রাশিয়ার মানুষ আসলে কেমন

Oct 03, 2017 02:56 pm
প্রতিদানহীন ভালোবাসা

জার্মান সাময়িকী দার স্পিজেল-এর প্রতিনিধি হয়ে তিন দশক রাশিয়ায় কাটিয়েছেন সাংবাদিক ক্রিশ্চিয়ান নিফ। দেশটির মানুষকে দেখেছেন একেবারে ভেতর থেকে। রাশিয়া ছাড়ার আগে আগে এঁকেছেন রুশ-মানসের একটি রেখাচিত্র। বলেছেন, এই মানস পুতিনের সৃষ্ট নয়, কিন্তু একেই তিনি কাজে লাগিয়েছেন দারুণ দক্ষতায়। অনবদ্য এই বিশ্লেষণটি ভাষান্তর করেছেন হুমায়ুন সাদেক চৌধুরী


সম্প্রতি বাড়িতে একটি বই খুঁজে পেলাম। বইটি বাড়িতেই ছিল কিন্তু ওটা নিয়ে অতটা ভাবার সময়-সুযোগ হয়নি। বইটির নাম ‘রাশিয়া : টুটাফাটা দেশের মানুষগুলো’। বইয়ের নামে রাশিয়া নামের দেশটিকে যেভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে তা কারো কাছে ঠিক মনে না হলেও আসলে কিন্তু মোটেই অসঙ্গত নয়।
সিকি শতাব্দী আগে কেমন ছিল রাশিয়া, বইটিতে সেটাই তুলে ধরা হয়েছে। সত্যি বলতে কী, তখন রাশিয়া ছিল একধরনের পাগলাগারদ। সোভিয়েত ইউনিয়ন তখন সবে ভেঙে পড়েছে, নতুন করে শুরু করার আশাবাদগুলো ক্রমেই অলীক স্বপ্ন হয়ে উঠছে, সাবেক আমলা (সরকারি ও পার্টির) ও ধূর্ত ব্যবসায়ীরা পতিত সোভিয়েতের উত্তরাধিকারকে নিজেদের কব্জায় নিয়ে হঠাৎ পাওয়া ধনের মজা লুটছে আর গোটা দেশ নিমজ্জিত হচ্ছে গভীর থেকে গভীরতর দারিদ্র্যে। দাদী-নানীর বয়সী প্রবীণাদের দেখা যাচ্ছে পুরনো জিনিসপত্র কেনাবেচার মার্কেটের সামনে এসে দাঁড়িয়ে থাকতে। হাতে বিয়ের স্মৃতি স্বর্ণের আংটি কিংবা অন্য কোনো অলঙ্কার; বিক্রি করবে ওগুলো তারা। দাঁড়িয়ে আছে ছাত্ররাও; তাদের কারো হাতে ডাকটিকেটের সংগ্রহ। এক সময় কত না শখ করেই না জমিয়েছিল ওসব! এখন দুর্দিনে সেগুলোও বিক্রি করে দিতে হচ্ছে! চার দিকে যুদ্ধ। চোখে দেখা যায় না কিন্তু স্পষ্ট অনুভব করা যায়।
এ-ই ছিল ১৯৯১ সালের রাশিয়া। তখন কোনো রুশ নাগরিকই বলতে পারত না দেশটির কী অবস্থা, রাজনৈতিকভাবে দেশটি কোন দিকে যাচ্ছে এবং চলমান সঙ্কটের সমাধানই বা কী। এসব প্রশ্নের উত্তর আমরা সাংবাদিকদেরও জানা ছিল না।
এসবই আজ ইতিহাস। পূর্বাপর সব কিছু বিবেচনায় নিয়েও বলা যায়, রাশিয়া নামে দেশটি আজ খুব খারাপ চলছে না। শুরুতে যে বইটির কথা বলেছি, সেটি আমারই লেখা। এতে আমি যুক্ত করেছি ১৮ ব্যক্তির প্রোফাইল, যারা ওই দিনগুলোতে রাশিয়ায় তাদের অবস্থান কী হবে, সেটার সন্ধানে ব্যাপৃত ছিলেন। যেকোনো দেশের ক্রান্তিকালে এঁদের দেখা মেলে। এঁরা হলেন রাজনীতিক ও সেনানায়ক, ব্যবসায়ী ও আর্টিস্ট, আদর্শবাদী ও জনপ্রিয় মানুষ এবং অপরাধী।
যাদের কথা বইয়ে বলা হয়েছে তাদের অনেকেই আজ বেঁচে নেই। এদের কারো স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে, আবার কেউ বা খুন হয়েছেন। এ ছাড়া কেউ কেউ দেশ ছেড়ে চলে গেছেন আবার কেউবা উঠে গেছেন সরকারের উঁচু পদে। আজকের দৃষ্টিকোণ থেকে যখন তাদের প্রোফাইলগুলো পরীক্ষা করে দেখি, বুঝতে কষ্ট হয় না কিভাবে একদল মানুষ তর তর করে সাফল্যের চূড়ায় উঠে গেল আর কেনই বা অন্য অনেকে পেছনে পড়ে রইল। পাঠক, আপনিও দেখতে পাবেন কিভাবে রাশিয়া তার ছন্দ ফিরে পেল।
বইয়ে যেসব বীরের কথা বলা হয়েছে তাদের একজন হচ্ছেন জোখার দুদায়েভ; চেচনিয়ার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট। ইনি ১৯৯১ সালে রাশিয়ার কাছ থেকে চেচনিয়ার স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং ককেশাস জনগণকে রুশ উপনিবেশবাদীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানান। জবাবে রাশিয়াও শুরু করে যুদ্ধ। চেচনিয়া নামের ছোট প্রজাতন্ত্রটিতে তারা মোতায়েন করে ৬০ হাজার সৈন্য। এই যুদ্ধে গুঁড়িয়ে যায় চেচেন প্রেসিডেন্টের দফতর, যেখানে বসে এ ঘটনার মাত্র তিন মাস আগে আমি তার সঙ্গে কথা বলেছিলাম। এর ১৫ মাস পর তার জীবন কেড়ে নেয় একটি রাশিয়ান মিসাইল। এরও ১৫ বছর পর শান্তি আসে চেচনিয়ায়, তবে তত দিনের যুদ্ধে কমবেশি ১৬০,০০০ মানুষের প্রাণহানি হয়েছে। তার পর থেকে আর কোনো অঞ্চল রাশিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার চেষ্টা করেনি।
বইয়ে বর্ণিত আরেক বীর হলেন সারগেই দেবভ। তিনি একজন বায়োকেমিস্ট ও স্কিন স্পেশালিস্ট। তিনিও এখন মৃত। দেবভ ১৯৫২ সালে যোগ দেন লেনিন মুসোলিয়াম ইউনিটে। এটি ছিল সোভিয়েত সরকারের একটি গোপন ইউনিট। এই ইউনিটের অধীনে একদল বিজ্ঞানী সেই ১৯২৪ সালে কমিউনিস্ট বিপ্লবের নেতা লেনিনের মৃত্যুর পর থেকে তার মরদেহ সংরক্ষণের কাজে নিয়োজিত। দেবভ একটি অনামা মিশ্রণ দিয়ে সপ্তাহে দু’বার লেনিনের শব পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করতেন। দেবভ পরবর্তীকালে সোভিয়েতের আরেক নেতা স্তালিনের মরদেহ সংরক্ষণের কাজেও নিয়োজিত হন।
এরপর সোভিয়েত ইউনিয়ন ও কমিউনিজম দুটোরই পতন ঘটে। বরিস ইয়েলৎসিন ক্ষমতায় বসেই গোপন ইউনিটের অর্থ বরাদ্দ এবং মুসোলিয়ামের সামনে অনার গার্ড বন্ধ করে করে দেন। আর লেনিন হঠাৎ করে অস্পৃশ্য ব্যক্তিতে পরিণত হন। অনেকে বলতে শুরু করেন, এবার তাকে (লেনিন) সেন্ট পিটার্সবারগ গোরস্থানে সমাধিস্থ করা হোক। নতুন সরকারের পদক্ষেপে এবং কিছু মানুষের কথাবার্তায় খুবই মর্মাহত হন দেবভ। তিনি আমাকে বলেছিলেন, ওরা লেনিনকে রাশিয়ার ইতিহাস থেকে বাদ দিতে চায়! এটা মানা যায় না।

রাশিয়ার ইতিহাসে অনুতাপ বলে কিছু নেই?

তবে বাস্তবতা হলো, ২৫ বছর পরও রেড স্কয়ারে বিপ্লবী নেতা লেনিনের মরদেহ প্রদর্শিত হয়ে চলেছে, দেবভের উত্তরসূরিরা এখনো কাজ করছেন এবং এর মধ্য দিয়ে ‘রাশিয়া কিভাবে স্থিতিশীলতার পথ খুঁজে পেল’ তার একটা ব্যাখ্যা পাওয়া সহজ হলো। অক্টোবর বিপ্লবের এই নেতা এখনো রাশিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রতীক, যদিও স্তালিনের মতো তিনিও কমিউনিস্ট আদর্শের জন্য কত লোকের প্রাণ গেল তা নিয়ে মাথা ঘামাতেন না। তার সার্বক্ষণিক উপস্থিতিই কমিউনিজম-অনুগতদের শান্ত রাখত আর পাশাপাশি ক্রেমলিন নেতৃত্বের এ ধারণারও প্রতিফলন ঘটাত যে রাশিয়ার ইতিহাসে অনুতাপ বলে কিছু নেই। পুতিনের রাশিয়ায় ইতিহাসকে যেভাবে দেখা হয় তাতে এই মনোভঙ্গিই ফুটে ওঠে।
বইয়ে বর্ণিত তৃতীয় ব্যক্তি এখনো জীবিত আছেন, তার বয়স এখন ৫৩ বছর। তিনি হচ্ছেন রোগোজিন। তার ও স্তালিনের জন্মতারিখ একই। তিনি যেন বেড়েই উঠেছিলেন উপপ্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য এবং এখন তিনি রুশ প্রতিরক্ষা শিল্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত। অল্প কিছু দিন আগেও তিনি কমিউনিস্ট পার্টির যুবশাখা কমসোমল-এ সক্রিয় ছিলেন। পরে তাকে ন্যাটোতে রাষ্ট্রদূত করে পাঠানো হয়। ওই সময় তিনি নানা রকম কড়া বিবৃতি দিয়ে পশ্চিমা মিলিটারিকে হতভম্ব করে দেন। সে সময় ব্রাসেলসে তার সঙ্গে আমার প্রায়ই দেখা হতো।
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর রোগোজিনকে দায়িত্ব দেয়া হয় আড়াই কোটি জাতিগত রুশের ভাগ্য নির্ধারণের, যারা এখন বাস করছে বিভিন্ন সাবেক সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রে। এ দায়িত্ব পেয়ে তিনি রাশিয়ার বাইরে বসবাসরত রুশীদের স্বার্থরক্ষায় প্রতিষ্ঠা করেন কংগ্রেস অব রাশিয়ান কমিউনিটিজ এবং হয়ে ওঠেন ‘রাশিয়ান ওয়ার্ল্ড’ নামের নতুন এক ভাবধারার প্রবক্তা। এর মর্মকথা হলো, রুশ জনগোষ্ঠী পৃথিবীর যে প্রান্তেই বাস করুক না কেন, তাকে রক্ষা করতে হবে।
রোগোজিন এখন রুশ সরকারের জাতীয়তাবাদী মাউথপিসের একজন কেউকেটা। এখনো কড়া কথায় তার জুড়ি নেই। অতি সম্প্রতিও তিনি পশ্চিমা রাজনীতিকদের ‘আবর্জনা’ বলে গালি দিয়েছেন।
চেচনিয়া পুনরুদ্ধার, সোভিয়েত ইতিহাসের পুনর্বাসন এবং ‘রাশিয়ান ওয়ার্ল্ড’ নামের নতুন ভাবধারার প্রবর্তন সবই নবীন রাশিয়াকে রক্ষায় সহায়ক হয়েছে আর সবই যেন ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন নিজ দেশে যা করছেন সেই ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির মতোই। রাশিয়ায় যা হচ্ছে তার জন্য রুশরা প্রেসিডেন্ট পুতিনের প্রতি কৃতজ্ঞ, যার প্রতিফলন দেখা গেছে সাম্প্রতিক জনমত জরিপে, যেখানে পুতিনের কাজকর্মকে সমর্থন দিয়েছে ৮০ ভাগ মানুষ।

নতুন রাশিয়া

পুতিনের নেতৃত্বে একটি নতুন রাশিয়ার যে অভ্যুদয় ঘটেছে তা অনেক জায়গাতেই দৃশ্যমান। কয়েক সপ্তাহ আগে রাশিয়ার পশ্চিমাঞ্চলীয় গভারদেয়িস্ক শহর ভ্রমণে যাই। ছোট একটি শহর, মাত্র ১৩ হাজার মানুষের বসবাস। সর্বশেষ এ শহরে আমি এসেছিলাম ১৯৯৮ সালে, ‘গ্রেট রুবল ক্রাইসিস’-এর ঠিক পরপরই। এই সঙ্কট সরকারকে প্রায় দেউলিয়া বানিয়ে ফেলেছিল। চালাতে না পেরে প্রথমে বন্ধ হয়ে যায় শহরের পেপার মিল, তারপর কনক্রিট ফ্যাক্টরি এবং শেষে মাখন কারখানা। হিটিং প্ল্যান্টগুলো বন্ধ হচ্ছিল কয়লার অভাবে। শহরের চার ভাগের তিন ভাগ মানুষের জীবন চলে গিয়েছিল দারিদ্র্যসীমার নিচে।
এ সময় এমনকি হাসপাতালগুলোতেও হিটিং সিস্টেম অকেজো হয়ে ছিল, ওষুধপত্র বা চিকিৎসা বলতেও কিছু ছিল না। ছিল না এমনকি ডাক্তারদের হাতে পরার গ্লোভও। শহরটির চার পাশের গ্রামগুলোতে পুষ্টিহীনতা ছিল ব্যাপক। খাওয়ার পানি ছিল নোংরা, ফলে যক্ষ্মা ও মেনিনজাইটিস রোগের প্রকোপ বেড়েই চলছিল।
এখন অর্থাৎ ২০১৭ সালে এসে সেই অবস্থা পুরোপুরি পাল্টে গেছে। শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত বাড়িগুলো নতুন লাগানো রঙে ঝকঝক করছে। খোলা হয়েছে নতুন কিছু কারখানাও একটি ফার্নিচার ফ্যাক্টরি, একটি মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণ প্ল্যান্ট এবং একটি প্যাকেজিং ম্যাটেরিয়াল ফ্যাক্টরি। আছে একটি ইয়ুথ সেন্টার এবং একটি ব্যায়ামাগারও। একটি দুর্গ, যেটিকে সাবেক সোভিয়েত আমলে জেলখানা বানানো হয়েছিল, সেটিকে সংস্কার করে পর্যটকদের জন্য খুলে দেয়ার ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।
যদি আপনি পুব দিকে অনেক দূরে চলে যান, মানে একেবারে গ্রামের ভেতরে, আপনার চোখে পড়বে সম্পূর্ণ ভিন্ন আরেক বাস্তবতা একটি মৃত্যুমুখী গ্রাম। তবে দুই দশক আগে জারি করা যে জরুরি অবস্থা দেশটিকে পঙ্গু করে ফেলেছিল তার কোনো চিহ্ন এখন আর এদেশে খুঁজে পাওয়া যাবে না, বিশেষ করে মস্কোতে। অনেক পদচারী জোন, বিশাল সব সুপার মার্কেট, জ্যাজ ক্লাব ও আভা-গারদ থিয়েটার, রাস্তায় রাস্তায় ওয়াইফাই এবং এমনকি পাতাল রেল সব নিয়ে মস্কো এখন নিজেকে আধুনিক মহানগরীতে রূপান্তরিত করে ফেলেছে।

রুশ রাজনীতিতে ফিডব্যাক লুপ নেই

তবে এত কিছুর মধ্যেও দেশটির কিছু জিনিস ঠিক আগের মতোই রয়ে গেছে, একটুও বদলায়নি; তা সে রাজধানীতে যেমন, সারা দেশেও তেমন। সম্প্রতি মস্কোর একটি অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিংয়ে লাগানো একটি নোটিশ দেখে ব্যাপারটা আমার মাথায় এলো। মনে হলো, শত বছর ধরে চলে আসা রাশিয়া ও আজকের নতুন রাশিয়ার মাঝে ‘কোনো ভেদ নাই’।
নোটিশটি জারি করেছে মস্কো মিউনিসিপ্যাল গভর্নমেন্ট। এতে বলা হয়েছে যে তারা মস্কোর ৪,৫০০ অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং ভেঙে ফেলার পরিকল্পনা নিয়েছে। কারণ, পাঁচতলা এসব ভবন প্রি-ফেব্রিকেটেড (বিভিন্ন অংশ আলাদাভাবে বানিয়ে পরে জোড়া দেয়া), ভয়াল দর্শন, কুৎসিত এবং বেশির ভাগই ঝুরঝুরে।
খুব ভালো কথা। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন করতে গেলে মস্কো নগরীর প্রায় এক মিলিয়ন অর্থাৎ ১২ ভাগের এক ভাগ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। কিন্তু নগর সরকারের এতেও বোধ হয় কিছু আসে-যায় না। তারা তাদের পরিকল্পনা নিয়ে নির্দয়ভাবে এগিয়ে যেতে চায়। এজন্য পার্লামেন্টকে দিয়ে বিদ্যুৎ গতিতে এ-সংক্রান্ত একটি আইনও পাস করিয়ে নিয়েছে তারা। আর তাতেই ঘৃণা ও ক্ষোভের ঝড় বইতে শুরু করেছে চার দিকে, এমনকি যেসব এলাকা সম্ভাব্য ভাঙচুরের আওতায় আসেনি, সেখানেও।
আমার বিল্ডিংয়ে একটি নোটিশ এসেছিল ‘মস্কোভিটস এগেইস্ট দ্য ডেমোলিশন’ নামে একটি সংগঠনের তরফ থেকে। তাদের বক্তব্য হচ্ছে, এটা হচ্ছে বাধ্যতামূলক পুনর্বাসনের একটা অবমাননাকর রূপ। এখানকার যেসব বাসিন্দা যেতে চাইবেন না তাদের জোর করে উৎখাত করা হবে এবং সেজন্য তাদের কোনো ক্ষতিপূরণও দেয়া হবে না। অনেকে এসব ফ্ল্যাট কিনে নিয়েছিলেন। এখন তাদের যে ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে তা দিয়ে তারা ওই রকম আরেকটি ফ্ল্যাট কিনতে পাবেন না।
এ নিয়ে মস্কোতে চেঁচামেচি কম হয়নি। সবাইকে অবাক করে দিয়ে সরকারও পিছু হটে। এমনকি একপর্যায়ে স্বয়ং প্রেসিডেন্ট পুতিন বিষয়টিতে হস্তক্ষেপ করেন। তিনি দুমার (রুশ সংসদ) কাছে আবেদন জানান যেন এ বিষয়ক আইনটি ঈষৎ সংশোধন করা হয়। প্রেসিডেন্ট পুতিনের হস্তক্ষেপের কারণও স্পষ্ট। আগামী বছর অর্থাৎ ২০১৮ সালে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা রয়েছে। ঠিক এর আগে-আগে তিনি দেশে কোনো গণবিক্ষোভ হতে দিতে চান না।
এই যে পুরো ব্যাপারটি, রাশিয়া নামে দেশটিতে এটাই স্বাভাবিক ঘটনা। এমনকি সরকার যদি জনগণের ভালোর জন্যও কোনো পদক্ষেপ নিয়ে থাকে, ঘটনা কিন্তু হয়ে যায় অন্য রকম। এর কারণ হলো, সরকার আগে সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়, তারপর সেটা জনগণকে জানায়। এ যেন বড়দিনের উপহার; আগেভাগে জানার উপায় নেই উপহারটি কী এবং তারা বলশেভিক কায়দায় তাদের প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করতে চায়। জনগণ বিরোধিতা করতে পারে এমন ধারণা থাকলেও সেটাকে পাত্তা দেয়ার কথা রুশ রাজনীতিকেরা ভাবতেই পারেন না। ফ্ল্যাটবাড়িতে বসবাসরতদের নিয়ে এই ঝামেলা আবারও দেখিয়ে দিলো যে রুশ রাজনৈতিক ব্যবস্থায় এখনো কোনো ফিডব্যাক লুপ নেই। সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়ায় জনগণকে অন্তর্ভুক্ত করার কোনো উদ্যোগ সরকার কখনো নেয় না। রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো আসে কখনো অনুগ্রহ, কখনো বা নিষেধাজ্ঞা হিসেবে। এতে করে মস্কো ও অন্যান্য শহরে কেন নতুন করে বিক্ষোভের ঢেউ উঠল, তা বুঝতে পারা সহজ হয়। আর সরকার ও জনগণ একমত হয়েছে এমন ঘটনা রাশিয়ায় কদাচিৎই ঘটে।

প্রতিদানহীন ভালোবাসা

লেখক ভিক্তর এরোফিয়েভ একবার বলেছিলেন, এটা হচ্ছে অনেকগুলো ব্যারিয়ারের (সড়ক প্রতিবন্ধক) দেশ এবং এসব ব্যারিয়ারের ‘স্বাভাবিক অবস্থা’ হচ্ছে বন্ধ থাকা। তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা দেশকে ভালোবাসি, এতে দেশ খুশি। কিন্তু দেশ কি সেই ভালোবাসা আমাদের ফিরিয়ে দেয়? রাশিয়া কি আমাদের ভালোবাসে?’ এরোফিয়েভ বিশ্বাস করতেন যে রাশিয়ার প্রতি রুশদের ভালোবাসা প্রতিদানপ্রত্যাশী নয়। গত কয়েক দশকে বিষয়টি আমিও মাঝে মধ্যে লক্ষ করেছি। তবে এরোফিয়েভ এও মনে করতেন যে এ জন্য রুশদেরই দায়ী করতে হয়। কারণ, তারা রাষ্ট্রীয় বিষয়াদিতে খুব একটা আগ্রহ খুঁজে পায় না।
কয়েক মাস আগে এ বিষয়টি নিয়ে বরেণ্য চলচ্চিত্রনির্মাতা ও থিয়েটার পরিচালক আন্দ্রেই কনচালোভস্কির সঙ্গে আমার বেশ একটা তর্কবিতর্ক হয়ে যায়। তার বয়স এখন ৮০ চলছে। রাশিয়ার সেরা সিনেমাগুলোর কয়েকটি তারই বানানো। তা ছাড়া দীর্ঘ দিন বসবাস করেছেন হলিউডে। এ বিষয়ে তার সঙ্গে আমার মতের মিল না হলেও আমরা একে অপরের খুবই ঘনিষ্ঠ এবং অনেক বিষয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি অভিন্ন। কনচালোভস্কির সোজাসাপ্টা কথা হলো, শতাব্দীর পর শতাব্দীব্যাপী রুশরা তাদের বুকের ভেতর একজন কৃষকের আত্মা ধারণ করে। সত্যিকার অর্থে ‘নাগরিক’ বলতে যা বোঝায়, রুশরা তা কখনো হতে পারেনি এবং তারা সবসময় রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। কারণ, সরকার সবসময় তাদের কাছ থেকে কিছু-না-কিছু কেড়ে নিতে চেয়েছে। একইভাবে রুশরা এত বেশি ধৈর্যশীল যে, যেকোনো অন্যায়কেও সহজে মেনে নেয়। রুশদের চিন্তার ধারাই আসলে প্রাচীন ম্যানিচিয়ান ধর্মের অনুসারীদের মতো হয় সাদা নয়তো কালো।
কনচালোভস্কি আরো মনে করেন, পুতিন প্রথম-প্রথম পশ্চিমাদের মতোই ভাবতেন। কিন্তু একপর্যায়ে তিনি বুঝে ফেললেন এদেশ শাসন করতে অতীতের প্রত্যেকটি শাসককে কেন লড়াই করতে হয়েছে কারণ হলো এ দেশের মানুষ তাদের অপরিবর্তনীয় ঐতিহ্যের সূত্র ধরে সব ক্ষমতা এক ব্যক্তির হাতে তুলে দেয়। তারা ভাবে, এই ব্যক্তিই তাদের ভালো-মন্দ সব কিছু দেখভাল করবে, তাদের নিজেদের আর কুটোটিও নাড়তে হবে না।
এ অর্থে বলতে গেলে বলতে হয়, রাশিয়ায় সরকার ও জনগণের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির জায়গাটি বিশাল। একজন বিদেশী কি এ নিয়ে কথা বলতে পারে? আমি মনে করি, পারে। আমি ৩০ বছর ধরে সাংবাদিকতা করছি এবং জীবনের অর্ধেক সময় এ দেশে কাটিয়েছি। আমার কাছে তাই এটা পরিষ্কার যে ১৯৯০-এর দশকে বরিস ইয়েলৎসিনের সঙ্গে থাকা উদারপন্থীরা কেন হেরে গিয়েছিলেন। আসলে ব্যাপার হলো, রাশিয়ায় উদারপন্থার কোনো ভাত নেই, এ দেশের জনগণ এসব পছন্দ করে না।
অনেক রুশের সাথে তাদের সরকারের অদ্ভুত সম্পর্কটি প্রতিদিনকার অসংখ্য ঘটনার মধ্য দিয়েও প্রকাশিত হয়। বছর দুই-তিন আগের একটি ঘটনার কথাই বলি। নগরীর পার্কিং সমস্যা সমাধানে মস্কোর মেয়র উদ্যোগ নিলেন অনলাইন পার্কিং সিস্টেম চালু করার। তার জন্য যে ফি ধার্য করা হলো তার পরিমাণও খুবই স্বল্প; ঘণ্টায় এক ইউরোরও কম। নতুন ব্যবস্থাটি ভালোই কাজ দিতে থাকল, পার্কিং সমস্যা অনেকটাই কমে এলো। এরপর কী হলো? মস্কোর গাড়িমালিক-চালকেরা তাদের গাড়ির লাইসেন্স-প্লেট নাম্বারটা ঢেকে রাখতে শুরু করল, যাতে ইন্সপেকশন গাড়িগুলো ওই নাম্বার স্ক্যান করতে না পারে। এর ফলে কোনো আইন লঙ্ঘনকারী গাড়িকে চিহ্নিত করা অসম্ভব হয়ে গেল।
আরেকটি উদাহরণ : কয়েক দশক ধরে রাশিয়ায় নতুন কোনো রাস্তা তৈরি হয়নি। তো এ অবস্থায় সম্প্রতি পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে যে মস্কো ও সেন্ট পিটার্সবার্গের মধ্যে একটি নতুন হাইওয়ে নির্মাণ করা হবে। মস্কোর শেরেমেতিয়েভো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর অভিমুখী একটি সড়ক এমনিতেই চালু আছে। তবে এটি দিয়ে যেতে গেলে টোল (শুল্ক) দিতে হয় বলে গাড়িওলারা বড় সহজে ওপথ মাড়াতে চায় না। ফলে রাস্তাটি একরকম অব্যবহৃতই থেকে যায়। অথচ টোলের পরিমাণ তুলনামূলক কমই। রুশ ড্রাইভাররা মনে করে, সরকারকে এই টাকা দেয়ার কোনো মানে নেই। তারা এর চেয়ে যানজটে বসে থাকাই ভালো মনে করে।

নিষ্ক্রিয়তা ও অবহেলা

সমাজের মানুষকে সমাজের জন্য কিছু করতে হয় এবং বিনিময়ে সমাজ বা রাষ্ট্রের কাছ থেকেও কিছু পায় এই বিশ্বজনীন ধারণাটির চর্চা রাশিয়াতে বিরল। রুশরা তাদের অভিনেতা ও কবিদের খুবই ভালোবাসে, কিন্তু সত্যিকার সৃষ্টিশীল মানুষ, যারা কিনা তাদের নিজস্ব পন্থায় দেশের ভবিষ্যৎ লক্ষ্যবিষয়ক বিতর্কটাকে এগিয়ে নিতে চান, তাদের ব্যাপারে রুশদের দৃষ্টিভঙ্গি সংশয়পূর্ণ।
সেটা কেমন, তা বলছি। লেখক বরিস আকুনিনের বই লাখ লাখ কপি বিক্রি হয়, কিন্তু তিনি দেশে থাকতে পারেন না, থাকেন দেশের বাইরে। কারণ, তিনি সরকারের রাজনীতির সমর্থক নন। একই কথা খাটে আরেক লেখক ভøাদিমির সরোকিনের বেলায়ও। সরকারের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সংগঠনগুলো তাকে বহু দিন বহু রকম হেনস্তা করেছে। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পরিচালক কিরিল সেরেব্রেনিকভও আছেন প্রচণ্ড চাপের মধ্যে। পুলিশ সম্প্রতি তার থিয়েটারে অভিযান চালিয়ে তা তছনছ করে দেয়। বলশয় থিয়েটারে তার ব্যালে ‘নুরিয়েভ’-এর প্রিমিয়ার শো হওয়ার কথা ছিল। রক্ষণশীল রাজনীতিকদের প্রবল চাপে শোর তিন দিন আগে তা বন্ধ করে দেয়া হয়। এতে আমি নিজেও ক্ষতিগ্রস্ত হই। কারণ, ওই সন্ধ্যার জন্য প্রায়-বিরল একটি টিকিট আমিও জোগাড় করেছিলাম।
সরকারের এসব বাড়াবাড়ি রুশদের মধ্যে কোনো আলোড়ন তোলে না। তাই মস্কোর বুদ্ধিজীবী মহলের দু-একটি কণ্ঠস্বর ছাড়া আর কোথাও কোনো প্রতিবাদ হয়নি। এ কারণেই বুঝি লেখক ভিক্তর ইয়েরোফিয়েভ ব্যঙ্গ করে বলেছিলেন, ‘আমরা হলাম সেই জাতি, আমরা তাদেরই পছন্দ করি যারা আমাদের মতো। আর যারা আমাদের মতো নয়, আমাদের কাছে তাদের কোনো প্রয়োজন নেই।’
এক সরকারি কৌঁসুলি, যে কিনা সবসময় মানুষকে আতঙ্কিত করে রাখত, সে চলে গেলেও সে-ই এখনো সংস্কারবাদী মিখাইল খোদরকোভস্কির চেয়ে তাদের কাছের মানুষ। অথচ তিনি পুতিন সিস্টেমের একজন বড় সমালোচক।
আমি ভেবে পাই না, কেন এমন হয়। সম্প্রতি সেন্ট পিটার্সবার্গের এক থানায় গিয়ে আমি হতবাক হয়ে যাই। জনগণ যে কিছুই না তা যেন তারা বুঝতে পারে, তা এখানকার চেয়ে বেশি আর কোথাও গেলে বুঝা যাবে না। থানার প্রবেশপথটিতে ভারী লোহার দরজা। সেটিও অজানা কারণে সবসময় বন্ধই থাকে, আবার অজানা কারণেই মাঝে মধ্যে খুলে দেয়া হয়। সেটি পেরিয়ে যারা ভেতরে ঢুকতে পারছে, তাদের দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না ডিউটি অফিসার বাবুটি। তার দফতরে সব কাজই হয় হাতে হাতে, মেশিনের কোনো বালাই ওখানে নেই। অফিসের দেয়ালে দেয়ালে ফেলিক্স দঝেরঝিনস্কির ছবি সাজানো। কী আশ্চর্য! এই লোক ছিলেন সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রথম গোয়েন্দাপ্রধান। তার পরিচালিত লাল সন্ত্রাস অভিযানে লাখ লাখ মানুষ নিহত হয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর প্রথম যার মূর্তি ভাঙা হয়, সে ছিল এই লোক। আর এখন কিনা তারই ছবি মাথার ঝুলিয়ে রেখেছে পুলিশ!
প্রশ্ন হলো, একটি কথাও না বলে রুশরা কেন এসব মেনে নিচ্ছে?
তাদের এই নিষ্ক্রিয়তা ও অবহেলা দুঃখজনকভাবে গ্রথিত নিয়তিবাদ ও দায়ভার গ্রহণের ভয়ের সঙ্গে এবং এটাই তাদের অধিকাংশের জন্য ঐতিহাসিক সত্যের মর্মে প্রবেশ করাকে অসম্ভব করে রেখেছে। আর তাই স্তালিনের নতুন মূর্তি তৈরি হতে দেখেও অনেকে দেখি এ ব্যাপারে উদাসীন। মস্কোর এক সাংবাদিক বলেন, এ যেন ইহুদিরা হিটলারের মূর্তি বানাচ্ছে!
রাষ্ট্রের হাতে নিপীড়িত হওয়াটাকেও এ দেশে এখনো কপালের লিখন বলেই দেখা হয়। সোশ্যাল ফিলোসফার আলেক্সান্দার জিপকো এ প্রসঙ্গে বলেন, সোভিয়েত আমলে পরিচালিত লাল সন্ত্রাস অভিযানে লাখ লাখ মানুষ নিহত হওয়ার বিষয়টিই এখনো এ দেশের বেশির ভাগ মানুষ বুঝতে চায় না।
এ প্রসঙ্গে ডেনিস কারাগোদিনের উদাহরণটি তুলে ধরা যায়। ৩৫ বছর বয়সী এই মানুষটি থাকেন সাইবেরিয়ান শহর তোমস্কে। ১৯৩৮ সালে তার পরদাদা স্তেপানকে ‘জাপানি গুপ্তচর’ সাব্যস্ত করে গোয়েন্দা বাহিনী। পরে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। এই মিথ্যা অভিযোগের পেছনে কারা ছিল, বহু বছরের গবেষণায় সম্প্রতি তা উদঘাটন করেছেন কারাগোদিন এবং সব তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তিনি দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে একটি মামলাও করেন, যদিও আসামিরা বহুকাল আগেই মারা গেছে। এখানে বলা প্রয়োজন যে, কারাগোদিনই রাশিয়ার প্রথম ব্যক্তি, যিনি রুশ সরকারের আনুষ্ঠানিক পুনর্বাসন নোটিশের ব্যাপারে অসন্তুষ্টি জানিয়েছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন অভিযুক্ত সবাইকেই বিচারের আওতায় আনা হোক, অন্তত প্রতীকীভাবে হলেও। কিন্তু নির্বুদ্ধিতা ও উন্মত্ততার কাছে হেরে যায় তার অধ্যাবসায়। তাদের ‘যুক্তি’ ছিল : যা ঘটে গেছে তার কিছুই তো আপনি বদলাতে পারবেন না।

চাপাবাজি, অর্ধসত্য ও মিথ্যা

এ বইয়ে আমি যেসব বিষয় নিয়ে লিখেছি, তার একটাও কিন্তু পুতিনের উদ্ভাবিত নয়। তিনি বড়জোর এগুলোকে খুঁজে বের করেছেন এবং নিজের যোগ-বিয়োগের সাথে মিলিয়ে নিয়েছেন। ব্যক্তিগত দায়ভারের ভয়? ভিন্নমতাবলম্বীদের কোণঠাসা করা? নিয়তির কাছে আত্মসমর্পণ? বাকি দুনিয়ার সামনে নিজেদের ছোট ভেবে জড়সড় হয়ে থাকা? রাষ্ট্রের উচিত এগুলোর বিরুদ্ধে কাজ করা। কিন্তু তা না করে সরকার যদি এসব তার পক্ষে যাবে ভেবে হাওয়া দেয়, তাহলে? কয়েক বছর ধরে এসব বিষয় আমাকে ক্রমাগত পীড়িত করে আসছে, বিশেষ করে যখন দেখি আমার রুশ বন্ধুদের অনেকেও তাদের প্রেসিডেন্টের চাপাবাজিতে বশীভূত।

ইউক্রেনিয়ানদের ব্যাপারে রুশদের অপমানবোধের আগুনটা ভালোভাবেই জ্বালিয়ে দিতে পেরেছেন পুতিন। ইউক্রেনিয়ানরা এখন ক্রমেই বেশি করে ইউরোপিয়ানদের কাছাকাছি হতে পারছে এতে রুশরা বেশ ঈর্ষান্বিত। পুতিনও তাদের মধ্যে এমন একটা ধারণা তৈরি করে ফেলতে পেরেছেন যে রুশদের নৈতিক ও সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব পাশ্চাত্যের চেয়ে উন্নত। এ ধারণার সঙ্গে বাস্তবতার বিন্দুমাত্র মিল তো নেইই, বরং এর ফলে দেশ ও জাতি আরো বেশি করে বাইরের জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। পুতিন রাশিয়াকে বিশ্বব্যবস্থার বিপরীত প্রান্তে দাঁড় করাচ্ছেন আর রুশবাসীও এতে আনন্দ-উত্তেজনা অনুভব করছে, যদিও এটা ঠিক যে, বহু রুশ তাদের জীবনধারণের জন্য প্রাথমিকভাবে ইউরোপ-আমেরিকার ওপরই নির্ভরশীল।
আগেই বলেছি, এর কিছুই পুতিন উদ্ভাবন করেননি। তিনি কেবল শিখে নিয়েছেন কিভাবে দক্ষতার সাথে এগুলোকে কাজে লাগাতে হয় এবং গলাবাজি, অর্ধসত্য ও মিথ্যা দিয়ে রুশবাসীর মন জয় করতে হয়। রাশিয়ার পুনর্জন্মের ২৫ বছর পর আমার কাছে এটাই আমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধি।