বিএনপি ও খালেদা জিয়া এখন যা নিয়ে ব্যস্ত

Sep 27, 2017 02:50 pm
জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ইস্যুতে সক্রিয় রয়েছে দলটি

মঈন উদ্দিন খান


রাজনীতিতে নির্বাচনমুখী দাবিদাওয়া নিয়ে নানামুখী বিতর্ক এখন কিছুটা স্তিমিত। এর মূল কারণ এক দিকে উত্তরাঞ্চলসহ দেশের একটি বড় অংশে বন্যা, অন্য দিকে রোহিঙ্গা ইস্যু। মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর জাতিগত নিধন অপারেশন চলমান থাকায় বাংলাদেশে স্রোতের মতো ঢুকছে শরণার্থী। আর এর ফলে কক্সবাজারের সীমান্ত পয়েন্টগুলোতে মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে। বিএনপি এখন ব্যস্ত রয়েছে বন্যাদুর্গত মানুষ ও রোহিঙ্গা শরণার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর কাজে।জনসম্পৃক্ততামূলক এসব কাজ দলের ভেতরে-বাইরে প্রশংসিতও হচ্ছে।


সরকারের দমন-পীড়ন ও উসকানি সত্ত্বেও দুই বছর ধরে বিএনপি ইতিবাচক রাজনীতি করে আসছে। সঙ্ঘাত বা সহিংসতা এড়িয়ে তারা সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধির দিকে নজর দিয়েছে। পাশাপাশি জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ইস্যুতে সক্রিয় রয়েছে দলটি। তবে এসব নিরীহ কর্মসূচি পালন করতে গিয়েও সরকারের রোষানলে পড়তে হচ্ছে তাদের।বন্যায় দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে এবং সর্বশেষ রোহিঙ্গা ইস্যুতে বিএনপির মানববন্ধনে কমপক্ষে ১৮ জেলায় বাধা দেয়া হয়েছে। রোহিঙ্গাদের জন্য নিয়ে যাওয়া ২২ ট্রাক ত্রাণ বিতরণ করতে দেয়নি প্রশাসন।
তবে এর পরও বসে নেই দলটি। বানভাসি মানুষের পাশে দলটি অনেকটা সুশৃঙ্খলভাবে পাশে দাঁড়িয়েছে। নির্বাচনের আগে এ কর্মসূচি অনেকেরই নজর কেড়েছে। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে বন্যা ও রোহিঙ্গা ইস্যু ভালোভাবেই সামাল দিচ্ছেন দলের নেতারা। যদিও এ ব্যাপারে খালেদা জিয়া সার্বক্ষণিক পরামর্শ দিচ্ছেন। আর জনসম্পৃক্ত ইস্যুতে সিনিয়র নেতারা সক্রিয় হওয়ায় তৃণমূল নেতাকর্মীরাও উজ্জীবিত।


এর বাইরে দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতিতে সরকারের ব্যর্থতা তুলে ধরে ‘বাজারে আগুন, জনজীবন বিপর্যস্ত’ শিরোনামে একটি পোস্টার দেশব্যাপী ছড়িয়ে দিয়েছে বিএনপি। দেশে গণতন্ত্রহীন সংস্কৃতি, সরকারের অপশাসন ও অন্যায়-অত্যাচার তুলে ধরে খালেদা জিয়ার নাগরিক সচেতনতামূলক একটি গণচিঠি তৃণমূলপর্যায় ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্রলীগের একচেটিয়া দখলসহ নানা অনিয়ম ছাত্রসমাজ তথা জনগণের মধ্যে তুলে ধরেছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। এ ছাড়া ছাত্রদলকে তার ২৫ দফা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারা দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দিতে দেখা গেছে।

শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্যের সমন্বয়ে একটি গণমুখী আন্দোলনের লক্ষ্যে সরকারের বৈষম্যমূলক নীতি ও শ্রমিক-কর্মচারীদের প্রতি সরকারের ক্রমাগত অমানবিক অবহেলা তুলে ধরে জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের একটি যৌক্তিক আহবান সারা দেশের সরকারি, আধা সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর শ্রমিক-কর্মচারীদের হাতে হাতে পৌঁছে দিয়েছে শ্রমিক দল। তৃণমূলপর্যায়ে জনমত সৃষ্টিতে দলের এসব কর্মকাণ্ড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে বলে দলটির নেতারা বলছেন।


সা¤প্রতিক সময়ে বিএনপি, ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, মহিলা দল এবং জাসাসের প্রায় সবপর্যায়ের কমিটি পুনর্গঠন করায় দলীয় নানা কর্মসূচিগুলোতে নেতাকর্মীদের প্রাণচাঞ্চল্য এখন চোখে পড়ার মতো। সরকারের গুম-খুন, মামলা-হামলাকে উপেক্ষা করে বিএনপির নেতাকর্মীরা আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছেন বলে মনে করছেন দলের নেতাকর্মীরা।


খালেদা জিয়া ঘোষিত ভিশন-২০৩০ জনমনে বেশ আশার সঞ্চার করেছে বলেও মনে করছে দলটি। এই ভিশনের ১০ লক্ষাধিক কপি ইতোমধ্যে দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। নানা সভা-সেমিনারের মাধ্যমে দলটি তার ভিশন-২০৩০ কে মাইলফলক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে।

সম্প্রতি  বিএনপি ১ কোটি নতুন সদস্য সংগ্রহ কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। ইতোমধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ ফরম পূরণকাজ সম্পন্ন হয়েছে বলে বিএনপির দফতর সূত্রে জানা গেছে।

দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, আমরা সঙ্ঘাত চাই না। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান চাই। সরকারের উসকানি বা ফাঁদে পা দেয়ার প্রশ্নই আসে না। এ মুহূর্তে দলকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করার দিকেই তারা বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
এদিকে চলতি মাসের শেষ সপ্তাহে অথবা অক্টোবরের প্রথমার্ধে দেশে ফিরতে পারেন বেগম খালেদা জিয়া। প্রায় দুই মাস ধরে দেশের বাইরে রয়েছেন তিনি। গত ১৫ জুলাই চিকিৎসা ও পরিবারের সদস্যদের সাথে সময় কাটাতে লন্ডনে যান। এ সফর একান্ত ব্যক্তিগত হলেও তিনি সেখানে কী করছেন, কবে ফিরবেন তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে রয়েছে নানা কৌতূহল। লন্ডনে খালেদা জিয়া চোখের ও পায়ের চিকিৎসা নিচ্ছেন। চিকিৎসকেরা ছাড়পত্র দিলে তিনি দেশে ফিরে আসবেন।


বিদেশে অবস্থান করলেও দেশের রাজনীতির খোঁজখবর প্রতিনিয়তই রাখছেন তিনি। দলের মহাসচিবের সাথে টাইম টু টাইম কথা হচ্ছে। বন্যায় অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং রোহিঙ্গাদের সহযোগিতার নির্দেশনা তিনিই দিয়েছেন।


লন্ডন থেকে চিকিৎসা শেষে বেগম খালেদা জিয়া দেশে ফিরলে বেশ কিছু নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চিন্তা করছে বিএনপি। সহায়ক সরকারের রূপরেখা তুলে ধরার পাশাপাশি এই ইস্যুতে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে কর্মসূচির ধরনও পাল্টে ফেলতে পারে দলটি। সাদামাটা কর্মসূচিতে থাকা বিএনপি নির্বাচনকে মূল লক্ষ্য ধরে এখন সামনে এগোচ্ছে। আসছে ডিসেম্বর থেকে কিংবা নতুন বছরে ‘সত্যিকারভাবেই’ ঘুরে দাঁড়াতে চায় তারা।


বিএনপির নেতারা বলেছেন, সাংগঠনিকভাবে বিএনপি চেয়ারপারসনের চলমান লন্ডন সফর খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সেখানে দলের দ্বিতীয় প্রধান নেতা সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান রয়েছেন। মা ও ছেলের মধ্যে সংগঠন ও আগামী দিনের রাজনীতির গতিপথ নিয়ে তাই আলোচনা হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক।


তারা বলেছেন, দল পুনর্গঠন এবং কর্মসূচি প্রণয়নের ক্ষেত্রে তারেক রহমান সবসময়ই পরামর্শ দিয়ে থাকেন। দেশে থাকা অবস্থায় মা ও ছেলের মধ্যে টেলিফোন আলাপে কিংবা বার্তাবাহকের মাধ্যমে পরামর্শ বিনিময় হয়ে থাকে। আগামী বছর নির্বাচনের বছর। নির্বাচনের আগে খালেদা জিয়া আর লন্ডনে না-ও যেতে পারেন। সে ক্ষেত্রে প্রতিটি আসনে দলের যোগ্য প্রার্থী ঠিক করা এবং আন্দোলনের কর্মসূচি নির্ধারণের ক্ষেত্রে কোন কোন দিকগুলো প্রাধান্য দেয়া হবে, তা নিয়ে মা ও ছেলে সরাসরি কথা বলেছেন বলেই তারা জেনেছেন।
খালেদা জিয়ার এ সফরের রাজনৈতিক ও ক‚টনৈতিক গুরুত্ব আছে বলে দলটির নেতাদের মত।