আরব ইসরাইল যুদ্ধে যে কারনে হেরে যায় আরবরা

Oct 03, 2017 04:53 pm
সর্বাত্মক যুদ্ধ

 

হুসেইন আল-রাজ্জাজ
অনুবাদ : হোসেন মাহমুদ


(৬ অক্টোবর,২০১৫ ছিলো সর্বশেষ আরব-ইসরাইল যুদ্ধের ৪২ বছর পূর্তি । ১৯৬৭-এর যুদ্ধে চরম পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে মার্কিন অস্ত্র ও অর্থবলে বলীয়ান এবং যুদ্ধকৌশলে দক্ষ ইসরাইলের বিরুদ্ধে ১৯৭৩ সালের ৬ অক্টোবর আবার যুদ্ধে নেমেছিল মিসর ও সিরিয়া। ইতিহাসে এটি চতুর্থ আরব-ইসরাইল যুদ্ধ নামে পরিচিত। আরবরা বলে একে বলে অক্টোবর যুদ্ধ, ইসরাইলিরা বলে ইয়ম কিপুরের যুদ্ধ। তো যে যুদ্ধই বলা হোক না কেন, এবারো কিন্তু আরবদের ক্ষেত্রে ভাগ্য সুপ্রসন্ন হয়নি। যুদ্ধে প্রাথমিকভাবে সাফল্য অর্জন করলেও অচিরেই আবারো পরাজয়ের তিক্ত স্বাদ নিতে হয় তাদের। তবে এ যুদ্ধেই প্রথম প্রমাণিত হয় যে, ইসরাইল অপরাজেয় নয়। এই ফিচারে সে অক্টোবর যুদ্ধের নানা দিক তুলে ধরা হয়েছে)।


লন্ডন, ৫ অক্টোবর, ১৯৭৩। মধ্য রাত সবে পেরিয়েছে। ইসরাইলি কর্মকর্তা ডুবি অ্যাশেরভের বাসার টেলিফোন বেজে উঠল। ‘মি: সোর্স’ ছদ্মনামের মিসরের এক গুপ্তচরের সাথে যোগাযোগ রাখা তার কাজ। ফোনটা ইসরাইলের কাছে অর্থের বিনিময়ে নিজেকে বিকিয়ে দেয়া সেই মি: সোর্সের। খুব সরল একটি বার্তা ‘বসের সাথে আমার দেখা করা প্রয়োজন। জরুরি।’

অ্যাশেরভ তৎপর হয়ে উঠলেন। সাথে সাথে তেলআবিবে তার বস ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের পরিচালক জভি জামিরকে ফোন করলেন তিনি। এর কয়েক ঘণ্টা পর জামিরকে দেখা গেল লন্ডনে। মোসাদের সেফ হাউসে সে সোর্সের সাথে দেখা হলো তার। তার দেয়া খবর অবিশ্বাস্যই বটে। তার চেয়েও বড় কথা গুপ্তচরের পরিচয় প্রকাশ হয়ে পড়ল যা এ পেশায় বিরল ঘটনা। তিনি ছিলেন আশরাফ মারওয়ান।

লন্ডনের কিংস কলেজের রণ অধ্যয়ন বিভাগের (ডিপার্টমেন্ট অব ওয়ার স্টাডিজ) আহরন ব্রেগম্যান বলেন, গুপ্তচরবৃত্তির ইতিহাসে আশরাফ মারওয়ান ছিলেন অন্যতম সেরা। তিনি কখনো ভুল করেননি। তিনি শুধু চালাক ও ভীষণ দক্ষই ছিলেন না, তার তথ্যও হতো নির্ভুল। তিনি ছিলেন প্রেসিডেন্ট (১৯৫৬-১৯৭০) জামাল আবদুন নাসেরের আত্মীয় আর প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাতের (১৯৭০-৮১) ডান হাত।
এই মারওয়ান যখন জামিরকে বললেন যে, পরদিন অর্থাৎ ৬ অক্টোবর সন্ধ্যা ৬টায় মিসর ও সিরিয়া ইসরাইল আক্রমণ করবে, তাকে বিশ্বাস করার সব কারণই ছিল। তারপরও কথা থাকে। এ খবর কি তিনি মিসরের ক্ষমতা কেন্দ্রের সর্বোচ্চপর্যায় থেকে পেয়েছেন? নাকি ‘সোর্স’ তাকে ধোঁকা দেয়ার জন্য তার কাছে ফাঁস করা খবর ইসরাইলকে দিয়েছেন?

সর্বাত্মক যুদ্ধ
৬ অক্টোবর ইহুদিদের পবিত্রতম দিন ইয়ম কিপুর বা প্রায়শ্চিত্তের দিন। জরুরি অধিবেশনে মিলিত হলো ইসরাইল মন্ত্রিসভা। রিজার্ভ সৈন্যদের জরুরি তলবের সিদ্ধান্ত নেয়া হলো। প্রণীত হলো প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা যার নাম দেয়া হলো ‘ডাভকোট’ বা ঘুঘুর বাসা। যুদ্ধ শুরুর দুই ঘণ্টা আগে তার বাস্তবায়ন শুরু করা হবে।

৬ অক্টোবর বেলা ২টায় ২২০টি মিসরীয় জঙ্গিবিমান সুয়েজ খাল পেরিয়ে সিনাইয়ের দিকে এগিয়ে গেল। একই সময়ে গোলান মালভূমির ইসরাইলি অবস্থানগুলোতে ব্যাপকভাবে হামলা চালাল সিরিয়ার জঙ্গিবিমানগুলো।

ইসরাইলের বিরুদ্ধে এ ছিল মিসর ও সিরিয়ার সর্বাত্মক যুদ্ধ। আর তারা তা শুরু করেছিল আশরাফ মারওয়ানের নির্ধারিত সময়ের চার ঘণ্টা আগে। মিসরের লক্ষ্য ছিল সিনাই উপদ্বীপ ও সিরিয়ার লক্ষ্য ছিল ইসরাইলের কব্জা থেকে গোলান মালভূমি মুক্ত করা। ১৯৬৭ সালে ৬ দিনের যুদ্ধে ইসরাইল এগুলো দখল করে নিয়েছিল।

আসন্ন আরব হামলার ব্যাপারে গোয়েন্দা সূত্রে আগাম খবর পেলেও ইসরাইলে সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আমান-এর প্রধান জেনারেল এলি জেইরা মনে করেছিলেন এ নিয়ে মোটেই উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। এর ফল হলো এই যে, মিসর ও সিরিয়ার হামলা শুরুর সময় ইসরাইল সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত অবস্থায় ছিল। তাদের নিয়মিত সৈন্যসংখ্যা ছিল প্রতিপক্ষের তুলনায় কম। আর রিজার্ভ সৈন্যরা তখনো জায়গায় এসে পৌঁছেনি।

সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে আনোয়ার সাদাতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে তারা যখন মিসরকে সামরিক সরঞ্জাম প্রদানের নিশ্চয়তা দিয়েছিল তখন ইসরাইল জানত যে, সাদাত সর্বাধুনিক অস্ত্র জোগাড় করতে পারেননি। ফলে সামরিক শক্তিতে মিসর ইসরাইলের চেয়ে অনেক পিছিয়ে রয়েছে।
তবে ছয় দিনের যুদ্ধে পরাজয়ের পর থেকে মিসরীয়রা চাইছিল যে, তাদের দেশ আবার যুদ্ধ করুক। মিসরীয় লেখক জামাল আল গনি বলেন, জনগণ পরাজয়ের গ্লানি সহ্য করতে পারছিল না, প্রতিশোধ নেয়ার জন্য পাগল হয়ে উঠেছিল।

মিসরের জনগণ যুদ্ধের জন্য যখন আন্দোলনে নামল তখন মিসরের সেনাবাহিনীও এটা প্রদর্শন করতে মরিয়া হয়ে উঠল যে, তারা সে শত্রুর সাথে লড়াই করতে ও তাদের পরাজিত করার ক্ষমতা রাখে যারা রয়েছে সুয়েজ খালের ওপারে।

প্রমাণের অপেক্ষা
মিসরের অস্ত্রশস্ত্র পুরনো দিনের এবং সামরিক অভিযানের মাধ্যমে সিনাইকে ইসরাইলের দখলমুক্ত করার ক্ষমতা নেই, এটা উপলব্ধি করে ক্ষমতায় আসার চার মাস পর প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত ইসরাইলকে একটি প্রস্তাব দেন। তিনি তাদের বলেন, তারা সিনাই ছেড়ে দিলে তিনি তাদের সাথে চুক্তি করবেন। কিন্তু ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।

সুতরাং যুদ্ধ ছাড়া সাদাতের সামনে কোনো পথ খোলা রইল না। মিত্র হিসেবে তিনি পেলেন সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট হাফেজ আল আসাদকে। ১৯৭০ সালে এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তিনি ক্ষমতা দখল করেন। নিজের জনগণের কাছে তার আস্থা অর্জন প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল।
বৈরুতে মধ্যপ্রাচ্য অধ্যয়ন কেন্দ্রের পরিচালক হিশাম জাবের বলেন, ইসরাইলের সাথে ১৯৬৭-এর যুদ্ধে আরব জোটের পরাজয়কালে হাফেজ আল আসাদ সিরিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী ছিলেন। পরাজয়ের জন্য তাকেই প্রধানত দায়ী করা হয়। তাই তিনি ক্ষমতায় আসার পর ’৬৭-এর যুদ্ধের পরাজয়ের দায় থেকে নিজেকে মুক্ত করতে সিরীয় সেনাবাহিনীকে পরবর্তী যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করলেন।

১৯৭৩ সালজুড়ে সাদাত ও আসাদ অনেকগুলো বৈঠকে যুদ্ধের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করলেন। বদর যুদ্ধে ইসলাম ও রাসূল সা:-এর বিজয়ের স্মৃতিতে এ পরিকল্পনার সাঙ্কেতিক নাম দেয়া হলো ‘বদর’।

সুয়েজ খাল অতিক্রম
সিরিয়া গোলান মালভূমিতে সৈন্য সমাবেশ করল, একই কাজ করল মিসর সুয়েজ খালে। পাঁচ মাস আগে এরকম একটি সেনা সমাবেশ দেখার পর ইসরাইল ব্যাপক পাল্টা ব্যবস্থা নেয়। তখন দেখা যায় মিসরীয় সেনা সমাবেশ সুয়েজ খালের পাড় থেকে আর এগোয়নি। ইসরাইলি সামরিক গোয়েন্দা বিভাগ একই ব্যয়বহুল ভুল আবার না করার ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিল।

ইসরাইলি সামরিক ঐতিহাসিক উরি বার-জোসেফ বলেন, ৫ অক্টোবর দুপুরে আমান-এর প্রকাশিত একটি দলিলে দেখা যায়, মিসরীয় সেনাবাহিনীর যুদ্ধ প্রস্তুতির একটি নিখুঁত বিবরণ এতে দেয়া হেেছ।

প্রথম বিমান হামলার কয়েক মিনিট পরই প্রচণ্ড গোলাবর্ষণ শুরু হয়। গোলন্দাজ বাহিনীর ছত্রছায়ায় ৭২০টি ভেলায় ৪ হাজার মিসরীয় স্থল সৈন্যের প্রথম দলটি সুয়েজ খাল অতিক্রম করে। এ দিকে যুদ্ধ শুরুর আধঘণ্টার মধ্যেই ‘ডাভকোট’ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু করে ইসরাইল। কিন্তু বিকেল ৫টার মধ্যেই ৪৫টি সিরীয় পদাতিক ব্যাটালিয়ন সুয়েজ পেরিয়ে যায়। ব্যর্থ হয় ‘ডাভকোট’।

দ্বিতীয় দিনের সূর্যোদয় নাগাদ যুদ্ধের পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণরূপে মিসরের অনুকূলে। ন্যূনতম ক্ষতি স্বীকার করে এক লাখ সৈন্য, এক হাজারেরও বেশি ট্যাংক ও ১০ হাজারেরও বেশি অন্যান্য সামরিক যান সুয়েজ খাল অতিক্রম করেছিল।

একটি সুযোগ নষ্ট
গোলান রণাঙ্গনে তিনটি সিরীয় পদাতিক ডিভিশন পার্পল লাইন নামে পরিচিত ১৯৬৭ সালের যুদ্ধবিরতি রেখা অতিক্রম করে। যুদ্ধ শুরুর দুই ঘণ্টার মধ্যেই সিরীয়রা ‘ইসরাইলের চোখ’ বলে পরিচিত হারমন পর্বতের ওপর সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২ হাজার মিটার উচ্চতায় অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে। এটি ছিল তাদের প্রথম তাৎপর্যপূর্ণ বিজয়ের ঘটনা।

৬ অক্টোবর রাতে সিরীয় সেনারা ইসরাইলি প্রতিরক্ষা রেখার প্রহরাহীন স্থানগুলো দিয়ে ঢুকে পড়ে। তাদের ট্যাংকগুলো গোলানের কেন্দ্রস্থলে পৌঁছে যায়। তারা যখন বিপুল সাফল্য লাভ করে চলেছিল এ অবস্থায় মধ্যরাতে তাদের থেমে যাওয়ার এবং সকালে পুনরাক্রমণের জন্য পুনর্গঠিত হওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। তাদের সামনে তখন জর্ডান উপত্যকা ও ইসরাইলের প্রাণকেন্দ্র প্রতিরক্ষাবিহীন অবস্থায় ছিল। পুবদিকে মাত্র কয়েক কিমি দূরে গোলানের প্রান্তে ছিল সেসব অবস্থান যেগুলো দখল করতে পারলে সিরীয় বাহিনী অজেয় হয়ে উঠত। কিন্তু প্রেসিডেন্ট আসাদ নিজে সিরীয় সামরিক বাহিনীকে লৌহমুষ্টিতে নিয়ন্ত্রণ করতেন। তার মূল যুদ্ধ পরিকল্পনার বিরোধিতা করার ক্ষমতা কারো ছিল না।
কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই প্রায় আড়াই লাখ ইসরাইলি রিজার্ভ সৈন্য জড়ো হয়। সিরীয়দের হিসাব ছিল যে, ইসরাইলি রিজার্ভ সৈন্যদের জড়ো হতে ও গোলানে পৌঁছতে ২৪ ঘণ্টা লাগবে। কিন্তু ইসরাইলের প্রথম ট্যাংক গোলানে পৌঁছে মধ্যরাতে অর্থাৎ যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তাদের সেখানে পৌঁছতে সময় লাগে মাত্র ১৫ ঘণ্টা।

ভোরের পরপরই সিরীয় বাহিনীর মোকাবেলা ইসরাইলিদের সাফল্যজনক সমাবেশ উপেক্ষা করে সিরীয় বাহিনী পূর্বপরিকল্পনা মাফিক ট্যাংক আক্রমণ শুরু করে। তাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল ইসরাইলি অগ্রবর্তী কমান্ড সেন্টার নাফাখ ও গোলান নিয়ন্ত্রণকারী কৌশলগত সংযোগস্থল। ইসরাইলিরা সৈন্য ও ট্যাংকের বিপুল ক্ষতির মাধ্যমে সিরীয়দের অগ্রগতি থামিয়ে দিতে সক্ষম হয়। তারা দু’টি সাঁজোয়া ডিভিশনের সমাবেশ ঘটায়।

যুদ্ধের চতুর্থ দিনের শেষে দেখা যায়, উত্তর গোলানের একটি স্থানে ইসরাইলিরা শত শত সিরীয় ট্যাংক ধ্বংস করেছে। পরে জায়গাটি ‘অশ্রুজলের উপত্যকা’ নামে পরিচিত হয়।

হিশাম জাবের বলেন, যুদ্ধের প্রথম দু’দিন অতি উৎসাহী সিরীয়রা ভেবেছিল তারা ইসরাইলিদের পরাজিত করতে পারবে। তারা গোলান হাইট মুক্ত করে ফিলিস্তিনের দিকে এগোবে। তারা ভেবেছিল তারা যুদ্ধ শেষ করতে পারবে। কিন্তু তারা নিজেদের খুব বেশি জায়গাজুড়ে ছড়িয়ে ফেলেছিল এবং প্রথম তিন দিনের যুদ্ধে বিপুলসংখ্যক ট্যাংক হারায়। সিরীয়দের অগ্রগতি পরিণত হয় পশ্চাৎপসরণে। ইসরাইলিরা দ্রুত অগ্রসর হয়ে সিরিয়ার আরো গভীরে ঢুকে পড়ে।

প্রতিরোধমূলক অবস্থানে
সিনাইয়ে মিসরীয়রা তাদের প্রথম দিনের বিজয়কে নিজেদের প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান নিশ্চিত করার কাজে ব্যবহার করে এবং ইসরাইলের অনিবার্য পাল্টা হামলা মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত হয়। ৮ অক্টোবর তা শুরু হয়।

মিসরের দ্বিতীয় পদাতিক ডিভিশনের ইয়োসরি ওমারা স্মৃতিচারণ করেন,‘ আমরা গুলি চালানোর নির্দেশ পেলাম। আমাদের কাছে যত রকম অস্ত্র ছিল সেসব দিয়ে আমরা গুলি চালাই। সত্যিকার অর্থেই এ ছিল এক গণহত্যা। মিসরীয় রকেটচালিত গ্রেনেড বা আরপিজিধারী সৈন্যরা পাখিরা যেমন এক গাছ থেকে আরেক গাছে লাফিয়ে বেড়ায় সেভাবে লাফিয়ে ফিরছিল। তারা ট্যাংকগুলো ৫০ মিটার দূরে থাকতে ও রেঞ্জের মধ্যে এলেই ফায়ার করছিল। তারা একটাকে অচল করে দেয়ার পর আরেকটাকে আঘাত করছিল।

২৫ বছরের মধ্যে এই প্রথম ইসরাইল প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান গ্রহণ করে। যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহেই ইসরাইল আরেকটি মারাত্মক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়। ১৩ অক্টোবর সুয়েজ খালের পূর্ব তীরের বারলেভ লাইন নামে পরিচিত ইসরাইলের প্রতিরক্ষা রেখার সর্বশেষ সেনাঘাঁটির সৈন্যরা বিশ্ব সংবাদমাধ্যমের সামনে মিসরীয় ৪৩তম কমান্ডো ব্যাটালিয়নের কাছে আত্মসমর্পণ করে। এ ব্যাটালিয়নের হামদি আল-শোরবাগি বলেন, আমি যখন দেখলাম পরাজিত ইসরাইলি সৈন্যরা সাদা পতাকা হাতে আত্মসমর্পণ করছে, তা বিশ্বাস করতে পারছিলাম না।

’৬৭-এর ছয় দিনের যুদ্ধে ইসরাইলের কাছে হারানো সিনাইয়ের ভূমি পুনর্দখল ও সামরিক বাহিনীর বিজয় সাফল্যে উল্লসিত মিসরীয়দের ভিড়ে কায়রোর রাজপথগুলো পূর্ণ হয়ে যায়। অন্য দিকে আনন্দের জোয়ার বয়ে যায় আরব বিশ্বজুড়ে।

দু’টি আলাদা যুদ্ধ
আট মাস আগে সাদাত ও আসাদ দু’টি ফ্রন্টে ইসরাইলের বিরুদ্ধে যুদ্ধের পরিকল্পনা প্রণয়ন করেন। কিন্তু এখন মনে হচ্ছিল যে দুই প্রেসিডেন্ট একত্রে যে পরিকল্পনা করেছিলেন তার ব্যাপারে দু’জনের ধারণা সম্পূর্ণ আলাদা ছিল।

ব্রিটিশ সাংবাদিক ও হাফেজ আল-আসাদের জীবনীকার প্যাট্রিক সিয়েল বলেন, আসাদ আমাকে বলেছিলেন যে, ক্ষমতায় আসার দিন থেকেই তার আকাক্সক্ষা, তার স্বপ্ন ছিল ১৯৬৭-এর পরাজয়ের প্রতিশোধ নেয়া যে যুদ্ধে সিরিয়া ইসরাইলের কাছে গোলান হারায়। সে সময় তিনি নিজেই ছিলেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী। তাই আমি মনে করি, হারানো এলাকা পুনরুদ্ধারকে তিনি ব্যক্তিগত দায়িত্ব বলে মনে করতেন। আসাদ এ যুদ্ধকে, যার পরিকল্পনা তিনি নিজে করেছিলেন, মুক্তির যুদ্ধ হিসেবে দেখতেন।

অন্য দিকে আনোয়ার সাদাত চেয়েছিলেন একটি সীমিত যুদ্ধ যার লক্ষ্য ছিল বিশ্ব শক্তিগুলোকে নাড়া দেয়া যাতে স্থগিত শান্তিপ্রক্রিয়া শুরু হয়।
যুদ্ধ শুরুর এক সপ্তাহের মধ্যে তা সাদাতের ব্যক্তিগত লক্ষ্য অতিক্রম করে যায়। একটি দ্রুত বিজয় যেন দৃশ্যমান হচ্ছিল। তাই ১৩ অক্টোবর মিসরে ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত তার কাছে জাতিসঙ্ঘের উদ্যোগে বর্তমান অবস্থানের ভিত্তিতে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিলে সাদাত তা প্রত্যাখ্যান করেন। ইসরাইলিরা যে সে যুদ্ধবিরতি মেনে নিতে রাজি ছিল তা তিনি সাদাতকে জানিয়েছিলেন। কিন্তু সাদাত বলেন, ইসরাইলিরা সমগ্র সিনাই থেকে প্রত্যাহার করলে তবেই তিনি যুদ্ধবিরতি মানবেন।

‘দি ইয়ম কিপুর ওয়ার’ গ্রন্থের লেখক আব্রাহাম রবিনোভিচ বলেন, সাদাতের জন্য সব কিছুই খুব ভালোমতো চলছিল। তিনি যুদ্ধ বন্ধ করতে চাননি। তাকে যুদ্ধবিরতিতে রাজি করাতে হলে নাটকীয় কিছু করা দরকার ছিল, হয়তো অনুরোধ করলে তিনি রাজি হতেন। সবচেয়ে ভালো কাজ হতো ইসরাইলিরা সুয়েজ খাল অতিক্রম করলে। তাকে তা যথেষ্ট শঙ্কিত করত।

১৪ অক্টোবর সকালে মিসরীয় সাঁজোয়া ডিভিশন পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়। কিন্তু ইসরাইলিরা পূর্বপ্রস্তুতি গ্রহণকৃত অবস্থানে অপেক্ষা করছিল। তাই প্রথম কয়েক মিনিটেই মিসরীয়রা প্রচণ্ড ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়। দুপুর নাগাদ ২৫০টি মিসরীয় ট্যাংক ধ্বংস হয়। মিসরের জেনারেল কমান্ড অগ্রগামী বাহিনীকে পশ্চাৎপসরণের নির্দেশ দেয়।

ওদিকে সিরীয় রণাঙ্গনে ইসরাইল প্রচণ্ড ক্ষতির সম্মুখীন হয়, কিন্তু তারা সাফল্য লাভ করে। তারা দামেস্কের ৩৫ কিমির মধ্যে পৌঁছে যায়। নতুন যেসব এলাকা তারা অধিকার করে তা পরে যুদ্ধবিরতির আলোচনায় তাদের দরকষাকষিতে সহায়ক হয়। ইসরাইলিরা মিসরীয়দের মনোযোগ দক্ষিণে সরিয়ে নিতে সক্ষম হয়। তারপর তারা সুয়েজ অতিক্রমের পরিকল্পনা করে যার নাম দেয়া হয় ‘স্টাউটহার্টেড ম্যান’। তবে এ জন্য প্রয়োজন ছিল তাদের অগ্রাভিযানের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারী মিসরের দ্বিতীয় আর্মিকে গুঁড়িয়ে দেয়া।

চীনা ফার্মের লড়াই
মিসরের একটি কৃষি উন্নয়ন কেন্দ্রের চার পাশে লড়াই চলছিল। ষাটের দশকে জাপানি বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় এটি চালু হয়েছিল। ’৬৭-র ছয় দিনের যুদ্ধে এলাকাটি দখলের পর ইসরাইলিরা সেখানে কৃষি সরঞ্জাম পরিচালনায় নিয়োজিত জাপানিদের চীনা বলে ভুল করেছিল। এবার তা মিসরীয় সৈন্যরা পুনর্দখল করে। কিন্তু ১৫ অক্টোবর ইসরাইলি ট্যাংকগুলো চীনা ফার্মটির ওপর হামলা শুরু করে।
১৬ অক্টোবর সকালে ১৫টি ভেলা খালে আনা হয়। সেগুলো ইসরাইলি ট্যাংকগুলোকে পশ্চিম পাড়ে নিতে থাকে। মিসরীয়দের প্রায় অজ্ঞাতসারেই ইসরাইলিরা এ কাজটি করতে সক্ষম হয়। সেদিনই সকালে প্রেসিডেন্ট সাদাত কায়রোর সড়কগুলোতে এক বিজয় কুচকাওয়াজে নেতৃত্ব দেন।

ইসরাইলিদের ট্যাংক সুয়েজ খাল পার করার মিসরীয় রিপোর্টগুলো ছিল বিভ্রান্তিকর এবং তাতে সমস্যার গভীরতা উপেক্ষিত হয়েছিল। তা তখনই ধরা পড়ে যখন ইসরাইলিরা খালের পশ্চিম পাড়ে হামলা শুরু করে এবং মিসরীয়রা দেখতে পায় যে, শত্রু তাদের পেছন দিকে অবস্থান নিয়েছে।

মিসরীয়রা প্রচণ্ড ক্ষতির সম্মুখীন হয়। চীনা ফার্ম নিয়ে দু’দিনের প্রচণ্ড লড়াইয়ের পর খাল অভিমুখী সড়কে ইসরাইলের অগ্রযাত্রার পথে প্রতিব›ন্ধকতা সৃষ্টিকারী মিসরীয় বাহিনী পশ্চাৎপসরণ করে। তবে সে জন্য ইসরাইলকে চড়া মূল্য দিতে হয়।

উরি ড্যান নামে এক ইসরাইলি রণাঙ্গন সংবাদদাতা বলেন, হ্যাঁ, প্রধানত আহত ও নিহতদের বিপুল সংখ্যার কারণে এটা ছিল একটি বেদনাময় বিজয়। খাল পার হওয়ার এক রাতেই আমরা ৪ শ’ লোক হারাই। টাংকগুলো যুদ্ধ করছিল যেগুলোর কিছু অংশকে আমরা পরদিন দিবালোকে দেখতে পাচ্ছিলাম। একটি ট্যাংকের ব্যারেল আরেকটি মিসরীয় ট্যাংকের বিরুদ্ধে, মধ্যযুগের তলোয়ারধারী দু’যোদ্ধা যেমন পরস্পরের সাথে লড়ত। তবে এখন তা ছিল ট্যাংক, তাদের দু’টিই ধ্বংস হয়ে যেত, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ভেতরে থাকা লোক সবাই নিহত হতো। পরদিন খাল বরাবর মৃত্যু উপত্যকার পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ, কিন্তু আমরা ছিলাম খালের অপর পাড়ে।

১৮ অক্টোবর ইসরাইলি হাইকমান্ড খালের পশ্চিম তীরে ৩টি সাঁজোয়া ডিভিশন মোতায়েনের মাধ্যমে তাদের খাল অতিক্রমের এ সাফল্যকে কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত নেয়। একটি ডিভিশন মিসরের দ্বিতীয় আর্মিকে ঘিরে ফেলবে ও ইসমাইলিয়া দখল করবে। অন্য দু’টি ডিভিশন দক্ষিণে গিয়ে মিসরের তৃতীয় আর্মিকে ঘেরাও ও সুয়েজ শহর দখল করবে।

এরপরই সাদাত মিসরের সোভিয়েত রাষ্ট্রদূতকে তলব করেন। বললেন, তিনি যুদ্ধবিরতি মানতে প্রস্তুত আছেন। কিন্তু এবার ইসরাইলিদের তাতে আগ্রহ ছিল না।

রবিনোভিচ বলেন, আমরা বলতে পারি যুদ্ধবিরতিতে ইসরাইলের প্রবল আগ্রহ ছিল তবে ঠিক এ সময় নয় যেহেতু তাদের আরো কিছু কাজ ছিল, তারা আরো এলাকা দখল করতে চাইছিল।

বিশ্বপ্রতিক্রিয়া
যুদ্ধের দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেলে এবং উভয় বাহিনী অচলাবস্থায় থাকা অবস্থায় মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার মস্কো পৌঁছেন। তার লক্ষ্য ছিল জাতিসঙ্ঘের উদ্যোগে একটা যুদ্ধবিরতি যা মিসরের সোভিয়েত মিত্রদের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে।

২২ অক্টোবর জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদ যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়ে ৩৩৮ নম্বর প্রস্তাব গ্রহণ করে। মধ্যপ্রাচ্য সময় সন্ধ্যা ৬টা ৩২ মিনিটে যুদ্ধ বন্ধ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ২৩ অক্টোবর সকালে ইসরাইলি বাহিনী যুদ্ধ অব্যাহত রাখে। দিনের শেষে তারা সুয়েজ সিটি পাশ কাটিয়ে গিয়ে আদাবিয়া বন্দরে পৌঁছে।

খালের পূর্ব পাড়ে অবস্থান নিয়ে থাকা মিসরের তৃতীয় আর্মি সব দিকে ইসরাইলি সৈন্য দ্বারা ঘেরাও হয়ে পড়ে । ৩৫ হাজার সৈন্য তাদের ঘাঁটিগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

২৩ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করতে আবার নিরাপত্তা পরিষদের অধিবেশন বসে। রণাঙ্গনে জাতিসঙ্ঘ পর্যবেক্ষক প্রেরণ সংবলিত ৩৩৯ নম্বর প্রস্তাব গৃহীত হয়। পরদিন অর্থাৎ ২৪ অক্টোবর সকাল ৭টা থেকে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার সময় নির্ধারিত হয়। কিন্তু আরেকবার ইসরাইল তা ভঙ্গ করে।

আল-ঘিতানি বলেন, তাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল একটি বড় শহর, সুয়েজ সিটি বা ইসমাইলিয়া সিটি দখল। একটি নামী শহর চাইছিল তারা। তারা একটি প্রচারণার লড়াই চাইছিল, একই সাথে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক লক্ষ্যও অর্জন করতে চাইছিল তারা।

সুয়েজের জন্য লড়াই
৬ দিনের যুদ্ধের আগপর্যন্ত সুয়েজ ছিল একটি বর্ধনশীল বাণিজ্যিক শহর ও বন্দর। কিন্তু ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পর সুয়েজ নিজেকে আবিষ্কার করল মিসর ও ইসরাইল অধিকৃত সিনাইয়ের মধ্যকার রণাঙ্গন হিসেবে। ইসরাইলি হামলার লক্ষ্য হিসেবে শিগগিরই তা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। আড়াই লাখ লোককে শহরটি থেকে সরিয়ে নেয়ার ফলে তা পরিত্যক্ত এলাকার রূপ নেয়। মাত্র পাঁচ হাজার লোক থেকে যায় অবকাঠামোগুলো পরিচালনা ও কারখানাগুলো পাহারা দেয়ার জন্য।

২৪ তারিখ সকালে নতুন যুদ্ধবিরতি সবে কার্যকর হতে শুরু করেছে। এ সময় প্রায় জনশূন্য শহরে ইসরাইলি ট্যাংকগুলো ও সৈন্যদের চলাচল শুরু হয়। তবে অবিলম্বেই তারা মিলিশিয়াদের একটি ছোট দলের প্রতিরোধের মুখে পড়ে। তাদের বিতাড়িত করা হলো, কিন্তু ততক্ষণে ৮০ জন ইসরাইলি সৈন্য নিহত ও ১২০ জন আহত হয়।

সেদিনই ওয়াশিংটনে একটি উদ্বেগজনক বার্তা পৌঁছে : সোভিয়েতরা যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নে একতরফা পদক্ষেপ নেয়ার কথা বিবেচনা করছে। ‘ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি’তে নাকানিচুবানি খেতে থাকা প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন এ সঙ্কট মোকাবেলার জন্য পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারকে দায়িত্ব দিলেন। তিনি শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে সোভিয়েত হুমকির জবাব দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। আমেরিকান সশস্ত্রবাহিনীর সতর্কাবস্থা শান্তিকালীন সময়ের সর্বোচ্চ পর্যায়ে উন্নীত করা হয়।

‘দ্য টু ও’ক্লক ওয়ার’ গ্রন্থের লেখক ওয়াল্টার জে বয়েন বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বনাম সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রশ্ন সবসময়ই পারস্পরিক নিশ্চিহ্নকরণের চেষ্টা আবর্তিত হয়েছে : আমরা সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রত্যেককে হত্যা করতে পারতাম, আমরা কি যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যেককে হত্যা করতে পারতাম? বাকি বিশ্ব কি নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত? এ সম্পূর্ণ এক পাগলামি পরিস্থিতি। যে বিষয়টি সবকিছু রক্ষা করেছে তা হলো সব পক্ষই জানত যে, কোনো যুদ্ধ সংঘটিত হলে নেতারা নিজেরাও মারা যাবেন। সুতরাং আপনি যখন জানেন যে, শুধু দরিদ্র কিছু কৃষক নয়, একটি যুদ্ধে আপনিও মারা যেতে চলেছেন, তখন আপনি যুদ্ধ শুরুর ব্যাপারে আলাদা সিদ্ধান্ত নেবেন।

পরদিন কূটনীতির জয় হলো। সোভিয়েতরা পিছিয়ে গেল, উচ্চ সতর্কাবস্থা স্বাভাবিক হলো। কিন্তু পুরো ২৪ ঘণ্টা বিশ্ব দু’টি পারমাণবিক পরাশক্তির মধ্যে একটি যুদ্ধের কিনারে দাঁড়িয়েছিল।
এ দিকে জাতিসংঘ ৩৪০ নম্বর প্রস্তাব গ্রহণ করল যা ছিল চার দিনের মধ্যে তৃতীয়।

একা লড়াই করা
লড়াইর ভারসাম্য ইসরাইলের দিকে চলে যাওয়ার পর অন্য আরব দেশগুলো সিরিয়া ও মিসরের সমর্থনে সৈন্য প্রেরণ করে। ইরাক, জর্ডান, সউদি আরব ও কুয়েত থেকে প্রেরিত সৈন্য সিরিয়ার শক্তি বৃদ্ধি করে। এ পাঁচমিশালি আরববাহিনী দিয়ে সিরিয়ার মূল ভূখণ্ডের বিভিন্ন দখল করা স্থান থেকে ইসরাইলিদের হটানোর পরিকল্পনা করা হয়। এ আক্রমণের তারিখ নির্ধারণ করা হয় ২৩ অক্টোবর। কিন্তু তা আর কখনোই হয়নি। কারণ সাদাত জাতিসঙ্ঘের যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব গ্রহণ করেছিলেন যা ওই দিন সন্ধ্যা থেকে কার্যকর হয়।
এ অবস্থায় হাফিজ আল-আসাদের জন্য একা লড়াই করার অবস্থার সম্মুখীন হন। তাই অনিবার্য পরিস্থিতির কাছে আত্মসমর্পণ করে সিরীয়রা।

তবে ইসরাইলের জন্য তখনো একটি বড় রকমের তিক্ততা বিরাজ করচিল। যুদ্ধের প্রথম দিনেই সিরীয় ছত্রী সেনারা হারমন পর্বতের ইসরাইলি লিসেনিং পোস্টটি দখল করে নিয়েছিল। এখন বিজয়ী ইসরাইলের গোলানি ব্রিগেড ২৩ অক্টোবর হারমন পর্বতে হামলা চালায়। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করে তারা তা পুনর্দখল করে।

ইসরাইলের ৬ শ’তম রিজার্ভ সাঁজোয়া ব্রিগেডের ইয়োরাম দোরি বলেন, কোনো যুদ্ধে কেউ জয়ী হয় বলে আমি মনে করি না। কেউ বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কেউ কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

সুয়েজ রণাঙ্গনে ৩৫ হাজার মিসরীয় সৈন্য বিপর্যয়ের শিকার হয়। তারা ঘাঁটি থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। তবে ইসরাইলিরাও একই অবস্থায় পড়ে। আরব-ইসরাইল যুদ্ধের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বহু সৈন্য যুদ্ধবন্দী হয়। তাদের সংখ্যা ছিল ২৩০।

ইসরাইলের জনগণ রাস্তায় নেমে আসে। তারা অভিযোগ করে গোল্ডামেয়ার সরকার যুদ্ধবন্দীদের ফিরিয়ে আনতে পর্যাপ্ত কিছু করছে না।
২৮ অক্টোবর মিসর ইসরাইলের সামরিক নেতারা যুদ্ধবিরতির জন্য আলোচনায় মিলিত হন। ২৫ বছরের মধ্যে দুই দেশের সামরিক পর্যায়ে এটাই ছিল প্রথম বৈঠক। কিন্তু রণাঙ্গনে সংঘর্ষ অব্যাহত থাকায় আলোচনা শিগগিরই থেমে যায়।

শাটল কূটনীতি
ইতোমধ্যে বিশ্বব্যাপী এ যুদ্ধের প্রভাব অনুভূত হতে থাকে। আরব তেল উৎপাদক দেশগুলো ইসরাইলের পশ্চিমা সমর্থকদের চাপে ফেলার জন্য তেলের মূল্যকে ব্যবহারের পরিকল্পনা করে। বৃহৎ উৎপাদনকারীরা একতরফাভাবে তেলের দাম ২০ শতাংশ বাড়িয়ে দেয়।
৬ নভেম্বর মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার কায়রোতে আনোয়ার সাদাতের সাথে প্রথমবারের মতো বৈঠকে মিলিত হন। চার দিন পর সুয়েজ সিটি ও অবরুদ্ধ মিসরীয় তৃতীয় আর্মির কাছে দৈনিক অসামরিক সরবরাহ বহনকারী গাড়িবহর প্রেরণ নিশ্চিত করে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। আরো চার দিন পর দুই পক্ষের মধ্যে বন্দীবিনিময় ঘটে।

১৯৭৪ সালের শুরুতে কিসিঞ্জার আবার মিসর-ইসরাইল সৈন্য প্রত্যাহার চুক্তির মহাপরিকল্পনার পরবর্তী পদক্ষেপে এ অঞ্চলে সফরে আসেন। ১৯৭৪ সালের ১১ জানুয়ারি তিনি মিসরের দক্ষিণাঞ্চলীয় আসওয়ান শহরে সাদাতের সাথে বৈঠকে বসেন। পরদিন তেলআবিব রওনা হন তিনি। দুই পক্ষই সৈন্য প্রত্যাহার চুক্তিতে সম্মত হয়। এ সময়ই আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শাটল কূটনীতি শব্দটি চালু হয়।

১৯৭৪ সালের ১৮ জানুয়ারি মিসরীয় সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফ জেনারেল মোহাম্মদ আল-গামাসি ও তার ইসরাইলি প্রতিপক্ষ জেনারেল ডেভিড এলাজার ধারাবাহিক সৈন্য প্রত্যাহারের প্রথম পর্যায়ের চুক্তি স্বাক্ষর করেন যার আওতায় ১৯৮২ সালের এপ্রিলে সিনাই থেকে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহার সম্পন্ন হয়। ইসরাইলি সৈন্যরা তাদের প্রত্যাহার উদযাপন করলেও তাদের দেশের চিত্র ছিল ভিন্ন। রবিনোভিচ বলেন, তিন সপ্তাহের যুদ্ধে ইসরাইল দুই হাজার ৬০০ সৈন্য হারায়।

ইসরাইলের সুপ্রিম কোর্টের প্রেসিডেন্টের নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিশনের রিপোর্টে এ প্রাণহানির জন্য সেনাবাহিনীকে দায়ী করা হয়। তদন্তে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী গোল্ডামেয়ার ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী মোশে দায়ানকে দায়মুক্তি দেয়া হয়। কিন্তু ইসরাইলি জনগণ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। বিক্ষোভ চলতে থাকে। অবশেষে কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশের নয় দিন পর গোল্ডামেয়ার পদত্যাগ করেন।

এ দিকে ইসরাইল সিরিয়ার অভ্যন্তরে দখলীকৃত এলাকায় অবস্থান করা অব্যাহত রাখে। ১৯৭৪ সালের মে মাসে কিসিঞ্জার দামেস্ক ও তেলআবিবের মধ্যে দ্বিতীয় দফা শাটল কূটনীতি শুরু করেন। প্রায় এক মাসের কঠিন আলোচনার পর তিনি সফল হন। ২৮ মে ইসরাইল সিরিয়া থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করতে রাজি হয়। ৫ জুন জেনেভায় এ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এভাবে যুদ্ধ শুরুর ২৪৩ দিন পর আনুষ্ঠানিকভাবে তার অবসান ঘটে।

উল্লেখযোগ্য বিষয়
’৭৩-এর যুদ্ধের বিশেষ উল্লেখযোগ্য কয়েকটি বিষয় হলো সিআইএসহ যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের কোনো গোয়েন্দা সংস্থা এ যুদ্ধ পরিকল্পনার কিছুই আঁচ করতে পারেনি। যুদ্ধে ৮ অক্টোবর পর্যন্ত ইসরাইল মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী সর্বশেষ ব্যবস্থা হিসেবে পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার অনুমোদন করেন। অন্য দিকে ইসরাইলের সামরিক ক্ষতিপূরণ করতে প্রেসিডেন্ট নিক্সন অস্ত্র সরবরাহে ওয়াশিংটন ও তেলআবিবের মধ্যে বিমান সেতু প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেন। এ দিকে সোভিয়েত ইউনিয়নও মিসর ও সিরিয়ায় অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রাখে। সিরিয়াতে সোভিয়েত টেকনিশিয়ান এমনকি সৈন্যরাও যুদ্ধে অংশ নেয়। ইসরাইল সিরিয়া উপকূলে একটি রুশ বাণিজ্য জাহাজ ডুবিয়ে দেয়ার পরিপ্রেক্ষিতে রাশিয়া ইসরাইলকে কড়া হুঁশিয়ারি দেয়ার পাশাপাশি দু’টি যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করে। প্রয়োজনে ইসরাইলি যুদ্ধজাহাজের ওপর গুলি চালানোরও অনুমতি দেয়া হয়। সিরিয়ার লাতাকিয়া বন্দর অভিমুখী পরিবহন জাহাজগুলোর নিরাপত্তা দিতে সোভিয়েত ইউনিয়ন দু’টি যুদ্ধজাহাজ পাঠায়।

কোনো কোনো বিশ্লেষকের মতে, এ যুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছ থেকে আনোয়ার সাদাত প্রত্যাশিত সহযোগিতা পাননি। এর পরিণতিতে পরে মস্কোর সাথে কায়রোর সম্পর্ক শীতল হয়ে পড়ে। সাদাত যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকে পড়েন। এ প্রসঙ্গে সোভিয়েত নেতা লিওনিদ ব্রেজনেভের মন্তব্য এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। তিনি ৪ নভেম্বর বলেছিলেন :
‘আমরা বহু দিন ধরে তাদের (আরবদের) বিচক্ষণতার পরিচয় দেয়ার জন্য বলে আসছি। কিন্তু তারা যুদ্ধ করতে চাইল। বেশ! আমরা তাদের সর্বাধুনিক প্রযুক্তিসহায়তা দিয়েছি যা এমনকি ভিয়েতনামকেও দেয়া হয়নি। ট্যাংক ও জঙ্গিবিমানের ক্ষেত্রে তাদের ইসরাইলের চেয়ে দ্বিগুণ ও আর্টিলারির ক্ষেত্রে তিন গুণ শ্রেষ্ঠত্ব ছিল। বিমান প্রতিরক্ষা ও ট্যাংক বিধ্বংসী অস্ত্রের ক্ষেত্রেও তারা সম্পূর্ণ এগিয়ে ছিল। কিন্তু আবারো তারা ব্যর্থ হয়েছে, আবার তারা তাদের রক্ষায় এগিয়ে যাওয়ার জন্য আমাদের সাহায্য চেয়ে চিৎকার করেছে। সাদাত মধ্যরাতে দু’বার টেলিফোনে আমার ঘুম ভাঙান। তিনি আমাকে তৎক্ষণাৎ সোভিয়েত সৈন্য প্রেরণের অনুরোধ জানান। কিন্তু আমি তাকে জানাই, না আমরা তাদের জন্য যুদ্ধ করতে যাচ্ছি না।’

বিশ্লেষকেরা বলেন, এ যুদ্ধের পর আরব দেশগুলো এ সিদ্ধান্তে পৌঁছে যে, সামরিকভাবে ইসরাইলকে পরাজিত করা সম্ভব নয়। তবে ইসরাইলের বিরুদ্ধে মিসর যেটুকু সাফল্য অর্জন করে তা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে কায়রোকে সমানে সমানে আলোচনা করা ও চূড়ান্তপর্যায়ে সিনাই ফিরে পেতে সাহায্য করে।

অন্য দিকে ইসরাইলের প্রতি মার্কিন সমর্থনের প্রতিবাদে সৌদি বাদশাহ ফয়সাল ১৭ অক্টোবর থেকে প্রতি মাসে ৫ শতাংশ তেল উৎপাদন হ্রাসের কথা ঘোষণা করেন। এর জবাবে প্রেসিডেন্ট নিক্সন ইসরাইলে অস্ত্র প্রেরণ ও ২২০ কোটি ডলার সহায়তা প্রদানের ঘোষণা দেন। পাল্টাব্যবস্থা হিসেবে সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তেল নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ওপেক এতে শরিক হয় এবং নেদারল্যান্ডসসহ অন্যান্য পাশ্চাত্য দেশও এ নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত হয়। ফলে বিশ্বে তেলসঙ্কট সৃষ্টি হয়।

বাইরের সমর্থন
এ যুদ্ধে অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো মিসর ও সিরিয়ার সমর্থনে বিভিন্ন দেশের এগিয়ে আসা। দেখা যায় কিউবা, আলজেরিয়া, উত্তর কোরিয়া, সৌদি আরব, কুয়েত, ইরাক, লিবিয়া, মরক্কো, তিউনিসিয়া, লেবানন, সুদান, মিসর ও সিরিয়ায় সৈন্য, জঙ্গিবিমান ও সামরিক সরঞ্জাম প্রেরণ করে।