হাইড্রোজেন বোমা কী করবে উত্তর কোরিয়া

Sep 26, 2017 03:47 pm
মানববিধ্বংসী মারণাস্ত্রের উদ্ভাবন


মীযানুল করীম


উত্তর কোরিয়া একের পর এক, মানববিধ্বংসী মারণাস্ত্রের উদ্ভাবন, বিস্ফোরণ, পরীক্ষা, আর মহড়া ঘটিয়েই চলেছে। কট্টর কমিউনিস্ট স্বৈরাচারী শাসিত দেশটির অব্যাহত রণোন্মাদনার সাম্প্রতিক ঘটনায় জাতিসঙ্ঘ কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এর ফলে উত্তর কোরিয়া জনশক্তি ও বস্ত্রশিল্প রফতানি এবং জ্বালানি তেল আমদানির ক্ষেত্রে বড় রকমের সমস্যায় পড়তে পারে। তবে পিয়ংইয়ং-এর একনায়ক নেতা কিম জং-উন স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে এই অবরোধের সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করে উল্টো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ‘কঠোর জবাব’ ও ‘চরম যন্ত্রণা’ দেয়া হবে বলে হুমকি দিয়েছেন।

এমতাবস্থায় বিশ্বের শান্তিকামী মানুষের প্রশ্ন, উত্তর কোরিয়াকে যুক্তরাষ্ট্র বহু আগেই জড়মঁব ঝঃধঃব বা দুর্বৃত্তরাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা দিলেও আজ পর্যন্ত তার পারমাণবিক রণসজ্জাকে কেন প্রতিরোধ করা হয়নি? অথচ ইরান পরমাণু অস্ত্র বানাতে পারে এই সন্দেহের বশবর্তী হয়ে দেশটিকে দীর্ঘদিন হেনস্তা করা হয়েছে। আজও এর অবসান হয়নি পুরোপুরি। এক দিকে কমিউনিস্ট কোরিয়ার ভয়াবহ সমর প্রস্তুতি ও রণহুঙ্কার, অন্য দিকে এই সুযোগে ক্যাপিটালিস্ট আমেরিকা কর্তৃক এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নিজ শক্তিমত্তা প্রদর্শন এবং প্রতিপক্ষ চীনকে হুঁশিয়ার করে দেয়া এই অবাঞ্ছিত পরিস্থিতি আর কতকাল দেখতে হবে, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।


উত্তর কোরিয়া বর্তমানে বিশ্বের নবম পারমাণবিক শক্তি, তথা পরমাণু বোমার অধিকারী দেশ বলে মনে করা যায়। বিশ্বের পাঁচটি বৃহৎ শক্তি ছাড়াও ইসরাইল এবং ভারত ও পাকিস্তান পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র। ইহুদিবাদী দখলদার রাষ্ট্র ইসরাইল মার্কিন নেতৃত্বাধীন পাশ্চাত্যের অনুমোদন, সমর্থন ও সহায়তায় পরমাণু অস্ত্র অর্জন করেছে, তা সর্বজনবিদিত। এ ক্ষেত্রে পশ্চিমা জগতের দ্বিমুখীনীতি, তথা সুবিধাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট।


যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা জগতের নীতিহীনতা এবং বিশ্বসংস্থার বরাবর পাশ্চাত্য স্বার্থরক্ষার প্রেক্ষাপটে উত্তর কোরিয়া তার সামরিক শক্তিমত্তা বাড়িয়ে যাচ্ছে। সর্বাধুনিক প্রতিরক্ষার গবেষণা, পরীক্ষা ও অস্ত্রসজ্জার ক্ষেত্রে ক্রমশ উত্তরণ ঘটিয়ে দেশটি পরমাণু বোমার পর গত ৩ সেপ্টেম্বর হাইড্রোজেন বোমার পরীক্ষা চালিয়েছে। এই বোমা আরো ভয়াবহ ধ্বংসের ক্ষমতাসম্পন্ন। হাইড্রোজেন বোমার পরীক্ষার মধ্য দিয়ে পিয়ংইয়ং আসলে ওয়াশিংটনের হুমকির জবাব দিয়েছে। আগস্টে স্বয়ং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ‘উত্তর কোরিয়াতে হামলা করা হবে’ বলে হুমকি দিয়েছিলেন।


অন্য সবার মতো উত্তর কোরিয়াও স্থিরনিশ্চিত, ‘জাতিসঙ্ঘের নিষেধাজ্ঞা মূলত মার্কিন প্রভাবের ফল।’ আসলেই, সংস্থাটি আজ পর্যন্ত এমন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি যা মার্কিন স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর। সে কারণে উত্তর কোরিয়া জাতিসঙ্ঘের নিষেধাজ্ঞার প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রকে হুমকি দিয়েছে। ব্রিটিশ সংবাদপত্র ইন্ডিপেন্ডেন্ট বলেছে, ‘যুক্তরাষ্ট্রের চাপে জাতিসঙ্ঘ উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে ছয়বার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।’
উত্তর কোরিয়া একের পর এক মারণাস্ত্রের পরীক্ষা চালাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যেকবার জবাবে হামলার হুমকি দিচ্ছে : মাঝে মাঝে কোরিয়ার কাছাকাছি গিয়ে দিচ্ছে মহড়া; বারবার জাতিসঙ্ঘকে দিয়ে আরোপ করা হচ্ছে নিষেধাজ্ঞা এটাই হয়ে আসছে বছরের পর বছর।


এবার নিষেধাজ্ঞা আসার আগেই উত্তর কোরিয়া বলেছে, ‘যুক্তরাষ্ট্র কঠোরতম দুর্ভোগের শিকার হবে যদি আবার নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হয়।’ বাস্তবে কী হবে বলা যায় না, তবে উত্তর কোরিয়ার এই হুমকির ভাষা লক্ষ করার মতো। তাদের পররাষ্ট্র দফতরের সে বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘পিয়ংইয়ংয়ের বিরুদ্ধে ওয়াশিংটন বিদ্বেষমূলক তৎপরতা অব্যাহত রাখলে উত্তর কোরিয়া এত বেশি কঠোর পদক্ষেপ নেবে যা যুক্তরাষ্ট্রের কল্পনা করাও দুঃসাধ্য।’ এখানেই থেমে থাকেনি কমরেড কিম জং উনের কমিউনিস্ট সরকার। তারা মার্কিন ‘গ্যাংস্টার’ বা ‘সশস্ত্র দুর্বৃত্ত’দের বশে এনে ছাড়বে বলেও জানিয়ে দেয়া হয়েছে।


এহেন বেনজির ও বেপরোয়া হুমকিতে মনে করা যেতে পারে, উত্তর কোরিয়া দিন দিন শক্তি বাড়িয়ে এখন পেন্টাগনকে চ্যালেঞ্জ করার পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। তবে অনেকের মতে, কোরিয়া-আমেরিকা বিরোধ যতই তীব্র হয়ে উঠুক, আবার গত শতাব্দীর মতো দীর্ঘ ও ভয়াবহ যুদ্ধের আশঙ্কা কম। এখন উভয় পক্ষ পরমাণু বোমা ও মিসাইলের মালিক। এ ক্ষেত্রে স্নায়ুযুদ্ধের আমলে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মাঝে যে দাঁতাত (উবঃবহঃব) বা ভয়ের ভারসাম্য ছিল, সে কথা মনে পড়াই স্বাভাবিক। দু’তরফেই জানা, পরমাণুযুদ্ধে কেউ জিতবে না এবং উভয়ের ধ্বংস অনিবার্য। আর এমন সঙ্ঘাতের পরিণাম কেবল সংশ্লিষ্ট দেশে সীমিত থাকে না।


যা হোক, বাস্তবতা হলো বারবার আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞায় উত্তর কোরিয়া অর্থনৈতিক সঙ্কট (দারিদ্র্য, দুর্ভিক্ষ) থেকে মুক্তি না পেলেও তার সামরিক শক্তি অর্জনে বিঘœ ঘটছে না। এসব নিষেধাজ্ঞা বা অবরোধে পিয়ংইয়ং যেন আরো একগুঁয়ে, আরো মরিয়া হয়ে উঠছে। কিম জং উনদের কাছে স্বৈরশাসক ও তার পরিবারের স্বার্থই মুখ্য; উত্তর কোরীয় জনগণের ভালো-মন্দের তোয়াক্কা তারা করে না। এ কারণে তারা জাপানকে ‘ডুবিয়ে দেয়া’ এবং আমেরিকাকে ‘পুড়িয়ে ছাই করে দেয়া’র হুমকি দিতে দ্বিধা করেন না।


এদিকে ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী স্যার মাইকেল ফ্যালোনের মতে, উত্তর কোরিয়ার সাথে যুদ্ধের মারাত্মক আশঙ্কা রয়েছে। তখন পিয়ংইয়ং থেকে লন্ডনেও মিসাইল ছোড়া হতে পারে। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘উত্তর কোরিয়ার মিসাইলের পাল্লা ক্রমেই বাড়ছে এবং সেখান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসের চেয়ে ব্রিটেনের লন্ডন কাছে। অবশ্য তার মতে, উত্তর কোরিয়ার সাথে লড়াই বাধবে, যদি পাশ্চাত্য হিসাব করতে ভুল করে বসে। তাই যে কোনোভাবে এটা পরিহার করা জরুরি।’


অপর দিকে, মার্কিন সিনেটের আর্মড সার্ভিসেস কমিটি চেয়ারম্যান জন ম্যাককেইন বলেছেন, ধৈর্যের সীমা পেরিয়ে গেলে কিম জং-উনকে ‘নিশ্চিহ্ন’ করে দেয়া হবে। টকশোতে তিনি বলেন, ‘কিম আক্রমণাত্মক ভূমিকা নিলে পরিণতি হবে ধ্বংসাত্মক।’