সাবধান ওষুধ হতে পারে মৃত্যুর কারন

Oct 12, 2017 02:26 pm
ওষুধ যখন ক্ষতি করে বেশি


হেলেন সিগনি

জুডি গ্রাহাম। বয়স ৬৭। মধ্যরাতে বাথরুমে যাবেন বলে বিছানা থেকে নামলেন। কিন্তু হঠাৎ মাথা ঘুরে পড়ে গেলেন। পড়ার আগে বিছানার পাশে থাকা টেবিলে লেগে চোয়াল গেল ভেঙে।


রক্তে পুরো ঘর ভেসে গেছে। জ্ঞান হারিয়েছেন তিনি। তার উদ্বিগ্ন স্বামী দ্রুত ফোন করে অ্যাম্বুলেন্স আনালেন। তাকে নিয়ে যাওয়া হলো হাসপাতালে। জ্ঞান ফিরলে ভাবলেন, কেন এমন হলো? তিনি স্বাস্থ্যবান, কাজকর্ম করতেও কোনো সমস্যা হয়নি। অবশ্য তিনি কয়েক দিন হলো উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ সেবন করছিলেন। খুব জরুরি ছিল না। তবুও তার মনে হয়েছিল, এখনই রক্তচাপটি নিয়ন্ত্রণ করা দরকার।
আর সেই ওষুধই তার কাল হয়েছে। হাসপাতাল চিকিৎসকেরা দেখলেন, তার রক্তচাপ অস্বাভাবিক কম। আর এর কারণেই তিনি মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছিলেন।


সারা দুনিয়ায় যে লাখ লাখ লোককে ওষুধ ভালোর চেয়ে খারাপের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, জুডি গ্রাহাম হলেন তার একটি উদাহরণ মাত্র।
অথচ এখন প্রায়ই দেখা যায়, বয়স যত বাড়ে, ব্যক্তিগত ওষুধের বাক্স তত বড় হচ্ছে। মনে হবে, একটা ফার্মেসিই বুঝি খুলে ফেলেছেন। তবে এখন গবেষকেরা জিজ্ঞাসা করতে চাচ্ছেন, ৫৫ বা তার বেশি বয়সের লোকদের সত্যিই কি এত বেশি ওষুধের প্রয়োজন?


সিডনির রয়্যাল নর্থ শোর হাসপাতালের অধ্যাপক সারা হিলাম বলেন, বয়স্কদের বেশি বেশি ওষুধ দেয়াটা একটি বড় সমস্যা। তার মতে, আমাদের বয়স যত বাড়ে, দেহ তত ভিন্নভাবে আচরণ করে। বয়স হলে আমাদের মাংসপেশিগুলো শিথিল হয়, চর্বি জমে বেশি। আমাদের যকৃৎ আর কিডনি ঠিকমতো কাজ করে না। ফলে যখন কম বয়স্ক ছিলাম, তার চেয়ে এই বয়সে আরো কম ওষুধের দরকার হয়।
বয়স্কদের চিকিৎসায় আরো কিছু বিষয় খেয়াল রাখতে হয়। তাদের নানা রোগ দেখা দেয়। সব রোগেরই চিকিৎসা দরকার। ফলে নানা ওষুধের দরকার। তবে ওষুধগুলো যাতে একটার সাথে আরেকটার সঙ্ঘাত না হয়, সে দিকে নজর রাখা উচিত। সব বিষয় মাথায় রেখে যদি ব্যবস্থাপত্র না লেখা হয়, তবেই বিপদ।


মাথা ঘোরানো সমস্যা ছাড়াই জুডির রক্তচাপের সমস্যা কাটানো গেছে। তবে তার চোয়াল এবং দুুটি দাঁত ভেঙে গিয়েছিল। সেগুলো সারিয়ে তুলতে বেশ কিছু দিন তাকে ভুগতে হয়েছে।


আর এর মাধ্যমে জুডি শিখেছেন, সবসময় ব্যবহৃত অনেক ওষুধও অনেক সময় মারাত্মক সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ায় এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, উচ্চ রক্তচাপের জন্য সর্বোচ্চ মাত্রার ওষুধের ব্যবস্থাপত্র দেয়া হচ্ছে। আর বয়স্কদের অতিরিক্ত চিকিৎসা প্রদান করা মানে ঝিমুনি আসা, স্মৃতিভ্রষ্টতা, কিডনি ইত্যাদি নানা সমস্যা দেখা দেয়া।


আবার ডায়াবেটিস রোগীদের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের দিকে চিকিৎসকেরা বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। কারণ এসব রোগীর হৃদরোগ ও স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে বেশি। কিন্তু বিশ্বজুড়ে চালানো এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, রক্তচাপ কমিয়ে দেয়া হলে ডায়াবেটিসে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।


সুইডেনে আরেক ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত অনেক রোগী উচ্চ রক্তচাপ নিয়ে চিকিৎসকের কাছে আসে। কিন্তু ওটা সত্যিকারের রক্তচাপ নয়। এসব রোগীর রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের ওষুধ দেয়া হলে তাদের হৃদরোগ ও স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায় ১৫ ভাগ।


আরেকটি সচরাচর দেখা যাওয়া রোগের নাম কোলেস্টেরল। বয়স্ক লোকদের কোলেস্টেরল কমানোর ওষুধ বুঝেশুনে না দিলে সমূহ বিপদের শঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে দুর্বলতা, পেশির ব্যথা দেখা দিতে পারে। এমনকি স্মৃতিভ্রষ্ট রোগেও আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
ডায়াবেটিস রোগ মানে ইনসুলিন। বিশেষ করে টাইপ ওয়ান এবং টাইপ টু ডায়াবেটিসে ইনসুলিন যেন অপরিহার্য বিষয়। কোনো লোক প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ইনসুলিন নিলে তার মধ্যে হাইপোগ্লিক্যামিয়া সৃষ্টি হতে পারে। অর্থাৎ তার রক্তপ্রবাহে গ্লুকোজের মাত্রা মারাত্মক কমে যেতে পারে। আর তা হওয়া মানে তিনি জ্ঞান হারাতে পারেন, এমনকি তার মৃত্যুও হতে পারে।


২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বয়স্কদের ক্ষেত্রে ইনসুলিন সমন্বয় করা খুবই কঠিন কাজ। খুব কম রোগীকেই যথাযথ পরিমাণ ইনসুলিন দেয়া হয়।


আরেকটি রোগ হলো ব্যথা। কত ধরনের যে ব্যথা আছে এবং সেগুলো যে কত ভোগায়, তার ইয়ত্তা নেই। আর ব্যথার ওষুধ পাওয়া যায় হাতের কাছে। আর এই ওষুধ রোগ সারায় ঠিকই, তবে ওষুধ সারাবে কে? সেই ওষুধটিই নানা জটিলতার সৃষ্টি করে। এমন সব রোগ সৃষ্টি করে যে, প্রাণবায়ুই বেরিয়ে যেতে চায়। এই সমস্যাটি সারা বিশ্বে অন্যতম একটি সমস্যা। এগুলো যে কোষ্ঠকাঠিন্য ও স্মৃতিশক্তিই নষ্ট করে দেয়, তা-ই নয়, এগুলো সহ্যক্ষমতাও বাড়িয়ে দেয়। আগে একটি ট্যাবলেট খেলে হয়তো ব্যথা সেরে যেত। পরে দেখা যায়, দুটিতেও কাজ হতে চায় না। অনেক রোগের সৃষ্টি অতি সামান্য ব্যথানাশক সেবন করতে গিয়ে।


বিশ্বজুড়েই ঘুমের ওষুধ সেবন করে চিরনিদ্রার দেশে যাওয়ার ঘটনা ঘটে সেটা ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায়। কিন্তু বয়স্ক লোকদের ঘুমের ওষুধে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া খুব বেশি মাত্রায় দেখা দেয়।


এই যে ওষুধ নিয়ে এমন ভয় ধরিয়ে দেয়া হলো, তাহলে কি ওষুধ সেবন করবেন না। অবশ্যই করবেন। তবে সম্ভব হলে মেডিক্যাল নির্দেশিকা অনুযায়ী আপনার চিকিৎসক ব্যবস্থাপত্র লিখছেন কি না সে দিকে লক্ষ রাখবেন। আর ওষুধ যত কম খাবেন ততই ভালো।
আর বয়স্ক লোকদের প্রতি একটি পরামর্শ দিয়েছেন ফার্মেসির অধ্যাপক ডা. ক্যারা তানেনবাম। তার কথা হলো, দিনে যদি ১২টির বেশি ট্যাবলেট সেবন করা হয়, তবে তার মানে হলো আপনি মাত্রাতিরিক্ত ওষুধ নিচ্ছেন। আপনি বিষয়টি নিয়ে আপনার চিকিৎসকের সাথে জোর গলায় তর্ক করতে পারেন।

রিডার্স ডাইজেস্ট থেকে অনুবাদ : মোহাম্মদ হাসান শরীফ