দেবালয়া

Oct 07, 2017 12:49 pm
মুম্বাইয়ের রুপালি জগৎ পৃথিবীর বিস্ময়


বুলবুল সরওয়ার

[গত সংখ্যার পর]


আরব সাগরের উছলে পড়া ঢেউয়ের ওপরেই শাহরুখের বাড়ি ‘মান্নত’। আমরা উল্টো দিকের ফুটপাথে বসি। শ-খানেক লোক বসে-দাঁড়িয়ে আছে অপেক্ষায়। কিং খান নাকি এখনো বেরোননি। সুতরাং চান্স আছে দেখা পাওয়ার। মুম্বাইয়ের রুপালি জগৎ পৃথিবীর বিস্ময়। হলিউডের পর একটাই পৃথিবীর সবচেয়ে আকর্ষণীয় স্থান। সেলিব্রিটি হওয়ার স্বপ্ন তো বহু মানুষরই থাকে। যাদের চেহারা ফিগার ভালো তারা অল্প সময়ে পৃথিবী-বিখ্যাত হওয়ার সুযোগটা নিতে পারে অল্পায়াসে। লাইট-সাউন্ড-কাট মানুষকে টানেও চুম্বকের মতো। শো-গার্ল নামের একটি ইংরেজি সিনেমায় এই যাওয়া-আসার চিত্রটি ভারি সুন্দরভাবে ফোটানো হয়েছে। পৃথিবীব্যাপী আলোচিত এলিজাবেথ বার্কলে-জিনা গার্সনের সেই খ্যাতির দ্বন্দ্বের ছবি। মুম্বাই তো সেই লাস ভেগাসই স্বপ্নের হলিউড। দুই শো কোটি মানুষের মহাভারত ছেঁকে হাজির করা হয় সুন্দরীদের। ধর্ম, দেশ, ভাষা সব ব্যবধান ঘুচিয়ে চলচ্চিত্র টেনে আনে সেরাদের সেরাটিকে।
আমরা আলোচনা করি আর পানি-পুরি সাবাড় করি। বোম্বেতে ছবি শুরু হয় ১৮৯৯-এ কাজী নজরুলের জন্মের বছর। হলিউডেরও দশ বছর আগে। সবাক চিত্রর শুরু ১৯৩০-এ। তখন একে বলা হতো টকিজ। কথা কইতে পারে যে।
প্রথম ছবি তো রাজা হরিশচন্দ্র, তাই না?
জি হ্যাঁ।
নির্বাক?
অবশ্যই। দাদাসাহেব ফালকের।
তাকেই তো বলিউড গুরু মানে, তাই না?
জি হ্যাঁ।
প্রথম সবাক ছবি কী?
আরদেশি ইরানির তৈরি আলম-আরা। ব্যাটা পার্সি ছিল কিন্তু ভাষা জানত পনেরো-ষোলোটা। আটটা ভাষায় ছবিই বানিয়েছে। প্রথম ভারতীয় রঙিন ছবির নির্মাতাও এই মটকু।
মটকু কেন?
ও ব্যাটা সব ব্যাপারেই নাক ডুবিয়েছে। আমার রাগ হয় মানুষকে বেশি প্রতিভাবান দেখলে। তোমার মতো শ্রীকৃঞ্চ!!

সোবহানাল্লাহ। আমি বিস্ময়ে উঠে দাঁড়াই।
এর উল্টো পিঠও আছে ববিতা মৃদু কণ্ঠে বলে : কত হাজার-হাজার নারী এর মোহজালে পড়ে ধ্বংস হয়ে যায়, তার হিসাব রাখো?
আমি এদিক-ওদিক মাথা নাড়ি।
জানো তো প্রতি রাতে এগারো-শো মানুষ এইডসে আক্রান্ত হয় এই তিলোত্তমা শহরে?
কী বলছো?
সত্যি বলছি। খোঁজ নিয়ে দেখ এ শহরেই আছে সাত মাইল লম্বা বস্তি এবং পাশাপাশি লার্জেস্ট প্রস্টিটিউশন অব-দ্য-ওয়ার্ল্ড। কত রুপালি পর্দার স্বাপ্নিকদের শেষ ঠাঁই হয়েছে ওই পল্লীতে তার হাদিস তুমি কখনোই পাবে না। সেই রূপের ফাঁদেই পা দেয় লোভী পুরুষেরা। ক্ষণিক আনন্দের বিনিময়ে নিয়ে যায় এইচআইভি ভাইরাস। ধ্বংস হয়ে যায় কোনো পরিবার কিংবা একটি পুরো মহল্লা।
আরব সাগরের অক্লান্ত ঢেউয়ের মতো ববিতার কণ্ঠে ঝরে মুম্বাইয়ের রেডলাইট এরিয়ার কাহিনী। হঠাৎ এ সময় শোরগোল ওঠে শাহরুখ-শাহরুখ!
আমরাও উঠে দাঁড়াই।
কালো কাঁচ ঢাকা গাড়ি ছেঁকে ধরে ভক্তরা। কিন্তু গাড়ির কাঁচ নামে না। বরং এগিয়ে আসে তাগড়া-জোয়ান সিকিউরিটি। তাদের ব্যাটনের চাপে ধীরে ধীরে পিছিয়ে যায় ভক্তের দল। গাড়ি এগিয়ে যায় সামনে।
আমার হঠাৎ মনে পড়ে বৈজু বাওয়ারা ছবির নায়কের কথা। মহানায়ক ভারত-ভূষণ এমনই খ্যাতিমান ছিলেন যে তার হেঁটে যাওয়া পথের ধুলা পর্যন্ত মাথায় মেখে নিত ভক্তরা। শেষ জীবনে তিনি এত অর্থকষ্টে ভুগেছেন যে শচিন ভৌমিক লিখেছেন : এক গ্লাস ঘোল কেনার পয়সাও তার ছিল না। মারাও গেছেন অখ্যাত-অজ্ঞাতভাবে। খবর হয়েছে দুই দিন পরে।
সেই তানসেনকে হারিয়ে দেয়া বৈজুর যিনি গেয়েছিলেন : ও দুনিয়া কো রাখওয়ালে?
হ্যাঁ, বন্ধু হ্যাঁ। রুপালি জগতটা এ রকমই পুরনোকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে সুদর্শন নায়ক আসে; এবং নিজেই একদিন পুরনো হয়ে সরে যায়। জীবনের ধারাক্রমের চেয়েও রূঢ় এই জগত।
আমি তার কথায় সায় দিয়ে দুই কাপ চা নেই ফুটপাথ থেকে। তারপর হাঁটতে থাকি। মহানায়কের বাড়ির সামনের ধুলা-মাটি

খুবই সাধারণ ও সাদামাটা সালমানের বাড়িটা। অটোওয়ালা বলল : বান্দ্রার সবচেয়ে সাধারণ মানুষ সালমান। থাকেন পুরো পরিবারকে নিয়ে মা, ভাই-বোন সবাই।
কেন, এ রকম কেন?
এটাই তার স্টাইল। আপনি কি জানেন, স্যার ইন্ডাস্ট্রিতে সবচেয়ে জনপ্রিয় মানুষ তিনি?
আর নায়িকাদের মধ্যে?
জুহি চাওলা। ওই দেখুন একের পর এক সে আমাদের দেখিয়ে চলে ধর্মেন্দ্র, শত্রুঘ, অমিতাভ-জয়া, দিলীপ কুমারদের বাড়ি। সত্য-মিথ্যা বোঝার উপায় নেই। শুধু মাথা নাড়ি আর দু-একটা যাপ নেই। তাও কি নেয়া যায়? তাগড়া সিকিউরিটি ধেয়ে আসে জড়ো-হওয়া অচীনদের তফাৎ করে দিতে। হট যাও ভাগো ইহাঁসে।
ক্যামেরার জীবনে আমার একটা গল্প আছে।
শোনাও।
ইন্টারমিডিয়েট মানে তোমাদের টুয়েলভ পাস করেই আমি ডিপ্লোমায় ভর্তি হই। আমার দুই ঘনিষ্ঠ বন্ধু শামিম আর মেসবাহও থাকে আমার সাথে। প্রশিক্ষক বেগ স্যার।
মানে, এম এ বেগ?
হ্যাঁ, আমি হতভম্ব হয়ে বলি : কিন্তু তুমি চিনলে কী করে?
তার একটা বই আছে না আধুনিক ফটোগ্রাফি? আমার ভাইয়ের পাঠ্য। সেখানকার ভূমিকায় বলা আছে যে তিনি বাংলাদেশের পথিকৃৎ ফটোগ্রাফার।
তোমাকে একটা চুমু খাওয়া দরকার। আমি আবেগাক্রান্ত হয়ে বলি।
এখানে? এই প্রকাশ্য রাস্তায়? ‘সেটা বোধ হয় ঠিক হবে না তাই না ভেইয়া’ ববিতা কৌতুক করে অটো ড্রাইভারকে জিজ্ঞাসা করে।
ঠিক বোলা, মাইজি? পোলিছ বহুতই নাফরমান হ্যায়।
আমি অবাক হয়ে যাই তার জবাবে। হেসে বলি : ঠিক হ্যায়, ভেইয়া তুম আগ বাড়ো। চুম্মা-চুম্মা খতম।

ইন্ডিয়া গেটের পাশেই ইতালিয়ান হোটেলে লাঞ্চ সারি আমরা। হাজার কবতুরের ডানা ঝাপটানো দেখলেই আমার শাহজালালের দরগাহ আর ইস্তাম্বুলের এইউপের কথা মনে পড়ে। কবুতরকে শান্তিকপোত কে বানিয়েছে জানি না তবে সুফিবাদ ও ইসলাম প্রচারকদের সাথে এর একটি অপ্রমাণ্য যোগাযোগ আছে বলে মনে হয়। আমি বিষয়টি দেখলেই আশ্চর্য তন্ময়তায় আচ্ছন্ন হই।
খাওয়া কি আজ শেষ হবে?
জি? আমি চমকে উঠে বলি : এই তো আমার শেষ।
হ্যাঁ, তা তো দেখতেই পাচ্ছি। ঘণ্টা না বাজালে তোমার ঘড়ি সময় দেয় না, না?
আমার মনে পড়ে যায় রবিবাবুর ডাকঘরের কথা। এই যে সেই নায়ক-অমলের কথা! হতবাক হয়ে বলি : তুমি বুঝি খুব রবীন্দ্রনাথের ভক্ত?
আমি রবীন্দ্রনাথের তেমন কিছু পড়িনি।
আমি আর কথা বাড়াই না। কলকাতায় আমি দুই ধরনের লোক দেখেছি একদল নাতি-রাবীন্দ্রিক; আরেক দল প্রকাশ্যে না হলেও প্রচ্ছন্নে রবীন্দ্র-বিরোধী। এর সাথে বাংলাদেশের তুলনাটা খুবই কন্ট্রাস্ট। একদল সেখানে রবীন্দ্র-পূজারী; আরেক দল রবীন্দ্র-খুনি। দু-দলের আয়োজনই মার-মার, কাট-কাট যেটা কলকাতায় তেমন নেই। ববিতা কোন্ দলের কে জানে!

আমরা লঞ্চের টিকিট কেটে একটা কেবিনের পাশের জানালায় ব্যাগ নিয়ে বসতে-না-বসতেই হইহই করে পর্যটকেরা ঢুকল। দেখি, সবার সাথে শ্রীমতী আগাথা।
হ্যালো, সারোয়ার? হাউ ডু ইউ ডু? ইনিই বুঝি তোমার পালিয়ে আসার কারণ?
ভেবেছিলাম ঝগড়া বেধে যাবে। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখি শ্যামাকে হারিয়ে চিত্রাঙ্গদা হাত বাড়িয়ে দিয়েছে তুমি নিশ্চয়ই আগাথা? সারোয়ার তো তোমার জন্য ফানাহ-ফিদা হয়ে আছে।
ইজ ইট? ওহ্ নো, সারোয়ার... মাই প্লেজার-মাই প্লেজার।
আমি ববিতার সপ্রতীভ কাণ্ডজ্ঞান দেখে স্তম্ভিত। আগাথাও অবাক হয়েছে। তবে সে তা বুঝতে না দিয়ে রসিক কণ্ঠে বলল : দেয়ার আর মেনি লাভ-কেইভস্ ইন এলিফ্যান্টা। আই লাইক ইট।
একাই নাকি সাথে কেউ থাকলে? আমি দুষ্টামী করে বলি।
সে চোখ মটকে বলে কমপক্ষে চারজন হলে, তবেই।
ববিতা ফোঁড়ন কেটে বলে : বেশ তো শক্তি তোমার। পুরো মুসলমানি। সবাই সমস্বরে হেসে উঠি আমরা।
ছোট ছোট অসংখ্য লঞ্চ যাচ্ছে এলিফ্যান্টায়। ইন্ডিয়া গেট থেকেই যাতায়াত। লঞ্চের সমানসংখ্যক স্পিডবোটও চলছে। তবে রিস্কি। কারণ সাগর শান্ত না থাকলেই অ্যাক্সিডেন্ট ঘটে।
পাশাপাশি তিনটি লঞ্চ যাচ্ছে একই সাথে। একটি পুরোপুরি ডেক-লঞ্চ। যাত্রীরাও সবাই বিদেশী। পোশাকও সংক্ষিপ্ত। শীতের দেশের মানুষ বলেই এদের এই খোলামেলা ভাব, নাকি আধুনিকতার চরম প্রকাশ আমি বুঝতে পারি না।
বোঝার দরকারও নেই। তোমার আগাথাকেই দেখো না কেন ফিসফিস করে বলে ববিতা : ঊরুর চল্লিশ ভাগই তো খুলে রেখেছে, তাই না? অ্যাংলো হলেও তো সে ভারতীয়; নাকি ব্রিটিশ?
রবীন্দ্রনাথের ঘরের মেয়েরা কী পরত জানো?
জানি জানি। ঠাকুর বাড়ির মেয়েরা পা খোলা তো দূরের কথা; হাতও ঢেকে রাখত। তাদের আব্রু মুসলিমদের পর্দাকেও হার মানায়।
তো আগাথাকে সেই সময়ের মেম ধরে নাও। ভগিনী নিবেদিতা।
তোমার বুঝি খুব সুবিধা হয় তাতে?
হ্যাঁ, তা একটু হয় বটে। দাম ছাড়া কাম তো পৃথিবীর কোথাও মেলে না।
মেলে মেলে; বন্ধুত্বে মেলে।
সে তো ওয়েস্টার্ন হলে।
তার দাম অবশ্য আরো বেশি। তারা তো আবার ভারত-লুণ্ঠনকারী। কামসূত্রও নিয়ে গেছে; যেখানে লাভের চেয়ে প্রি-লাভই ইমপরট্যান্ট।
আমি হাসি চাপতে না পেরে বিষম খাই।
থাক আর কিছু খেতে হবে না। লঞ্চ প্রায় এসে গেছে। চলো, নামি।
কাঠের সিঁড়ি বেয়ে নামতে যেয়ে অনেকেরই পড়ো পড়ো অবস্থা। আমি দুই হাতে দুই নারী আগাথা ও ববিতাকে ধরে নামাই।
গবার অবাক চোখ দেখে ববিতা মুখ ভেংচায় : দু-কদম সিঁড়ি টপকেই দেবানন্দ হয়ে গেলে দেখছি!
আমি হেসে তার হাত ছেড়ে দেই। কে জানে কে জানে, মুখের মতো যদি তার হাতও ধারালো হয়ে ওঠে।
লম্বা পাথর-ফেলা রাস্তার দু-পাশে সারি সারি দোকান। কী নেই সেখানে দেবীর মূর্তি থেকে চানাচুরের প্যাকেট; বাঁশি বেলুন থেকে বোম্বাইয়া পানি-পুরি। তবে সব সৈকতের মতো এখানেও ডাব-নারকেলেরই আধিক্য।
কিছু দূর যাওয়ার পরই সিঁড়ি শুরু হলো। ববিতা যথারীতি ফোঁড়ন কাটল দেখা যাক বাবুর কোমরের জোর কত।
আমি তার দুষ্ট চোখে চোখ রেখে বলি : সেটা দেখার জন্য পাহাড়ে ওঠাই কি জরুরি? আর কোনো জায়গা নেই?
আছে সে সব দিনদুপুরে অনুল্লেখযোগ্য।
এবং ছোট ছোট তাই না?

সে আবারো হাসে। হাসতেই হাসতেই বলে : কাহিনী কি আমি বলবো, না আগাথা?
আগাথা অল্প বাংলা বোঝে। ববিতার কাঁধে হাত রেখে বলে : আমার তো পুরো টিম ম্যানেজ করতে হবে, দিদি। তুমি দাদাকে একাই সামলাও।
আমি কি তোমার মতো রম্ভা যে ইন্দ্রপ্রস্থ বশ করব?
তুমি তার চেয়েও বেশি বলেই দ্রুত ছুটল আগাথা।
আমরা একটু উঠি। একটু থামি। এবং একটু গল্প করি।

এভাবেই শুনি যে দ্বীপটা আদতে ছিল গুজরাটের সুলতানদের অধীন। তাদের কাছ থেকে নেয় পর্তুগিজরা। সেখান থেকে বোম্বের দ্বীপগুলের সাথে সাথে এটাও যৌতুক হিসেবে যায় ইংল্যান্ডের রাজা চার্লস-টুর অধীনে। কিন্তু পর্তুগিজরাই দ্বীপটাকে নষ্ট করে।
কিভাবে?
এই গুহাগুলোতে তারা চাঁদমারী প্র্যাকটিস করে। প্রধান গুহায় যে তিনটি মূর্তি সেগুলো ছাড়া সবগুলোই আধা ধ্বংস হয় শয়তানগুলোর হাতে।
এলিফ্যান্টা নাম কেন এর?
একটা বড় পাথরের হাতি ছিল সমুদ্রের ধারে। তার নামেই এই নাম।
হাতিটা গেল কোথায়?
বিশ্রাম নিতে।
মানে?

মানে হলো মানুষের বদমায়েশীর হাত থেকে বাঁচাবার জন্য সেটাকে তুলে নিয়ে মুম্বাইয়ের জিজামাতা উদ্যানে রাখা হয়েছে। গেলেই দেখতে পাবে।
ভালো বিশ্রামেই আছে তাহলে।

খুব। ববিতা পায়ের কাপড় গোছা পর্যন্ত তুলে একটা নালা পার হতে ছোট লাফ দেয়। লাফ দিয়েই হোঁচট খায়। ছোট্ট একটা নুড়ি ছিল সেখানে সেই খেল দেখিয়ে মেয়েটাকে আমার কোলে এনে ফেলে। সতর্ক না থাকলে দুজনেই আহত হতাম। ভাগ্য ভালো থাকায় এ-যাত্রা হাসপাতাল গমন থেকে রক্ষা।
খাড়া হতে হতে বলে সে : পড়বি তো পড় মালির ঘাড়েই?
সে আর হলো কই? সন্ধ্যার আঁধার না নামলে মালির কি লাভ?
দেব এক কিল! খালি শয়তানি। আমি মরি, আর উনি খোঁজেন পরী।
উপকারের এই বিনিময়?
না না, স্যরি। সে আমার মাথা টেনে নিচু করে সত্যি সত্যিই কপালে ঠোঁট ছোঁয়ায়।
আমি চমকে উঠি।

এটা কি হিন্দুদের তীর্থ স্থান, না বৌদ্ধদের?
আপাতত হিন্দুদেরই। তবে বৌদ্ধদেরও ছোঁয়া আছে। অথবা আদিতে হয়তো তারাই এখানে ধ্যান-ধর্ম শুরু করেছিল।
কিভাবে?
ঐ যে পুব পাশে আরেকটা পাহাড় দেখছো না ওর নাম স্তূপ। ঐ নাম তো বৌদ্ধদেরই হয়, তাই না?
তা ঠিক। ওখানে কি বৌদ্ধ মূর্তি আছে?
হ্যাঁ, আছে। তবে প্রায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া। সংরক্ষণ করেনি কেউ। হয়তো মৌর্যদের সাথে সংঘর্ষ হয়েছিল। জানোই তো হিন্দুদের হাতেই বৌদ্ধরা নির্যাতিত হয়েছে সবচেয়ে বেশি।
আমি চুপ করে থাকি আর মুগ্ধ হই। মানুষ সাধারণত নিজ জাতি-ধর্ম বা দেশের দোষ দেখতে পায় না। ববিতা সে ক্ষেত্রে অবলীলায় সত্য উচ্চারণ করছে। এ গুণ শুধু বেদুইনদের মধ্যেই দেখা যায়। ভারতে যার উল্টোটাই সুলভ।
এবং পাহাড়েও।
আমি এবার সত্যিই অবাক হই। এটা আমার মনে ছিল না। পাহাড়ি মানুষ এত সরল যে প্রায়ই সত্যের বাইরে যেতে পারে না। মনকে আমি জিজ্ঞাসা না করে পারি না সত্য কি তবে সরলতারই নামান্তর? মন জবাব দেয় সুরা ফাতিহা পড়। উম্মুল কোরান।
কী ভাবছো?
ভাবছি না, দেখছি।
গুহাগুলো?
হ্যাঁ। এত বড় পাথুরে পাহাড় আদি-মানুষ কাটল কিভাবে? এ যে পিরামিড যুগের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে।
না না, অত পুরানো নয় এসব গুহা।
কত পুরনো?
ঐতিহাসিকরা ধারণা করেন তোমাদের নবী-যুগের।
মানে পঞ্চম শতাব্দী?
জি।
সোবহানাল্লাহ। আমি সত্যিই মনে মনে সূরা আর রহমানের বারবার বলা সেই আয়াতটা আওড়াই। এটা কত বড়, ববিতা?
চলো ঐ যে আগাথা বর্ণনা করছে শুনি।
আগাথা প্রফেশনাল গাইড। স্বদেশী-বিদেশী সবার জন্যই তার বর্ণনা অ্যাকাডেমিক।

...এই দ্বীপ পূর্ব তীর থেকে এগারো কিমি দূরে আর পশ্চিম উপকূল, মানে ইন্ডিয়া গেট থেকে দশ কিমি। এর আরেক নাম ঘারাপুরি। দ্বীপটি প্রায় আড়াই কিমি লম্বা এবং এখানে আছে দুটো ছোট পাহাড় পশ্চিমে ও পূর্বে। মাঝখানে একটি ক্যানাল। আমরা যে পাহাড়ে দাঁড়িয়ে আছি, তার উচ্চতা পাঁচ শো সত্তর ফিট। আম, তেঁতুল ছাড়াও এখানে জন্মে তাল-সুপারি।
প্রধান গুহার নাম শিভা কেইভ। দেবতা শিবের সম্মানে তৈরি। মন্দিরটি প্রায় নব্বই ফুট লম্বা ও সমান চওড়া। প্রধান দরোজা তিনটি। ছয় সারি খুঁটির ওপরে ছাদ। শিবমূর্তির দুই পাশে রয়েছে যোগী ও নটরাজের অবয়ব। চালুকিয়ান রীতিতে গড়া দেবতার পাশে রয়েছে আরো অনেক সহযোগীদের মূর্তি পার্বতী, গঙ্গাধারা, লিঙ্গম...।
রাবনেরও যে মূর্তি দেখছি, ববিতা?
আমিও দেখছি। এটা আগে খেয়াল করিনি।
তুমিও কি গাইড হতে চাও নাকি?
ইচ্ছে আছে।
সত্যি?
হুম। ববিতা ময়ূরের মত পেখম তুলে হাসল। যেন কাউকে গোপন স্বপ্নের কথা বলতে পেরে খুশি।
আমি দ্রুত দেখার চেষ্টা করলাম দেয়াল চিত্রের শিবকে। যার মাথার মুকুট থেকে ঝরছে তিনটি ধারা গঙ্গা, যমুনা, সরস্বতী। পাশে সুসজ্জিতা পার্বতী। শিরের চারটি হাতের দুটি ভাঙা। গলায় পেঁচিয়ে আছে সাপ। পার্বতীর বামে বিষ্ণু।
আজো আমি হিন্দু-পুরাণের দেব-দেবীদের বংশলতিকা মনে রাখতে পারি না ববিতা বিষণœ কণ্ঠে বলে : এত বিরাট তাদের পরিবার এবং মাছের জালের মতো জড়ানো হিসাব-কিতাব।
আমি হেসে উঠি তার কথায়। মিথ মানেই তো তাই, বন্ধু। আলো-আঁধারীর খেলা বেশি বলেই তো তার নাম ইতিহাস না হয়ে হয়েছে পুরাণ।
ঠিকই বলেছো।
আমরা আগাথার পেছনে পেছনে হাঁটছি ঠিকই কিন্তু খুব কিছু মনোযোগ দিয়ে শুনছি না। সূর্যের আলো ফিকে হয়ে এসেছে। আমি একটু অবাক হয়ে বলি : আচ্ছা ববিতা, আমি যত দূর জানি হিন্দু-মন্দির দক্ষিণমুখী হয়। এটা তো দেখি পূর্বমুখী। কারণ কী?
কানে কানে বলবো, না জোরে?
আমি অবাক হয়ে তার দিকে তাকালে সে ফিস ফিস করে : শোনা যায় এটা আদিতে বৌদ্ধ মন্দিরই ছিল আরেকটু ছোট আকারে। সেগুলো ভেঙে এটাকে বড় করা হয়। বুদ্ধের জায়গায় শিব বসেন। যেভাবে সব-ধর্ম অন্যের ওপর চড়াও হয়।
আমি হাসি।
হেসো না সে ক্রুদ্ধ হয়ে বলে: তোমাদের ধর্মে মূর্তি থাকলে তোমরা কুতুব-মিনার গড়তে না ইসলামি মূর্তি গড়তে।
আমি তার কথায় চমকে উঠি। ইসলামি মূর্তি কী? আমি বুঝতে চেষ্টা করি মনে মনে। হ্যাঁ-হ্যাঁ, ইসলামি মূর্তি নিশ্চয়ই আছে এবং তা গড়ে তুলেছে মুসলিম ঘরে জন্ম নেয়া প্রগতিশীলরাই মাদরাসা, মক্তব, চাঁদ-তারা, পাজামা-পাঞ্জাবি, আরবি-ফার্সি এবং ধর্মীয় পুস্তকও। আজ এসবের উল্লেখেও মানুষ মানুষকে হেয় করে; সাম্প্রদায়িক জ্ঞান করে। মননশীল মানুষ যখন আক্রমণাত্মক হয় তখন সে হয় মূর্খের চেয়েও বর্বর। আমার চোখ ভিজে আসে লজ্জায়। ধর্মের ত্রিশুলধারীরাই আজ যেমন ধর্মের প্রবক্তা হয়ে উঠেছে; তেমনি বিরুদ্ধাচারীরাও হাতে নিয়েছে অদৃশ্য খড়গ। দু-দলেই যেন পণ করেছে প্রতিশোধের; হিং¯্রতার; হননের। পৃথিবীজুড়ে এই বাড়াবাড়ি! যুক্তি বুদ্ধি শুভবোধ সব শুধু কেতাবি বিষয়; মনের মধ্যে গেড়ে বসেছে দুর্যোধনের পাশবিকতা। বাংলাদেশে এ সমস্যা বুঝি পৃথিবীর মধ্যে সর্বোচ্চ!
আরে না ববিতা প্রতিবাদ করে পশ্চিম বাংলা, বিহার, ইউপি, পাঞ্জাব কোথাও কম নেই। আসলে ব্যাপারটা তো বোধের; শিক্ষার। ঘাটতি সেখানেই। তুমি যদি রবীন্দ্রনাথ-নজরুল, ইকবাল-গালিব, প্রেমচাঁদ-কৃষ্ণ চন্দর পড়াও মানুষ ঘৃণা ত্যাগ করতে শিখবে।
আমি অবাক হয়ে বলি সত্যি?
নিশ্চয়ই। সৎসাহিত্য ধর্মের মতই মানুষকে সঠিক পথ দেখায়। আলো দেয়। ভালো স্বপ্ন দেখতে সাহায্য করে। বেহেশতও তো তা-ই, ঠিক না?
আমি আর কথা বলতে পারি না। অল্প শোকে কাতর, অধিক শোকে পাথর। বেহেশত যে সত্যিই একটি ভালো-স্বপ্ন হতে পারে তা আমার কখনোই মনে হয়নি; বোধেই ছিল না। স্বপ্ন মানেই তো তো কেবল কল্পনা নয়। স্বপ্ন হচ্ছে বিশ্বাস; গন্তব্য বৃহত্তর সোনালি পৃথিবী!

আমরা পাহাড়গুহা দেখা শেষ করে ফিরতি পথ ধরি। অস্তগামী সূর্যের আলোকে বলে কনে-দেখা-আলো। ফটোগ্রাফারদের কাছে এ আলো স্বর্গীয়। সেই আলোতে আমরা ছবি তুলি। ববিতা হেসে গলার কাপড় টেনে নিচে নামায়। বলে সামান্য ক্লিভেজ দেখা না গেলে ছবি সেক্সি হয় না। আমি ঢোক গিলে শাটার টিপি।
সন্ধ্যার লঞ্চ যাত্রাটা হৃদয়গ্রাহী শুধু নয়, হৃদয় হরণকারীও বটে। সমদ্রের উত্তাল গর্জনে গর্জনে সৃষ্ট মিহি কুয়াশার ওপর সোনালি সূর্যালোক যেন মেহেদির আলপনা ছড়াচ্ছে। দূরে মুম্বাই স্কাইলাইন সিলোয়েটের আকারে চিত্রায়িত। অলৌকিক মুগ্ধতা প্রায় নির্বাক করে দিলো আমাকে।
হ্যালো, বাঙ্গাল বাবু হাউ আর ইউ? আগাথা এসে বসল পাশেই।
আমি হেসে বলি : অল দ্য বিউটিজ ব্রোকেন দ্য সাইলেন্স অফ মাইন্ড।
রিয়েলি?
সার্টেনলি ফোঁড়ন কাটে ববিতা : সারা পথ তো তোমার কথা বলে বলেই আমার যৌবনকে সতিন করে রাখল।
ও মাই গড! আগাথা হেসে আমার হাত টেনে হাত মেলায়। রাতে তোমার কী প্রোগ্রাম?
ববিতা ঝটিতে ঘুরে বসে। আমার বাসায় খাবে।
না না, তুমি মিথ্যে বলছো।
তাহলে তুমিই দাওয়াত দাও। তোমার সাথে ডিনার, ওকে?
আমার অবস্থা হলো ফাঁদে পড়া ইঁদুরের মতো। তাড়াতাড়ি করে বললাম: বোথ ইউ বুবলি বি মাই গেস্ট টু নাইট।
দু’জনে হাতে হাতে চাপড় দিলো যেন বাবরের ভারত-জয় সম্পন্ন হয়েছে!

সন্ধ্যার গেটওয়ে অব ইন্ডিয়া একেবারেই অন্য রকম। আলোয় আলোয় রূপসী হয়ে উঠেছে সে। পাশের তাজ হোটেল যেন বিশ্বসুন্দরী ঐশ্বরিয়া। যে গেট ব্রিটিশরা নির্মান করেছিল তাদের স¤্রাট ও রানীর জন্য সেই গেট দিয়েই শেষ ইংরেজ সৈন্য বিদায় নেয় আটচল্লিশের আট ফেব্রুয়ারি। জগতের নিয়ম মেনেই যেন দখলকারীরা ফিরে যেতে বাধ্য হয়।
কিন্তু মোঘলরা? তোরা তো ফেরেনি। মুরগির গ্রিল-কাবাবে কামড় বসিয়ে আগাথাকে প্রশ্ন করে ববিতা। তাদের কী হলো?
তারা তো থেকে গেল!
তাহলে তারা হানাদার নয়?
না-না, তারাও আগ্রাসী।
তাহলে আর্যরা কী?
আগাথা বিষম খায়। তুমি তুমি কি ভারতীয় হিন্দু; নাকি বিদেশী চর?
আমি তাদের বিতর্কে নাক গলাই না। আগাথা ইংরেজদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। আর তাকে হারাতেই ববিতা ক্রমশ মুসলমানদের পক্ষে যুক্তি দিচ্ছে।
বলো কত মুঘল ফিরে গেছে সমরকন্দে?
ঝগড়া তুঙ্গে ওঠে। শেষে খাওয়াই বন্ধ। বাধ্য হয়ে আমি তাদের থামিয়ে দিতে মাঝখানে গিয়ে দাঁড়াই। কারণ আলোচনা আবার ফিরে এসেছে প্রথম জায়গায়। তর্কে কখনো কেউ জেতে না সেই পুরানো প্রবাদটাই মনে পড়ে গেল।

উঞ্চ-পানীয়তে চুমুক দিয়ে দুজনে ঠাণ্ডা হওয়ার পর আমি জানতে চাই : এবার কোথায়?
একটা পদ্মিনী ডাকি?
আমি ভয় পেয়ে বলি : নারী নয়তো?
হ্যাঁ, নারীই। তোমার তৃতীয় বউ। ওকে?
দু-মিনিট পরেই একটা হলুদ-কালো ট্যাক্সি এসে সামনে দাঁড়ায়। আগাথা দাম মিটিয়ে বলে : সামনে কে বসবে?
আবার ঝগড়ার ভয়ে বলি : আমিই উঠি?
না-না, আমি। ববিতা স্বেচ্ছায় সামনের দরোজা খুলে উঠে বসে। আমি তিন দিন ধরে তোমায় চিবিয়ে খাচ্ছি এবার দো-আঁশলাটাই খাক। সে খাঁটি বাঙাল-ভাষা ব্যবহার করায় আগাথা কিছুই না বুঝে বলে: এনিথিং রঙ, মাই-ডিয়ার?
নাথিং। আমি তাকে আশ্বস্থ করি।
রাতের মুম্বাই-দর্শনের ব্যবস্থা সরকারী ভাবেই করা আছে। শুনে আমি অবাক। সিঙ্গাপুর, কুয়ালালামপুর, ব্যাংকক এমনকি বেইজিংও রাতে ঘুমায়। সেখানে মুম্বাই জেগে থাকে প্রায় সারা রাত।
কারণ কী জানো? সামনে থেকে গলা বাড়িয়ে বলে ববিতা : এটি বিশ্বের ব্যস্ততম শহরের অন্যতম শহরই নয় বিশ্বের ষষ্ঠ কোটিপতিদেরও নিবাস। বিশ্বের দ্বিতীয় নান্দনিক বিল্ডিংয়ের নগরী যদি নিজেকে নগ্ন করেই না দেখালো তাহলে কি করে চিনবে উর্বশীকে?
ববিতার রসবোধে না-হেসে উপায় নেই। ট্যুরিস্ট-ট্যাক্সির ড্রাইভাররাও সাধারণত রসিক হয়। কথার খেই ধরে সে বলল : শুধু উর্বশী একা কেন, মাইজি স্বর্গলোকের সব রম্ভাই এখানে আছেন হেমা থেকে শ্রীদেবী; হেলেন থেকে ঊর্মিলা; মধুবালা থেকে মাধুরী।
শুধু এরাই? বলো, সাথে আছে দহিমার, পয়সার, ওশিয়ারও।
ড্রাইভার প্রথমে বুঝতে পারেনি। তারপর যেই বুঝল যে তিনটিই নদীর নাম যারা মুম্বাইয়ের প্রাণসঞ্চারিণী গাড়ি থামিয়ে কিছুক্ষণ হেসে নিলো। মাইজি, আপনি বোধহয় বাঙালি আছেন, তাই না? আমি বিহারের।
কিভাবে বুঝলে? খাঁটি বাংলায় জানতে চায় ববিতা।
ইন্ডিয়ার মধ্যে বাঙালিই রসবোধে সেরা।
ববিতা ময়ূরের মতো পেখম ফুলিয়ে বলে শুকরান, ভেইয়া।
মেরিন ড্রাইভ ধরে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলছে গাড়ি। কুইনস্ নেকলেস সত্যিই অপরূপ। আলোর মালা যেন অনন্তকে বেস্টন করে আছে। আমার মন উদাস হয়ে যায় রানী ভিক্টোরিয়ার কথা ভেবে। ব্রিটিশ এই মহারানীকে আল্লাহ ক্ষমতা দিয়েছিলেন পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বাধিক কিন্তু রূপ দেননি। কিছুটা স্থূলাঙ্গী এবং খানিকটা হ্রস্ব এই রমণী খুব বেশি প্রকাশ্যে আসতে পছন্দ করতেন না এজন্য। এমনকি লন্ডনেও বেশি থাকতেন না বাস করতেন স্কটল্যান্ডের প্রাসাদে। যার সাম্রাজ্যে সূর্য অস্তমিতই হতো না, তার নিজস্ব জগত ছিল অন্ধকারের কাছাকাছি। খোদার কী বিচিত্র লীলা!
আমি রূপের অভাবে ভুগছি বলেই বুঝি আগাথা পায়ের ওপর পা তুলে বসল। না চেয়েও দেখতে পেলাম তার অন্তর্বাসের লেস উকিঝুঁকি মারছে। সামনের দিকে তাকিয়ে দেখি ববিতা মুখ টিপে হাসেেছ। সে মুখে ইঁদুর-বেড়ালের কৌতুক।
সাতটি দ্বীপ নিয়ে গড়ে উঠেছে এ শহর মুম্বাই, পারেল, মাঝগাঁও, মাহিম, কোলাবা, ওরলি এবং ওল্ড-উম্যান-আইল্যান্ড। যদিও এখন আর তাদের আলাদা করা যায় না। ওই য উল্টো দিকে দেখছো ঝাড়বাতির মতো দালানকোটা ওর নাম নেভি মুম্বাই। পঞ্চাশ বছর পরে হয়তো দেখা যাবে, ওঠাও এক হয়ে গেছে।
সত্যি?
হতেও পারে ববিতা ফোঁড়ন কাটল : কাছাকাছি আসতে থাকলে কত কিছুই ঘটে।
তার কথায় কাজ হলো। আগাথা ব্লাউজের ঝুলন্ত গলা খানিকটা উঠিয়ে নিলো আর টেনে নামালো স্কাটের নি¤œদেশ।
ববিতা হেসে বলল : এবার হয়তো একশো বছর লাগবে। কিন্তু ঠেকানো যাবে না। মুম্বাই বাড়বেই।

আমরা বিচ রোড ধরে এগিয়ে যাই। আরেকটি মোড় ঘুরতেই ঝিলমিল করে ওঠে হাজি আলী দরদাহ। মোম্বাইয়ের আইকোনিক স্থাপনা। কি সিনেমা, আর কি রহস্যগল্প সর্বত্রই হাজী আলী দরগাহ্র উল্লেখ। প্রায় গোলাকার বিচের সবটুকুর কেন্দ্রে আলোর পূর্ণিমা হয়ে ফুটে আছে হাজী-আলী।
ডাইনে তরফ দেখিয়ে স্যার। ড্রাইভার আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলে : লতাজী কা বাংলো।
মানে লতা মুঙ্গেশকর?
হ্যাঁ জি, স্যার।
আমি শিহরিত হই। সেই দিলীপ কুমারের যুগ সালমান কাল পর্যন্ত রাজত্ব করে যাচ্ছেন এই গানের বুলবুল। পুরো ভারতকে যেমন চার শো বছর ধরে উজ্জ্বল করে রেখেছে তাজমহল; তেমনি অর্ধশতাব্দী ধরে মাতাল করে রেখেছেন লতাজী।
চারটি তলা জুড়েই থাকেন?
না না, তিনতলায় লতাজী। চারতলায় আশা ভোঁসলে।
দুই বোন এক বিল্ডিংয়ে? শুনেছিলাম ওনাদের মুখ দেখাদেখি নাই।
ওসব জার্নালিস্ট গসিপ। আর-ডি বর্মন মারা যাওয়ার পর থেকে দুই বোন এক সাথেই থাকেন।
মানে আশাজীর হাজবেন্ড?
জি। পঞ্চমজী।
আমি ববিতার দিকে তাকাই। তার চোখে খুব সূক্ষ্ম একটি কাঁপুনি দেখেই আমি পর্যটনের সেই চিরায়ত প্রবাদটি খুঁজে পাই শোনো, কিন্তু বিশ্বাস কোরো না।
ড্রাইভার আম্বালা টাওয়ার, নেহেরু পার্ক, সার্কুলার উদ্যান দেখিয়ে দিতে দিতে এগিয়ে চলে। ওরলির ইম্পেরিয়াল টাওয়ারের সামনের রোডে গিয়ে সত্যিই পাখা মেলে উড়তে ইচ্ছে করে। বাঁয়ে উত্তাল আরব সাগর আর ডানে জোড়া-টাওয়ারের আলোর ঝিলিমিলি। এর নাম ইম্পেরিয়াল টাওয়ার।
টুইট টাওয়ারের মতই দেখতে এই জোড়া-মিনারটি মুম্বাইয়ের সবচে উঁচু বিল্ডিংও বটে। আমরা গাড়ি থামাই সৈকতে শত শত নাগরিক ও পর্যটক চা-কফি ভেলপুরি-পানিপুরি খাচ্ছে। তাদের হাসি কলতানে মুখরিত আরব সাগর। আগাথা জানাল : আরেকটি টাওয়ার হচ্ছে আরো বড়।
কোথায়? কী নাম?
সেটি হচ্ছে পারেলে। নাম ওয়ার্ল্ড ক্রেস্ট। এটির উচ্চতা ৮৩৩ ফিট (২৫৪ মি.) আর ক্রেস্ট হবেÑ (৩৬০ মি.)। তবে আমার কিন্তু দুটির চেয়ে একটু ছোট লোধা বিল্ডিংই দেখতে সুশ্রী লাগে।
কেন সেটি সমুদ্রপাড়ে বলেই?
ও তুমি চেনো?
আমি কিছু না বলে হাসি।
কোহিনূর দেখেছো?
না না, রানী ভিক্টোরিয়া অনুমতি দেয়নি। আমি তো মাহাথিরের ভক্ত!

মানে?
মানে হলো মাহাথির মোহাম্মদকে তরুণ বয়সে ভিসা দেয় নি ব্রিটিশরা। সম্প্রতি তিনি শোধ নিয়েছেন রানী এলিজাবেথের মালয়-ভিসা প্রত্যাখ্যান করে।
বাপের বেটা ফোঁড়ন কাটে ববিতা। কিন্তু বন্ধু আগাথা সে কোহিনূরের কথা বলেনি। ও বলেছে কোহিনূর-বিল্ডিংয়ের কথা। ফোর্থ হাইয়েস্ট বিল্ডিং অব মুম্বাই।
ও শিবাজী পার্কেও দিকের চৌকো দালান?
দালান? চোখে তাচ্ছিল্যের কটাক্ষ হেনে ববিতা বলে : ভাগ্যিস মিউজিয়াম বলোনি।
হাসতে হাসতেই আমরা ভেলপরিয়াদের মহাসম্মেলনে মিশে গেলাম অতি দ্রুত।

ঘড়ির কাঁটা এগারোর ঘর পেরোবার আগেই টেক্সি আমাকে হোটেলে নামিয়ে দিলো। আগাথা নেমে গেছে আগেই। ববিতা একা যেতে পারবে কি না জানতে চাইলে সে হেসে বলল : বরং আমি জানতে চাই তুমি একা থাকতে পারবে তো?
আমার নির্বাক মুখের সামনে দিয়ে তার টেক্সি হুঁশ করে বেরিয়ে গেল। এমনই গাধা হয়ে ছিলাম যে (তার কাণ্ডে) ভাড়াটাও দিতে ভুলে গেছি।

সিনেমা স্টুডিও দেখার অভিজ্ঞতা সুখকর হলো না। প্রখ্যাত নটরাজদের সুরক্ষায় সিকিউরিটি এতই কড়া যে বেশিরভাগ শুটিং স্পট দূর থেকে দেখেই ফিরতে হলো। মেহবুব-স্টুডিও দেখার কঠিন ইচ্ছেটাকেও দমন করতে হলো সালমান খানের জন্য উপচে পড়া ভিড় ঠেকাতে পুলিশের মৃদু লাঠিচার্জের আতংকে।
ট্যুরিস্ট বার্সের ড্রাইভার বলল : এ প্রায় নিত্যদিনের ঘটনা, স্যার। কিচ্ছু করার নেই। দুশো কোটি মানুষের মধ্যে মাত্র একজন সালমান-শাহরুখ-ঋত্বিক। দু-চার হাজার মানুষ তো তাদের জন্য পাগল হতেই পারে, তাই না?
আপনারা হন না কেন?
ছোটবেলায় আমরাও হয়েছি। পুনে থেকে বোম্বে ছুটে এসেছিলাম তো সিনেমা জগতের লোভেই।
আফসোস হয় না?
নাহ্।
কেন?
এই তো মানুষের তকদির স্যার। চাঁদ ধরার জন্যেই চকোর ছুটোছুটি করবে কিন্তু কেউই তারা গন্তব্যে পৌঁছাবে না। বলিউডে যেতে পারি নি তো কি হয়েছে মুম্বাইতে তো আছি!
তা অবশ্য ভালো বলেছেন। তা, সালমান-শাহরুখ পারল কিভাবে?
ওরা হলো ব্যতিক্রম। ভাগ্যবান। আর এই তকদিরও ফ্যাক্টর, স্যার সে তার কপালে টোকা দিয়ে বলল : দুনিয়াটা এমনই স্যার। পার্সেন্টেজ কষলে ডজনখানেক শূন্য লাগবে।
আমি তার বেদনাবোধকে স্পর্শ করে গালিবকে স্মরণ করি। এই উর্দু শেরের রাজা বলেছেন :
এলো তার চিঠি-বিরহের শেষে
এলো না খুশির দিন
দুই ঠোঁট যেই কাছাকাছি হলো
হাঁকলো মুয়াজ্জিন।
সে দ্রুত এসে আমার সাথে হাত মেলায়। আপনি কবি? বাংলাদেশের লোকেও গালিব পড়ে, স্যার? মারহাবা। ...আমরা শুনেছিলাম : আপনাদের ওখানে ল্যাঙ্গুয়েজ মুভমেন্ট হয়েছিল সেটা নাকি উর্দুর বিরুদ্ধেই।
ঠিকই শুনেছো। তবে উর্দু ভাষার বিরুদ্ধে নয়; উর্দু-ঠেঙ্গাওয়ালাদের বিরুদ্ধে।
আপনারা কি উর্দুতে কথা বলেন না?
না।

(চলবে)