আলোর নিচে...

Oct 06, 2017 02:00 pm
মাকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই

নয়ন রহমান

 

সূর্যটা আজ গনগনে আগুন ছড়াচ্ছে যেন। বাতাসে আগুনের হলকা। গা তো পুড়ে যাচ্ছেই, মগজের ঘিলুও মনে হয় টগবগ করে ফুটছে।
মুমু বারবার বোতল থেকে পানি খাচ্ছে। গলা শুকিয়ে কাঠ। মাথাটা কেমন খালি খালি লাগছে।
অ্যাই মুমু, তুই কি ভয় পাচ্ছিস?
ভয়? কাকে?
তোর মাকে।


মাকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। মা খুব সাদাসিদা মানুষ।
তোর মা তো প্রাইভেট য়ুনিভার্সিটিতে পড়ান।
সো হোয়াট, যারা য়ুনিভার্সিটিতে পড়ায় তারা সাদাসিদা হতে পারে না?
না, বলছিলাম তুই যে সারাটা দিন আর রাত্রি পোয়াটাক সময় আমার সাথে কাটালি...
বাদ দে তোর প্যানপ্যানি। মাথাটা ছিঁড়ে যাচ্ছে আমার।
বাসায় গিয়ে ঠিকমতো ওষুধ-টষুধ খেয়ে লম্বা একটা ঘুম দিস।
উপদেশ ঝাড়িস না তো? কী করব, কী করব না সে আমার ব্যাপার।
অ্যাই, তুই এরকম চ্যাটাং চ্যাটাং কথা বলছিস কেন?
মাখন মাখন কথা বললে খুশি হবি?
আমিও কিছু ভাবতে পারছি না রে।


কী আর ভাববি বল? সব ছেঁটেছুটে ঝেড়ে ফেলে এলাম।
ভীরু কাপুরুষের সঙ্গে কেন যে ভিড়েছিলাম...
মুমু ঝুমু...
অ্যাই, পরের শব্দটা আর উচ্চারণ করবি না।
তুই রেগে যাচ্ছিস, এবার বিদায়। এই তো তোর রাজপ্রাসাদের গেট। দারোয়ান টানটান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আলোতে আর যেতে চাই না।


তুই তো অন্ধকারের-ই জীব। বিদায় হ। তোর মুখ আমি আর দেখতে চাই না। ভীরু, কাপুরুষ একটা।
মুমু, তুই আমাকে অপমান করছিস। আমি সাহসী হলে কী হতো বল তো?
তুই সাহসী হলে আমি মাথা উঁচু করে যেকোনো কাজি অফিসে গিয়ে দাঁড়াতে পারতাম।
রেজাল্ট কি ভালো হতো? তোর বড়লোক বাবা আমাকে জেলের ঘানি টানিয়ে ছাড়ত।
তবু তো বুঝতাম তুই বীর পুরুষ। সাহস আছে তোর।
জাপান যাচ্ছি। ফিরে এসে সাহস দেখাব।


মুমু টলমল পায়ে গেটের সামনে এসে দাঁড়াতেই দারোয়ান শশব্যস্ত হয়ে গেট খুলে দেয়।
শীতল বাতাসের ঝাপটা এসে মুমুর শরীর জুড়িয়ে দেয়। বাতাসে ফুলের মিষ্টি সুবাসে মনটা জেগে ওঠে। আহ! কি শান্তি! হাঁটতে গিয়ে পা দুটো যেন ভেঙে আসে, নিজেকে একটা খোঁড়া মানুষের মতো টানতে টানতে লিফটের সামনে নিয়ে আসে। হুশ করে উঠে যায় আটতলায়।
পাখির সুমিষ্ট সুর শুনে কেউ একজন দরজা খুলে দেয়। মুমু এতক্ষণে ভাঙাচোরা মানুষের মতো ড্রাইংরুমের গদি মোড়া সোফায় শরীরটাকে ঝপাৎ করে ফেলে আয়াকে বলে, ঠাণ্ডা পানি দে। আয়া পানি নিয়ে আসার আগেই ঝুমুর আম্মা এসে সামনে দাঁড়ান।
কটা বাজে ঝুমু?


আম্মু, সময় দেখার সময় ছিল না। প্লিজ, এখন কোনো প্রশ্ন করো না। কাল সকালে তোমার সব প্রশ্নের জবাব দেবো।
এলোমেলো পায়ে মুমু ওর রুমে ঢুকে বিছানায় লুটিয়ে পড়ে। পেছন পেছন ওর আম্মাও আসে।
খাবে না?
ক্ষিধে নেই আম্মু। প্লিজ আমাকে ঘুমুতে দাও।


এ কি! তোমার জামা-কাপড়ে এত রক্ত কেন? টয়লেটে যাও আগে। ফ্রেশ হয়ে এসো।
আম্মু... মুমুর গলা থেকে আর কোনো শব্দ বের হয় না। অচৈতন্যের ঘোরে মুমু প্রলাপ বকতে থাকে থেমে থেমে। মেয়ে কি বন্ধুদের সাথে বাইরে থেকে কিছু খেয়ে এসেছে! সারা দিন কোথায় ছিল? আজ তো ছুটির দিন। য়ুনিভার্সিটি বন্ধ। মুমুর সাদাসিদে মা সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে মুমুর গায়ে হাত রাখেন।
আরে, গা যে জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। এত তাপ। মেয়ের কপালে হাত রেখে সটকে সরে আসেন। তাড়াতাড়ি আয়াকে আইস ব্যাগ আনতে বলেন। নিয়ন বাতির ফকফকে আলোয় বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে তিনি স্থানুর মতো দাঁড়িয়ে থাকেন। হায় আল্লাহ! রক্তে যে ভেসে যাচ্ছে বিছানা। এত রক্ত। অ্যাই মেয়ে, তোর কি কোনো হুঁশ জ্ঞান নেই?


এই মুমু, ওঠ। তাড়াতাড়ি বাথরুমে গিয়ে ফ্রেশ হযে আয়। তোর বয়স বেড়েছে, না কমেছে? এতটুকু হুঁশ জ্ঞান নেই!
মুমুর আম্মা বেগজাদী বেগম তাড়াতাড়ি একটি চাদর দিয়ে মুমুর গা ঢেকে দেন।
খুবই দিশেহারা অবস্থা।
মুমু, মা আমার, এত জ্বর বাধালি কী করে? সারা দিন টো টো করে কোথায় ঘুরেছিস? একটুও কাণ্ডজ্ঞান নেই? ওঠ মা, বাথরুমে চল। অ্যাই মুমু, তোর কি খুব খারাপ লাগছে? মুমু গোঙানির মতো কী বলে বোঝা যায় না।


বেগজাদী বেগম আয়াকে ডেকে মেয়ের ড্রেস বদলাবার চেষ্টা করেন।
আয়া আর্তকণ্ঠে চিৎকার করে ওঠে। হায় আল্লাহ! আফায় যে রক্তে ভাইসা যাইতেছে। আফার প্যাট থাইকা এত রক্ত পড়তেছে ক্যান? আম্মা, শিগগির আব্বারে বোলায়েন।
ওর আব্বাকে এ সময় ডাকা কি ঠিক হবে? এ সব মেয়েলি ব্যাপার। বেগজাদী মনে মনে ভাবেন।
চৌধুরীকে ডাকতে হয় না। আয়ার চেঁচামেচি শুনে নিজেই মেয়ের রুমে চলে আসেন।
মেঝেতে রক্তের স্রোত দেখে তাঁর মাথা টলে ওঠে। তখনি তিনি পারিবারিক ডাক্তারকে কল দেন।
ডাক্তারকে ডাকছ কেন? কী যে করো না? বেগজাদী বেগম স্বামীকে একটু ভর্ৎসনা করেন।
চৌধুরী বাক্য ব্যয় করেন না। মেয়ের মাথার কাছে তিনি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। মেয়ের মুখখানি কেমন ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে।


প্রতিবেশী ডাক্তার তাড়াতাড়িই চলে এলেন। মুমুর পালস ইত্যাদি পরীক্ষা করে বলেন, ওকে এক্ষুনি হসপিটালাইসড করতে হবে। রক্ত বন্ধের ব্যবস্থা করতে হবে।
হসপিটালে কেন? রক্ত বন্ধ হওয়ার ওষুধ দেন।


না ভাবী, মুমু এখন সে পর্যায়ে নেই। রক্ত বন্ধ করে রক্ত দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
রাত তখন ১টার ঘর ছাড়িয়ে গেছে। রাস্তায় দু’একটি গাড়ি হুস হুস করে চলছে। চৌধুরী সাহেব ড্রাইভারকে গাড়ি বের করতে বলে নিজে তৈরি হয়ে নেন। মুমুর আম্মা আর ড্রেস বদল করেন না।
চৌধুরী সাহেব স্ত্রীকে বলেন, ওখানে গিয়ে উল্টাপাল্টা কোনো কথা বলবে না। ডাক্তার সাহেব, আপনিও আমাদের সাথে চলুন।


গাড়ি রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে তীব্র বেগে ছুটে চলছে। উত্তরা ছাড়িয়ে গাড়ি ইউনাইটেড হাসপাতালে এসে থামে। চার দিক নীরব। নিঝুম। কেবল হাসপাতালের প্রাঙ্গণ আলোয় উদ্ভাসিত।
খুব দ্রুতই চিকিৎসা শুরু হয়। নার্সদের তৎপরতা লক্ষ করার মতো। পিনপতন নীরবতা চার দিকে। ওটিতে নিয়ে মুমুকে সাফসুতোর করে বেডে নিয়ে আসতে বেশ কায়েক ঘণ্টা কেটে যায়। রক্ত দিতে হবে। তারও ব্যবস্থা হয়। মুমু ঝরাপাতার মতো সাদা ধবধবে বিছানায় পড়ে থাকে। ওর চৈতন্য ধীরে ধীরে ফিরে আসবে, ডাক্তার বলেন।


ডাক্তার ওর বাবাকে মৃদুকণ্ঠে বলেন, অ্যাবরশন যেখানে করানো হয়েছিল, তারা অ্যাকুরেটলি করেনি। ভাগ্য ভালো আপনারা তাড়াতাড়ি ব্যবস্থা নিয়েছেন।


‘অ্যাবরশন’ শব্দটি মুমুর বাবা-মা দু’জনের কানেই ধাক্কা দেয়। মুমুর বাবা মাথা নত করে দাঁড়িয়ে থাকেন। মুমুর আম্মার চোখ থেকে অনবরত পানি গড়িয়ে পড়ে।
ফোঁটায় ফোঁটায় রক্ত শিরা দিয়ে শরীরে প্রবেশ করছে ধীর লয়ে। মুমুর বাবা মাথা নুইয়ে একটি সোফায় বসে আছেন। আঠারো বসন্তের পুষিপত্র বাগান তছনছ করে দিয়েছে বনদস্যু। কোন ফাঁকফোকর দিয়ে ঢুকেছে এ দস্যু?


নাকি আধুনিকতার সদর দরজা দিয়েই এর প্রবেশ ঘটেছে?
ডাক্তার খুব মৃদু কণ্ঠে বলেন, এ ধরনের রিস্কি অ্যাবরশন ভবিষ্যতে মাতৃত্বের জন্য নিরাপদ নয়। মি. চৌধুরী, আলোর নিচেই কিন্তু থাকে ঘোর অন্ধকার। বন্ধু বলেই কথাটা বললাম।