শান্তিপূর্ণ লড়াই। অ-ভারতীয়দের অনেকের অভিমত, নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ীদের তালিকায় গান্ধীর নাম অন্তর্ভুক্ত করতে না পারা নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটির একটি বড় মাপের ব্যর্থতা বৈ কিছু নয়। কিছু ভারতীয় মনে করেন, বর্ণবাদী রাজনীতিও সক্রিয় ছিল গান্ধীর নোবেল না পাওয়ার ব্যাপারে।

অনেকে মনে করেন নোবেল কমিটি গান্ধীকে মরণোত্তর নোবেল শান্তি পুরস্কার দিয়ে ভুল কিছুটা শুধরে নিতে পারে। কিন্তু এর বিপ্রতীপ ভাবনাও আছে অনেক ভারতীয়র মাঝে। তারা মনে করেন, যেখানে নোবেল শান্তি পুরস্কার তালিকায় নাম এসেছে থিওডোর রুজভেল্টের মতো উলঙ্গ সাম্রাজ্যবাদীর, আত্মস্বীকৃত সন্ত্রাসী মোনাহেম বেগিন এবং কম্বোডিয়ার সিক্রেট বম্বিংয়ের স্থপতি হেনরি কিসিঞ্জারের, সেখানে এ তালিকায় গান্ধীর নাম না আসাটাই শ্রেয়তর। ভারতবাসী মনে করে, এই কিসিঞ্জারের নীতি অবলম্বন করে ভিয়েতনাম, লাওস, কম্বোডিয়াম, চিলি ও অন্যান্য দেশে হাজার হাজার নিরীহ মানুষকে হত্যা করে আমেরিকানরা। এদের সাথে গান্ধীর নাম সংযোজন বড্ড বেমানানই হবে। হেনরি কিসিঞ্জারের বাংলাদেশ বিরোধিতাও ছিল চরম অমানবিক পর্যায়ের।


জর্গ লুই বর্গেম বিখ্যাত লেখকদের একজন। তাকে কখনোই নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়নি। কেন? কারণ, তিনি পিনাসোটের দেশ চিলি সফর করেছিলেন। এ সফর তার নোবেল পুরস্কার পাওয়ার সম্ভাবনা চিরদিনের জন্য নষ্ট করে দেয়। তার সফরের বছর এবং তার জীবনের বাকি বছরগুলোতে নোবেল পুরস্কার কমিটির একজন সদস্য তার পুরস্কার পাওয়ার ব্যাপারে বার বার আপত্তি দাঁড় করেন। এমনকি এই সদস্য প্রকাশ্যে বলেছেন, তিনি কখনোই বর্গস-কে ক্ষমা করবেন না, কারণ তিনি জেনারেল পিনোসেটের সরকারের প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন জ্ঞাপন করেছিলেন। বর্গেস বিশ্বাস করতেন গণতন্ত্রে, কিন্তু তিনি ভেবেছিলেন প্রাপ্ত অপমানের মধ্যে পিনোসেটেই ছিলেন সেরা।


এমনিভাবে নোবেল পুরস্কার নিয়ে অনেকের বেলায়ই রাজনৈতিক বিতর্ক ছিল। ভবিষ্যতেও থাকবে বলে ধরে নেয়া যায়। এর বাইরে নানা ব্যতিক্রমধর্মী বিতর্কও ছিল। থমাস এডিসন ও নিকোলা টেসলা ছিলেন দুই প্রতিভাধর বিজ্ঞানী। বিজ্ঞানে তাদের রয়েছে অসাধারণ অবদান্ কিন্তু এরা ছিলেন পরস্পর পরস্পরের চরম বিদ্বেষী। এ দু’জনই সম্ভাবনাময় নোবেল পুরস্কার বিজয়ী হিসেবে ১৯১৫ সালে নমিনেশন পান। কিন্তু একটা ধারণা প্রতিষ্ঠিত রয়েছে এরা একে অন্যের প্রবল শত্রু হওয়ায় এদের কাউকেই নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়নি, যদিও নোবেল পাওয়ার যোগ্যতা প্রশ্নে এরা দু’জনেই শতভাগ যোগ্য বলে সবার কাছে বিবেচিত। এমন আভাস ইঙ্গিত সুস্পষ্ট ছিল একজন আরেকজনের অবদানকে ছোট করে দেখার চেষ্টা করতেন সব সময়।

এমনকি একজন অপরজনের নোবেল পুরস্কার পাওয়ার অধিকার পর্যন্ত অস্বীকার করতেন। এমনো বলা হতো এদের একজনকে নোবেল পুরস্কার দেয়া হলে, অপরজন ক্ষোভে-রাগে তাৎক্ষণিকভাবে ঘোষণা দিয়ে বসতেন, এটা তার নিজের প্রতি অন্যায় করেছে নোবেল কমিটি। তাকে পরবর্তীকালে নোবেল পুরস্কার দেয়া হলেও কখনো তিনি তা গ্রহণ করবেন না। তবে তৎসময়ের পত্রপত্রিকায় এমন খবরও প্রকাশ পেয়েছিল যে, টেসলার খুবই আর্থিক টানাপড়েন ছিল, তা ছাড়া বিংশ ও একবিংশ শতাব্দীর জীবনে টেসলার ব্যাপক প্রভাবে রয়েছে। অতএব টেসলাকেই নোবেল পুরস্কার দেয়াটা অধিকতর যৌক্তিক ছিল। এতে করে হয়তো বেচারা দেউলিয়াত্ব বরণ থেকে রক্ষা পেতেন। উল্লেখ্য, টেসলা ১৯১৬ সালে দেউলিয়াত্ব বরণের আবেদন করেন।


দেখা গেছে, একজনের অবদানের জন্য হয়তো নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন আরেকজন। যেমন চুং ইয়াও চাও সর্বপ্রথম চিহ্নিত করেন পজিট্রন। ইলেকট্রন-পজিট্রন ... বা পুরোপুরি ...সাধনের মাধ্যমে ১৯৩০ সালে ছাত্র থাকা অবস্থায়ই তিনি এ কাজটি করেন। অবশ্য তখনো ইয়াও চাও বুঝে উঠতে পারেননি ইলেকট্রন ও পজিট্রন আসলে কী। যাই হোক এই পজিট্রন আবিষ্কারের জন্য ১৯৩৮ সালে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয় কার্ল ডি অ্যান্ডারসনকে। অ্যান্ডারসন চাওয়ের মতো একই তেজস্ক্রিয় পদার্থ বা রেডিওয়েকটিভ উৎস থোরিয়াম কার্বাইড ব্যবহার করে এ কাজটি করেন।

পরবর্তী জীবনে অ্যান্ডারসন নিজেও স্বীকার করেছেন আসলে চাও থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই তিনি এ আবিষ্কার করেন। চাওয়ের গবেষণাই এর ভিত্তি রচনা করেছিল, যার ওপর ভিত্তি করে অ্যান্ডারসনের বেশির ভাগ কাজ সম্পাদিত হয়েছিল। ইয়াও চাও মারা যান ১৯৯৮ সালে। তখনো তিনি নোবেল পুরস্কার পাওয়ার সুযোগ পাননি। যদিও অনেকেরই অভিমত ছিল, পজিট্রন আবিষ্কারের অবদানের জন্য তাকেই প্রধানত নোবেল পুরস্কার দেয়া যুক্তিযুক্ত ছিল। অ্যান্ডারসনকে এ ক্ষেত্রে সহ-বিজয়ী করা যেত। জানি না, এর পেছনে কোন রাজনীতি, কূটকৌশল কাজ করেছে। তবে বিষয়টি এখনো বিতর্ক হিসেবেই থেকে গেছে।


একইভাবে বিতর্ক আছে ১৯৫০ সালে পদার্থ বিজ্ঞানে সেসিল পাওয়েলের নোবেল পুরস্কার পাওয়া নিয়ে। যদি ব্রাজিলের পদার্থবিজ্ঞানী সিজার লেটিস ছিলেন সাব-অ্যাটোমিক-পার্টিকল meson pi (pion)-এর মূল গবেষক। তিনিই সবার আগে ঐতিহাসিক ‘ন্যাচার’ পত্রিকায় এ নিয়ে গবেষণা প্রবন্ধ লিখেন। অথচ তার ল্যাব বস সেসিল পাওয়েলকে ১৯৫০ সালে পারমাণবিক প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণে ফটোগ্রাফি পদ্ধতি উদ্ভাবনের ও মেসন সম্পর্কিত আবিষ্কারের কৃতিত্বের। অথচ কৃতিত্বের পুরোটির দাবিদার সিজার লেটিস। তিনি এ ক্ষেত্রে একক কৃতিত্বের অধিকারী। নোবেল কমিটি ১৯৬০ সালের আগে শুধু গবেষক দলের নেতাকেই বিবেচনা করত সংশ্লিষ্ট আবিষ্কারের আবিষ্কারক হিসেবে, যা যৌক্তিক বলে বিবেচিত হতে পারে না।

এভাবে শত শত উদাহরণ রয়েছে নোবেল পুরস্কার নিয়ে রাজনৈতিক ও বিবিধ মাত্রিক বিতর্কের। আজো তা অব্যাহত। এ প্রেক্ষাপটে ক্রমেই বিবেকবান মানুষের পক্ষে জোরালো দাবি উঠেছে স্বাধীন নোবেল কমিটি গঠনেও কমিটির আন্তর্জাতিকায়নের। কিন্তু এতে কি এ বিতর্কের অবসান ঘটবে? বাস্তব অভিজ্ঞতা তেমনটি নির্দেশ করে না। তবে বিতর্কের মাত্রা যথাসম্ভব কমিয়ে আনা সম্ভব নোবেল কমিটির আন্তরিক ও নিরপেক্ষ বিচার বিবেচনায়ই। নোবেল কমিটির আন্তর্জাতিকতায় বিপদ আরো বাড়াবে। কারণ তখন নোবেল কমিটি পরাশক্তির ক্রীড়নকে পরিণত হবে। যেমনটি আজ হয়ে আছে আন্তর্জাতিক সংস্থা : বিশ্বব্যাঙ্ক, আইএমএফ, জাতিসঙ্ঘ ও এর অঙ্গসংগঠনগুলো। আগে থেকেই নোবেল কমিটির আন্তর্জাতিকায়নের বিপদ থেকে সতর্ক থাকতে হবে বৈ কি।