প্রতিভাবান মানুষরা যে কাজগুলো করে থাকে

Oct 12, 2017 12:01 pm
আর দশটা মানুষের মতো তাদের জীবন হয় না


হাসান শরীফ

সাধারণ মানুষ সাধারণ জীবনযাপন করে। ছকবাঁধা জীবন। কিন্তু প্রতিভাধরেরা? সাধারণ জীবনের বাইরে বলেই তারা প্রতিভাধর। কিংবা প্রতিভাধর বলেই তারা আর দশটা মানুষের মতো তাদের জীবন হয় না। কিংবা হয়ও। তারা হয়তো একটা বা দুটো বিষয়ে প্রতিভাধর। বাকি সব বিষয়ে অন্যদের মতোই। তবে যেটাই হোক না কেন, প্রতিভাধরেরা কিভাবে তাদের জীবন কাটায়, তা জানার আগ্রহ প্রবল। প্রতিভাধরদেরও সবার জীবন একই ধরনের নয়। তার পরও আমরা তাদের দৈনন্দিন জীবনটা একনজরে দেখতে পারি। সম্প্রতি ডেইলি রিচুয়ালস : হাউ আর্টিস্টস ওয়ার্ক নামে একটি বই লিখেছেন ম্যাসন কারি নামের একজন। তিনি ১৬১ জন চিত্রশিল্পী, লেখক, সঙ্গীতজ্ঞ, দার্শনিক, বিজ্ঞানী ইত্যাদি বিভাগে প্রতিভাধরের জীবনযাপন চিত্র তুলে ধরেছেন।


কাজের পরিবেশ : মনোযোগে ব্যাঘাতহীনতা
তারা নিজ নিজ কাজ করার সময় কোনো ধরনের ব্যাঘাত যাতে না ঘটে, সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতেন। জ্যাঁ অস্টিনের দরজার কব্জাটা প্রচণ্ডভাবে ক্যাচ ক্যাচ শব্দ তুলত। কখনো তেল দিয়ে এই শব্দটা বন্ধ করার চেষ্টা করা হতো না। যে ঘরে বসে লিখতেন, সেখানে কেউ ঢুকলে তিনি যাতে সাথে সাথে টের পান, সে জন্য এই ব্যবস্থা। মার্ক টোয়েনের পরিবারের কাছে ছিল দুর্দান্ত একটা ব্যবস্থা। যখন তাকে তাদের দরকার হতো, তারা কিন্তু তার ঘরে যেতেন না, বরং শিং দিয়ে তৈরি বাঁশি বাজাতেন। গ্রাহাম গ্রিন ছিলেন আরেক ধাপ সরেস। তিনি গোপন অফিস ভাড়া করতেন। কেবল তার স্ত্রী ওই ঠিকানা বা ফোন নম্বর জানতেন। জানালা দিয়ে কিছু দেখে মনোযোগ নষ্ট হতে পারে এটা মনে করে এনসি ওয়েথ জানালায় কার্ডবোর্ড সেটে দিয়েছিলেন।

 

হাঁটাহাঁটি
মন যাতে ঠিকমতো কাজ করে, সে জন্য অনেকেই নিয়ামিত হাঁটাহাঁটি করতেন। এখানেও আছে নানা কাহিনী। এই কাজটি করতে গিয়ে অনেকে নতুন নতুন চিন্তা পেয়ে যেতেন। সরেন কার্কগার্ড তো কোনো আইডিয়া পেলে হাঁটাহাঁটির পোশাক না খুলেই টেবিলে ছুটে লিখতে বসে পড়তেন। চার্লস ডিকেন্স প্রতিদিন বিকেলে সাড়ে তিন ঘণ্টা হাঁটার জন্য বিখ্যাত ছিলেন। তিনি এ সময় যা কিছু লক্ষ করতেন, সবই তিনি বাসায় ফিরে লিখে ফেলতেন। চেইকোভস্কি হাঁটতেন আড়াই ঘণ্টা। এক মুহূর্তও কম কোনো দিন করতে চাইতেন না। তিনি মনে করতেন, এই কাজে একটু ফাঁকি দেয়া মানে নিজের সাথে প্রতারণা করা এবং তাতে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়বেন। বিথোফেন লাঞ্চের পর দীর্ঘ সময় পায়চারি করতেন। এ সময় পেন্সিল আর কাগজ থাকত সাথে, নতুন কিছু মাথায় এলেই লিখে ফেলতেন।

 

কাজের দায়বদ্ধতা
প্রতিভাধরদের প্রায় সবাই কাজের ব্যাপারে খুবই যতœশীল ছিলেন। নিজেরাই ঠিক করে নিতেন কতটুকু করবেন। অ্যান্থনি ট্রলোপ দিনে মাত্র তিন ঘণ্টা লিখতেন। তবে সেটা ছিল প্রতি ১৫ মিনিটে ২৫০টি শব্দ করে। তার কোনো উপন্যাস যদি কোনো দিন ওই তিন ঘণ্টার আগেই শেষ হয়ে যেত, তিনি সাথে সাথেই আরেকটি লিখতে শুরু করে দিতেন। আর্নেস্ট হেমিংওয়ে প্রতিদিন নিজেকে স্মরণ করিয়ে দিতেন, খবরদার, নিজেকে ঠকিও না। বি এফ স্কিনার সময় নির্ধারণ করে লেখা শুরু করতেন, শেষ করতেন। কতগুলো শব্দ লিখবেন, কয়টা প্যারাগ্রাফ হবে, সবই আগে ঠিক করে নিতেন তিনি।

 

কত কাজ কখন
কিছু কাজ গুরুত্বপূর্ণ, কিছু কাজ আবার দৈনন্দিন রুটিনের। ইমেইল যুগের আগে চিঠিপত্র লিখতে হতো। আশ্চর্য মনে হতে পারে, কিন্তু সত্য, তারা প্রচুর চিঠিপত্র লিখতেন। যারাই তাদের কাছে চিঠি লিখত, তারা জবাব দিতেন। অনেকে তাদের লেখালিখির সময়টা দুই ভাগে ভাগ করতেন। একভাবে তারা নিজেদের লেখা লিখতেন, আরেকভাবে তারা চিঠিপত্রের জবাব দিতেন। সাধারণত তারা সকালে মৌলিক কাজটি করতেন, বিকেলে চিঠিপত্র নিয়ে বসতেন। তবে তাদের একটা সুবিধা ছিল। বর্তমানের মতো যখন তখন বা অব্যাহতভাবে ইমেইল আসত না। ডাকপিয়ন এসে চিঠি দিয়ে যেত, একটা নির্দিষ্ট সময়ের পর তাদের ওই দিকে নজর দিলে চলত।

থামতে জানতেন
কখন লেখা বা আঁকার কাজে থামতে হবে তা তারা জানতেন। হেমিংওয়ে বলতেন, আপনি ওই পর্যন্ত লিখে যাবেন, যেখানে আপনি সাবলীল থাকবেন, জানবেন, পরের ঘটনা কী ঘটবে। তারপর ওই ঘটনার মধ্যে মগ্ন থেকেই পরদিন আবার লেখা শুরু করবেন। আর্থার মিলারও প্রায় একই কথা বলেছেন। তিনিও মাথায় যা আছে, সব কিছু তখনই লিখে ফেলার ধারণায় বিশ্বাস করতেন না। তবে ব্যতিক্রম ছিলেন ওলফগ্যাং আমরাডিয়াস মোজার্ট। তিনি সকাল ৬টায় উঠতেন, একের পর এক মিউজিক লেসন, কনসার্ট, সামাজিক কাজ করে যেতেন। কোনো কোনো দিন বিছানায় যেতে রাত ১টা বেজে যেত। সকালে অনেক কিছু লিখতেন। লাঞ্চের পর কিছুটা পায়চারী করতেন, চিঠিপত্রের জবাব দিতে এক থেকে দুই ঘণ্টা লেগে যেত।

 

সহায়ক সঙ্গী
প্রতিভাধরদের একজন খুব ভালো সঙ্গীর প্রয়োজন হয়। সিগমন্ড ফ্রয়েডের স্ত্রী মার্থা তার স্বামীর পোশাক, রুমাল এগিয়ে দিতেন। এমনকি তার টুথব্রাশে পেস্টও লাগিয়ে দিতেন। গারট্রুড স্টেইন গ্রাম এলাকায় মাঠে বসে লিখতে বসতেন। পরিবেশটা যাতে সবসময় গ্রামীণ থাকে, সে জন্য আশপাশে কয়েকটি গরু চড়তে থাকাটা তার জন্য বাধ্যতামূলক ছিল। এ কারণে অ্যালিস বি টোকলাসকে কয়েকটি গরু সবসময় যাতে তার দৃষ্টিসীমায় থাকে, তার ব্যবস্থা করতে হতো। গুস্তাভ মাহলার যখন সুর তৈরি করতেন, তখন কোনো ধরনের শব্দ একেবারেই সহ্য করতে পারতেন না। এ কারণে তার স্ত্রী প্রতিবেশীদের ঘুষ হিসেবে ওপেরার টিকিট দিতেন, যাতে তারা সঙ্গে করে তাদের কুকুরগুলোও নিয়ে যান। জ্যাঁ অস্টিন যাতে ঠিকমতো লিখতে পারেন, সে জন্য তার বোন ক্যাসান্দ্রাই ঘরবাড়ির যাবতীয় কাজ করে যেতেন।

 

সামাজিক কাজে না জড়ানো
অনেকেই সামাজিক কাজে জড়াতেন না। পার্টি বা সামাজিক অনুষ্ঠান বর্জন করতেন ভালোভাবেই। সিমোনে ডি বুভর তো কোনো রিসিপশন, পার্টিতে যেতেনই না মার্সেল প্রস্ট ১৯১০ সালে সব ধরনের সামাজিক অনুষ্ঠান বয়কটের ঘোষণা দিয়েছিলেন। পাবলো পিকাসো এবং তার গার্লফ্রেন্ড রোববারকে ‘গৃহদিবস’ হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন।