যেভাবে চাপের মুখে পড়েছে সরকার

Sep 26, 2017 03:37 pm
নানা ইস্যুতে চাপের মুখে পড়েছে সরকার


জাকির হোসেন লিটন

আগামী জাতীয় নির্বাচন, নির্বাচন পদ্ধতি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং রোহিঙ্গা সমস্যা নানা ইস্যুতে চাপের মুখে পড়েছে সরকার। এ অবস্থায় খুব একটা স্বস্তিতে নেই সরকারের নীতিনির্ধারকেরা। চাপ সামলাতে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের। দফায় দফায় বৈঠক-আলোচনা করেও তেমন কোনো কূলকিনারা হচ্ছে না।


২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি বিরোধী জোটের অংশগ্রহণ ছাড়াই অনুষ্ঠিত ‘একতরফা’ নির্বাচনের মাধ্যমে দ্বিতীয় মেয়াদে সরকার গঠনের পর বেশ ভালোই যাচ্ছিল সরকারের। মাঝে সরকারবিরোধীরা আন্দোলন শুরু করলেও সরকারের মারমুখী অবস্থানের কারণে মাঠ দখলে রাখতে পারেনি তারা। হামলা, মামলা, জেল, ধরপাকড়ের মুখে কোণঠাসা বিরোধীদের কার্যক্রম একেবারেই ঘরে আবদ্ধ। বেশ ফুরফুরে মেজাজে নীতিনির্ধারকেরাও নির্বিঘেœ সরকার পরিচালনা করছেন। কিন্তু মেয়াদের শেষ দিকে এসে হঠাৎ করেই বেশ বিপাকে পড়ে সরকার। ভয়াবহ পাহাড় ধসের ঘটনা কাটিয়ে উঠতে-না-উঠতেই হাওর এলাকায় বাঁধ ভেঙে স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্যোগে পড়েন হাওরবাসীরা। এর চরম বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করে চাল ও নিত্যপণ্যের বাজারসহ সাধারণ মানুষের জনজীবনে।

এরই মধ্যে শুরু হয় প্রলয়ঙ্করী বন্যা। এ বন্যায় তলিয়ে যায় দেশের উত্তরাঞ্চল। বানের পানির প্রভাব পড়ে মধ্যাঞ্চলেও। বিশাল এ জনগোষ্ঠীর ঘুরে দাঁড়ানোর আগেই দেশের চরম আপদ হিসেবে আবির্ভূত হয় রোহিঙ্গা ইস্যু। মুসলিম জনগোষ্ঠী রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের ওপর মিয়ানমার সরকারের বর্বর হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগসহ মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতনে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের স্রোত নামে। এ পর্যন্ত প্রায় ৫ লাখ রোহিঙ্গা ইতোমধ্যেই বাংলাদেশে ঢুকে পড়েছে। এ সংখ্যা ১০ লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছে জাতিসঙ্ঘ। শুরুর দিকে সরকার বর্ডারে ভিড় করা রোহিঙ্গাদের পুশব্যাক করে মিয়ানমারে ফিরিয়ে দিলেও পরে নানা কারণে সে অবস্থান পরিবর্তন করে।


রোহিঙ্গাদের পুশব্যাক করে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিলে এ সরকারকে মুসলিমবিদ্বেষী হিসেবে আখ্যায়িত করতে পারে দেশের জনগণ। যার চরম নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে আগামী জাতীয় নির্বাচনে। এ ছাড়া মুসলিম বিশ্বসহ বহির্বিশ্বের সাথে সম্পর্কের আরো অবনতি ঘটতে পারে সরকারের। সেজন্য অবস্থান পরিবর্তন করে সীমান্ত খুলে দিতে বাধ্য হয় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার। এতে মুসলিমবিশ্বসহ প্রায় পুরো বিশ্বই শেখ হাসিনার সরকারের প্রশংসা করছে। এমনকি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ইস্যুতে তুরষ্কসহ যেসব মুসলিম দেশের সাথে সরকারের শীতল সম্পর্ক চলে আসছির তারাও সরকারের এ উদ্যোগের প্রশংসা করছে। বিশাল ত্রাণের ভাণ্ডার নিয়ে তুরস্কের ফার্স্টলেডি স্বয়ং বাংলাদেশে এসে রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। শেখ এ ইস্যুতে হাসিনা সরকারের প্রশংসাও করে গেছেন তিনি। অন্যান্য দেশ থেকেও আসছে বিপুল ত্রাণ। এক কথায় রোহিঙ্গা ইস্যু শুরু দিকে সরকারের জন্য বিপদ হিসেবে আবির্ভাব হলেও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে তা আশীর্বাদ হিসেবে রূপ নেয়। কিন্তু সরকারের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু দেশ ভারত ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের সহযোগী চীন মিয়ানমারের পক্ষ অবলম্বন করে। ফলে সরকারের কূটনৈতিক ব্যর্থতা নিয়ে সমালোচনা বাড়তে থাকে। বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে সরকার।


এছাড়া অন্য বিপদ তো আছে। এত বিশাল জনগোষ্ঠীর এ দেশে অতিরিক্ত আরো ১০ লাখ জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসন বাংলাদেশের জন্য চরম দুঃসাধ্য কাজ। উখিয়া, টেকনাফ, কক্সবাজার ও বান্দরবানসহ পুরো সীমান্তবর্তী এলাকায় ইতোমধ্যেই ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় শুরু হয়ে গেছে। আশ্রিত রেহিঙ্গারা অন্য এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ছে। এদের পুনর্বাসন, কর্মসংস্থান এবং মৌলিক অধিকার পূরণ কোনোভাবেই সম্ভব নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এ অবস্থা চলতে থাকলে কক্সবাজার, বান্দরবান ও রাঙামাটিসহ পুরো পর্যটন এলাকায় বিপর্যয় নেমে আসবে। জীবনের তাগিদে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতিসহ নানা বিশৃঙ্খল কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়তে পারে রোহিঙ্গারা। দেশে আইন শৃঙ্খলার চরম অবনতি দেখা দিতে পারে। যা সরকারের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও এটিকে সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।


এ দিকে একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং সরকারের ভুল নীতির কারণে দ্রব্যমূল্যের বেশ ঊর্ধ্বগতি চলছে। চালের কেজি ঠেকেছে ৭০ টকার ঘরে। অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যও একই অবস্থা। এতে জনজীবনে চরম নাভিশ্বাস উঠেছে। জীবিকা নির্বাহে চরম হিমশিম খাচ্ছে সাধারণ মানুষ। এ অবস্থা আরো কিছু দিন চলতে থাকলে তার খেসারত দিতে হতে পারে সরকারকে। আওয়ামী লীগ ও সরকারের কর্তাব্যক্তিরও বিষয়টি নিয়ে বেশ অশ্বস্তিতে পড়েছেন।


অন্য দিকে এ সরকারের মেয়াদও প্রায় শেষ দিকে। ঘনিয়ে আসছে জাতীয় নির্বাচন। সে নির্বাচনের ফর্মুলা নিয়ে সরকারবিরোধী বিএনপি জোটের সাথে সরব হয়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন প্রভাবশালী দেশ অংশগ্রহণমূলক একটি অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জোর তাগিদ দিচ্ছেন। নির্বাচনের ফর্মুলা নিয়ে জানতে চান সরকারের কাছে। বর্তমান সরকারের আমলে সংশোধিত সংবিধান অনুযায়ী আগামী নির্বাচন এ বর্তমান শেখ হাসিনা সরকারের অধীনেই হবে বলে দাবি করছেন সরকারের কর্তাব্যক্তিরা। অন্য দিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার তথা নির্দলীয় একটি নির্বাচনকালীন সরকারের দাবি করছেন বিএনপিসহ সরকারবিরোধীরা। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও এমন মনোভাব পোষণ করছেন।

এমন প্রেক্ষাপটে আগামী নির্বাচন কোন আদলে হবে তা নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন দেশের মানুষ। আর সরকারের দমন পীড়নের মুখে বিএনপি জোটসহ সরকারবিরোধীরা আপাতত ব্যাকফুটে অবস্থানে থাকলেও নির্বাচনকালীন তাদের আন্দোলন কৌশল কী হতে পারে তা নিয়ে নানা জল্পনা কল্পনা রয়েছে। বিরোধী জোট নেত্রী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া চিকিৎসার জন্য বর্তমানে লন্ডনে অবস্থান করছেন। এটি তার ব্যক্তিগত সফর হলেও বিএনপির ভবিষ্যৎ রাজনীতির গতিবিধি সেখানেই আবির্ভূত হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। বিএনপির সিনিয়র বাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সাথে একান্তে বসে বিএনপির রাজনীতির ছক তৈরি করা হচ্ছে বলে ধারণা করেছেন সবাই। এ অবস। তায় খালেদা জিয়া দেশে আসলে রাজনীতির গতিপথ কোন দিকে মোড় নিয়ে তা নিয়ে স্পষ্ট করে কেউ কিছু বলতেও পারছেন না। বিষয়টি নয়ে সরকারও বেশ চিন্তিত। সে জন্য খালেদা জিয়ার লন্ডন সফর নিয়ে নানা ধরনের তীর্যক মন্তব্যও করছেন তারা।


সরকারের সূত্রগুলো জানায়, ৫ জানুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠানে সরকারের বড় সহযোগী ছিল পাশের ভারতের কংগ্রেস সরকার। কিন্তু সে দেশের জাতীয় নির্বাচনে কংগ্রেসকে পরাজিত করে বিজেপি ক্ষমতায় এলেও নিজেদের সীমান্ত নিরাপত্তা ও জঙ্গি ইস্যুতে বাংলাদেশ সরকারের সাথে বেশ মানিয়ে নিয়েছিল নরেন্দ্র মোদি। তবে বাংলাদেশের উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে ভারতের পাশাপাশি চীনকেও অবারিত সুযোগ দেয় শেখ হাসিনা সরকার। এতে সরকারের ওপর মোদি সরকার খানিকটা নাখোশ বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে।

কিন্তু সম্প্রতি রোহিঙ্গা ইস্যুতে আবার শক্তিশালী দেশ ভারত ও চীন উভয় দেশই মিয়ানমারের পাশে অবস্থান নিয়েছে, যা প্রকারান্তরে শেখ হাসিনা সরকারের বিপক্ষে অবস্থান বলেই দেখা হচ্ছে। তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ব্যাপক সমালোচনার মুখে ভারত সরকার তার অবস্থান থেকে খানিকটা সরে এসে রোহিঙ্গাদের জন্য বাংলাদেশে ত্রাণও পাঠিয়েছে। চীন রয়েছে আগের অবস্থানেই। অন্য দিকে শেখ হাসিনা সরকারের পরম বন্ধু রাশিয়াও মিয়ানমারের পক্ষে একাট্টা অবস্থান নিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে বেশ বিপাকে রয়েছে সরকার। দেশের অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভবিষ্যৎ সমর্থন কোন দিকে যায় তা নিয়ে বেশ অশ্বস্তিতে রয়েছেন সরকারের নীতিনির্ধারকেরা। হ