ট্রাম্পের স্বপ্ন কী পূরন হবে

Sep 27, 2017 03:06 pm
মার্কিন জাতির মাঝে বিভেদ-বিভাজন বাড়ছে


মীযানুল করীম

আমেরিকায় এখন ‘ড্রিমার’ নিয়ে বিতণ্ডা তুঙ্গে। ‘ড্রিমার’ অর্থ যারা স্বপ্ন দেখে। ‘অভিবাসীর দেশ’ যুক্তরাষ্ট্রে ‘ড্রিমার’ হলো সেসব অভিবাসী, যারা যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী বসবাসের মাধ্যমে নাগরিকত্ব লাভ এবং এ দেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি, শান্তি ও জনকল্যাণের ক্ষেত্রে অবদান রাখার ড্রিম বা স্বপ্ন দেখে। যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের মধ্যে কিছু আদিবাসী রেড ইন্ডিয়ান বাদ দিলে সবাই মূলত অভিবাসী, অনেকেই শরণার্থী। দেশটির ইংরেজিভাষী শ্বেতাঙ্গদের মূল বাসিন্দা মনে করা হলেও তারা প্রকৃতপক্ষে উপনিবেশবাদের আমলে
আগত ব্রিটিশদের বংশধর।

মার্কিন প্রেসিডেন্টদের মধ্যেও আছেন অভিবাসীদের অধস্তন পুরুষ। শুধু কৃষ্ণাঙ্গ ওবামা নন, শ্বেতাঙ্গ কেনেডি, এমনকি বর্তমান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও অভিবাসীর সন্তান। অথচ উগ্র জাতীয়তাবাদী ধ্যানধারণার অংশ হিসেবে ট্রাম্পের একটি ড্রিম বা স্বপ্ন হচ্ছে, প্রধানত কালো, মুসলমান ও হিস্পানিকসহ অভিবাসীদের নানা ছলছুতায় তাড়িয়ে শ্বেতাঙ্গদের রাষ্ট্ররূপে যুক্তরাষ্ট্রকে পরিচিত করা। তবে ট্রাম্প তার এ ধরনের বর্ণ-বৈষম্যমূলক পরিকল্পনা এগিয়ে নিতে বারবার প্রবল বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন। সংসদে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি এবং রাজপথে হাজার হাজার গণতন্ত্রী ও মানবতাবাদী মানুষ ট্রাম্প ও তার কট্টরপন্থী দোসরদের এ জাতীয় কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সোচ্চার।


ডোনাল্ড ট্রাম্প গত জানুয়ারিতে প্রেসিডেন্টের দায়িত্বভার গ্রহণের পর থেকেই বারবার বিভিন্ন বিতর্কিত পদক্ষেপ নিচ্ছেন। এতে মার্কিন জাতির মাঝে বিভেদ-বিভাজন যেমন বাড়ছে, তেমনি বহির্বিশ্বে আমেরিকার গণতান্ত্রিক ইমেজ ক্ষুণ হচ্ছে ব্যাপকভাবে। তবে ট্রাম্পের ‘বেপরোয়া পাগলামি’র গতি এতে কমেনি। অভিবাসীবিরোধী তথা বর্ণবিদ্বেষী নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়ে তিনি ক্ষমতায় এসেছেন। প্রেসিডেন্টের সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠানের পর তিনি কয়েকটি মুসলিম দেশের নারী-পুরুষকে আমেরিকায় প্রবেশের অযোগ্য ঘোষণা দিয়ে অভিবাসন প্রশ্নে প্রচণ্ড সমালোচনার সম্মুখীন হন। অচিরেই মার্কিন আদালত এই ইস্যুতে স্থগিতাদেশ দিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের হুঁশ ফেরাতে চেষ্টা করেছে। অপর দিকে, যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসীবিরোধী মনোভাবকে উসকে দেয়ার কাজ অব্যাহত রাখে কায়েমি স্বার্থবাদী মহল। ঘন ঘন Hate crimeএর ঘটনা ঘটে। এর শিকার হলেন প্রধানত মুসলমানেরা।


বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে চরম দৃষ্টিভঙ্গি এবং অগণতান্ত্রিক পদক্ষেপের দরুন ট্রাম্প তার মেয়াদ পূর্তির আগেই হোয়াইট হাউস ত্যাগ করতে, অর্থাৎ প্রেসিডেন্ট পদ থেকে বিদায় নিতে বাধ্য হবেন এমন ধারণা অনেকের। এখন অভিবাসন প্রশ্নে তার দল, রিপাবলিকান পার্টির কলহকোন্দল এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, খোদ ট্রাম্পের গুরুত্বপূর্ণ সাবেক উপদেষ্টা স্টিভ ব্যানন বলেছেন, ‘অভিবাসীদের প্রশ্নে বিতর্ক ও বিতণ্ডার জের ধরে প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানরা আগামী বছরই গরিষ্ঠতা হারাতে পারে।’ এই ব্যানন হচ্ছেন সেই লোক, যার অতিদক্ষিণপন্থী দৃষ্টিভঙ্গি ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারণার ধরন নির্ধারণ করেছিল এবং অভিবাসন, বাণিজ্য, জলবায়ু প্রশ্নে সে মোতাবেক ট্রাম্প এখন বিতর্কিত ভ‚মিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। তবে হোয়াইট হাউসে তার নিজের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের মাঝে উপদলীয় কোন্দল এত বেড়ে যায় যে, তিনি আগস্ট মাসে ব্যাননকে পদচ্যুত করে এই বিরোধ কমাতে চেয়েছেন।


‘ড্রিমার’ (স্বপ্ন দেখে যারা) হিসেবে পরিচিত আট লাখ অভিবাসীকে নিয়ে ট্রাম্প আর তার দল এখন বিষম বিপাকে। ‘ড্রিমার’রা শৈশবেই এসেছে যুক্তরাষ্ট্রে এবং তাদের এই আগমন আইনসম্মত ছিল না বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে খোদ রিপাবলিকানদের মধ্যে তাদের নিয়ে দু’টি মত রয়েছে। একাংশ মনে করে, ড্রিমাররা অবৈধ অভিবাসী এবং মার্কিনিদের চাকরিবাকরিতে ভাগ বসাচ্ছে। অপরাংশ মনে করে, এই অভিবাসীরা নানাভাবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অবদান রাখছে এবং এ কারণে সহানুভ‚তিই তাদের প্রাপ্য। গত বছর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রচারাভিযানের সময় ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ডেমোক্র্যাটদের অপেক্ষাকৃত নমনীয় ও উদারনীতির জবাবে উগ্র স্বাদেশিকতার কারণে অভিবাসীদের বিরুদ্ধে উসকানি দিচ্ছিলেন, তখন নিশ্চয়ই ভাবেননি, তার প্রপাগান্ডা ড্রিমার ইস্যুতে আজ বুমেরাং হয়ে নিজ ঘরেই ফাটল ধরাবে।
ড্রিমারদের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী হতে প্রেরণা জুগিয়েছে ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট ওবামার গৃহীত একটি কর্মসূচি। এর নাম Deferred Action for Childhood Arrivals (DACA), যার অর্থ ‘শৈশবে আগতদের জন্য স্থগিত পদক্ষেপ’। উগ্রপন্থী স্টিভ ব্যানন বিগত প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার এই কর্মসূচির অবসানের জোরালো সমর্থক। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও বলেছেন, ‘তিনি এই কর্মসূচি বাতিল করে দেবেন।’ তা হলে তরুণ অভিবাসীরা যুক্তরাষ্ট্রে এসে বসবাস ও চাকরি লাভের সুযোগ হারাবে। এখন মার্কিন পার্লামেন্টের উভয় কক্ষ (প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট) মিলিয়ে ট্রাম্পের দলই সংখ্যাগরিষ্ঠ। তিনি তাদের ছয় মাস সময় দিয়েছেন ‘ড্রিমার’-এর বিকল্প নির্ধারণের জন্য। ট্রাম্প জানান, এই আইন প্রণেতারা সম্মত হতে না পারলে তিনি ড্রিমার ইস্যু আবার ‘পরীক্ষা করে দেখবেন’। কিন্তু ব্যানন মনে করেন, এভাবে চললে প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকান পার্টির নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া হয়ে যাবে।


বলা প্রয়োজন, ব্যাননকে ট্রাম্প বরখাস্ত করলেও তিনি দাবি করেছেন যে, নিজের ইচ্ছায়ই তিনি হোয়াইট হাউস ছেড়ে এসেছেন। ব্যানন রিপাবলিকানদের কায়েমি নেতৃত্বের সমালোচক। তারাই ট্রাম্পের মতো অনভিজ্ঞ ব্যক্তি ও রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ীকে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে আজকের পর্যায়ে তুলেছেন।


সর্বশেষ সংবাদে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হতে পারে। তা হলো, ১৩ সেপ্টেম্বর রাতে ‘ড্রিমার’ কর্মসূচি নিয়ে ট্রাম্পের সাথে বিরোধী দল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ‘সমঝোতা’ হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। তবে ট্রাম্প তা অস্বীকার করেছেন। এএফপি জানায়, ১৩ তারিখে নৈশভোজ বৈঠকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাথে ‘ড্রিমার’ নিয়ে আলোচনা করেছেন সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের নেতা চাক হুকার এবং প্রতিনিধি পরিষদে তাদের নেত্রী ন্যান্সি পেলোসি। বৈঠকের পর ওই দু’জনের যৌথ বক্তব্যে জানানো হয়, ‘ড্রিমার কর্মসূচিকে অবিলম্বে আইনে রূপ দিতে আমরা একমত হয়েছি।’ অবশ্য টুইটার বার্তায় ট্রাম্প বলেন, এই কর্মসূচি নিয়ে কোনো সমঝোতা হয়নি। এদিকে, হোয়াইট হাউস প্রেস সেক্রেটারি বলেছেন, ‘এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে এবং সীমান্তে দেয়াল তোলা নিয়ে সমঝোতা হয়নি।’